
মানবসভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কৃষির ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানতে ইচ্ছে হয়, কে প্রথম জমির মাটি আলগা করতে লাঙল আবিষ্কার করেছিল? সেই লাঙল আবিষ্কারের মাধ্যমেই কৃষিতে প্রথম যন্ত্রের ছোঁয়া লেগেছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে কৃষির ধরনেও এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ১৭৬০ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে যে প্রথম শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তা মানুষের কায়িক শ্রমকে কিছুটা হলেও যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল। পরবর্তীকালে ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব এবং ১৯৬০ সালে তথ্যপ্রযুক্তির উদ্ভবের মাধ্যমে তৃতীয় শিল্পবিপ্লব সারা বিশ্বের উৎপাদনব্যবস্থায় এক অভাবনীয় গতির সঞ্চার করে। এই প্রতিটি বিপ্লবই কৃষিকে ধাপে ধাপে আধুনিক থেকে আধুনিকতর করেছে। বর্তমানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ইন্টারনেট অব থিংসের মতো আধুনিক প্রযুক্তিগুলো কৃষিতে এক অভাবনীয় যান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করেছে।
বিশ্বজুড়ে কৃষিপ্রযুক্তির এই বিপুল অগ্রগতি বুঝতে হলে আন্তর্জাতিক পরিসরে আয়োজিত কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদর্শনীগুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবছর চীনে অনুষ্ঠিত হয় চায়না ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল মেশিনারি এক্সিবিশন। এ বছর অক্টোবরে চীনের তিয়ানজিন শহরে আয়োজন করা হবে বিশাল এক প্রদর্শনী। এতে প্রায় তিন লাখ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিশ্বের হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান তাদের সর্বাধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি প্রদর্শন করবে। গত বছর এই আয়োজন হয়েছিল চীনের উহানে। লাখ লাখ দর্শনার্থী ও পেশাজীবীদের উপস্থিতিতে এসব আয়োজন প্রমাণ করে যে, আধুনিক কৃষির ভবিষ্যৎ পুরোপুরি যন্ত্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর হতে চলেছে। এসব প্রদর্শনীতে তুলে ধরা প্রযুক্তিগুলো কেবল উৎপাদন বাড়ানোর কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে না, বরং এগুলো মানুষের কায়িক শ্রমকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার এক বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করছে।
কৃষিকাজে বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় খরচের ও চিন্তার জায়গাটি হলো শ্রমিক। মোট খরচের প্রায় অর্ধেকই চলে যায় এই শ্রমিক খাতে। ফসল বোনা কিংবা কাটার মৌসুমে বাংলাদেশে যে তীব্র শ্রমিক-সংকট তৈরি হয়, তা কৃষকদের জন্য এক বিশাল লোকসান হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যার সমাধানে উন্নত দেশগুলো এখন স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকেছে। আধুনিক ট্রাক্টরগুলোতে এখন আর চালকের প্রয়োজন হয় না। আগে ট্রাক্টর চালানোর জন্য দক্ষ চালকের দরকার হতো এবং মানুষের চালানো যন্ত্রে অনেক সময় ফসলের মাঠের লাইন সোজা হতো না। কিন্তু এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যন্ত্রগুলো সম্পূর্ণ নিজেদের মতো করে চলতে পারে। আগে থেকে প্রোগ্রাম করে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী এগুলো এতই নিখুঁতভাবে কাজ করে যে ভুলের কোনো অবকাশ থাকে না। চীনের কৃষি যন্ত্রপাতি মেলায় প্রতিবছর নতুন নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতি দেখেছি, যা সময়ের সঙ্গে উন্নত হয়ে আসছে।
প্রযুক্তির কল্যাণে কৃষকদের এখন আর রোদ, বৃষ্টি বা কাদায় নেমে অমানবিক কষ্ট করার প্রয়োজন পড়ছে না। আধুনিক কৃষিব্যবস্থা এতটাই স্মার্ট হয়ে উঠেছে যে একজন কৃষক চাইলে নিজের ঘরে একটি আরামদায়ক চেয়ারে বসেই পুরো খামারের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। মনিটরের সামনে বসে বিভিন্ন ভাষা যেমন ইংরেজি, স্প্যানিশ বা রুশ ভাষা ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র পরিচালনা করা সম্ভব। ঘরে বসেই কৃষক দেখতে পারেন তাঁর জমির কোথায় সেচ দরকার, কোথায় সার প্রয়োগ করতে হবে কিংবা ফসল তোলার সময় হয়েছে কি না। ২০১৯ সালে চীনের চিংদাওয়ের এক কৃষি খামারে একটি ট্রাক্টর কাজ করছে দেখে অপেক্ষা করছিলাম, ট্রাক্টর কাছে আসলে সেখানে থাকা কৃষকের সঙ্গে কথা বলব। কিন্তু ট্রাক্টরটি কাছে আসলে দেখি সেখানে কোনো চালক নেই। অটোমেটেড ট্রাক্টরটি পরিচালনা করছেন কৃষক ঘরে বসে। এই ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে কৃষিকাজে আগ্রহী করে তুলতে পারে, যারা মূলত কায়িক শ্রমের ভয়ে কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
আধুনিক কৃষিতে সেচব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে এখন আগের মতো নিয়ম করে বৃষ্টি হয় না। ফলে সেচের পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। এখন এমন স্মার্ট প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে যার মাধ্যমে কৃষক যেকোনো জায়গায় বসে নিজের হাতের মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করেই সেচপাম্প চালু বা বন্ধ করতে পারেন। এর ফলে অতিরিক্ত শ্রমিকের যেমন প্রয়োজন হয় না, তেমনি সময় ও খরচও বেঁচে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা ব্যবহার করলে প্রায় ৩০ শতাংশ পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এসব প্রযুক্তি সৌরশক্তিতে পরিচালিত হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতের তার টানা বা লোডশেডিংয়ের মতো কোনো জটিলতার মুখে পড়তে হয় না।
নবায়নযোগ্য শক্তির কথা বলতে গেলে কৃষিতে সৌর প্যানেলের আধুনিক ব্যবহারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। সাধারণ সৌর প্যানেলগুলো আনুভূমিকভাবে বসানোর ফলে অনেক মূল্যবান কৃষিজমি নষ্ট হয়, যা বাংলাদেশের মতো স্বল্প জমির দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন উলম্ব বা ভার্টিক্যাল সৌর প্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। সেটিও দেখেছি আমি ২০২৩ সালে উহানে আয়োজিত কৃষি-প্রযুক্তি মেলায়। এই বিশেষায়িত প্যানেলগুলোর উভয় দিক থেকেই সারা দিন সুষম হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এগুলো লম্বালম্বিভাবে বসানোর কারণে কৃষিজমি উন্মুক্ত থাকে এবং প্যানেলের নিচে অনায়াসেই কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া যায়।
ভবিষ্যতের কৃষিকে টেকসই করতে বিশ্বের অনেক দেশ তাদের গ্রামীণ কাঠামোগুলোকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষকদের বিক্ষিপ্ত বসতবাড়িগুলোর বদলে এখন আধুনিক সব সুবিধাসম্পন্ন বহুতল ভবন তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি সেন্টারের মতো সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থাকছে। আর চারপাশের বিশাল কৃষিজমিগুলোকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক উপায়ে স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষাবাদের জন্য। এসব বিশাল জমিতে সার বা কীটনাশক প্রয়োগের জন্য বড় আকারের স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে আবাদি জমি দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং বাড়িঘর বানিয়ে জমি নষ্ট করা হচ্ছে, সেখানে এ ধরনের সমন্বিত কৃষিব্যবস্থা এবং ড্রোনের ব্যবহার কৃষি খাতে এক বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে।
গবেষকদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর বর্ধিত জনসংখ্যার পুষ্টিচাহিদা মেটাতে কৃষি উৎপাদন বর্তমান সময়ের চেয়ে ৭০ ভাগ বাড়াতে হবে। এই বিশাল চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের সনাতন পদ্ধতি আঁকড়ে ধরে থাকলে চলবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আমাদের কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কৃষির আধুনিকায়নের পাশাপাশি নগরকৃষি বা ছাদকৃষির প্রতিও আমাদের সমান মনোযোগ দিতে হবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার কৃষিকে একটি লাভজনক ও আধুনিক শিল্পে পরিণত করা সম্ভব। সরকার, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকে সম্মিলিতভাবে কাজ করে এসব আধুনিক ও স্মার্ট প্রযুক্তি বাংলাদেশের সাধারণ কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। কৃষককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া গেলে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
শাইখ সিরাজ, পরিচালক ও বার্তাপ্রধান, চ্যানেল আই

জন্মদিন উপলক্ষে আজকের পত্রিকার পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। আলোচনা শুরু করতে চাই আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি তরুণ। সে সময়ের স্মৃতি জানতে চাই।
২ ঘণ্টা আগে
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে পুলিশি ভাষ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে আগ্রহী প্রত্যেক মানুষই ইতিমধ্যে পুলিশি বয়ান শুনেছেন। একজন কেবলই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া তরুণ ও দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর মিলে কুমিল্লায় একটি শিশুকে যেভাবে হত্যা করেছে, তা নানা রকম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়গুলো
২ ঘণ্টা আগে
কুমিল্লায় ১৩ বছরের অপ্রতীম নামের এক শিশুকে মোবাইল ফোনের কারণে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় যখন সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ছে, তখনই আরেকটি নির্মম ঘটনা ঘটেছে খুলনায়।
১ দিন আগে
মাত্র সাত মাসের মধ্যেই দেশের অর্থনীতিকে সরকার একটি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে ফেলবে—এমনটি নিশ্চয়ই কোনো বিবেকবান মানুষ আশা করে না বা সেটি তাদের কারও দাবিও নয়। তবে সরকার সেটি করতে চায় কি না বা এ বিষয়ে কী করতে চায়, তা বোঝার জন্য সাত মাসই যথেষ্ট।
১ দিন আগে