বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। শিল্প ও সেবা খাতের বিস্তার ঘটলেও খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, কাঁচামাল সরবরাহ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দু এখনো কৃষক। অথচ জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতের গুরুত্বের তুলনায় বরাদ্দের অনুপাত ক্রমাগত কমছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। কিন্তু কৃষি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরেও মোট বাজেটের তুলনায় কৃষি খাতের অংশ ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান অপরিসীম হলেও বাজেটে কৃষি ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।
সরকার কৃষি কার্ড, যান্ত্রিকীকরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, কৃষি বিমা ও কোল্ড চেইন স্থাপনের মতো নানা পরিকল্পনার কথা বলছে। পরিকল্পনাগুলো ইতিবাচক হলেও প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাজেট বাস্তবে কৃষকের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনবে? কারণ বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় সংকট কেবল উৎপাদন নয়, বরং ন্যায্য মূল্য, সংরক্ষণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা। বাংলাদেশের কৃষক এখন উৎপাদনে দক্ষ। ধান, সবজি, মাছ, ফল, ভুট্টা কিংবা আলু উৎপাদনে বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু কৃষক লাভবান হয় না। কারণ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় আড়তদাররা।
ধান কাটার মৌসুমে কৃষকের হাতে নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। ঋণ পরিশোধ, শ্রমিকের মজুরি, সংসারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে কৃষক কম দামে ধান বিক্রি করে দেয়। এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা বিপুল পরিমাণ ধান কিনে পরে বেশি দামে বিক্রি করে। এমনকি সরকারি ধান সংগ্রহ কর্মসূচিতেও প্রকৃত কৃষকের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা দালালেরা বেশি সুবিধা নেয়। ফলে সরকারি সহায়তার বড় অংশ কৃষকের হাতে পৌঁছায় না। এই অবস্থার পরিবর্তনে সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ধান কেনার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কৃষি কার্ডের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জমির তথ্য সংযুক্ত করে কৃষকভিত্তিক ডেটাবেইস তৈরি করা জরুরি। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির টাকা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে।
এবার আগাম বন্যায় হাওর অঞ্চলের বহু ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক ধান ঘরে তোলার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আবার যেসব ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল, অতিবৃষ্টি ও সংরক্ষণের অভাবে তার বড় অংশ নষ্ট হয়েছে। হাওরাঞ্চলের কৃষি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই অঞ্চলের জন্য বিশেষ বাজেট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। হাওরে আধুনিক ধান সংরক্ষণাগার ও শুকানোর কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। বন্যা সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত উদ্ভাবন ও চাষে ভর্তুকি দিতে হবে। কৃষকদের জন্য জরুরি ক্ষতিপূরণ ও কৃষি বিমা কার্যকর করতে হবে। বর্তমানে কৃষি বিমার কথা বলা হলেও তা এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক খুব কমই সহায়তা পায়।
বাংলাদেশে পারিবারিক বণ্টনের কারণে কৃষিজমি প্রতিনিয়ত খণ্ড-বিখণ্ড হচ্ছে। একসময় যে কৃষকের ২০ বিঘা জমি ছিল, তা কয়েক প্রজন্মে ভাগ হয়ে ২-৩ বিঘায় নেমে এসেছে। ফলে বড় কৃষক প্রায় বিলুপ্ত। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকই এখন কৃষির মূল চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতায় প্রচলিত কৃষিনীতি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। ক্ষুদ্র জমিতে উৎপাদন খরচ বেশি হয় এবং যন্ত্রের ব্যবহার সীমিত থাকে। তাই সমবায়ভিত্তিক চাষ, শেয়ারিং মডেলে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার এবং ব্লক ফার্মিং চালু করা প্রয়োজন। সরকার যদি ইউনিয়নভিত্তিক কৃষিযন্ত্র ব্যাংক গড়ে তোলে, তাহলে ছোট কৃষকরাও কম খরচে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্রের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে কর রেয়াত ও আর্থিক সহায়তা দিলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় শিল্প গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশে কৃষিকে এখনো মূলত খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু উন্নত দেশগুলো কৃষিকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও রপ্তানির মাধ্যমে তারা বহু গুণ বেশি আয় করছে। বাংলাদেশেও জেলা ও অঞ্চলভিত্তিক কৃষি শিল্প গড়ে তোলা প্রয়োজন। যেমন আলুভিত্তিক শিল্প, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধ শিল্প, মাছ সংরক্ষণ শিল্প কিংবা চাল প্রক্রিয়াজাত শিল্প। এতে কৃষক শুধু কাঁচামাল বিক্রি করবে না, মূল্য সংযোজনের অংশও পাবে। কোল্ড চেইন ও আধুনিক গুদামব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ফল ও সবজি নষ্ট হয়। বাজেটে এই অবকাঠামো নির্মাণে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করলে কৃষক মৌসুমে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবে না।
একটি সত্যিকারের কৃষকবান্ধব বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা- উৎপাদন খরচ কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের সুরক্ষা দেওয়া। এই লক্ষ্য অর্জনে কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো এবং ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। প্রকৃত কৃষকের ডেটাবেইস তৈরি করে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম ডিজিটাল করতে হবে। কৃষি বিমা সহজলভ্য ও কার্যকর করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে শস্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ জরুরি। হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষ কৃষি পুনর্বাসন তহবিল গঠন করতে হবে। সমবায়ভিত্তিক যান্ত্রিক কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষিপণ্যের ন্যূনতম মূল্য নিশ্চিতে আইন প্রণয়ন, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সহনশীল বীজ উদ্ভাবনের ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক স্থানীয় শিল্প ও উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদন করে না, দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিও রক্ষা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করা মানুষটিই সবচেয়ে কম লাভ পায়। তাই কৃষি বাজেটের সাফল্য কেবল বরাদ্দের অঙ্কে নয়, বরং কৃষকের হাতে সরাসরি কতটা সুবিধা পৌঁছাল, সেটির ওপর নির্ভর করবে। যদি সরকার সত্যিই কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তাহলে শুধু প্রকল্প ঘোষণা নয়, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার, সংরক্ষণ অবকাঠামো, কৃষকের সরাসরি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দেশীয় কৃষি শিল্প গড়ে তোলার দিকে জোর দিতে হবে। অন্যথায় বাজেটের সংখ্যা বাড়লেও কৃষকের জীবন বদলাবে না।
লেখক: কবি ও রাজনীতিবিদ

সারা দেশে হামের আতঙ্ক বিরাজ করছে। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে আর মৃত্যুবরণ করেছে পাঁচ শতাধিক। এপ্রিলের শেষ দিকে বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রী ইউনিয়নেও হানা দিয়েছে এই সংক্রামক রোগ। হামের প্রাদুর্ভাবের পর এবার সেখানে হামলা করেছে ডায়রিয়ার জীবাণু। স্থানীয় ওষুধের দোকানগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না...
১৩ ঘণ্টা আগে
ডা. লেলিন চৌধুরী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং ‘হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতাল’-এর চেয়ারম্যান। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঐতিহ্যবাহী শিশু সংগঠন...
১৫ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা যে কেউ ভাবেন না, সেটা আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর থেকে স্পষ্ট হওয়া যাবে। চট্টগ্রাম নগরের সার্সন রোডসংলগ্ন জয়পাহাড়ের কোলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এখন শুধু উদ্বোধনের অপেক্ষা।
১ দিন আগে
আমরা কি বারবার এইসব লোককে দিয়ে রাষ্ট্র শাসন করব? যদিও মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর কোনো শাসকই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। নানা ধরনের দুর্বলতার কারণে তাঁরা রাষ্ট্র শাসনে অক্ষম হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে এত বড় ভারতবর্ষ রাষ্ট্রটাকে বিক্রি করে দিয়েছেন।
১ দিন আগে