
মানবজাতির অন্তহীন দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে ফরাসি দার্শনিক ভলতের (আমাদের দেশে বেশি পরিচিত ‘ভলতেয়ার’) একবার আশা প্রকাশ করেছিলেন এটা ভেবে যে ‘আমরা যে রকমটি চাই পৃথিবী যদি তেমনটিই হতো—যদি সর্বত্র মানুষ খুঁজে পেত জীবিকা-নির্বাহের সহজ ও নিশ্চিত উপায়, এবং তাদের স্বভাবপ্রকৃতির অনুকূল জলবায়ু—তবে একজন মানুষের পক্ষে আর-একজনকে অবদমিত করা স্পষ্টত অসম্ভব হতো।’ আর এরই ধারাবাহিকতায় তিনি স্বপ্ন দেখতেন এই ‘পৃথিবী কানায়-কানায় হোক শস্যশ্যামল; এমন সুনির্মল বায়ু বিরাজ করুক সর্বত্র যাতে কোন ব্যাধি এবং অকাল মৃত্যু না ঘটে; যেন একটি হরিণের তুলনায় অধিকআশ্রয়স্থল প্রয়োজন না পড়ে মানুষের।’ আর সে রকমটি যদি কখনো হয়, তাহলে ভলতের বিশ্বাস করতেন, চেঙ্গিজ খান আর তৈমুর লংদের আপন সন্তানসন্ততি ছাড়া আর কোনো অনুচর-অনুগামীর দরকার হবে না, এরাই তাদের বৃদ্ধ বয়সে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী তো সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তব দুনিয়া যুদ্ধ-মহামারি-মন্বন্তর থেকে শুরু করে মানুষের শাসন-শোষণ-লোভের কাছে অসহায়। হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগীরা এ দেশের সাধারণ মুক্তিকামী জনগণের ওপর হায়েনার মতো যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন, মানুষের সেই অসহায়ত্বের পাশাপাশি তার আক্রোশ, লোভ, হননের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পেয়েছিলাম। যাঁদের আমরা তখন হারিয়েছি, তাঁদেরই একজন ছিলেন অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী।
মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী নিজের লেখালেখির উৎস সম্পর্কে বলতে গিয়ে একবার বলেছিলেন, ‘আমার লেখার উৎস আনন্দ এবং বেদনা। যে আনন্দে আমার শৈশবের ও কৈশোরের দিনগুলি মধুময় হয়ে উঠেছিল, তার কথা বুঝি বলে কিছুতেই বোঝাতে পারব না। এখনও আমার মনে পড়ে চার-পাঁচ বছর বয়সের কথা।’ লেখকের সেই বয়সে ‘দ্বিপ্রহরের অবসর সময় মা আমায় শুইয়ে রাখতেন, বাইরে যেন দুষ্টমি করতে যেতে না পারি। ঘরের বারান্দায় চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে চেয়ে থাকতুম আকাশের দিকে। নীল স্বচ্ছ আকাশের ওপর দিয়ে সাদা সাদা মেঘ ভেসে চলে যেত। আমার মনে হত এরাও এক রকম প্রাণী, কিংবা বুঝিবা মেঘরাজ্যের শিশু।’ সেই বালকের তখন মনে হতো যেন-বা ‘গল্প করতে করতে কিংবা কথা বলতে বলতে, ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।...নির্জন দুপুরের শান্ত আকাশের সেই অলস মেঘগুলির সঙ্গে সঙ্গে আমায় ক্ষুদ্র শিশু চিত্তখানিও উড়ে চলে যেত কোন্ সুদূরে যেন পাড়ি দিতে।’ এ কথা আমরা তো বলতেই পারি যে আমাদের প্রবন্ধ-সাহিত্যে চিন্তা ও আবেগের যে ঐতিহ্য দেখা যায়, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সেই ধারাই বারবার অনুসরণ করে গিয়েছেন। তবে সেই সঙ্গে এটিও মানতে হয় যে তিনি সব ক্ষেত্রে ধরাবাঁধা ছকের পথ অবলম্বন করতে চাননি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে এসব লেখার মধ্যে লেখকের আত্মবিস্মৃতি কিংবা আত্মগরিমার কোনো ব্যাপার কখনোই ফুটে ওঠেনি। এটি একজন প্রাবন্ধিকের ক্ষেত্রে সামান্য কোনো অর্জন নয়, বেশির ভাগের মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রবণতা আমরা দেখতে পাই। সার্থক শিল্পের কাজ তার ঐতিহ্য-পরম্পরাকে ঋজু করে তোলা—সেটি বিষয় এবং শৈলী—এ দুইয়ের বেলায়ই প্রযোজ্য।
রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম—এই দুটিই মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর গভীর আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসার বিষয় ছিল। তাঁর জীবনের একটা অংশ কেটেছে শান্তিনিকেতনের বিদ্যায়তনিক পরিবেশে। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর আগ্রহ আমাদের কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। রবীন্দ্রসাহিত্য সম্পর্কে নিজের ভাবনার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে পড়তে কবিকে কখনও-কখনও মনে হয় অতি চেনা একজন কাছের মানুষ; আবার কখনও মনে হয় তিনি যেন অচেনা এক সুদূর লোকের অধিবাসী। রবীন্দ্রকাব্য শিশুও কিছু কিছু বুঝতে পারে, আবার বহু উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিকেও তার মর্ম উদ্ঘাটন করতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যেতে হয়।’ আবার অনেকের কাছে ‘রবীন্দ্রকাব্য বড় অস্পষ্ট, হেঁয়ালি, ঠিক ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না।’
