ঈদের দিন বিকেলে পাবনা থেকে সাবেক সহকর্মী আশীষ-উর-রহমান শুভর ফোন। কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘বন্ধু, খুব বিপদে আছি, একটু তেল জোগাড় করে দাও।’ তিনি ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে পাবনায় শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন ঈদ করতে। রাজধানীতে ফিরে যেতে পারছেন না শুধু নিজের গাড়িতে তেল না থাকার কারণে। শুভর কথায় সচকিত হলাম। এবার নেমে পড়লাম নিজের জন্যও তেল জোগাড়ে। দেখা গেল কোথাও তেল নেই, একের পর এক বন্ধ পাম্পে ঢোকার মুখে নোটিশ ঝোলানো।
ফোন করলাম গ্রামের বাড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার দূরের এক তেল ব্যবসায়ী আত্মীয়কে। তিনি সব শুনে সহায়তার হাত বাড়ালেন। পরের দিন কয়েক লিটার তেল পাঠালেন চটের বস্তার ভেতরে লুকানো জেরিকেনে করে। যেভাবে অনেক সময় সীমান্তের গ্রামগুলোতে চোরাই পণ্য বাজারজাত করা হয়!
গাড়িতে তেল ভরে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে টিভির সামনে বসলাম। টিভি খুলতেই দেখি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের বলছেন, ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে। পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ঈদের ছুটি শেষ হলো, এবার ঢাকায় ফেরার পালা। রাজশাহী থেকে ঢাকা ফেরার পথে মহাসড়কের পাশেই আছে শতাধিক পেট্রলপাম্প। মনে মনে ভাবলাম, কোনো না কোনো পাম্পে তেল ঠিকই পেয়ে যাব। কিন্তু বিধি বাম। ঢাকার পথে যতই এগোচ্ছি কোথাও তেল নেই। সব পাম্পে প্রবেশের মুখে আড়াআড়ি রশি দিয়ে পথ আটকে রাখা। আর সাদা কাগজের ওপরে লেখা ‘তেল নেই’। সম্বল যেটুকু তেল ছিল, তা নিয়েই গাড়ি চালিয়ে দুরু দুরু বুকে ঢাকায় ফিরলাম।
ঈদের লম্বা ছুটিতে পত্রিকা তখনো বন্ধ। কোনো অনলাইন সাইটে দেখলাম, সরকারি ভাষ্য হচ্ছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বেড়েছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ। সংখ্যার হিসাবে এটি হয়তো স্বস্তিদায়ক। কিন্তু বাস্তবে পাম্পের যে চিত্র দেখলাম, তা একেবারেই ভিন্ন! সব মিলিয়ে যা দাঁড়াল তা হলো, মন্ত্রীর কথার সঙ্গে মাঠের পরিস্থিতির একেবারেই মিল নেই।
ঢাকায় ফিরে বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তাঁরাও বললেন, রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা—প্রায় সর্বত্র পেট্রলপাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল না পাওয়ার অভিযোগ করছেন লোকজন। কোথাও সীমিত বিক্রি হচ্ছে, কোথাও আবার পাম্প সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এসব শুনে মনে হচ্ছে, এ চিত্র আসলে এক বড় ধরনের গাফিলতি বা অসামঞ্জস্যতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। আমার সরল প্রশ্নটি হলো, সরবরাহ যদি সত্যিই বেড়ে থাকে, তাহলে তেলের ঘাটতি কেন দেখা দিচ্ছে?
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে অন্য অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও জ্বালানির সাময়িক সংকট হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই সংকটকে শুধুই আন্তর্জাতিক বাজার বা সরবরাহপ্রবাহের সমস্যা বললে বাস্তবতা আড়াল করা হবে। মাঠপর্যায়ে প্রাপ্যতার তথ্য, ডিপোর বরাদ্দের ধরন এবং সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা মতে, চলতি সমস্যার মূল উৎস দেশের ভেতরেই বিদ্যমান। দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়ের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত অদক্ষতার কারণেই বর্তমানে তেলের সংকটের জন্ম দিয়েছে। এখন যার ভুক্তভোগী হচ্ছে সারা দেশের মানুষ।
একটি কথা পরিষ্কারভাবে বলা দরকার, এবারের ইরানসংক্রান্ত উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ১২ দিনের এক দফা সংঘাত হয়েছে। সম্প্রতি সমঝোতা আলোচনার মধ্যে সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু সেই আলোচনার আলোকে বাস্তব প্রস্তুতির উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং ইরানে ইসরায়েলি-মার্কিন যৌথ হামলা শুরুর পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে হঠাৎ করেই তেলের রেশনিং চালু করা হয়। এতে বাজারে একধরনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক তৈরি হয়, যা স্বাভাবিকভাবেই চাহিদাকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। একপর্যায়ে রেশনিং কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করা হলেও সরবরাহ আর স্বাভাবিক হয়নি।
একটি মৌলিক অর্থনৈতিক সত্য হচ্ছে—পণ্যের চাহিদা যখন বাড়ে, তখন সরবরাহ একই জায়গায় থাকলে ঘাটতি তৈরি হবেই। দৃশ্যত দেশে এখন সেটিই ঘটছে। পাম্পমালিকদের অভিযোগ, তারা চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল পাচ্ছে; কখনো ৩০ শতাংশ, কখনোবা ৬০ শতাংশেরও কম। ডিপোর বরাদ্দ তালিকাও এই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদ্বেগবশত কেউ কেউ পারলে বারবার পাম্পে গিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশিও কিনছেন। সুযোগসন্ধানী কিছু লোক মজুত করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে পাম্পের তেল দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন অনেকে। ‘পর্যাপ্ত তেল থাকার’ সরকারি আশ্বাস তাই মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে আশ্বস্ত করতে পারছে না।
অনেকে বলছেন, তেলের সংকট আরও প্রকট করেছে সরকারি বিধিবিধানের কিছু কঠোরতা। পে-অর্ডার ছাড়া ডিপো থেকে তেল উত্তোলনের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকা, ছুটির সময়ে ব্যাংক বন্ধ থাকায় লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়া—এসব বিষয় জ্বালানি তেল সরবরাহের মতো একটি জরুরি খাতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আগে সেখানে কিছুটা নমনীয়তা থাকলেও এখন তা অনুপস্থিত। ফলে জ্বালানি তেল সরবরাহের ব্যবস্থা কার্যত ব্যাংকিং সময়সূচির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চলমান সংকটের মধ্যে ঈদের এই দীর্ঘ ছুটি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লেনদেনের যে সমস্যা তৈরি করবে, তা আগে কেন অনুমান করা হলো না? এত বড় সংকটের মধ্যে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রাখা গেল না কেন? ডিপোগুলো কি ছুটির দিনেও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখা সম্ভব ছিল না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে?
চলমান সংকটে আমাদের জ্বালানি খাতের অবকাঠামোগত দুর্বলতার কথাও নতুন করে বেশ আলোচিত হচ্ছে। দেশে জ্বালানি তেল-গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে মজুত সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না। কয়েক বছর আগে ৬০ দিনের চাহিদার মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, বর্তমানের মজুত সক্ষমতা নাকি ৩০-৩৫ দিনের চাহিদার সমান। আন্তর্জাতিক সংকটের এই পরিস্থিতিতে এটা কোনোভাবেই যথেষ্ট হতে পারে না। অন্যান্য দেশ অনেক বেশি সময়ের মজুত ধরে রাখে—যা ঝুঁকি মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা বাড়ায়। গত কয়েক দশকে জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রের প্রচুর অর্থ ব্যয়, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ (যার মধ্যে আছে অনেক বিতর্কিত উদ্যোগও) ও লুণ্ঠন হয়েছে। কিন্তু কেন এমন খাতে দরকারি বিনিয়োগ ও প্রস্তুতির ঘাটতি রয়ে গেল? যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়নি বৈদ্যুতিক যান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও, যা প্রথাগত জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে পারে।
জ্বালানি তেলের এই পরিস্থিতি নিয়ে অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছি। সেসব সূত্র ইঙ্গিত দেয়, মজুত বাড়ানো বা এ-সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে ‘নগদ’ আর্থিক লাভ এবং সুবিধাভোগের প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। আর সে কারণে দরকারি পরিকল্পনাগুলো এগোতে পারেনি।
তেল সংকটের নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ইতিমধ্যে স্পষ্ট হচ্ছে। যাত্রী পরিবহন খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে, ভাড়া বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। তেলের কালোবাজারির অভিযোগও উঠছে। এসবই ক্ল্যাসিক সংকট অর্থনীতির লক্ষণ।
জ্বালানি তেল সংকটের উদ্বেগজনক প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতেও। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন। পাম্পে পেট্রল ও অকটেনের ঘাটতির তুলনায় ডিজেল কিছু পাওয়া গেলেও দৃশ্যত তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। সেচের অভাবে কৃষির ফলন কমলে তা খাদ্যনিরাপত্তাসহ সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলবে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহলকে বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে সমস্যা সমাধানে দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জ্বালানিসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে তাদের যথাযথ ভূমিকার ঘাটতিগুলো নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। সংকটকে অস্বীকার করে শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর দায় চাপানো সমাধানের কোনো পথ হতে পারে না। এখন জরুরি করণীয় হলো, মজুতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, চাহিদার পরিমাণ নিয়ে পূর্বাভাসের উন্নয়ন এবং নীতিগত সংস্কার।
তেলের এই নজিরবিহীন সংকট আমাদের একটি মৌলিক সত্য আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, জ্বালানি শুধু অর্থনীতির আর একটি খাত মাত্র নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনজীবনের স্বস্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কাজেই এখানে সামান্য অদক্ষতাও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে।
মাঠের বাস্তবতা যদি বিপরীত হয়, তাহলে পরিসংখ্যান বা তত্ত্ব দিয়ে স্বস্তি আনার চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এখন দেখার বিষয়, এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কি একটি দূরদর্শী জ্বালানি ব্যবস্থাপনার পথে হাঁটতে পারব, নাকি ভবিষ্যৎ কোনো সংকটে একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হবে।

২৫ মার্চ বিকেলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। পন্টুন থেকে সৌহার্দ্য পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মার উত্তাল স্রোতে তলিয়ে গেছে। নিখোঁজ থাকা অনেক মানুষকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অল্প কিছু মানুষ সাঁতরে জীবন বাঁচাতে পেরেছেন।
২ ঘণ্টা আগে
বিজ্ঞান আমাদের শেখায় যে মানববুদ্ধি হলো স্ব-সংশোধনযোগ্য; এর জন্য প্রয়োজন কেবল সহনশীলতা ও নমনীয়তা। মহাবিশ্ব যেমন, তেমন করেই আমাদের তাকে বুঝতে হবে; কোনোভাবে এর কেমন হওয়া উচিত, তার সঙ্গে কতটুকু সাদৃশ্যপূর্ণ—এই ভেবে আমাদের বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক হবে না।
২ ঘণ্টা আগে
বাংলার জনজীবন ও নাটক হাজার বছর পেরিয়ে হাজারো বাধা উজিয়ে চলেছে পরস্পরের হাতে হাত রেখে। এর রূপবদল ঘটেছে অনেক, বহু দিক দিয়ে নাটক হয়েছে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে নাট্যস্রোতে বদ্ধতাও এসেছে কখনো কখনো, চোরাটান কিংবা আবিলতা নাটককে পথভ্রষ্ট করতে হয়েছে উদ্যত, এর জঙ্গমতা হরণ করবার শঙ্কা তৈরি করেছে।
২ ঘণ্টা আগে
আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলার মানুষ গড়ে তুলেছিল তাদের নিজের আবাসভূমি—বাংলাদেশ। ২৫ মার্চে ইয়াহিয়া সরকার তাদের সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিল বাঙালি নিধনের জন্য। তারই পরিণতিতে রক্তক্ষয়ী ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের পর এসেছিল বিজয়। বিজয় এসেছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে...
১ দিন আগে