Ajker Patrika

কূটনৈতিক পথেই ঢাকা-দিল্লির বরফ গলাতে হবে

বাংলাদেশের উচিত হবে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেও আলোচনার দরজা খোলা রাখা। জাতীয় স্বার্থে যেখানে আপস করা যাবে না, সেখানে আপস না করা; আবার যেখানে সমঝোতার সুযোগ আছে, সেখানে অকারণে দেয়াল না তোলা।

চিররঞ্জন সরকার
কূটনৈতিক পথেই ঢাকা-দিল্লির বরফ গলাতে হবে

তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর আপাতত থমকে গেছে। কয়েক দিন আগেও যখন আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে জোর আলোচনা চলছিল, তখন মনে হচ্ছিল ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের বরফ হয়তো গলতে শুরু করেছে। কিন্তু ১৬ আগস্ট ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিল, সফরের জন্য এখনো অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি। দুই দেশের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ চললেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে জবাব চেয়েছে ঢাকা।

ঘটনাটি নিছক একটি প্রধানমন্ত্রীর সফর স্থগিত হওয়ার খবর নয়। এর মধ্যে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার একটি বড় প্রতিচ্ছবি আছে। কারণ, তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ছিল দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠনের একটি সুযোগ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবেও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে সফরটি কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ হওয়ার কথা ছিল না; এটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারত।

কিন্তু কূটনীতিতে সময় কখনো সরলরেখায় চলে না। এক সপ্তাহে যে দরজা খুলতে দেখা যায়, পরের সপ্তাহেই সেখানে তালা ঝুলে যেতে পারে। আবার সেই তালা চিরস্থায়ীও নয়। দরকার হয় সঠিক চাবির। ঢাকা-দিল্লির ক্ষেত্রে সেই চাবির নাম কূটনীতি।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। দুই দেশের সীমান্ত আছে, নদী আছে, বাণিজ্য আছে, জ্বালানি ও যোগাযোগের সম্পর্ক আছে, নিরাপত্তার স্বার্থ আছে। আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের রাজনৈতিক, সামরিক ও মানবিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ ভারতের ভূমিকার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অস্বীকারের কোনো সুযোগ রাখে না।

কিন্তু ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা আর রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের হিসাব এক জিনিস নয়। ইতিহাস কৃতজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু কূটনীতি পরিচালিত হয় জাতীয় স্বার্থ দিয়ে। বন্ধুত্ব টিকে থাকে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও স্বার্থের ভারসাম্যের ওপর। ফলে বাংলাদেশ যেমন ভারতের ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করতে পারে না, তেমনি বর্তমানের কোনো অমীমাংসিত প্রশ্নে চিরস্থায়ী নীরবতাও পালন করতে পারে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তাঁকে ফেরত চেয়েছে এবং দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় এ বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও ঢাকার অস্বস্তি বাড়িয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, এই বিষয়গুলো এখন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়; এগুলো দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিবেশকেও প্রভাবিত করছে।

ঢাকার অবস্থান তাই একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। একটি দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অন্য দেশে অবস্থান করছেন, তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে, আর সেই দেশের মাটি থেকে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন হলো, এই অস্বস্তির সমাধান কি সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে, নাকি আরও বেশি কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে? উত্তর দ্বিতীয়টিই হওয়া উচিত।

কারণ, ভারতকে এড়িয়ে বাংলাদেশ তার কোনো বড় জাতীয় স্বার্থ পূরণ করতে পারবে না। আবার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ রেখে ভারতও তার পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক স্বার্থ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারবে না। ভৌগোলিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো, প্রতিবেশী বেছে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশ চাইলে ভারতের জায়গায় অন্য কোনো দেশকে বসাতে পারবে না, ভারতও বাংলাদেশকে মানচিত্র থেকে সরিয়ে দিতে পারবে না। তাই বাস্তবতা যত প্রতিকূলই হোক, শেষ পর্যন্ত একই টেবিলে বসতেই হবে।

