Ajker Patrika

সাক্ষাৎকার /যেকোনো সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যেই বিপ্লবী উপাদান তৈরি হয়

আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের একজন অন্যতম গণবুদ্ধিজীবী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম সংগঠক, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের অন্যতম নেতা এবং ‘সর্বজন কথা’ পত্রিকার সম্পাদক। আজ তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁর সঙ্গে জীবনের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।

মাসুদ রানা
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৪৭
যেকোনো সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যেই বিপ্লবী উপাদান তৈরি হয়
আনু মুহাম্মদ

জন্মদিন উপলক্ষে আজকের পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। আলোচনা শুরু করতে চাই আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি তরুণ। সে সময়ের স্মৃতি জানতে চাই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি কেবল দশম শ্রেণিতে উঠেছি। ১৯৭১ সালের শুরুতে ক্লাস ঠিকমতো শুরু হয়নি। আমরা সেভাবে ক্লাস করতে পারিনি। আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হয় ১ মার্চে। সেদিন আমি একরকম ঘটনাক্রমেই এর সঙ্গে জড়িয়ে যাই। স্কুলে যাচ্ছিলাম, পথে স্টেডিয়ামে খেলা হচ্ছিল পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ। স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হলো না, স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়লাম। পাকিস্তান তখন খুব ভালো ব্যাটিং করছিল, পুরো মাঠের দর্শক পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের বাহবা দিচ্ছিল। হানিফ মোহাম্মদ, ইন্তেখাব আলম, এদের ছক্কা-চারে গ্যালারি উত্তাল। দুপুর ১২টার দিকে আমার পেছনে থাকা একজন লোক রেডিওতে একটা খবর শুনলেন। পাকিস্তানের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান স্থগিত করেছেন। ঘোষণাটা আমি নিজে খেয়াল করিনি, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম স্টেডিয়ামের পুরো চেহারা পাল্টে গেল। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বলে উঠল, হইচই শুরু হলো। যে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের এতক্ষণ বাহবা দিচ্ছিল দর্শকেরা, সেই তাঁদের পেছনে দৌড়াতে লাগল তারা মারার জন্য।

এবার স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ধরনের স্লোগান উঠল। সেখান থেকে একটা মিছিল বেরিয়ে গেল, আর সেই মিছিলের সঙ্গে আমিও চলে গেলাম। মিছিল কোথায় কোথায় গেছে জানি না, কিন্তু সেই মিছিল থেকে আর বেরোতেই পারিনি। মিছিল শেষ করে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। এভাবেই আমার শুরু। বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ঘটনাপ্রবাহ যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, আমি ঠিক সেখানেই ছিলাম। ১ মার্চের ওই মিছিলটাই ছিল তখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মিছিল।

এরপর শেখ মুজিবুর রহমান যিনি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা, তাঁর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলো ২ মার্চ থেকে। আমাদের সিদ্ধেশ্বরী এলাকাতেই আর্মির হাতে দুজন নিহত হন। তাঁদের একজন শহীদ ফারুক-ইকবাল; এখনো সেই এলাকায় তাঁর নামে একটা স্তম্ভ আছে। তারপর এল ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। আমরা সেটা শুনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। পরিস্থিতি ছিল খুবই অশান্ত। বাসায় টেপরেকর্ডার নিয়ে বসেছিলাম রেকর্ড করব বলে, কিন্তু সেদিন রেডিওতে ভাষণ সম্প্রচারই হলো না। পরে জেনেছি, রেডিওর কর্মীরা ধর্মঘট করেছিলেন। পরদিন ৮ মার্চ ভাষণটা সম্প্রচারিত হলো। তার পর থেকে পুরোটাই ছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে।

আমাদের পাড়ায় ‘পল্লীমা সংসদ’ নামে একটা সংগঠন ছিল, যেখানে আমার বড় ভাইয়েরা সক্রিয় ছিলেন এবং আমিও যুক্ত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ তখনো শুরু হয়নি, কিন্তু এই সংগঠনের মধ্যেই রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চলত। সে সংগঠনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, এমনকি নকশালপন্থী ধারার লোকজনও যুক্ত ছিলেন। এই সবার মিলিত সিদ্ধান্তে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ঠিক হলো, আমরা ব্যারিকেড তৈরি করব। সিমেন্টের বস্তা, বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করলাম। ভাবলাম এতে আর্মি ঠেকানো যাবে। কিন্তু আর্মি সম্পর্কে বা তাদের আক্রমণের মাত্রা সম্পর্কে আমাদের আসলে কোনো ধারণাই ছিল না। একপর্যায়ে ভয়ংকর আক্রমণ শুরু হলো। পল্লীমা সংসদ থেকে বাসায় ফেরাটাই তখন আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ল। এরপর ঢাকা শহরে আর থাকা গেল না। প্রথমে ঢাকার এক প্রান্ত মেরাদিয়ার দিকে গেলাম, সেখানেও থাকা গেল না। শেষে নৌকায় প্রায় সাত দিন ধরে জামালপুরে নানাবাড়িতে চলে গেলাম।

নানাবাড়িতে গিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতাম, আর সেটা শুনতে শুনতেই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার একটা তীব্র আগ্রহ তৈরি হলো। সেই তাগিদ থেকে ১৯৭১ সালে আমি একবার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সেটা একটা ব্যর্থ চেষ্টা ছিল।

সেটা কী রকম?

সে বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়াটা নিয়ে একধরনের ফ্যান্টাসি তৈরি হয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে শুনতে মনে হতো, বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেই রাস্তায় কোথাও না কোথাও কোনো মুক্তিযোদ্ধার দেখা হয়ে যাবে। বাস্তবে কোনো মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। কোনো সিনিয়র গাইড করার মতোও কেউ ছিলেন না। শুধু এইটুকু জানা ছিল যে জামালপুর শহর হয়ে শেরপুর পেরিয়ে সীমান্তের দিকে যেতে থাকলে কারও না কারও সঙ্গে দেখা হবে। এমনই একটা কল্পনা থেকে আমি কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। শেষ পর্যন্ত রাজি হলো আমার এক বন্ধু। তিনি একজন খেতমজুর ছিলেন। তাঁর নাম কোবাদ। আমরা দুজনে এক ভোরে ফজরের নামাজের পরপরই রওনা দিলাম। কোনোভাবে পাঁচ টাকা জোগাড় করেছিলাম। তখনকার হিসাবে অনেক টাকা। বাসে চড়ে জামালপুর শহরে পৌঁছালাম।

জামালপুর থেকে শেরপুরের দিকে যেতে একটা নদীর ঘাট পার হলাম। সেখানে পাকিস্তান আর্মি সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে পরীক্ষা করছিল—একটা ছিল কলেমার পরীক্ষা, আরেকটা ছিল মুসলমান কি না তা যাচাই করা। আমার বন্ধুর দুটোতেই ফেল করার আশঙ্কা ছিল। তাই একটু টেনশন হচ্ছিল। কিন্তু কীভাবে যেন আমরা দুজনই পার হয়ে গেলাম। নইলে সেদিনই ওর বিপদ হয়ে যেত। পার হয়ে আমরা হাঁটতে থাকলাম। জামালপুরেই আমাদের হাতের টাকা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই হেঁটেই এগোতে হলো। যেভাবে ভেবেছিলাম, কেউ আমাদের জিজ্ঞেস করবে যে, আমরা মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছি কি না, তেমন কিছু হলো না। উল্টো, কারও কাছে পানি চাইতে গেলে বা কথা বলতে গেলে সবাই যেন ভয় পেয়ে আমাদের তাড়িয়ে দিত।

এভাবে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। বুঝলাম, কোথাও থামতে হবে। রাস্তার পাশে একটা বাড়ির সামনে একজন লোককে জাল বা এই জাতীয় কিছু একটা নিয়ে কাজ করতে দেখলাম। ভাবলাম, পানি চাইলে হয়তো রাতটা থাকার একটা প্রস্তাব পাব। কিন্তু আমাদের পানি চাওয়ার পর লোকটা অদ্ভুতভাবে তাকাল, তারপর ‘আসছি’ বলে ঘরে ঢুকে গেল। পনেরো-বিশ মিনিট, হয়তো আধ ঘণ্টা পার হয়ে গেল, লোকটা ফেরে না। হঠাৎ দেখি বড় রাস্তার দিক থেকে ১৫-২০ জন লোক লাঠিসোঁটা হাতে এসে আমাদের ঘিরে ধরল। তারা আসলে পাকিস্তানপন্থী রাজাকার ছিল। প্রথমেই মারধর শুরু করল। আমার বাবার হাতে আগে অনেকবার মার খেয়েছি, কিন্তু রাজাকারদের হাতে এই প্রথম মার খেলাম। ওরা ধরেই নিয়েছিল আমরা ট্রেনিং নিয়ে ফিরছি। আমার হাতঘড়ি দেখেই বোধ হয় তাদের সন্দেহ আরও পোক্ত হলো। গালিগালাজ করল। আমাদের মতো লোকদের কারণেই পাকিস্তানের ক্ষতি হচ্ছে, এসব বলে। কোথায় যাচ্ছি জিজ্ঞেস করায় বললাম, মামাবাড়ি যাচ্ছি, কিন্তু যেদিকে বললাম সেদিক তো সীমান্ত। ফলে তাদের সন্দেহ আরও প্রবল হওয়ার কারণে আরও একবার মার খেলাম। তারপর আমাদের একটা ঘরে বন্দী করে রাখা হলো।

এক-দুই ঘণ্টা পর বাড়ির এক মহিলা এসে কাঁঠালবিচির ভর্তা দিয়ে সামান্য ভাত খেতে দিলেন। সঙ্গে বকাও দিলেন—এই বয়সে এসবের মধ্যে জড়ানোর কী দরকার ছিল? নিশ্চয়ই তাঁর নিজের সন্তানের কথা মনে পড়ছিল তখন। এরপর তন্দ্রার মধ্যে কতটা রাত কেটেছে জানি না। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙল। কোথাও একটা বড় অপারেশন হচ্ছিল, পরে জেনেছি সেটা সম্ভবত জামালপুরে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বের কোনো অপারেশন ছিল। সেই শব্দ শুনে রাজাকারেরা আরও নিশ্চিত হলো যে, আমরা এই অপারেশনের সঙ্গে যুক্ত। বাইরে দাঁড়িয়ে ওরা কথা বলল, ঠিক করল যে ফজরের নামাজের পর আমাদের ক্যান্টনমেন্টে দিয়ে দেবে, মুক্তিযোদ্ধা ধরার কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য। ভেতর থেকে সেই কথা শুনে তখন আর কিছু ভাবার মতো অবস্থা ছিল না আমাদের।

ফজরের আজান শোনার পরপরই একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটল। সেই মহিলা এলেন, সঙ্গে যে লোকটা আমাদের ধরিয়ে দিয়েছিল সেও। এখন মনে হয়, রাতভর হয়তো ওই লোকের সঙ্গে মহিলার এক রকম ঝগড়া হয়েছিল। আমাদের বয়স দেখে হয়তো তাঁর মাতৃসুলভ মন সাড়া দিয়েছিল। মহিলা আমাদের ঘর থেকে বের করে বাড়ির পেছনে বিলের দিকে নিয়ে গেলেন, বললেন ওদিক দিয়ে ঘুরে বড় রাস্তায় উঠতে, আর যেন এদিকে না আসি। তিনি আমাদের বাঁচাতে পারবেন না। সেভাবে বেরিয়ে আবার হাঁটতে হাঁটতে যখন জামালপুর শহরে ফিরলাম, তখন পরদিন বিকেল প্রায় তিনটা বাজে।

জামালপুরে আমার আত্মীয়স্বজন ততক্ষণে আমাদের খোঁজাখুঁজি করে অস্থির। তখনো মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছাটা মাথায় ছিল। ভাবছিলাম পরিচিত কারও কাছ থেকে যদি আরেকটু টাকা জোগাড় করা যায়। ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাস্তায় হাঁটছি। এমন সময় হঠাৎ কেউ শক্ত করে হাত চেপে ধরল—তাকিয়ে দেখি আমার নানা, সঙ্গে আরও অনেকে। তাঁরা তখন আমাদের খুঁজেই অস্থির ছিলেন। এভাবেই আমার প্রথম, ব্যর্থ চেষ্টাটার সমাপ্তি হলো।

যুদ্ধ চলাকালে আপনি কি আবার ঢাকায় ফিরেছিলেন?

এই ঘটনার পর বাবা আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। ঢাকায় ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই দেখলাম, আমাদের পাড়ার পরিচিত কয়েকজন বড় ভাই আরবান গেরিলা হিসেবে ঢাকায় ফিরেছেন। তাঁদের সঙ্গে দেখা হলো। তাঁদের ইউনিট কমান্ডার ছিলেন আব্দুল্লাহিল বাকি, শহীদ বাকি, যাঁর নামে এখানে একটা সরণি আছে। তাঁকে বললাম, আমি মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাই। এই প্রথম একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সরাসরি কথা হলো। তিনি বললেন, এই বয়সে যাওয়ার দরকার নেই। বরং লেখালেখি, চিঠিপত্র কপি করা—এই ধরনের ছোটখাটো কাজ করলেই হবে। আমি বারবার জোর করার পর একপর্যায়ে তিনি বললেন, দুই কপি ছবি নিয়ে রেডি থাকতে, ৪ ডিসেম্বর তিনি আবার যাবেন, তখন আমাকে নিয়ে যাবেন।

কিন্তু ৪ ডিসেম্বরের আগেই যুদ্ধ পুরোদমে শুরু হয়ে গেল। তখনো বুঝিনি যে যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। তবু আমি সেই তারিখের অপেক্ষায় ছিলাম। ৪ ডিসেম্বর সকাল ১০-১১টার দিকে বাসায় খবর পেলাম, শহীদ আব্দুল্লাহিল বাকি ও শহীদ বাবুলের লাশ রেললাইনের পাশে পাওয়া গেছে। আসলে ৩ তারিখ রাতেই রাজাকারেরা তাঁদের হত্যা করেছিল। এরপর তো বোমাবর্ষণ শুরু হয়ে গেল, আর ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো।

যুদ্ধের পরের একটা ঘটনা শুনেছিলাম, আপনাদের একটা তরুণ দল শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?

এটা ১৯৭২ সালের ঘটনা, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। যুদ্ধের প্রভাবে তখন তরুণদের মধ্যে দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে একটা প্রবল আগ্রহ ও কিছু করার তাগিদ তৈরি হয়েছিল। সেই তাগিদ থেকে আমরা ছোটবেলায় সাইক্লোস্টাইল করে একটা পত্রিকা বের করতাম। ‘অঙ্কুর পরিষদ’ নামে একটা সংগঠনও করেছিলাম। পল্লীমা সংসদে নানা রকম অনুষ্ঠান করতাম। এরই মধ্যে একদিন মনে হলো, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার জন্য কিছু একটা করা যায় কি না। সরকারের তরফ থেকে তখন কিশোর-তরুণদের জন্য এমন কোনো উদ্যোগ ছিল না, তাই আমরা নিজেরাই ভাবলাম, একটা চ্যারিটি সিনেমা শো করে টাকা তুলব।

সেই বয়সেই কীভাবে যে এই পরিকল্পনা মাথায় এল! গুলিস্তানে গিয়ে যত ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরের অফিস ছিল, সবখানে গিয়ে বললাম যে আমরা এমন একটা শো করতে চাই। একটা সিনেমা পাওয়া গেল, টিকিট ছাপালাম। নিজেরাই সেই টিকিট বিক্রি করলাম, গুলিস্তান সিনেমা হল ভাড়া করলাম। শো হলো। কোন সিনেমা ছিল এখন আর মনে নেই। খরচ বাদ দিয়ে টিকিট বিক্রির টাকা থেকে আমাদের হাতে থাকল প্রায় ৩৫২ টাকার মতো।

এবার প্রশ্ন এল, এই টাকা শেখ মুজিবকে কীভাবে দেওয়া যায়? তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী, কোথায় বসেন, কীভাবে দেখা করতে হয়, কিছুই জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে জানলাম, মিন্টো রোডে পুরোনো গণভবন—এখন যেটাকে সুগন্ধা বলা হয়, সেটায় তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একদিন বিকেলে আমরা আট-দশজন হেঁটে হেঁটে সেখানে গেলাম। কেউ কেউ আমার চেয়ে বড়, আবার বেশ কয়েকজন আমার চেয়েও ছোট ছিল। গেটে গিয়ে বললাম, আমরা স্কুলে পড়ি। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে টাকা দিতে এসেছি। প্রহরীরা একটু অবাক হলেন, আমাদের গেটে বসিয়ে ভেতরে খবর দিলেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এল, ভেতরে যাওয়া যাবে, তার মানে প্রধানমন্ত্রী তখন সেখানেই ছিলেন। গেট থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে দোতলায় উঠতে হলো। আমি জীবনে ওই একবারই সেখানে গিয়েছিলাম।

ওপরে উঠে একটা বড় ঘরে দেখলাম, তখনকার প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতিদের চারপাশে এখনকার মতো জাঁকজমক ছিল না। সাদা রঙের সোফা, সাদামাটা পরিবেশ। মনে হলো কোনো একটা সভা চলছিল, নেতারা উপস্থিত। আমাদের দেখে শেখ মুজিব নিজেই উঠে এলেন, তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে বললেন, ‘কিরে, তোরা কী চাস, কী খবর?’ আমি বললাম, আমরা কিছু টাকা দিতে এসেছি। তিনি বেশ অবাক হলেন, তারপর ফটোগ্রাফার ডাকলেন, ছবি তোলা হলো—পরদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় সেই ছবি ছাপা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এত অল্পবয়সীদের যাওয়াটা তখন খবর হওয়ার মতোই ছিল।

এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কী চাই। এই প্রশ্নে আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। কারণ, কিছু চাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। হঠাৎ মনে পড়ল, বললাম, আমরা একটা পত্রিকা বের করি। একটা বিজ্ঞাপন দিন। তিনি হেসে বললেন, তাঁর নিজেরই সবকিছু ভাঙা। পাকিস্তান সব ভেঙে ফেলেছে, কলকারখানা সব বিধ্বস্ত, কী দেবেন আমাদের! তারপর সচিবকে ডেকে কিছু একটা বলে দিলেন।

সেই সময়কার তরুণ প্রজন্মের যে মানসিক অবস্থা ও উদ্যম ছিল, নেতৃত্ব থেকে সেভাবে কোনো ডাক এলে তারা যেকোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু এই সম্ভাবনাটা তখনকার শেখ মুজিব বা সরকারের উপলব্ধির মধ্যে ছিল না বলেই মনে হয়।

এরপর তো আপনি ম্যাট্রিক পাস করলেন।

ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম ১৯৭২ সালে।

মুক্তিযুদ্ধের যে প্রভাব আপনার মধ্যে পড়েছিল, সেটা পরবর্তী জীবনে কীভাবে কাজ করেছে?

এর প্রভাব হলো, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি, বিপ্লব—এসব বিষয়ে আমার প্রবল আগ্রহ তৈরি হলো। মনে হতো, শেখ মুজিব যদি মার্ক্সবাদী হতেন তাহলে ভালো হতো। কারণ, মার্ক্সবাদ সম্পর্কে তখন আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশেষত দুই নম্বর সেক্টরে যাঁরা ছিলেন এবং অন্যান্য সেক্টরেও, যেকোনো সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যেই একটা বিপ্লবী উপাদান তৈরি হয়। তখন চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা—এসব দেশের বিপ্লবের কাহিনি আমাদের কাছে নায়কোচিত হয়ে উঠল, আর তার ফলে আমাদেরও আগ্রহ তৈরি হলো। বইপত্র পড়তাম, পত্রপত্রিকা পড়তাম, আর ধীরে ধীরে মনে হতে লাগল যে বাংলাদেশে একটা বিপ্লবী পরিবর্তন দরকার। শেখ মুজিবের ব্যাপারে আমার প্রত্যাশা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকল। আমি বুঝতে পারছিলাম, তাঁর পক্ষে কী কী কারণে সেই পরিবর্তন সম্ভব নয়। এরপর বাম দলগুলোর অফিসে যাতায়াত শুরু করলাম, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতাম, মওলানা ভাসানীর প্রোগ্রামেও গিয়েছি।

১৯৭৩ সাল থেকে ঢাকা কলেজে পড়ছি। একটা সাইকেল ছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যেতাম, লাইব্রেরিতে যেতাম, বইপত্র পড়তাম, সেমিনার শুনতাম। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর—এরা তখন আমার আগ্রহের কেন্দ্র। কারণ, এরা বিপ্লবী ও পরিবর্তনের কথা বলতেন। মনে আছে, বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন’ বইটা পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে পড়েছিলাম, তখনো কলেজের ছাত্র। এসব থেকেই এই ধারার প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়।

১৯৭৩ সাল থেকে ‘বিচিত্রা’য় লেখালেখি শুরু করি। প্রথমে ডাকে লেখা পাঠাতাম। পরে বিচিত্রায় গিয়ে শাহাদত চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হলো। আমার বয়স দেখে তিনি একটু অবাকই হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তরুণদের উৎসাহ দিতেন। এভাবে বিচিত্রায় লেখার একটা ভালো সুযোগ পেলাম। ফলে গ্রাম, শ্রমিক, কৃষি, সাম্রাজ্যবাদ, নানা রকম বৈষম্য—এসব বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে লেখার অভ্যাস তৈরি হলো। লিখতে গিয়ে অনেক কিছু পড়তে হতো, শিখতে হতো। এভাবেই আমার চিন্তার জগৎ গড়ে উঠল। ১৯৭৩ থেকে প্রায় মাস্টার্স পর্যন্ত বিচিত্রায় লেখালেখিই ছিল আমার একটা বড় কাজ।

এরপর তো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। সেখানকার কর্মকাণ্ড নিয়ে কিছু বলুন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার বন্ধুদের মধ্যে ক্লাসেই পেলাম হুমায়ুন ফরিদী, শেখ মঞ্জুরুল হক—ছিলেন আমার রুমমেট, আর ফজল মাহমুদ নামে একজন কবিও ছিলেন আমাদের দলে। যিনি পরে আত্মহত্যা করেন। আমরা ছিলাম একটা ছোট টিম। এর সঙ্গে আমাদের সিনিয়র কয়েকজন ভাই ও আপাও বেশ আগ্রহী ছিলেন। আমরা মিলে বেশ কিছু সংগঠন করেছিলাম। যেমন ‘শিরোনাম’ নামে একটা পত্রিকা বের করলাম, ‘ইকোনমিক স্টাডি গ্রুপ’ নামে একটা স্টাডি সার্কেল (পাঠচক্র) করলাম। প্রতি মাসে একটা নিয়মিত আলোচনা হতো, যাতে বিচিত্রা-সূত্রে পরিচিত ঢাকার অনেককেও নিয়ে যেতাম। একটা লাইব্রেরিও গড়ে তুলেছিলাম। এইসব কাজের মধ্যেই আমি ১৯৭৮ সালের দিকে ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’-এর সঙ্গে যুক্ত হই। তার আগে গ্রন্থাগার, পাঠচক্র, শিরোনাম পত্রিকা—এ সবকিছুতেই হুমায়ুন ফরিদী আমার সঙ্গে ছিলেন; ফরিদী ছিলেন আমাদের সিনিয়র।

হুমায়ুন ফরিদী সম্পর্কে একটু জানতে চাই।

হুমায়ুন ফরিদী আমার চেয়ে পাঁচ বছরের সিনিয়র হলেও নানা কারণে তাঁর কয়েক বছর লস হয়েছিল। তাই আমরা প্রায় একই সময়ে ক্লাসে পড়তাম। উনি ছিলেন চাঁদপুরের ছেলে। প্রথম দিন থেকেই বুঝেছিলাম, ওনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হবে। কারণ, ওনার কথা বলার ধরনটাই ছিল আলাদা। নাটক-ফিল্মের প্রতি ওনার অসম্ভব আগ্রহ, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে গভীর মনোযোগ, কবিতা আবৃত্তি করতেন চমৎকার, আর অনেক কিছুর খোঁজখবর রাখতেন। উনি নিজেই বলতেন, পড়াশোনায় তাঁর তেমন আগ্রহ নেই, অভিনয়েই আসল আগ্রহ। কিন্তু মাস্টার্স না করলে বিয়ে করা যাবে না বলেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে তাঁর কয়েক বছর গ্যাপ পড়লেও তাতে আমাদের বন্ধুত্বে কোনো সমস্যা হতো না। আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমাদের নিয়মিত ছাত্রজীবন খুব একটা ছিল না, কিন্তু পরীক্ষার সময় ফরিদীসহ আমরা একসঙ্গে পড়তাম। শুরুতে আমি অন্য হলে থাকলেও ফরিদী আমাকে নিজের হলে নিয়ে আসেন, যেটা ছিল খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ একটা জায়গা। ‘শিরোনাম’ পত্রিকা, ‘ইকোনমিক স্টাডি গ্রুপ’, লাইব্রেরি—এসব প্রায় সব কাজেই ফরিদী আমার সঙ্গে ছিলেন, একসঙ্গেই করতাম।

একটা পর্যায়ে জাহাঙ্গীরনগরে সাত দিনব্যাপী নাট্য প্রতিযোগিতা হলো, সেখানে ফরিদীর লেখা ও পরিচালিত নাটক শ্রেষ্ঠ নাটক নির্বাচিত হলো। সেই সূত্রেই ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। নাসির উদ্দীন ইউসুফ ছিলেন সেই প্রতিযোগিতার বিচারক। এরপর ধীরে ধীরে তিনি ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন; আমরা যখন মাস্টার্সে, তত দিনে তিনি একটা পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।

আপনি কীভাবে সাংগঠনিক সক্রিয়তায় যুক্ত হলেন?

১৯৭৬ সালে ‘লেখক শিবির’ নতুন করে পুনর্গঠিত হলো, আর আমার যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন শাহরিয়ার কবির। তিনি তখন একটা বিপ্লবী রাজনৈতিক ধারা মানেন, বদরুদ্দিন উমরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বদরুদ্দীন উমরের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকা থেকে। ১৯৭৪ সালে তাঁর সম্পাদনায় এই পত্রিকা বের হতে শুরু করে। যেহেতু এসব বিষয়ে আমার আগে থেকেই আগ্রহ ছিল, তাই সংস্কৃতি পত্রিকা মন দিয়ে পড়তাম, লেখাগুলোকে বেশ মানসম্মত মনে হতো। পাঠক হিসেবে সম্পাদকের কাছে চিঠিও লিখেছিলাম। অনেক বছর পর বদরুদ্দীন উমর সেই চিঠি ফাইল থেকে খুঁজে বের করে আমাকে দেখিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই গোছানো একজন মানুষ। ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকা পড়েই তাঁর সম্পর্কে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর তাঁর অন্যান্য বইপত্রও পড়ি। শাহরিয়ার কবির কাজ করতেন বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে, সংগঠন করতেন। লেখক শিবিরের কথা তখনই জানলাম এবং যথেষ্ট আগ্রহী হয়ে উঠলাম। কারণ, অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে আমি ততটা তৃপ্ত হচ্ছিলাম না। ১৯৭৬ সালে লেখক শিবির পুনর্গঠিত হওয়ার পর, ১৯৭৮ সাল থেকে বলা যায় আমি সেই রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত হয়ে গেলাম।

আপনি ‘সংস্কৃতি’র নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

হ্যাঁ, ১৯৮১ সালে। আমাদের মাস্টার্স পরীক্ষা তখন শেষ হয়েছে। একদিন বদরুদ্দীন উমরের শান্তিনগরের বাসায় কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘সংস্কৃতি’ আবার নতুন করে বের করা হবে। আর আমাকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিতে হবে। এটা আমার ওপর একটা বড় দায়িত্ব হিসেবে এল। প্রায় একই সময়ে আরেকটা বড় দায়িত্বও এসে পড়ল, লেখক শিবির তখন নতুন করে দাঁড়াচ্ছে। আবরার চৌধুরী (অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা) তখন সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু তিনি বিদেশে। ফলে লেখক শিবিরের কেন্দ্রীয় কাজের দায়িত্বও আমার ওপর এসে পড়ে। ১৯৮১ সাল থেকে এই দায়িত্ব পালন করে আসছিলাম। আর ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই।

আপনার সাংগঠনিকভাবে একধরনের বিচ্ছেদ হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটটা একটু বলুন।

লেখক শিবিরে আমি ১৯৮৪, ৮৬, ৮৮ ও ৯০—এই চারটি সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলাম। প্রথম দিকে সভাপতি ছিলেন বদরুদ্দীন উমর, পরের দিকে হাসান আজিজুল হক। ১৯৯৩ সালের সম্মেলনে ডা. মনিরুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক হন। এরপরও আমি লেখক শিবিরের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবেই যুক্ত ছিলাম। এর পাশাপাশি আমি টাফ, কৃষক ফেডারেশন এবং ১৯৮৭ সালে গঠিত গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট—এসবের সঙ্গেও কেন্দ্রীয়ভাবে যুক্ত ছিলাম।

২০০০ সালে এই সাংগঠনিক ধারার সঙ্গে আমার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক অবস্থানে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না, কিন্তু কাজের ধরন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আমার সঙ্গে দ্বিমত তৈরি হয়। এ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি না করে অনেক বছর চেষ্টা করেছি বিষয়টা সামলাতে।

১৯৯০-এর দশক থেকে আমাদের অফিস ছিল ৬৮/২ পুরানা পল্টনে। আমি মনে করি, সেই সময়ে সে অফিসটা একটা বিকল্প বাম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। আমরা তখন অনেকগুলো সংগঠন গড়ে তুলেছিলাম। সরাসরি রাজনৈতিক দল না হলেও নানা সামাজিক-রাজনৈতিক কাজের প্ল্যাটফর্ম। যেমন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি’। এটা ছিল বাঙালি ও পাহাড়িরা একসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে কাজ করার প্রথম এমন উদ্যোগ। এরপর ‘বস্তি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’, ‘যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ মঞ্চ’। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে এই ধরনের কাজ। পরে ‘তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি’, ফ্যাসিবাদবিরোধী কমিটি—এ রকম নানা উদ্যোগ। এ ছাড়া ‘জনযুগ’ পত্রিকা বের হতো, লেখক শিবির থেকে ‘তৃণমূল’ পত্রিকা। ‘কৃষক আন্দোলন বুলেটিন’, ‘সাংস্কৃতিক আন্দোলন বুলেটিন’—এ রকম আরও নানা বুলেটিন বের হতো। এই বৈচিত্র্যের কারণে অনেক মানুষের কাছে এটা একটা বিকল্প জায়গা হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। আমি চেষ্টা করছিলাম এই ধারার মধ্যে জনসম্পৃক্ততা যতটা সম্ভব বাড়ানো যায়, কিন্তু সেই প্রশ্নে মতপার্থক্য তৈরি হলো। আর সে কারণেই একপর্যায়ে ২০০০ সালে আমি সংগঠন ত্যাগ করি।

একসময় আপনার সম্পাদনায় ‘মেঘবার্তা’ নামে একটা অনলাইন পত্রিকা বের হতো। কোন প্রেক্ষাপটে এটা শুরু করেছিলেন?

মেঘবার্তা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের পরপর। তখন ‘দৃক’ এখনকার মতো বড় প্রতিষ্ঠান ছিল না, ছোট আকারের একটা প্রতিষ্ঠান। তাদের একটা অনলাইন সংযোগ ছিল। বাংলাদেশে তখন ইন্টারনেট বলতে মূলত ই-মেইলের একটা ব্যবস্থা সদ্য তৈরি হয়েছে। আর সেটা প্রথম যারা নিয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যে দৃক অন্যতম। তখন টেলিফোন লাইনে ডায়াল করে ইন্টারনেট সংযোগ নিতে হতো, আর যতক্ষণ সংযোগ থাকত ততক্ষণ টেলিফোনের বিল উঠত—এমনই ছিল ব্যবস্থা। সেই সময়ে বাংলাদেশে একটা অনলাইন ম্যাগাজিন বের করাটা অনেকের কাছে একরকম বিলাসিতা মনে হতো। কিন্তু আমার ছাত্র-ছাত্রী ও সহকর্মীদের মধ্যে তখন একটা আগ্রহ তৈরি হলো যে অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের জায়গাটা ধীরে ধীরে বিকশিত হবে। তাই আমাদেরও এ রকম একটা পত্রিকা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই মেঘবার্তা শুরু হয়, যেখানে দৃকের ইন্টারনেট সুবিধাই ছিল মূল সহযোগিতা। পরে মেঘবার্তার প্রকাশনা নিয়ে দৃকের সঙ্গে আমার মতপার্থক্য তৈরি হলে আমরা এটাকে ৬৮/২ পুরানা পল্টনের অফিসে নিয়ে আসি। ২০০০ সালে আমি সংগঠন ত্যাগ করলেও মেঘবার্তা এরপর আরও বেশ কয়েক বছর চলেছিল।

এই পত্রিকার প্রভাব কেমন ছিল?

পরে বুঝতে পেরেছি, মেঘবার্তার প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছিল। যদিও বাংলাদেশে এর পাঠকসংখ্যা কমই ছিল। কারণ, তখন এখনকার মতো ইন্টারনেট সবার হাতে হাতে ছিল না, আর অনেকের ধারণা ছিল এসব একধরনের এলিট বিলাসিতা, অহেতুক পরিশ্রম। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখেছি, প্রবাসে থাকা অনেক বামমনা মানুষ এবং আমরা যেহেতু ইংরেজিতেও লিখতাম, সেই সূত্রে একটা ভালো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল। তবে এটা আমরা দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে পারিনি। ২০১১-১২ সাল পর্যন্ত চেষ্টা করেছি।

আপনি ‘নতুন পাঠ’ বের করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প চিন্তার পত্রিকা ‘সর্বজন কথা’ সম্পাদনা করছেন। প্রচলিত গণমাধ্যমের বাইরে গিয়ে নীতিনির্ধারণী ও বুদ্ধিভিত্তিক পরিসরে এই পত্রিকার প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।

‘নতুন পাঠ’ পত্রিকাটা বের হয় ২০০৩ সালে। কয়েকটা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর ২০০৪-০৫ সালে আমি জাতীয় কমিটির কাজে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ২০০৫-০৬ সালে ফুলবাড়ির বড় আন্দোলন, তার আগে ২০০৪ সালে টাটাবিরোধী আন্দোলন, এসব নিয়ে চলছিল কাজ। এই আন্দোলনগুলো চলার মধ্যেই ২০১৪ সালে আমরা ‘সর্বজন কথা’ শুরু করি। এই ধরনের একটা উদ্যোগের চেষ্টা আমার আগে থেকেই ছিল। ২০১৪ সালে দেখলাম কয়েকজনকে একসঙ্গে পাওয়া গেল, যাঁদের নিয়ে এটা করা সম্ভব, তখন তাঁদের নিয়েই সর্বজন কথা শুরু করি। এখনো এটা চলছে, আগামী নভেম্বরে এর ১২ বছর পূর্ণ হবে।

এর প্রভাবটা মানে বুদ্ধিভিত্তিক পরিসরে কেমন?

এর প্রভাব আমার চেয়ে পাঠকেরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি মনে করি, একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, শেখ হাসিনার যখন পতন হলো, তখন অনেকের কাছেই এটা একটা বিস্ময়ের বিষয় ছিল। কারণ, এত দিন পত্রপত্রিকা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়নের কথাই দেখে আসছিল সবাই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এত উন্নয়নের পরও কীভাবে তাঁর পতন হলো? আমি মনে করি, এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই পাওয়া যাবে সর্বজন কথায়। কী ধরনের উন্নয়ন হয়েছে, সেই উন্নয়ন মানুষের ও প্রকৃতির জন্য কীভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে এবং কীভাবে তা অযৌক্তিকভাবে বৈষম্য ও নিপীড়ন বাড়িয়েছে—এসব নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে অনেক লেখা, বিশ্লেষণ, সমাজ-বিশ্লেষণ আমরা প্রকাশ করে এসেছি। বাংলাদেশে বিপ্লবী রাজনীতি, পরিবর্তনের রাজনীতি বা জনগণের রাজনীতির বিকাশের পথে অন্যতম বাধা হলো বুদ্ধিভিত্তিক কাজের এই দুর্বলতা, আর সেই জায়গাতেই সর্বজন কথা দিয়ে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করি, এই চিন্তার জগতে একটা প্রভাব তৈরি করতে।

আপনি এবং প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ দীর্ঘ সময় ধরে ‘তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র নেতৃত্বে ছিলেন। এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন ও শিক্ষা কী? একসময় আপনি সেখান থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। এর কারণইবা কী?

এই আন্দোলনটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা বড় ঘটনা। এর কিছু সাফল্য একেবারে চোখে দেখা যায়, আবার কিছু সাফল্য চোখে দেখা যায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাখে।

চোখে দেখা সাফল্যের মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো, গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করা। মার্কিন একটি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ভারতে গ্যাস রপ্তানি করতে চেয়েছিল, আর এর জন্য ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়েছিল। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত এই চাপ দিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, মার্কিন দূতাবাস, ভারতীয় দূতাবাস, বাংলাদেশের আমলা-মন্ত্রী, এমনকি একাংশ গণমাধ্যম পর্যন্ত ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিল যে গ্যাস রপ্তানি করতেই হবে। এটা কতটা অযৌক্তিক, সে বিষয়ে বুদ্ধিভিত্তিক লড়াইয়ের পাশাপাশি লংমার্চ ইত্যাদির মাধ্যমে যে জনমত তৈরি হলো, তার ফলে গ্যাস রপ্তানি আটকানো গেল। এই কারণেই আজও বাংলাদেশে কিছু গ্যাস মজুত আছে এবং শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখনো চলছে। এটা না হলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতো, তা চিন্তা করাও কঠিন।

আরেকটা কংক্রিট সাফল্য হলো, রপ্তানি ঠেকানোর পর ২০০৪ সালের দিকে টাটা এসেছিল, যারা ৩০ বছরের জন্য গ্যাসক্ষেত্রগুলো নিজেদের হাতে নিয়ে সেখানে স্টিল কোম্পানি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও উন্মুক্ত খনি করতে চেয়েছিল। এই আন্দোলনের চাপেই শেষ পর্যন্ত টাটা প্রকল্প থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। এরপর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ফুলবাড়ি গণ-অভ্যুত্থান, যার সাফল্য এখনো ধরে রাখা গেছে। যদিও এখনো সেটার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। রামপাল নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানে দুটো ইউনিট করার পরিকল্পনা ছিল, আন্দোলনের চাপে একটা ইউনিট বন্ধ হয়েছে। যদিও আরেকটা এখনো চালু আছে।

এগুলো হলো দৃশ্যমান সাফল্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য হলো—রাজনীতিতে বা উন্নয়ন-চিন্তায় পরিবেশ প্রশ্ন, জনগণের মালিকানার প্রশ্ন একটা স্থায়ী জায়গা পেয়েছে বলে আমি মনে করি। ভবিষ্যতে যেকোনো রাজনৈতিক চিন্তায় এই প্রশ্নগুলো অবশ্যই ফিরে আসবে।

জাতীয় কমিটিতে ২০০০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ বছর আমি সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেছি। ২০২০ সালে আমি এই দায়িত্ব থেকে সরে আসি। তবে জাতীয় কমিটির সদস্য হিসেবে এখনো আছি এবং কাজ করতে চাই। এখনো বিভিন্ন শাখার সঙ্গে যেমন ফুলবাড়ি শাখার সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তবে যে কেন্দ্রীয় দায়িত্বটা ছিল, সেখান থেকে সরে আসার কারণ হলো, সেই দায়িত্বে থেকে জাতীয় কমিটিকে সক্রিয় রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এর নানা কারণ থাকতে পারে। আমাদের অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একসঙ্গে ছিল এই কমিটিতে। তাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন হয়েছে, নিজেদের মধ্যে নানা বিভাজন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অবস্থানেও তাদের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা দিয়েছে। এসব কারণে এটা সক্রিয় রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। তবে আমার মনে হয়, এই আন্দোলনের তাগিদ ও বাস্তবতা এখনো আছে। আর যেকোনো সময় এটা আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। তখন হয়তো এর নেতৃত্ব দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু আমি অবশ্যই জাতীয় কমিটির সঙ্গে থাকব।

এখন শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় ও ডানপন্থার উত্থান হচ্ছে। এটাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

এর বেশ কিছু কারণ আছে। অনেকে বলেন সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণ এক দিনে হয়নি, শত শত বছর লেগেছে। বারবার সামন্তবাদ পরাজিত হয়েছে, আবার ফিরে এসেছে; পুঁজিবাদকে প্রতিষ্ঠিত হতেও কয়েক শ বছর লেগেছে। তেমনি বৈষম্যহীন-নিপীড়নমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার যে রাজনীতি বা প্রতিষ্ঠান দরকার, তার খোঁজে আমরা এখনো নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমি মনে করি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এই পথের একেকটা ধাপ। রুশ বিপ্লব ও তার পরবর্তী সাফল্য এবং সারা বিশ্বে তার প্রভাব থেকে যেমন শিক্ষা নিতে হবে, তেমনি এর মধ্যে যেখানে সমস্যা বা ব্যর্থতা ছিল, সেখান থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। চীনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের একটা ব্যাপক প্রভাব সারা পৃথিবীতে পড়েছে বলে আমার মনে হয়। ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত যেসব দেশে বিপ্লবী আন্দোলন হয়েছে, সেখানে মানুষের সামনে একটা লক্ষ্য, আদর্শ বা দৃষ্টান্ত ছিল। এখন সামনে তেমন কিছু নেই। এই শূন্যতার মধ্যেই ধর্মীয় উগ্রপন্থা ও ডানপন্থা জায়গা করে নিচ্ছে। অনেকে ধারণা করেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে, কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, এই পতন আসলে সমাজকে আরও প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে ঠেলে দেবে। সমাজে যত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ছিল, তারা এখন আরও ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে।

ডানপন্থা বলতে বোঝায় যারা বর্ণ, জাতিগত, লিঙ্গীয়, শ্রেণিগত বৈষম্য—এসবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ইউরোপে অভিবাসীদের তাড়ানো, বৈষম্যবাদী নানা তৎপরতা, ওয়েলফেয়ার ব্যবস্থা কাটছাঁট করা, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের মতো নেতার উত্থান, ভারতে মোদির মতো নেতার উত্থান—এসবই একটা বৈশ্বিক প্রবণতা। নতুন পথের সন্ধানে বিশ্বব্যাপী একেকটা প্রচেষ্টা। কিন্তু অন্যদিকে যদি তাকাই শ্রীলঙ্কা, নেপাল, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে নানা চেষ্টা, সাম্প্রতিক স্পেন বা সুইডেনের বিভিন্ন লড়াই—এসবও কিন্তু চলছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও শুধু ট্রাম্পকে দেখলে পুরো চিত্রটা বোঝা যাবে না। ট্রাম্পের পাশাপাশি মামদানিকে দেখতে হবে, বার্নি স্যান্ডার্সকে দেখতে হবে। কংগ্রেসের মধ্যে লাতিন আমেরিকান কণ্ঠস্বর বা প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোকে দেখতে হবে। অকুপাই মুভমেন্ট, যুদ্ধবিরোধী শ্রমিক আন্দোলন—এসব দেখলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ডানপন্থী বা উগ্রপন্থীদের এই বিজয় একেবারে নিশ্চিত নয়। বরং সর্বত্রই লড়াই চলছে। সেই লড়াইটাই ইতিহাসের একটা চালিকাশক্তি। মানুষ কিন্তু মানুষ হিসেবেই বাঁচতে চায়, আর মানুষকে বাঁচতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে সংগতি রেখে বাঁচতে হবে। তাই এই পুঁজিবাদী উন্নয়ন ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড়াতেই হবে।

আমাদের দেশে শেখ হাসিনার পতনের পর যে ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর উত্থান দেখা যাচ্ছে, সেটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

এটা আসলে একই ঘটনারই অংশ। শেখ হাসিনা নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন পক্ষকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। আর্মি, আমলাতন্ত্র, ভারত, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সঙ্গে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকেও। আজ আমরা যে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দানবীয় চেহারা ও দাপট দেখছি, তাদের বেশির ভাগই শেখ হাসিনার আমলেই পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। তিনি মনে করতেন, ক্ষমতায় থাকতে হলে এদের খুশি রাখতে হবে। তাই তাদের নানা রকম প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ও রাজনৈতিক-মতাদর্শিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। শেখ হাসিনার আমলেই মাজারের ওপর হামলা, বাউল-বয়াতিদের ওপর আক্রমণ, মন্দিরে হামলা, সেক্যুলার চিন্তাধারা বা লেখকদের ওপর আক্রমণ—এসব ঘটেছে।

তবে শেখ হাসিনার পতনের পর তারা মনে করছে সেই শূন্যস্থানে তারা ক্ষমতায় চলে এসেছে। কিন্তু শুধু তারা ভাবলেই তো হবে না, সমাজ তাদের গ্রহণ করবে না। আগে তারা যে ভিকটিম বা নিপীড়িত হিসেবে সহানুভূতি পেত, সেই পর্বটা এখন শেষ হয়েছে। এখন তারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে আর সামনে এই প্রতিরোধ আরও বাড়বে। তবে সংগঠিত রাজনীতির অভাবে, হয়তো আমাদের কিছুটা সহিংসতা বা অস্থিরতার মধ্য দিয়েই যেতে হবে।

শেষ প্রশ্ন। প্রতিবাদী ভূমিকা রাখতে গিয়ে আপনি বহুবার রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, হামলা ও হুমকির মুখে পড়েছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নির্ভয়ে রাজপথে টিকে থাকা এই প্রতিবাদী কণ্ঠের নৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির জায়গাটা কি আপনার?

এই শক্তির জায়গাটা হলো, একজন মানুষ হিসেবে চারপাশে যখন দেখি বা শুনি; ধরুন, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে, সরকার ফুলবাড়িতে আবার উন্মুক্ত খনির কথা তুলছে কিংবা শিশুদের ওপর নানা জায়গায় নিপীড়ন চলছে—এসব যখন ঘটে, তখন যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের মধ্যেই একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়। যদি এসব না ঘটত, হয়তো আমি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকতাম। কিন্তু এসব ঘটার কারণেই, যদি কারও মধ্যে একটা দায়িত্ববোধ কাজ করে, তবে তার মধ্যে প্রতিক্রিয়া হবেই। জীবনের ঝুঁকি বা আক্রমণের যে ঝুঁকির কথা বললেন, সেগুলো তো আছেই। কিন্তু এই ভূমিকা পালন না করলে যে যন্ত্রণা হতো, সেটা তার চেয়েও অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক হতো। এই তাগিদটা আসলে সমাজের এই পরিস্থিতি থেকেই তৈরি হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত