অন্য যেকোনো দেশের নাগরিকের জন্য আমাদের বিমানবন্দরগুলো এক বিভীষিকাময় স্থান। আমরা প্রায়ই বিদেশি বিনিয়োগের জন্য হাহাকার করি, আমাদের সেই অনুরোধে যদি সেই সব দেশের কোনো বিনিয়োগকারী এখানে আসেন, বিমানবন্দরে নেমেই তো তাঁরা প্রথম ধাক্কাটা খাবেন।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের রাজনীতি আমার পছন্দ নয়। ওনার রাজনীতির গতিপথ খুবই এলোমেলো। বিএনপি থেকে উনি দুবার এমপি হয়েছেন। আবার পাঁচবার বহিষ্কার হয়েছেন। এতবার ওনাকে দল থেকে বের করে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে এতবার উনি দলে প্রবেশও করতে পেরেছিলেন! বিএনপি তাঁকে বারবার ত্যাগ করেছে, আবার বারবার গ্রহণও করেছে। তিনি নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও শেষ বয়সে এসে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন। তাঁর এই ডিগবাজিও আমার পছন্দ হয়নি। তবে তাঁর যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে বেশি অপছন্দের, সেটা হচ্ছে তাঁর মুখের ভাষা। প্রায়ই তিনি উলটা-পালটা কথা বলেন। উনি যখন মুখ খোলেন, আমি আতঙ্কিত বোধ করি। ভাবি—এই বুঝি এমন কিছু বলবেন, যা নিয়ে তুমুল হট্টগোল হবে। এটা কেবল ঘরোয়া আলোচনাতেই নয়, ওপেন প্ল্যাটফর্মেও তিনি ঝুঁকিপূর্ণ একজন ব্যক্তি। মুখের ভাষার পাশাপাশি উত্তেজিত অবস্থায় তাঁর মুখের হাবভাব পর্যন্ত পুরো পরিবেশকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। রেগে গেলে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে কথা বলেন। কেমন যেন একটা মারমুখী ভঙ্গি। এমনটা হতেই পারে, দুনিয়ার সব মানুষের চিন্তাভাবনা বা তার প্রকাশভঙ্গি তো আর এক রকম হবে না। কিন্তু এই বিষয়টাই যখন শালীনতার সীমারেখাকে অতিক্রম করে যায়, তখন সমস্যা হয়।
সে রকম একটা পরিস্থিতি আবার আমরা দেখলাম গত বৃহস্পতিবার। বিমানবন্দরে তিনি ক্ষুব্ধ ও রাগান্বিত অবস্থায় সিনিয়র সরকারি কর্মচারীদের যা তা বলেছেন। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে ঘাড় ধরে বের করে দিতে চেয়েছেন। চড়-থাপ্পড় মারতে চেয়েছেন। বলেছেন—তিনি নাকি তদবির করে ওই পদে বসেছেন, তিনি আসলে কোনো কাজই জানেন না। এই কথাবার্তা, এগুলো এখানে পড়তে যতটা আপত্তিকর মনে হচ্ছে, বাস্তবে ছিল অনেকগুণ বেশি অশালীন। তাঁর ওই উত্তেজিত গালাগালির ভিডিও দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। এগুলো দেখতে ভালো লাগেনি।
কিন্তু এর চেয়ে বেশি মন্দ লেগেছে ওই ‘অপরাধে’ মেজর (অব.) আখতারকে গ্রেপ্তার করা এবং রিমান্ডে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায়। ওনার আচরণ ভালো ছিল না, তাই বলে সেটা কি গ্রেপ্তার হওয়ার মতো? এ প্রশ্নের জবাবে হয়তো বলা হবে—উনি পাবলিক নুইসেন্স ক্রিয়েট করেছিলেন। জনসমক্ষে একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাকে অপমান করেছেন, হুমকি দিয়েছেন, এ কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আর মামলা হলে তো গ্রেপ্তার হতেই পারে। যুক্তিগুলো মন্দ নয়। গ্রেপ্তারের পেছনে কিছু কারণ নিশ্চয়ই আছে। আচ্ছা, উনি সেদিন বিমানবন্দরে খেপেছিলেন কেন? কোনো যৌক্তিক কারণ কি ছিল না এই ক্ষোভের?
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ওই ফ্লাইটে ওমরাহ ফেরত সাধারণ যাত্রী ছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। আর তাঁদের সঙ্গে ছিলেন মেজর (অব.) আখতার। ৮ নম্বর ব্যাগেজ বেল্টের সামনে লাগেজ সংগ্রহ করার সময় যাত্রীরা তীব্র ট্রলির সংকটের মুখোমুখি হন এবং লাগেজ ও পবিত্র জমজমের পানি পেতে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হয়। বিলম্বের এই দীর্ঘ সময় আসলে কতটুকু সময়? লাগেজের জন্য আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে! আর এর আগে লাগেজ বহনের ট্রলি পেতে লেগেছে ২০ থেকে ৩০ মিনিট! দীর্ঘ ভ্রমণের পর এয়ারপোর্টে নেমে যদি সঙ্গে সঙ্গে ট্রলি না পাওয়া যায়, লাগেজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, যে কারোরই মেজাজ খারাপ হওয়ার কথা।
আমাদের দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরে এটা একটা নিয়মিত ঘটনা। ট্রলি কিংবা লাগেজ পেতে ভোগান্তি হবেই। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন অনিয়ম হয় বলে আমার জানা নেই। মানুষ প্লেন থেকে নামবে, ইমিগ্রেশন পার হয়ে বেল্টের কাছে আসবে, আর তার লাগেজ পেয়ে যাবে। অপেক্ষা যদি কখনো করতে হয়, সেটা ১০ মিনিটের বেশি হবে না। কারণ সেসব এয়ারপোর্টে প্লেন থেকে বেল্ট পর্যন্ত লাগেজ আসে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। আর আমাদের দেশে পুরো কাজটিই হয় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। প্লেন থেকে প্রতিটি লাগেজ ধরে ধরে নামিয়ে একটা ভ্যানে তোলা হয়, সেখান থেকে আবার নামিয়ে তোলা হয় বেল্টে। আবার হাতে ধরে এই দুবার নামানো-ওঠানোর ফলে অনেক লাগেজ ছিঁড়ে যায়, ড্যামেজ হয়। দুনিয়া এগিয়ে গেছে, বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টগুলো স্বাভাবিক গতিতেই আধুনিক হয়ে গেছে, আর আমরা পড়ে আছি এখনো সেই মান্ধাতার আমলে।
আমি নিশ্চিত, অন্য যেকোনো দেশের নাগরিকের জন্য আমাদের বিমানবন্দরগুলো এক বিভীষিকাময় স্থান। আমরা প্রায়ই বিদেশি বিনিয়োগের জন্য হাহাকার করি, আমাদের সেই অনুরোধে যদি সেই সব দেশের কোনো বিনিয়োগকারী এখানে আসেন, বিমানবন্দরে নেমেই তো তাঁরা প্রথম ধাক্কাটা খাবেন। ভাববেন—এ কোন দেশে এসে পড়লাম! লাগেজের জন্য দুই-আড়াই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবেন বোকার মতো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর লাগেজ পেলেও হয়তো দেখবেন সেটা কাটা-ছেঁড়া। ভেতর থেকে মূল্যবান জিনিস উধাও। হাজার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না। কদিন আগে এ রকম একটা ঘটনার ভিডিও দেখেছিলাম। এক প্রবাসী দেশে ফিরেছেন, লাগেজ হাতে নিয়ে দেখে সেটা কাটা। ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। রাগে-ক্ষোভে ভদ্রলোক লাগেজের বাকি জিনিসপত্র সেখানেই ফেলে দিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন। আশপাশের লোকজন দাঁড়িয়ে তা দেখছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার হয়নি। উনিও ফেরত পাননি কিছুই। কিছুদিন আগে আর একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছিল। তাতে দেখা যাচ্ছিল প্রবাসী এক ভদ্রলোক কোনো ট্রলি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মালামাল নিজের মাথায় তুলে নিয়ে বের হচ্ছিলেন।
এসব তো বিদেশ থেকে ফেরার সময়কার বিড়ম্বনা। বিদেশে যাওয়ার সময়ও কিন্তু ভোগান্তি কম হয় না। দুসপ্তাহ আগের একটা ঘটনা বলি। সেদিন আমি নিজেই বিদেশে যাচ্ছিলাম। গাড়ি থেকে নেমেই দেখি রীতিমতো মাছবাজারের মতো ভিড়। একজন যাচ্ছেন তো তাঁকে বিদায় দিতে দশজন এসে হাজির। বিশাল এক মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছেন, সেটা রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনে গাড়ির লাইন, কেউ সামনে যেতে পারছেন না, এক বিকট স্থবির পরিস্থিতি। এর মধ্যে যাঁরা মালামাল নিয়ে নামতে পেরেছেন, তাঁরা আবার ভেতরে ঢুকতে পারছেন না। সেখানেও লম্বা লাইন। সব মিলিয়ে এক চরম অব্যবস্থা।
এসব দেখে যদি কেউ খেপে যান, তাঁকে কি খুব দোষ দেওয়া যাবে? আসলে যাঁরা বিদেশে যান বা বিদেশ থেকে আসেন, তাঁদের প্রায় সবারই রয়েছে এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। তারা সবাই ক্ষুব্ধ হন, কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের জায়গা পান না। মেজর আখতার সেই ক্ষোভটিই প্রকাশ করেছেন। হয়তো তিনি খুব আদুরে ভঙ্গিতে প্রতিবাদ করেননি, ওনার স্বভাবসুলভ উগ্র ভঙ্গিতে করেছেন। এতটা উগ্রতা হয়তো না দেখালেও পারতেন। কিন্তু যে কারণে তিনি রাগটা প্রকাশ করেছেন, সেই কারণটা কী মিথ্যা? ভয়ংকর অনিয়ম তো আসলেই চলছে। বিমানবন্দরের যিনি নির্বাহী পরিচালক, তাঁর আসলে কাজটা কী? এই সব অনিয়ম তো তাঁরই দূর করার কথা। তিনি কি সেটা পারছেন? না পারাটা কি তাঁর অযোগ্যতা নয়? অযোগ্য লোককে কেন অযোগ্য বলা যাবে না? বললেই গিয়ে তিনি মামলা করে দেবেন?
আমাদের সরকার বিমানবহর নিয়ে বেশ চিন্তা করে। এরই মধ্যে ২৫টি নতুন বোয়িং কেনার জন্য চুক্তি করেছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, এ মাসেই নাকি আরও ১০টি এয়ারবাস কেনার চুক্তি হবে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে বিমান কিনছেন, কিন্তু বিমানবন্দরকে আধুনিকায়ন করতে কোনোই উদ্যোগ নিচ্ছেন না। এটা কেমন বৈপরীত্য? মানুষ কিন্তু এয়ারক্রাফট দেখেই তাতে চড়বে না, সেই এয়ারক্রাফট যে বন্দরে নামবে তার সুযোগ-সুবিধাও দেখতে চাইবে। সেটা তো ঠিক করবেনই না, আবার তা নিয়ে কথা বললে মন খারাপ করবেন, রেগে যাবেন! এ কেমন কথা!
লেখাটা শেষ করার আগে একটা ছোট্ট প্রশ্ন করি। মেজর আখতার কিন্তু নতুন করে এমন বদরাগী হননি। অনেক আগে থেকেই তিনি এমন। আজকে যে কথার জন্য তিনি জেলে গেছেন, তিনি যদি জামায়াতে যোগ না দিতেন, যদি এখনো বিএনপিতেই থাকতেন, তবু কি এই আচরণের জন্য তাঁকে এভাবে রিমান্ডে নেওয়া হতো?
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

একটি প্রচলিত কথা আছে, মোমবাতি নিজে পুড়ে অন্যকে আলো দেয়। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রবাদটি অনেকখানি সত্য। শিক্ষকেরা কোনো শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দেন, কারও ভেতরে এমন এক আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে দেন, যা দিয়েই শিক্ষার্থীরা সামনে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রণা পেয়ে যায়।
১ ঘণ্টা আগে
দেশে যে মগের মুলুক চলছে, তা নানা ঘটনায় বোঝা যায়। আর এসব ঘটনায় জনগণকে বলির পাঁঠা বানানো হয়। গণ-অভ্যুত্থান হয়, সরকারের পতন ঘটে আবার নতুন সরকার আসে; কিন্তু জনগণের সংকটের কোনো সুরাহা হয় না।
১ ঘণ্টা আগে
আমাদের অধিকাংশের কাছেই কবির বকুল মূলত গীতিকার। তাঁর লেখা গান বাংলাদেশের জনপ্রিয় শ্রুতি-সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে; শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তাঁর এই পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করেছে।
১৬ ঘণ্টা আগে
টাকা কামানো আজকাল খুব সহজ হয়ে গেছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—সবাই পারবেন, শুধু মাথাটা এদিক-সেদিক নাড়িয়ে নিতে হবে। এর আগে পৌঁছাতে হবে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার এক মুরগির খামারে, নয়তো ডেমাজানি ব্রিজের কাছে একটি গুদামে। সেখানে গিয়ে ফিটফাট হয়ে কয়েকটা ছবি তুলে বা ভিডিও করলে পাওয়া যায়...
১ দিন আগে