জাহীদ রেজা নূর

অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতায় তখন আকাশে উড়ছে শকুন। রাজপথে চিৎকার করছে কুকুর। আকাশে ‘কা কা’ করে কর্কশ কণ্ঠে ডেকে কাকেরা বুঝিয়ে দিচ্ছে, সোনার বাংলাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে পাকিস্তানি হানাদারেরা।
২৩ মার্চ স্থানীয় স্কুলে পাকিস্তানি পতাকা না উড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা আর শোকের কালো পতাকা ওড়ানোয় স্থানীয় বিহারিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। বাঙালিরা মিরপুর ছাড়তে শুরু করে। ডাকসাইটে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবও ২৪ মার্চ তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলেকে পাঠিয়ে দেন চামেলীবাগে বোনের বাড়িতে।
২৫ মার্চেও তিনি ফিরতে চেয়েছিলেন মিরপুর। কিন্তু পরিবারের সবাই তাঁকে বারণ করলে তিনি চামেলীবাগে থেকে যান। যাঁরা ইতিহাসের এই অংশটুকু জানেন, তাঁরা বলতে পারবেন ২৬ মার্চ সান্ধ্য আইনের কারণে কেউ বাইরে বের হতে পারেনি। সেই সুযোগে পাকিস্তানি সেনারা চালিয়েছিল হত্যাযজ্ঞ। ২৭ মার্চ সকালে কিছুক্ষণের জন্য সান্ধ্য আইন শিথিল করা হয়। এরপর ২৮ মার্চ ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। আবু তালেব ছুটে যান ইত্তেফাক অফিসে। দেখতে পান অফিসটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অফিসের ভেতরে নিথর কয়েকটি লাশ।
এ সময় মিরপুরে নিজের বাড়িতে যাওয়ার জন্য তাঁর মন উতলা হয়ে ওঠে। পরিবার, আত্মীয়স্বজনের নিষেধ অমান্য করে তিনি ২৯ মার্চ চলে যান মিরপুরে। অনেকেই তাঁকে সতর্ক করে বলেছিল, বিহারিরা মাথায় লালপট্টি বেঁধে বাঙালিদের হত্যা করছে, লুটপাট চালাচ্ছে। কিন্তু কিসের এক অমোঘ আকর্ষণে মিরপুরে নিজের বাড়িটা অক্ষত আছে কি না, দেখতে চলে যান তিনি। নিজেকে প্রবোধ দেন এই বলে, ‘ওরা তো আমাকে চেনে। আমি তো কারও ক্ষতি করিনি। ওরা কেন আমার ক্ষতি করবে?’
খন্দকার আবু তালেব বোঝেননি, সে সময় এই বিহারি এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিকে তাদের শত্রু মনে করেছে। এবং দেখামাত্রই বাঙালিদের হত্যা করতে চেয়েছে। অপারেশন সার্চলাইটের অন্তর্নিহিত উচ্চারণ ছিল, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, অথবা সমর্থক প্রত্যেককেই হত্যা করতে হবে। ধর্মীয় পরিচয়ে কেউ হিন্দু হলে হত্যা করতে হবে। ফলে সে সময় বাঙালিমাত্রই ছিল ‘বধযোগ্য’—এটা এখন কারও কাছেই অপরিষ্কার নয়।
২৯ মার্চ অফিসে যাচ্ছিলেন খন্দকার আবু তালেব। পথে দেখা হয় ইত্তেফাকের অবাঙালি চিফ অ্যাকাউনটেন্ট আবদুল হালিমের সঙ্গে। তিনিই আবু তালেবকে নিজের গাড়িতে নিয়ে আসেন মিরপুরে। এর পরের কথা শুনেছি খন্দকার আবু তালেবের মেয়ে সখিনা খন্দকারের কাছে। তিনি বলেছেন, এই আবদুল হালিমই খন্দকার আবু তালেবকে তুলে দেন কাদের মোল্লার হাতে। এরপর খন্দকার আবু তালেবকে হত্যা করা হয়। তাঁর লাশ খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলা হয়। পাকিস্তানিরা রক্তের নেশায় কতটা নৃশংস হয়ে উঠেছিল, খন্দকার আবু তালেব হত্যাকাণ্ড তারই একটি নমুনামাত্র।
খন্দকার আবু তালেব আমাদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। প্রিয়জন ছিলেন। আমার আব্বা সিরাজুদ্দীন হোসেনের সঙ্গে তাঁর ছিল অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। দেশভাগ হওয়ার পর দুজনই কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায়। দৈনিক আজাদে চাকরি করেন। পরে দুজনই চলে আসেন ইত্তেফাকে। সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক, খন্দকার আবু তালেব ছিলেন প্রধান প্রতিবেদক। আর তাঁদেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু তোহা খান ছিলেন অসাধারণ অনুবাদক। এই তিনজনকে ‘সাংবাদিক ত্রয়ী’ নামে ডাকা হতো।
সে যুগে সাংবাদিকতার সঙ্গে সততার যোগসূত্র ছিল। তৈলমর্দনের মাধ্যমে বিশাল সাংবাদিক হওয়ার রেওয়াজ তখনো চালু হয়নি। সম্পাদক বা ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের স্যাটেলাইট হয়ে কেউ উন্নতির স্বপ্ন দেখত না। নিষ্ঠা, একাগ্রতা, সততার মূল্য ছিল। খন্দকার আবু তালেব ছিলেন সে রকমই একজন নিষ্ঠাবান সাংবাদিক। বড় ভাইদের কাছ থেকে তাঁর অনেক রসিকতার কথা শুনেছি। কোনো এক সময় বৃহৎ পরিসরে তা লেখা যাবে। এখানে শুধু বলে রাখি, এখন পর্যন্ত এই লেখায় তারিখ দিয়েছি শুধু, সালের উল্লেখ করিনি। যিনি পড়বেন, তিনি যেন তাঁরই মেধার বলে সালটা বেছে নিতে পারেন। শহীদ আবু তালেবরা যে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে দেশটি আজ কোন অবস্থায় আছে, সেটা তাঁরা দেখে যেতে পারেননি। স্বাধীনতার পর এই পঞ্চাশের অধিক বছরেও সে স্বপ্ন রয়ে গেছে অধরা। বরং এখন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকগুলো ভাঙচুর করছে একদল দুর্বৃত্ত। ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চাইছে। এ সময় খন্দকার আবু তালেব বেঁচে থাকলে কী লিখতেন তিনি, সে কথা ভাবার চেষ্টা করি!
নরপশুদের হাতে নৃশংসভাবে খণ্ডবিখণ্ড লাশে পরিণত হওয়া খন্দকার আবু তালেবকে স্মরণ করে বলি, ‘তালেব মামা, উঠুন তো! আপনার কলমটা হাতে নিন! মেরুদণ্ডী প্রাণীই কেবল পারে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে! এই নিন কলম। লিখুন!’
লেখক: উপসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতায় তখন আকাশে উড়ছে শকুন। রাজপথে চিৎকার করছে কুকুর। আকাশে ‘কা কা’ করে কর্কশ কণ্ঠে ডেকে কাকেরা বুঝিয়ে দিচ্ছে, সোনার বাংলাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে পাকিস্তানি হানাদারেরা।
২৩ মার্চ স্থানীয় স্কুলে পাকিস্তানি পতাকা না উড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা আর শোকের কালো পতাকা ওড়ানোয় স্থানীয় বিহারিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। বাঙালিরা মিরপুর ছাড়তে শুরু করে। ডাকসাইটে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবও ২৪ মার্চ তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলেকে পাঠিয়ে দেন চামেলীবাগে বোনের বাড়িতে।
২৫ মার্চেও তিনি ফিরতে চেয়েছিলেন মিরপুর। কিন্তু পরিবারের সবাই তাঁকে বারণ করলে তিনি চামেলীবাগে থেকে যান। যাঁরা ইতিহাসের এই অংশটুকু জানেন, তাঁরা বলতে পারবেন ২৬ মার্চ সান্ধ্য আইনের কারণে কেউ বাইরে বের হতে পারেনি। সেই সুযোগে পাকিস্তানি সেনারা চালিয়েছিল হত্যাযজ্ঞ। ২৭ মার্চ সকালে কিছুক্ষণের জন্য সান্ধ্য আইন শিথিল করা হয়। এরপর ২৮ মার্চ ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। আবু তালেব ছুটে যান ইত্তেফাক অফিসে। দেখতে পান অফিসটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অফিসের ভেতরে নিথর কয়েকটি লাশ।
এ সময় মিরপুরে নিজের বাড়িতে যাওয়ার জন্য তাঁর মন উতলা হয়ে ওঠে। পরিবার, আত্মীয়স্বজনের নিষেধ অমান্য করে তিনি ২৯ মার্চ চলে যান মিরপুরে। অনেকেই তাঁকে সতর্ক করে বলেছিল, বিহারিরা মাথায় লালপট্টি বেঁধে বাঙালিদের হত্যা করছে, লুটপাট চালাচ্ছে। কিন্তু কিসের এক অমোঘ আকর্ষণে মিরপুরে নিজের বাড়িটা অক্ষত আছে কি না, দেখতে চলে যান তিনি। নিজেকে প্রবোধ দেন এই বলে, ‘ওরা তো আমাকে চেনে। আমি তো কারও ক্ষতি করিনি। ওরা কেন আমার ক্ষতি করবে?’
খন্দকার আবু তালেব বোঝেননি, সে সময় এই বিহারি এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিকে তাদের শত্রু মনে করেছে। এবং দেখামাত্রই বাঙালিদের হত্যা করতে চেয়েছে। অপারেশন সার্চলাইটের অন্তর্নিহিত উচ্চারণ ছিল, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, অথবা সমর্থক প্রত্যেককেই হত্যা করতে হবে। ধর্মীয় পরিচয়ে কেউ হিন্দু হলে হত্যা করতে হবে। ফলে সে সময় বাঙালিমাত্রই ছিল ‘বধযোগ্য’—এটা এখন কারও কাছেই অপরিষ্কার নয়।
২৯ মার্চ অফিসে যাচ্ছিলেন খন্দকার আবু তালেব। পথে দেখা হয় ইত্তেফাকের অবাঙালি চিফ অ্যাকাউনটেন্ট আবদুল হালিমের সঙ্গে। তিনিই আবু তালেবকে নিজের গাড়িতে নিয়ে আসেন মিরপুরে। এর পরের কথা শুনেছি খন্দকার আবু তালেবের মেয়ে সখিনা খন্দকারের কাছে। তিনি বলেছেন, এই আবদুল হালিমই খন্দকার আবু তালেবকে তুলে দেন কাদের মোল্লার হাতে। এরপর খন্দকার আবু তালেবকে হত্যা করা হয়। তাঁর লাশ খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলা হয়। পাকিস্তানিরা রক্তের নেশায় কতটা নৃশংস হয়ে উঠেছিল, খন্দকার আবু তালেব হত্যাকাণ্ড তারই একটি নমুনামাত্র।
খন্দকার আবু তালেব আমাদের খুব কাছের মানুষ ছিলেন। প্রিয়জন ছিলেন। আমার আব্বা সিরাজুদ্দীন হোসেনের সঙ্গে তাঁর ছিল অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। দেশভাগ হওয়ার পর দুজনই কলকাতা থেকে চলে আসেন ঢাকায়। দৈনিক আজাদে চাকরি করেন। পরে দুজনই চলে আসেন ইত্তেফাকে। সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক, খন্দকার আবু তালেব ছিলেন প্রধান প্রতিবেদক। আর তাঁদেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু তোহা খান ছিলেন অসাধারণ অনুবাদক। এই তিনজনকে ‘সাংবাদিক ত্রয়ী’ নামে ডাকা হতো।
সে যুগে সাংবাদিকতার সঙ্গে সততার যোগসূত্র ছিল। তৈলমর্দনের মাধ্যমে বিশাল সাংবাদিক হওয়ার রেওয়াজ তখনো চালু হয়নি। সম্পাদক বা ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের স্যাটেলাইট হয়ে কেউ উন্নতির স্বপ্ন দেখত না। নিষ্ঠা, একাগ্রতা, সততার মূল্য ছিল। খন্দকার আবু তালেব ছিলেন সে রকমই একজন নিষ্ঠাবান সাংবাদিক। বড় ভাইদের কাছ থেকে তাঁর অনেক রসিকতার কথা শুনেছি। কোনো এক সময় বৃহৎ পরিসরে তা লেখা যাবে। এখানে শুধু বলে রাখি, এখন পর্যন্ত এই লেখায় তারিখ দিয়েছি শুধু, সালের উল্লেখ করিনি। যিনি পড়বেন, তিনি যেন তাঁরই মেধার বলে সালটা বেছে নিতে পারেন। শহীদ আবু তালেবরা যে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে দেশটি আজ কোন অবস্থায় আছে, সেটা তাঁরা দেখে যেতে পারেননি। স্বাধীনতার পর এই পঞ্চাশের অধিক বছরেও সে স্বপ্ন রয়ে গেছে অধরা। বরং এখন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকগুলো ভাঙচুর করছে একদল দুর্বৃত্ত। ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চাইছে। এ সময় খন্দকার আবু তালেব বেঁচে থাকলে কী লিখতেন তিনি, সে কথা ভাবার চেষ্টা করি!
নরপশুদের হাতে নৃশংসভাবে খণ্ডবিখণ্ড লাশে পরিণত হওয়া খন্দকার আবু তালেবকে স্মরণ করে বলি, ‘তালেব মামা, উঠুন তো! আপনার কলমটা হাতে নিন! মেরুদণ্ডী প্রাণীই কেবল পারে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে! এই নিন কলম। লিখুন!’
লেখক: উপসম্পাদক, আজকের পত্রিকা

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। বর্তমানে তিনি ‘অলটারনেটিভস’ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক।
২১ ঘণ্টা আগে
উত্তর আমেরিকার শীতকালটা বেশ অদ্ভুত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ১০ তারিখে পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গে এসে দেখলাম, সব ঝকঝকে পরিষ্কার, রোদ ঝলমল দিন, রাস্তার কোলে সরু ফিতার মতো স্বল্প কিছু তুষার স্তূপ জড়ো হয়ে রয়েছে, ছোট ছোট সাদা সাদা তুষারের পাতলা টুকরো রয়েছে পাহাড়ের উপত্যকাজুড়ে, নিষ্পত্র বৃক্ষময় বনের ভেতর।
২১ ঘণ্টা আগে
দেশে বর্তমানে ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমে নিযুক্ত আছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজেই রয়েছে ১০ লাখের বেশি শিশু। এ রকম একটি তথ্য হাজির করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই সরকার শিশুশ্রম দূর করতে চায়।
২১ ঘণ্টা আগে
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তরল পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের তীব্র সংকট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার একটি সংকেত মাত্র। যদিও সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির ঘাটতি দীর্ঘকালের। সাধারণভাবে কখনো কম কখনো বেশি ঘাটতি নিয়েই দেশ চলেছে। এবারের মতো সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব কালেভদ্রেই হয়ে থাকে।
২ দিন আগে