এমনটি কেন হয়?—এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বলেছিলেন, ‘শ্রেষ্ঠ কাব্য স্ফটিকের মতো বহুমুখী; আর তার মধ্যে আছে এক সুদূরব্যাপী গভীরতা; তাই পাঠকরা একেকজন তার একেকটা দিক দেখতে পান এবং প্রত্যেকে নিজ-নিজ রুচি, বুদ্ধি এবং কল্পনাশক্তি অনুযায়ী তার একেক রকম অর্থ করে থাকেন। আর সেটাই স্বাভাবিক এবং এটি শ্রেষ্ঠ কাব্যের একটি লক্ষণও বটে। রবীন্দ্রকাব্যও তেমনি গভীর এবং সুদূরপ্রয়াসী।’ অন্যদিকে আবার কাজী নজরুল ইসলামকে ‘মানবতার কবি’ হিসেবে অভিহিত করে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ‘ভাগ্য যাদের বঞ্চিত করেছে বারে বারে, অন্ধ প্রকৃতি যাদের নিয়ে খেলেছে সর্বনাশী কৌতুক, আর মানুষও যাদের উপর করেছে শোষণ-অত্যাচার, সেই হতভাগ্য চাষী-মজুরদের মর্মবাণী...শোষিত কৃষকদের চিত্তক্ষোভই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত কবির...অলঙ্কৃত সরল অথচ বলিষ্ঠ ভাষায়।’ সমালোচক ও সাহিত্যের মর্মগ্রাহী একজন পাঠক হিসেবে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী মনে করতেন যে ‘ক্লাসিক সৌন্দর্যপ্রীতি, পাশ্চাত্য ট্রাজিডির বোধ, অদৃষ্টবাদ, যা প্রকৃতিতে অনেকটা গ্রিক এবং এক অন্তঃস্রাবী রোমান্টিকতা’—এসব উপাদান নিয়েই মধুসূদনের কবিমানস গঠিত হয়েছিল। তিনি এ-ও বিশ্বাস করতেন যে ‘সজ্ঞানে মধুসূদন ক্লাসিক রূপাদর্শের অনুসারী হলেও এক দুরপনেয় রোমান্টিক কবিভাবনা ও আর্তি বাল্যাবধি মাইকেলের সমস্ত চেতনাকে অধিকার করে রেখেছিল।’ সংক্ষেপে যদি বলা যায়, তাহলে এটিই ছিল মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সাহিত্য-সমালোচনার ধরন। খুব সংগত কারণেই কবি-অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তাঁকে একই সঙ্গে ‘রবীন্দ্র-সাহিত্যের পরম অনুরাগী ভক্ত পাঠক’ এবং ‘বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রশ্নে আপোষহীন তীক্ষ্ণধী অধ্যাপক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পূর্বমুহূর্তে আমরা মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে হারাই। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এদেশীয় সহযোগীদের হাতে তিনি নিহত হন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আমার দুই শিক্ষক মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি।’ শহীদ এই অধ্যাপক সম্পর্কে নীলিমা ইব্রাহিম তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘শান্ত, ভদ্র, বিনয়ী এবং পরিশীলিত রুচির কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে চিন্তা করতে গেলে অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর কথাই বিশেষভাবে মনে পড়ে। নিজের স্বভাবসুলভ কমনীয় আচরণে তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। অজাতশত্রু অধ্যাপক চৌধুরী এমন নির্মমভাবে নিহত হবেন, এ কথা কেউ কখনও ভাবতে পারেনি।’
অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে আমরাও ভুলতে পারিনি। আজ এই শহীদ বুদ্ধিজীবীর জন্মশতবর্ষ। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

সেই যে মেয়ে, নাটোরের বনলতা সেন, তার উদ্দেশে জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন ‘এতোদিন কোথায় ছিলেন?’ তাঁর সে-বলার দ্বিধা থরথর বৃন্তে কেঁপেছিল জানি অত্যন্ত গভীর আগ্রহ ও ব্যাকুলতা; কিন্তু জানা তো ছিল না—আমার নয়, হয়তো অনেকের নয়—ওই বলার মধ্যে একটি নিষ্ঠুর প্রত্যাখ্যান রয়ে গেছে। কবি-সমালোচক জগন্নাথ চক্রবর্তী জানিয়েছ
৪১ মিনিট আগে
একসময় সরকারি অর্থায়নের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল সঞ্চয়পত্র। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিধবা নারী, ক্ষুদ্র সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবার নিরাপত্তা এবং নিশ্চিত মুনাফার আশায় এখানে সঞ্চয় রাখতেন। সরকারও দীর্ঘদিন এই খাত থেকেই বাজেট ঘাটতির একটি বড় অংশের অর্থ সংগ্রহ করেছে।
১ ঘণ্টা আগে
ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে ছিল বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি অনায়াসে ভেঙে ফেলা হচ্ছিল। অথচ কারা এটি ভাঙছে, সে ব্যাপারে কেউ কিছু জানত না। আজকের পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। জেলা প্রশাসনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় বলা হয়েছে, ভাস্কর্যটি
১ ঘণ্টা আগে
বেলুচিস্তান কিংবা পাকিস্তানের প্রসঙ্গ এলেই ইতিহাস যেন আমাদের অজান্তেই ৫৫ বছর পেছনে টেনে নিয়ে যায়। আর যখন বেলুচিস্তানে সামরিক অভিযান, বিদ্রোহ ও গণ-অসন্তোষের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়, তখন ১৯৭১ সালের স্মৃতি অনিবার্যভাবেই ফিরে আসে।
১ দিন আগে