দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে ২০০১-০৬ মেয়াদকালে সরকারের অন্যতম প্রচারণা ছিল, ‘বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত অনেকে সেই প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। সরকারের বাইরের কোনো কোনো বিশেষজ্ঞও এ ক্ষেত্রে প্রচণ্ডভাবে সরব ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন বুয়েটের একজন অধ্যাপকও, যিনি পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা হয়েছিলেন (২০০৮-০৯)। জন-আলোচনা মতে, ‘বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’ সংক্রান্ত তাঁদের সেদিনের প্রচারণা ছিল বস্তুত কানাডাভিত্তিক কোম্পানি নাইকোসহ কোনো কোনো বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে গড়ে ওঠা সখ্যেরই ফল। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে পাইপলাইনে করে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে বিদেশে গ্যাস রপ্তানি করা। আর বিদেশে গ্যাস রপ্তানি করতে হলে ‘দেশে এর পর্যাপ্ত মজুত আছে’, এটি বোঝানোর জন্য ‘দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’ বলাটাই ছিল সেদিনের নীতিনির্ধারকদের জন্য উত্তমতম স্লোগান।
গ্যাস রপ্তানির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা ক্ষমতায় আসীনদের ওই সব আত্মঘাতী প্রচারণা তথা গ্যাস রপ্তানির উদ্যোগ ঠেকাতে এ দেশের দেশপ্রেমিক সচেতন জনগণকে সে সময় আন্দোলন করাসহ অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।
সে ক্ষেত্রে আন্দোলনকারীদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল নানামাত্রিক প্রতিবাদ সংগঠিত করার পথে দেশের বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মতামত ও অংশগ্রহণকে একত্র করতে পারা। বস্তুত দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধ লেখা, সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং অন্যান্য গণমাধ্যম প্রচারণায় অংশ নেওয়ায় সেদিন দেশব্যাপী গ্যাস রপ্তানিবিরোধী জনমত গড়ে ওঠার বিষয়টি অনেকাংশে সহজ হয়ে উঠেছিল। আর সেরূপ সর্ববিস্তৃত ও গভীরতাপূর্ণ জনমতই কার্যত ওই আন্দোলন-প্রতিবাদকে বহুলাংশে সফল করে তুলতে পেরেছিল। তবে গ্যাস রপ্তানি ঠেকানোর আন্দোলন সফল হলেও অবাধ গ্যাস রপ্তানিতে বাংলাদেশ সম্মত না হওয়ার কারণে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের আগ্রহে তখন ঠিকই ভাটা পড়ে। সেই আন্দোলনের কারণে অন্তরালের বনিবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও তখন এ ব্যাপারে অর্থাৎ গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
উল্লেখ্য, বিশেষজ্ঞ অভিমত অনুযায়ী বাংলাদেশের অনাবিষ্কৃত সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে রপ্তানি করার মতো অঢেল মজুত না থাকলেও আরও বেশ কিছু সময় ধরে স্থানীয় চাহিদা পূরণের মতো মজুত সেখানে রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও উক্ত আন্দোলন-উত্তর পরিস্থিতিতে সরকারি উপেক্ষার কারণে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ তখন অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। অথচ ‘বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’ প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত দেশি-বিদেশি পক্ষ যদি সে সময় রপ্তানি-আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে এসে শুধু স্থানীয় বাজারের কথা বিবেচনায় রেখে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যেত, তাহলে এত দিনে বাংলাদেশের গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি ঘটতে পারত। তদুপরি এ কাজে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের তেল-গ্যাস কোম্পানি বাপেক্সকে যুক্ত করা হলে এর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যেমন বাড়ত, তেমনি এ কাজে অর্থব্যয়ও বহুলাংশে কমে আসত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তৎকালীন সরকারের কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থপর চিন্তার কারণেই সেদিন দেশের সমুদ্র বা স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যাপারে বর্ধিত কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই দেশের জ্বালানি মজুত পরিস্থিতিও ক্রমেই নাজুকতার দিকে এগোতে থাকে।
উক্ত প্রেক্ষাপটে ধারণা করা হয়েছিল, সরকার বদলের পর হয়তো গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটবে, অর্থাৎ গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে নতুন সরকার (২০০৯-১৪) বিশেষ উদ্যোগ নেবে। তদুপরি মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমার বিষয়ে সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ২০১২ সালের মার্চে বাংলাদেশের পক্ষে রায় দিলে সে ধারণা ও আশাবাদ—দুই-ই আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
কিন্তু সবাইকে হতাশ করে অতি অল্প সময়ের মধ্যে নতুন সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরাও আশার গুড়ে বালি ঢেলে বিদেশ থেকে এলএনজি এবং আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর মধ্য দিয়ে চাপা পড়ে যায় গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে সাধারণ মানুষের বিপুল প্রত্যাশাও। এবং সবচেয়ে বেশি হতাশা তৈরি করে এ ঘটনা, যখন দেখা গেল, সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের কাছ থেকে পাওয়া জলক্ষেত্রের বিষয়ে সরকার একেবারে নিশ্চুপ। অথচ সেখানেই গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল সর্বাধিক।
কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত এবং ব্যবস্থা নিতে থাকে এলএনজি ও এলপিজি আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের পক্ষে, যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে গুটিকতক মুখচেনা বেসরকারি কোম্পানি, যারা এই ব্যবসাকে এখন একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং যাচ্ছেতাইভাবে অযৌক্তিক হারে মুনাফা লুটে যাচ্ছে।
উল্লিখিত ঘটনাবলি থেকে প্রতীয়মান হয়, বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা থেকে পেট্রোবাংলাকে বিরত রাখা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আগের সরকারের নেওয়া জনস্বার্থবিরোধী এসব সিদ্ধান্ত এখনো একই ধারায় ও চেতনায় বহাল আছে। আর আগামী নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের জন্য যারা প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের কারও প্রস্তুতি বা অঙ্গীকারেও গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলনসহ সম্ভাব্য জ্বালানিনীতি সম্পর্কে একটি শব্দেরও উল্লেখ নেই। এর মানে হচ্ছে, অতীতের মতো আগামী দিনেও হয়তো গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিবর্তে গ্যাস আমদানিকে উৎসাহদানই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অন্যতম জ্বালানি নীতিমালা। এতে করে ওই বেসরকারি কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে লাভবান হতে থাকলেও তার জন্য বর্তমানের
মতো ভবিষ্যতেও উচ্চমূল্যের মাশুল গুনতে হবে দেশের সাধারণ ভোক্তাদের; এবং এই একই ধারার জ্বালানি নীতির কারণে জনগণের ভোগান্তির মাত্রা দিনে দিনে আরও বাড়তেই থাকবে।
অন্যদিকে ওই নীতিমালা অব্যাহত থাকার কারণে ক্রমাগতভাবে পিছিয়ে পড়বে দেশের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম তথা জ্বালানি খাত এবং এর ধারাবাহিকতায় একপর্যায়ে এ খাত অনিবার্যভাবে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে, যার কিছু কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে। এমনই পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতের বৃহত্তর স্বার্থে এখানে অতি সংক্ষেপে দুটি প্রস্তাব তুলে ধরা হলো:
এক. আগামী নির্বাচনে জিতে যারা সরকার গঠন করতে চায়, তাদের উচিত দলের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে নিজেদের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করা। অর্থাৎ ক্ষমতায় গেলে তারা কি গ্যাস আমদানিকে প্রাধান্যদানের বর্তমান ধারাই অব্যাহত রাখবে, নাকি গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করবেন, সেই বিষয়গুলো খোলাসা করা দরকার।
দুই. নির্বাচনে জয়লাভ করে যারাই দায়িত্বে আসুক না কেন, তাদের উচিত হবে অবিলম্বে গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে কূপ খননের লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প নেওয়া। এই উদ্দেশ্যে খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ মন্ত্রণালয় যত দ্রুত সম্ভব বাপেক্সকে প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির জন্য বলতে পারে; এবং বাপেক্স তেল-গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে লাভজনক সম্পর্কমুক্ত স্বাধীন ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে একাধিক ডিপিপি তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে পারে। পরিকল্পনা কমিশনের উচিত হবে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সঠিকভাবে প্রণীত ডিপিপিগুলো যত দ্রুত সম্ভব অনুমোদন করা। আর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে এগুলো বাস্তবায়ন করা।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে যেভাবে ব্যাপক পরিসরে আমদানিনির্ভর এবং আমদানির ক্ষেত্রে গুটিকতক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের তাঁবেদার হয়ে উঠেছে, তাতে করে গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যাপারে সরকারের শৈথিল্যপূর্ণ অবস্থানই টিকে যাবে বলে আশঙ্কা। অন্যদিকে, সাড়ে পাঁচ দশকের ব্যবধানেও দেশে নতুন কোনো জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপিত না হওয়াটাও এ খাতকে হীন উদ্দেশ্যে আমদানিনির্ভর করে রাখারই প্রমাণ বহন করে। বিষয়টি প্রচণ্ডভাবে দেশ ও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী। এমতাবস্থায় দেশের জ্বালানি খাতকে জনগণের স্বার্থের অনুগামী করে তুলতে হলে সর্বাগ্রে গ্যাস অনুসন্ধান এবং এর উত্তোলনের কার্যক্রম জোরদার করা এবং দেশে নতুন নতুন জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কাজগুলো সত্যি সত্যি হবে তো, যে লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাব এবং পর্যবেক্ষণ ওপরে তুলে ধরা হলো?
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল এবং এরপর তা যে খাতে প্রবাহিত হয়েছিল, তা নিয়ে বহুদিন ধরে বিতর্ক চলবে। চব্বিশ সালের মাঝামাঝি সময় যে ঘটনাবলিকে বিপ্লব না গণ-অভ্যুত্থান বলা হবে, তা নিয়ে ভাবছিল মানুষ, তারাই এই ২০২৬ সালে এসে ওই ঘটনার নানা ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।
৪২ মিনিট আগে
মাতৃদুনিয়ার রক্তাক্ত লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আজ আমরা নিদারুণভাবে ‘প্রাণবৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়ন’ ও ‘সবুজ অর্থনীতি’ নিয়ে কথা তুলছি। আমাদের কিষানিরা যখন বলেছিল, বীজ আমাদের বংশরক্ষার হাতিয়ার, রাষ্ট্র তা কানে তোলেনি। গ্রামের শিশি-বোতল-ডুলি-কলস-রাও-হাঁড়ি—সব শূন্য করে বীজসম্পদ তুলে দেওয়া হলো বহুজাতিক কোম্পানির
১ ঘণ্টা আগে
বাঙালির অতি আবেগ প্রকাশের জন্য খ্যাতি আছে। খেলার প্রধান উদ্দেশ্য মূলত আনন্দ পাওয়া। কিন্তু আনন্দের সঙ্গে যখন আবেগ জড়িত হয়ে মৃত্যু ও সংঘর্ষের কারণ হয়, তখন খেলা বিষাদে পরিণত হয়। প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবলে দেশে খেলা নিয়ে নানা ধরনের অঘটনের খবর পাওয়া যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমরা আজকের পত্রিকায় তিনটি খবর
১ ঘণ্টা আগে
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—তিনটি দেশ মিলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসর। ৪৮টি দল, ১০৪টি ম্যাচ, ১৬টি শহর এবং আনুমানিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রাজস্ব—শুধু এই সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায়, আধুনিক বিশ্বকাপ আর নিছক খেলার মাঠের বিষয় নয়।
১ দিন আগে