সেই টেবিলে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি অবশ্যই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। বাংলাদেশ তার আইনি অবস্থান তুলে ধরেছে এবং ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে। ভারতেরও নিজস্ব আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক বিবেচনা রয়েছে। ফলে ঢাকা দ্রুত সিদ্ধান্ত চাইতে পারে, কিন্তু দিল্লির প্রতিক্রিয়া যে বাংলাদেশের প্রত্যাশামতোই হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এই অমিলকে সংঘাতের কারণ না বানিয়ে আলোচনার বিষয় বানানোই পরিণত কূটনীতির কাজ।

একই কথা প্রযোজ্য ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের কাছে এটি গুরুতর ফৌজদারি ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়। ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানরত কোনো অভিযুক্তকে ফেরত পাওয়ার দাবি তাই ঢাকার কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার পথেই এগোতে হবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যেন কোনোভাবেই শেখ হাসিনা বনাম তারেক রহমানের সম্পর্ক হয়ে না যায়। শেখ হাসিনা একজন ব্যক্তি ও একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তারেক রহমান বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দুই রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক। ব্যক্তি ও সরকার বদলাবে, সম্পর্কের মৌলিক বাস্তবতা বদলাবে না।

ভারতের জন্যও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের জনগণ যদি মনে করে কোনো বিদেশি রাষ্ট্র একটি বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত, তাহলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই রাষ্ট্রের প্রতি জনমতও বদলে যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের স্বার্থে তাই বাংলাদেশের সব বৈধ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ভারসাম্য রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা। পররাষ্ট্রনীতি ভারতপন্থী বা ভারতবিরোধী হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে বাংলাদেশপন্থী। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, চীনের সঙ্গেও থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্য শক্তিগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক থাকবে। একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর অর্থ অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা নয়। বর্তমান বিশ্বে দক্ষ কূটনীতি মানেই বহু দরজা খোলা রাখা।

অর্থনীতির জায়গায় এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। খাদ্যপণ্য, কাঁচামাল, জ্বালানি, শিল্পপণ্যসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি যোগাযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যেও ভারতের গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার দরজা সংকুচিত হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা-বাণিজ্য।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ভারতের বিরুদ্ধে কোনো সশস্ত্র বা বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত না হওয়া যেমন ঢাকার দায়িত্ব, তেমনি সীমান্তে হত্যা, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান কিংবা মানবিক সমস্যাগুলো সমাধানে ভারতেরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। নিরাপত্তা যদি একতরফা দাবি হয়ে যায়, তাহলে আস্থা তৈরি হয় না। আস্থা তৈরি হয় যখন দুই পক্ষই নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্য পক্ষের উদ্বেগকেও গুরুত্ব দেয়।

পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, ভিসা, জ্বালানি, যোগাযোগ, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও প্রত্যর্পণসহ বহু বিষয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য আছে। কিন্তু মতপার্থক্য মানেই শত্রুতা নয়। বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতির আসল দক্ষতা হলো মতপার্থক্যের মধ্যেও সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা।

এই কারণেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে শুধু সফর হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি হতে পারত বরফ গলানোর একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। এখন সফরটি থমকে গেলেও কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়নি। বরং ঢাকার সাম্প্রতিক বক্তব্য দুই পক্ষের সামনে আলোচনার জন্য স্পষ্ট কিছু বিষয় তুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের উচিত হবে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেও আলোচনার দরজা খোলা রাখা। জাতীয় স্বার্থে যেখানে আপস করা যাবে না, সেখানে আপস না করা; আবার যেখানে সমঝোতার সুযোগ আছে, সেখানে অকারণে দেয়াল না তোলা। ভারতেরও উচিত বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্মান করা এবং সম্পর্ককে কোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে আবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা।

দুই দেশের সম্পর্কের বরফ এক দিনে গলবে না। কিন্তু বরফ গলানোর প্রথম শর্ত হলো কথা বলা। আর সেই কথোপকথনের দরজা যত দিন খোলা থাকে, তত দিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎও খোলা থাকে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত