Ajker Patrika

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জিতে যাচ্ছে রাশিয়া-চীন

রাজিউল হাসান
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৮: ৪৯
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জিতে যাচ্ছে রাশিয়া-চীন
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বিশ্বজুড়ে সংকট তত প্রকট হবে। ছবি: এএফপি

দুটি সাম্প্রতিক খবর দিয়ে লেখাটা শুরু করছি। প্রথম খবরটি হলো, রাশিয়ার তেলের ওপর শর্ত সাপেক্ষে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অপর খবরটি হলো, চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বিশ্বজুড়ে বেড়ে গেছে। দুটি সংবাদের সঙ্গেই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত-সংকটের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। সোজা কথায় যদি বলা হয়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কিন্তু জিতে যাচ্ছে রাশিয়া ও চীন।

ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। বোমার আঘাতে সব তছনছ হয়ে যাচ্ছে ইরানে। পাল্টা জবাবও দিচ্ছে তেহরান। তাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চল ও আরব অঞ্চলের দেশগুলো। ইরান সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিয়েছে, প্রতিবেশী কোনো দেশের ওপর তারা হামলা চালাতে ইচ্ছুক নয়, যদি না সেই দেশের ভূখণ্ড থেকে তেহরান আক্রান্ত হয়।

ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো যুদ্ধের শুরু থেকেই বলে আসছে, তাদের মাটি থেকে ইরানে হামলা চালানোর অনুমতি তারা দেয়নি, দেবেও না। কিন্তু সমস্যা যেটা হচ্ছে, উপসাগরীয় ও আরব অঞ্চলের দেশগুলোয় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। সেসব ঘাঁটি থেকে হামলা হওয়া মানে ওই দেশগুলো থেকেই হামলা হওয়া। ইরান এই যুক্তিতেই অনবরত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

এই যুদ্ধের প্রভাবে এরই মধ্যে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি টালমাটাল। ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ। সিএনএনের তথ্য বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে অন্তত ১৬টি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। এদিকে গত রোববারের তথ্য বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর মাত্র দুই সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ। তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। ইউরোপের দেশগুলোয়ও তেল-গ্যাসের দাম নিয়ে হাহাকার শুরু হয়েছে।

এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ৩২ সদস্যরাষ্ট্র তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তাতেও বাজারে প্রভাব পড়েনি। বাধ্য হয়ে রাশিয়ার তেলের ওপর শর্ত সাপেক্ষে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার শক্তির অন্যতম উৎস তেল বিক্রির অর্থ। সেই শক্তি ক্ষয় করতে রাশিয়ার ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। কিন্তু তারপরও ফাঁকফোকর দিয়ে রুশ তেল কেনাবেচা থামানো যায়নি। এ কারণে পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রুশ তেল কেনা দেশগুলোর ওপর বাড়তি শুল্ক চাপিয়েছিল। এ তালিকায় ভারতও ছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের জেরে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এখন নমনীয় যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে যে উদ্দেশ্যে তেলসহ রাশিয়ার বিভিন্ন খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞা শর্ত সাপেক্ষে প্রত্যাহারে সেই উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ অর্থনীতি এখন অনেকটাই দুর্বল। কিন্তু তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা যদি শিথিল থাকে, তাহলে সেই অর্থনীতি চাঙা হতে খুব বেশি সময় লাগবে না—এ কথা নিঃসন্দেহে বলে দেওয়া যায়। কারণ, তেলসহ খনিজ সম্পদকে রাশিয়ার অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা যায়।

এবার আসা যাক যুদ্ধক্ষেত্রে। অতিসম্প্রতি খবর বেরিয়েছে, যুদ্ধে ইরানকে ‘পেছনের দরজা’ দিয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করছে রাশিয়া ও চীন। ফলে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই রাশিয়া এ যুদ্ধে মুনাফা লুটছে না, সমরেও যুক্তরাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলছে তারা।

একই কথা খাটে চীনের ক্ষেত্রেও। দেশটি যুদ্ধ থামাতে বেশ তৎপরতা চালাচ্ছে। কিন্তু কোনো পক্ষই যেন থামতে নারাজ। এদিকে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, তেলের বাজার অস্থির হয়ে ওঠায় বিক্রি বেড়েছে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির। চীনা এই গাড়িগুলোর দাম যুক্তরাষ্ট্রের বৈদ্যুতিক গাড়ির তুলনায় অনেক কম। ফলে দ্রুত বাজার বড় হচ্ছে চীনা গাড়ির। এরই মধ্যে ভারতে আগের তুলনায় চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির হার বেড়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র গ্রেপ্তারের আগে চীনে তেলের অন্যতম বড় জোগানদাতা ছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ছিল আরেক বড় জোগানদাতা। ইরানও এখন আক্রান্ত। ফলে প্রাথমিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তায় ছিল চীন। কিন্তু রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় এবং নিজেদের তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় আপাতত দুশ্চিন্তামুক্ত বেইজিং। এই অবস্থায় যদি বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বাড়ে, তাহলে তো চীনের পোয়াবারো।

কাজেই আমরা সরাসরি উপসংহারে পৌঁছাতে পারি যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষ আসলে রাশিয়া-চীন। তবে একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। রাশিয়া ও চীন আরও ধনী হলেও বাংলাদেশসহ বাকি বিশ্বের উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর জন্য তা কতটা সুখবর, সেটা বিচার-বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এ ক্ষেত্রে একটা বিষয় অবশ্যই স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তেল পরিশোধনের ব্যবস্থা বাংলাদেশের থাকলেও রুশ তেল কিন্তু সরাসরি কিনে এনে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। এই তেল শোধনের ব্যবস্থা আছে প্রতিবেশী ভারতের। ফলে বাংলাদেশসহ যে দেশগুলোর রুশ তেল শোধনের সুযোগ নেই, তাদের নির্ভর করতে হবে তৃতীয় কোনো দেশের ওপর।

ফলে চীন-রাশিয়ার জয়ে যেমন বাকি বিশ্বের মুনাফা তেমন নেই, আবার হারানোরও আপাতত তেমন কিছু নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্য সংকট যত দ্রুত সমাধান হয়, ততই বিশ্ববাসীর জন্য মঙ্গল। এই যুদ্ধে এরই মধ্যে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে। ইসরায়েল গত রোববার ঘোষণা দিয়েছে, তারা আরও অন্তত তিন সপ্তাহ ইরানে হামলা চালাবে। স্বভাবতই ইরানও পাল্টা হামলা চালাবে। এদিকে ট্রাম্প তাঁর মিত্রদেশগুলোর প্রতি হরমুজ প্রণালি মুক্ত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে আহ্বানেও সেভাবে কেউ সাড়া দেয়নি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ আসলে কোন দিকে গড়াবে, কত দিন স্থায়ী হবে—তা এই মুহূর্তে কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু এটা সবাই এরই মধ্যে অনুধাবন করেছে যে যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বিশ্বজুড়ে সংকট তত প্রকট হবে।

কেউ কেউ হয়তো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পরামর্শ দেবেন। সেই প্রক্রিয়া বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। কিন্তু এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে তেলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বব্যবস্থাকে হঠাৎ করেই পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে নেওয়া অসম্ভব। ধীরে ধীরে তা করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্য হলো পুরো বিশ্বের তেল-গ্যাসের চাহিদার সিংহভাগের জোগানদাতা। কাজেই পুরো বিশ্বের স্বার্থেই এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা জরুরি। কিন্তু পরাশক্তিগুলো কোনো দিনই সাধারণের সেই চাওয়া পূরণের তাগিদ অনুভব করেনি। তারা কেবল মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার এবং এখানকার খনিজ সম্পদের ফায়দা লোটার মানসে কাজ করে গেছে। যুগ যুগ ধরে এই প্রক্রিয়া চলছে। তাতে ক্ষতি হয়েছে বিশ্বের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তুরস্ক ও সিঙ্গাপুরে ঈদুল ফিতরের তারিখ ঘোষণা, মধ্যপ্রাচ্যে চাঁদ দেখার প্রস্তুতি

অভিনেতা শামস সুমনের জানাজা সম্পন্ন, পরিবার দেশে ফিরলে দাফন

চাঁদ দেখা যায়নি, সৌদি আরবে ঈদ শুক্রবার

সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেসের ৯ বগি লাইনচ্যুত, উত্তরের ৫ জেলার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

পটিয়ায় ৩ বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত অন্তত ১৫

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত