
এ বছরের শুরুর দিকে প্রায়ই একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কোন দল কত আসন পেতে পারে? প্রশ্নটা কেউ করেছেন সিরিয়াসলি, আবার কেউবা নেহাতই কথাচ্ছলে। আমি তো জ্যোতিষী নই, আমি কীভাবে বলব! যাঁরা প্রশ্ন করেছেন, তাঁরাও জানতেন, আমি জ্যোতিষী নই। তাহলে তাঁরা এমন প্রশ্ন কেন করতেন? আসলে তাঁরা জানতে চাইতেন নির্বাচনে দলগুলোর শক্তি-সামর্থ্যকে আমি কীভাবে মূল্যায়ন করি।
প্রশ্নটি নিয়ে আমি তখনই বেশ ভেবেছি। দেখতাম সম্ভাব্য জবাবগুলো বেশ কনফিউজিং। একেকবার একেক রকম মনে হয়। নানাজনের বিশ্লেষণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা হয়। ফলে অনেক ভেবেচিন্তে আমি একটা কৌশল অবলম্বন করলাম। ওই ধরনের প্রশ্নের জবাবে বলতে শুরু করলাম, কে কত আসন পাবে সেটা বলতে পারব না, তবে আমি কী চাই সেটা বলতে পারি। আমি চাই বিএনপি ১৭০ থেকে ১৮০টি আসন পাক, জামায়াত পাক ৮০ থেকে ৯০টি, বাকি আসনগুলো স্বতন্ত্র ও অন্যরা। বাস্তবে আমার সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আমার চাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি আসন বিএনপি পেয়ে গেছে। বিপরীত দিকে জামায়াত সামান্য কম পেয়েছে। স্বতন্ত্র এবং ছোট দলগুলো অনেক কম পেয়েছে। অনেকে তখন জিজ্ঞাসা করেছেন, কেন আমি বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই না? জবাব একটাই—নিরঙ্কুশ ক্ষমতাই কোনো শাসককে স্বৈরাচারীতে পরিণত করার প্রথম ধাপ। এমন একচেটিয়া ক্ষমতা থাকলেই যে সবাই স্বৈরাচারী হয়ে উঠবে, সেটা হয়তো নয়। কিন্তু স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার প্রথম ধাপই হচ্ছে একচ্ছত্র ক্ষমতা।
শেখ হাসিনার কথা চিন্তা করুন। এই আওয়ামী লীগ কিন্তু ১৯৯৬ সালেও ক্ষমতায় এসেছিল। তখনকার চেহারা আর ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ কিংবা ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগের আচরণ কী একই রকম ছিল? পার্থক্যের কারণটা ওই ক্ষমতার দাপট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৩০টি আসন। দুই শর বেশি আসন পাওয়ার অর্থ হলো যা ইচ্ছা তা-ই করার ক্ষমতা। এই বিশাল ক্ষমতা তাদের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তার প্রতিফলন আমরা দেখেছি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, যা কিনা আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফলেই সংবিধানের অংশে পরিণত হয়েছিল, সেটাকে বাতিল করে দেওয়ার মধ্যে। এসব ঘটনা আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। দেখেছি কেবল ক্ষমতার ভার বহন করতে না পারার কারণে একটি গণতান্ত্রিক দল কীভাবে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে যায়। আবার এটাও দেখেছি স্বৈরতন্ত্রের মর্মান্তিক পরিণতি কীভাবে হয়।
এই যে এত কথা, এত ভূমিকা—সবই কিন্তু বিএনপির দুই শতাধিক আসন প্রাপ্তি এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে। জামায়াত-এনসিপির বিরোধী জোট এরই মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বিএনপির সমালোচনা করা শুরু করেছে। তারা রাজপথে আন্দোলনের কথা পর্যন্ত বলছে। দেখলাম একটা কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। তারা বলছে, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছে। তারা নিজেরা জনগণকে বলেছে জুলাই সনদের পক্ষে গণভোটে রায় দিতে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে। এখন তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। অথচ এর বিপরীতে বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। বিরোধীরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চায়, সরকারপক্ষও বাস্তবায়নের কথাই বলছে, তাহলে দুই পক্ষের বিরোধটা কোথায়? বিরোধ হচ্ছে মোটাদাগে দুটি। প্রথমত, বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া নিয়ে এবং দ্বিতীয়ত, জুলাই সনদের ব্যাপ্তি নিয়ে।
জুলাই সনদ আসলে কতটুকু—তা নিয়েও এই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ আছে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। জামায়াত-এনসিপি মনে করে জুলাই সনদে বলা হয়েছে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। বিএনপি যে জুলাই সনদের কথা বলে সেখানে কি পিআর পদ্ধতির কথা আছে? নেই। বিএনপি সারা দেশে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের বিরোধী। তারা মনে করে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে জাতীয় সংসদে আসনপ্রাপ্তির আনুপাতিক হারে। কাজেই বিএনপি যখন জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের কথা বলে, তখন তারা আসলে সারা দেশের ভোটপ্রাপ্তির আনুপাতিক হারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখে না। তাদের যুক্তি হলো, যে জুলাই সনদে তারা স্বাক্ষর করেছে, সেখানে এই প্রসঙ্গে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। অথচ ইউনূস সরকার যখন গণভোটের আয়োজন করে, তখন চারটি প্রশ্নের মধ্যে এই উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়াসহ বেশ কয়েকটা বিষয়কে সন্নিবেশিত করে, যেগুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি ছিল। তাহলে বিএনপি তখন এ নিয়ে আপত্তি করেনি কেন? ঠিক এই প্রশ্নটি জামায়াত ও এনসিপিও করছে। এর জবাবে বিএনপি কিছু বলছে না। এই না বলারও একটা কারণ রয়েছে। আসলে বিএনপি তখন চেয়েছিল কোনোভাবে একবার নির্বাচনটা হয়ে যাক। নির্বাচনের আগে এত বিষয় নিয়ে আপত্তি বা প্রশ্ন তুলতে গেলে সেটা নিয়ে জামায়াত বা এনসিপি শোরগোল শুরু করে দিতে পারে। তখন হয়তো নির্বাচনটাই অনিশ্চিত হয়ে যাবে। আর তার সব দায় চাপানো হবে বিএনপির ওপর। বিএনপি এমন একটা ঝুঁকি নির্বাচনের ঠিক আগে আগে নিতে চায়নি।
কেবল গণভোটের প্রশ্ন নিয়েই নয়, গণভোটের বৈধতা নিয়েই বিএনপির আপত্তি ছিল। সরাসরি না বললেও নানাভাবে তারা সেটা প্রকাশ করেছে। দেশের বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক গণভোটের বৈধতা নিয়ে তাঁর বিস্ময় ও আপত্তির কথা বারবার উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু ড. ইউনূস ও অধ্যাপক আলী রীয়াজের গোঁয়ার্তুমির কারণে কোনো আপত্তিই টেকেনি। রাষ্ট্রপতির নামে একটা অবৈধ অধ্যাদেশ জারি করে তারা সেটা করেই ছেড়েছে। এখন যখন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে বৈধতা দেওয়ার প্রশ্ন উঠেছে, দেখা যাচ্ছে গণভোট নিয়ে শাসক দলের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। আগামী এক সপ্তাহে গণভোট অধ্যাদেশটি আদৌও অনুমোদন পাবে—এমন সম্ভাবনা আমি দেখছি না। সে ক্ষেত্রে গণভোট অবৈধ হয়ে যাবে। অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হলে সেটা অবধারিতভাবে বাতিলও হয়ে যাবে। যে আইনটি অবৈধ, তার মাধ্যমে করা কাজগুলো কি তাহলে বৈধ হবে? গণভোট অবৈধ হলে গণভোটের মাধ্যমে যে রায় পাওয়া গেছে, সেগুলো কি বৈধ হবে? এটি কিন্তু একটা জরুরি প্রশ্ন।
আমি আইন বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু সংবিধান তো কেবল আইনজ্ঞদের জন্যই লেখা হয়নি। সাধারণ মানুষও এটা পড়তে পারে, পড়ে নিজের নিজের মতো করে উপলব্ধিও করতে পারে। আপনি যদি সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদটি পড়েন, দেখবেন সেখানে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অধ্যাদেশ জারির বিষয়ে সবিস্তারে লেখা রয়েছে। সেখানে শর্ত হিসেবে ৯৩ (১) এর (ক) অনুচ্ছেদে একটা কথা পরিষ্কার করে বলা হয়েছে—এমন কোনো বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করা যাবে না, যা কি না ‘সংসদে আইন দ্বারা আইনসংগতভাবে করা যায় না’। এ কথাটির ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। গণভোট কোনো আইন না। এটা সংবিধানের একটি অংশ। সংসদের ১৫১ জনের সমর্থন নিয়ে যেকোনো আইন করা যায়। কিন্তু কোনো একটি বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন লাগে। এর আগে যে তিনবার দেশে গণভোট হয়েছে, তখন হয় বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল অথবা তখন সংবিধান স্থগিত রাখা হয়েছিল। এখন কি সে রকম কিছু বাস্তবতা আছে? আর তা ছাড়া রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমেই যদি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক গণভোটকে কার্যকর করা যায়, তাহলে তো জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কারের বিষয়গুলোকেও রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেত।
এসব কারণে গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে যে পদক্ষেপ বিএনপি নিয়েছে, তাকে আমার কাছে যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবিষয়ক অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহমিকা কিছুটা দেখেছি। বলা বাহুল্য, এই প্রবণতা আমাকে হতাশ করেছে, আতঙ্কিত করেছে।

অর্পিতা নওশিন নামের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। প্রথম বর্ষ থেকে নওশিন কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের একজন শিক্ষকের রোষানলে পড়েন। প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় অন্য সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হলেও শুধু অ্যানাটমি বিষয়ে ফেল করেন।
২ ঘণ্টা আগে
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হলো সংবিধানের ভবিষ্যৎ। ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়েছে, তাকে একটি স্থায়ী আইনি ও সাংবিধানিক রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার...
২ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি ক্রমেই বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় বীজের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, বীজের বিস্তারের লক্ষ্যে গ্রামীণ বীজ মেলা অনুষ্ঠিত হলো খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায়। এই বীজ মেলায় স্থানীয় ১৭ গ্রামের অর্ধশতাধিক নারী বীজ প্রদর্শন, বিনিময় ও বিক্রি করেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লোকজ ও মৈত্রী কৃষক ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে...
২ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও ঐতিহাসিক। গ্রামীণ জীবনব্যবস্থা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতির ভিত নির্মাণে কৃষি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
১০ ঘণ্টা আগে