Ajker Patrika

ভোটের ডামাডোলে চাপা বন্দর রক্ষা

বড় দল হিসেবে পরিচিত ও দাবিদার যেসব রাজনৈতিক দল দিনরাত সরকারের সঙ্গে দেনদরবার, হাসিঠাট্টা আর ফটোসেশনে সময় কাটিয়েছে, তারা কিন্তু এসব জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি ও তার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটিও করেনি এযাবৎ। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এ নিয়ে কোনো কথা নেই। নির্বাচনে কে কাকে টেক্কা দেবে সে নিয়েই ব্যস্ত তারা।

আজাদুর রহমান চন্দন
ভোটের ডামাডোলে চাপা বন্দর রক্ষা

‘কথায় রাজা উজির মারা’র বাংলাদেশ কথামালার রাজনীতিচর্চার এক অতি উর্বর ক্ষেত্র। এ দেশে ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে কত যে বিস্তর ব্যবধান থাকে, সে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না পারতপক্ষে। বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ যেমন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় সেটি আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা ভেবে দেখার তাগিদ বোধ করেন না; তেমনি অনেক সাধারণ মানুষও নেতাদের মুখে সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতির কথা শুনতে ভালোবাসেন। সেই সুবাদে ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনীতিকেরা ভাষণে দুধের সাগর, মধুর নহর বইয়ে দিতে পিছপা হন না। বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ইশতেহারও এর ব্যতিক্রম নয়। যে কর্তৃত্ববাদী সরকারকে চব্বিশে জনতা উৎখাত করল, তার নির্বাচনী ইশতেহারগুলোও কি কিছু কম আকর্ষণীয় ছিল? আপামর জনগণ নির্বাচনী ইশতেহারের ভালো-মন্দ কিংবা বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ না করলেও সংবাদমাধ্যমে তো কমবেশি আলোকপাত করা হয়েই থাকে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একেবারেই দোরগোড়ায়। এ উপলক্ষে ৬ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বড় রকমের কারসাজি বা পক্ষপাতিত্ব না হলে দলটি এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে অনায়াসে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক ও খামারিদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু, রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন, ‘ফ্যাসিস্ট আমলে’ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আশ্বাস এবং বিগত সময়ে নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুসহ সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা ও পেনশন বাড়ানো; বেকার ভাতা ও রেশন চালু; এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারণসহ আর্থসামাজিক সব খাত নিয়ে দলটি যে পরিকল্পনা হাজির করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থের সংস্থান করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইশতেহার ঘোষণাকালে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি যখন ৩১ দফা দেয়, তখন জুলাই সনদের বিষয়টি ছিল না। জাতি গঠন ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন জরুরি। জুলাই সনদের অনেক কিছুর সঙ্গে ৩১ দফার মিল আছে। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমরা দেখেছি, এটিকে কীভাবে একটি পরিবারের বা দলের করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহ করা প্রয়োজন।’ এর পরদিন দেশের উত্তরাঞ্চলে একাধিক জনসভায় তারেক রহমান বলেন, একাত্তরে দেশের স্বাধীনতার জন্য সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। তখন দেখা হয়নি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে আদিবাসী। ২০২৪ সালেও সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। এ দেশে হাজার বছর ধরে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ শান্তিতে বসবাস করে আসছে। আগামী হাজার বছরও প্রত্যেক ধর্মের মানুষ যেন শান্তিতে এ দেশে বসবাস করতে পারে। যে যার যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাবে—প্রত্যেককে বিচার করা হবে এর ভিত্তিতে। ধর্ম দিয়ে তাকে বিচার করা হবে না। অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের প্রথমেই আছে ‘সর্ব শক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাটিকে সংবিধানের মূলনীতি করার কথা। এসব দেখে-শুনে শক্তি চট্টোপাধ্যায় রচিত কাব্যগ্রন্থটির কথাই কেবল মনে পড়ে, যার শিরোনাম ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’।

এই নির্বাচনে বিএনপির মূল প্রতিপক্ষ হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপির দুই দিন আগেই। ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ, যুবকদের ক্ষমতায়ন, নারীদের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সবুজ-পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতো নানা আকর্ষণীয় ও চটকদার প্রুতিশ্রুতি আছে ইশতেহারে। কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা তিন ঘণ্টা কমানোর যে বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা এর আগেই তৈরি হয়েছিল, সেই বিষয়টি ব্যাখ্যাসহ নির্বাচনী ইশতেহারে রেখেছে দলটি। ইশতেহারে জামায়াত বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে নারীদের সম্মান রক্ষা করে নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সেই সঙ্গে মাতৃত্বকালে মায়েদের সম্মতি সাপেক্ষে কর্মঘণ্টা ৫-এ নামিয়ে আনা হবে।

জামায়াতসহ ধর্মতান্ত্রিক দলগুলো নারী ইস্যুতে ইশতেহারে যা বলেছে তা কতটা তারা বিশ্বাস করে, সেই প্রশ্ন আছে তাদের অতীত বক্তব্য ও অবস্থানের কারণেই। বরং রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেলে মানুষের মৌলিক ও সমঅধিকার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নারীর নিরাপত্তা নিয়ে চটকদার নানা কথা বললেও নীতিগতভাবে তারা যে নারীর ক্ষমতায়নের বিরোধী, সে কথা কয়েক দিন আগে স্পষ্ট করেই বলেছেন জামায়াতের এক নারী প্রতিনিধি।

বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের ইশতেহারে কিছু নতুন বক্তব্য দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টার প্রকাশ ঘটলেও অনেক কিছুই আছে যা বরাবরই ঠাঁই পেয়ে আসছে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির তালিকায়। বিভিন্ন সময়ে দলগুলো ক্ষমতায় থেকেও সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। এ ছাড়া দলগুলো এমন অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট কর্মপন্থা উল্লেখ করেনি। সব দলই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং রাষ্ট্র সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা কিংবা নির্দেশনা নেই। যে দলটির মূল স্লোগানের মধ্যেই আছে সৎলোকের শাসন চাওয়ার কথা, সেই দলের বাহরাইনে প্রবাসী এক নেতার বাসা থেকেই অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনের আগে প্রবাসী ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং কারসাজির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেছেন একাধিক প্রবাসী বাংলাদেশি। এ ছাড়া দেশেও লক্ষ্মীপুরে ভোটের অবৈধ ছয়টি সিল উদ্ধারের ঘটনায় সম্প্রতি গ্রেপ্তার প্রিন্টিং প্রেসের মালিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নির্দেশদাতা হিসেবে যার নাম প্রকাশ করেছেন তিনিও একই রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা।

এদিকে নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে ঘটতে যাচ্ছে দেশের জন্য এক বিপর্যয়কর ঘটনা। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। এর আগে চব্বিশের আন্দোলন দমনের নামে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিচার ঘিরে সৃষ্ট উদ্দীপনার মধ্যে দুই বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে কনটেইনার টার্মিনাল এবং পানগাঁওয়ে নৌ টার্মিনালের দায়িত্ব। নন-ডিসক্লোজার বা গোপনীয় ওই চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানি দুটি ১০ বছর পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধাও পাবে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলায় প্রথম রায় ঘোষণার দিনটিকে তখন বেছে নেওয়া হয় ওই চুক্তির জন্য। তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-বন্দরের মতো জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য আগাগোড়া আন্দোলন করে আসছে কেবল দেশের বামপন্থী দল ও সংগঠনগুলো।

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা না দেওয়ার দাবিতেও গত নভেম্বরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে দুই দিনব্যাপী রোডমার্চ করা হয় ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’-এর ব্যানারে। কিন্তু এখন কেবল বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও সিবিএর ডাকে আন্দোলন চলছে স্থানীয়ভাবে। বন্দর শ্রমিকদের এই আন্দোলন চলা অবস্থায়ই নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারার চুক্তি ঠেকানো সম্ভব নয়। বড় দল হিসেবে পরিচিত ও দাবিদার যেসব রাজনৈতিক দল দিনরাত সরকারের সঙ্গে দেনদরবার, হাসিঠাট্টা আর ফটোসেশনে সময় কাটিয়েছে, তারা কিন্তু এসব জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি ও তার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটিও করেনি এযাবৎ। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এ নিয়ে কোনো কথা নেই। নির্বাচনে কে কাকে টেক্কা দেবে, সে নিয়েই ব্যস্ত তারা। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের ঐতিহ্য বহনকারী দলগুলোর যদিও ভোটে কাউকে টেক্কা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকার কথা নয়। সেই সামর্থ্যও তাদের নেই। কিন্তু তারাও কেন চূড়ান্ত মুহূর্তে ভোটের ডামাডোলে মজে থেকে এনসিটি রক্ষায় রাজপথে অনুপস্থিত, সেটি বোধগম্য নয়।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত