Ajker Patrika

পুতিন কি মৃত্যুকে জয় করতে পারবেন

মইনুল হাসান
পুতিন কি মৃত্যুকে জয় করতে পারবেন
আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা মানুষের আয়ুষ্কাল বাড়ানোর আশা জাগাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন পুতিন। ছবি: এএফপি

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আজকাল রাতে খুব ভালো ঘুমাতে পারেন না। ঠিক কোথায়, কখন, কোন স্থানে তিনি রাতে ঘুমাবেন, তা তিনি তাঁর খুব ঘনিষ্ঠজনদেরও জানতে দেন না।

সেই ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিনা উসকানিতে বিশাল এক বাহিনী নিয়ে ইউক্রেন দখলে নিতে সর্বাত্মক আগ্রাসন চালান। ভেবেছিলেন সপ্তাহ না ঘুরতেই আক্রান্ত দেশটিতে সদম্ভে রাশিয়ার পতাকা ওড়াবেন। অথচ সেই অসম যুদ্ধ আজ পাঁচ বছরে পা রেখেছে। দেশটিকে পদানত করার উদগ্র স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এমন দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কারণে দিনে দিনে তাঁর নিজের দেশেই অসন্তোষ আর অনাস্থা বেড়ে চলছে। উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়েও সামরিক বাহিনীতে টানতে সে দেশের নাগরিকদের উৎসাহিত করতে পারছেন না। সেনা কর্মকর্তাদের চোখের ভাষা বদলে গেছে। তাঁর খুব কাছের লোকজনদের মধ্যেও একধরনের অস্বাভাবিক অস্থিরতা তিনি লক্ষ করছেন। ব্যক্তিগত বাবুর্চি, গৃহকাজে নিযুক্ত কর্মচারী, এমনকি তাঁর দেহরক্ষীদের ওপর তিনি আস্থা রাখতে পারছেন না। অদৃশ্য মৃত্যুভয় সারাক্ষণ তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

তাই তিনি ঠিক করেছেন, ‘মৃত্যু’ নামক অদৃশ্যে থাকা ঘাতককে ঘায়েল করবেন। বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের এক উচ্চাভিলাষী এবং বিতর্কিত বিশাল বাজেটের জাতীয় কর্মসূচি অনুমোদন করেছেন। মৃত্যুকে ঠেকাতে না পারলেও ক্রেমলিনের অভেদ্য প্রাচীরের আড়ালে অন্তত দীর্ঘ এক জীবন বাঁচার আকুতিতে এই বিশাল অর্থের বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির আয়োজন করেছেন। চিরযৌবন লাভের মোহে তিনি আচ্ছন্ন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে এই মহাপ্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ানদের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। অনন্ত যৌবন লাভের মোক্ষম উপায় বের করার উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের প্রধান পদে নিয়োগ দিয়েছেন নিজ কন্যা এবং এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট (অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও হরমোন বিশেষজ্ঞ) মারিয়া ভোরন্তসোভাকে। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন রুশ পদার্থবিজ্ঞানী মিখাইল কোভালচুক। কোভালচুক মনে করেন, অদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞান এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ মেরামত কিংবা প্রতিস্থাপন করা সহজেই সম্ভব হবে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, তিনি আর কত দিন, কত বছর বাঁচতে চান? কী করে তা সম্ভব?

পুতিন জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯৫২ সালের ৭ অক্টোবর। সে হিসাবে এ বছর অক্টোবরে তিনি ৭৪ বছর পূর্ণ করে ৭৫-এ পা রাখবেন। ৭৪-এর দোরগোড়ায় এসেও তিনি সুঠাম দেহের মানুষ। চেহারায় তারুণ্যের ছাপ। সাধারণ মানুষের থেকে অনেক বেশি কর্মঠ। কঠিন পরিশ্রমের খেলাধুলায় তাঁকে হারানো প্রায় অসম্ভব। নিয়মিত শিকারে যান গহিন বনে। তেজি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তীব্র গতিতে ছুটে যান মাইলের পর মাইল, তরতর করে উঠে যান উঁচু পাহাড়ে। জল কাঁপিয়ে সাঁতার কাটেন হিম ঠান্ডা পানিতে। বরফের পিচ্ছিল এবং কঠিন আচ্ছাদনের ওপর হকির ব্যাটে সজোরে বল ঠুকে দেন। নিয়মিত শরীরচর্চায় মোটেও শৈথিল্য নেই। এককথায় বলা চলে প্রাণশক্তিতে ভরপুর পুতিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চান না। পুতিন অবশ্য নিজের অলক্ষ্যে এমন বাসনার কথা প্রকাশ করে ফেলেছেন।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে এক সামরিক কুচকাওয়াজের সময় পুতিন ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যেকার একটি ব্যক্তিগত আলাপচারিতার সময়ে তাঁদের সামনে থাকা মাইকটি চলছিল। পুতিন তা খেয়াল করেননি। পুতিন বলছিলেন, জৈবপ্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অঙ্গ ক্রমাগত প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে, যার ফলে মানুষ আরও তরুণ থাকতে পারবে, এমনকি অমরও হতে পারবে। জবাবে সি চিন পিং বলেছিলেন, এই শতাব্দীতে মানুষ ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারবে। তাঁদের দুজনার এমন কথাবার্তা বেশ স্পষ্ট শুনতে পাওয়া গেছে।

পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনে এই কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করে পুতিন বলেন, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রযুক্তি মানবজাতির সক্রিয় আয়ুষ্কাল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আশা জাগাচ্ছে।

পুতিন অমরত্বকে ছুঁতে না পারলেও প্রকৃতির নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেহের খাঁচায় প্রাণকে ধরে রাখতে চান আরও বহুদিন, বহু বছর। তিনি তা পারবেন কি না, সে সম্পর্কে এখনই ভবিষ্যদ্বাণী না করা গেলেও এ কথা সত্য যে ভ্লাদিমির পুতিন ক্রেমলিনের মসনদ নিজের দখলে রাখার দীর্ঘতম রেকর্ড সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি একাধারে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেই ১৯৯৯ থেকে দোর্দণ্ড প্রতাপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চ। ২৭ বছর ধরে রাশিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে থেকে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় নিতে স্বপ্ন দেখছেন। জোসেফ স্তালিন ক্ষমতায় ছিলেন ২৪ বছর (১৯২৯-১৯৫৩)। আর আয়ু পেয়েছিলেন ৭০ বছর।

তাঁর আমলে, এই দীর্ঘ সময়ে ইতিমধ্যে সাবেক হয়ে গেছেন পাঁচজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ বুশ জুনিয়র, বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হয়েছেন। কিন্তু পুতিন ক্রেমলিন ছাড়েননি, অদূর ভবিষ্যতেও ছেড়ে যাবেন, তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২০২০ সালে সাংবিধানিক সংশোধনী করিয়ে নিয়ে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার আইনি বৈধতা নিশ্চিত করেছেন। ২০৩৬ সালে পুতিনের বয়স হবে ৮৪ বছর। পুতিন খুব দক্ষতার সঙ্গে গণতন্ত্রের আলখেল্লা গায়ে চড়িয়ে একনায়কতন্ত্র কায়েম করে যুগের পর যুগ ক্ষমতার মসনদটি নিজেদের দখলে রাখতে পেরেছেন। ছলে-বলে-কৌশলে জনগণকে পাশ কাটিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। তাঁর কাছে জনগণ মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে ক্ষমতার ‘তালগাছ’ নিজের দখলে থাকতে হবে, তা।

ইতিমধ্যে অঢেল অর্থ, বৈভবেও নিজেকে বিশ্বের অতি ধনীদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। ফরচুন ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে সিকি শতাব্দী সময়ে পুতিন আয়ত্তে নিয়েছেন ২০ বাড়ি, ৭০০ গাড়ি, ৫৮ উড়োজাহাজসহ আরও বহু সম্পদ। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসারে পুতিনের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মূল্য ২ হাজার কোটি ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। তাঁর দখলে থাকা ৭১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের একটি অতি বিলাসবহুল উড়োজাহাজের কথাও শোনা যায়। অনেকে কৌতুক করে এই জেট প্লেনকে ডাকেন ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার পোমেরান্তসেভ আগেই লিখেছিলেন যে ‘প্রচণ্ড মৃত্যুভীতি’ ক্রেমলিনের লৌহমানবটিকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের রক্তের সাগরে হাবুডুবু খেয়েও ভ্লাদিমির পুতিন যখন জয়ের দেখা পাচ্ছেন না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, শেষ পর্যন্ত পুতিন কি মৃত্যুকে জয় করতে পারবেন?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত