Ajker Patrika

পরিবর্তন কতটুকু হয়

স্বপ্না রেজা, কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক
পরিবর্তন কতটুকু হয়
প্রতীকী ছবি

জনগণ পরিবর্তন চাইছে। চাওয়া অনুযায়ী পরিবর্তন কতটুকু হয় বা হচ্ছে, সেই বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে, পরিবর্তন চাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। তারপরও জনগণ পরিবর্তন চায়। এককথায়, বেঁচে থাকার জন্য সহনীয় একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা চায়, সমাজ চায়। এই পরিবর্তন চাওয়া কিন্তু নতুন নয়, বহু পেছনের। যুগ যুগ ধরে জনগণ পরিবর্তন চাইছে, এ পরিবর্তন চাওয়া যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিদ্যমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে। পরিবর্তন চাওয়াই বলে দেয় যে জনগণ কখনোই শান্তিতে, নিরাপত্তার মধ্যে থাকছে না। কথিত নিরাপত্তা আদতে মানুষকে নিরাপদ করতে পারছে না। পাকিস্তান আমলে স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো বলে দেয় যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ কতটা পরাধীন ছিল, অধিকারবঞ্চিত ছিল।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে একটা চূড়ান্ত পরিবর্তন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা তথা ভূখণ্ড পেয়েছিল। বাঙালি জাতি একটা সংবিধান পেয়েছিল। খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে বলতে হয় যে একটা সংবিধান ও ভূখণ্ড এবং সার্বভৌমত্ব পেলেও জনগণ কিন্তু আশানুরূপভাবে একটা সহনশীল রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাপনা পায়নি সেই অর্থে। ফলে জনগণ অতীতের মতোই অধিকারবঞ্চিত ও অনিরাপদই থেকে গেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পাকিস্তান আমলে বাঙালি নারীদের ওপর যে বর্বরোচিত নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা কিন্তু একটা স্বাধীন রাষ্ট্রেও চলমান রয়ে গেছে এবং সেটা ব্যাপকভাবে। একজন কন্যাশিশু সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ থাকতে পারছে না। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আছে অধিকার বঞ্চনার ক্ষেত্রেও। আবার রাষ্ট্র ভাষা বাংলা হলেও তার ব্যবহার কিন্তু মর্যাদাপূর্ণভাবে নেই। তেমন চেষ্টা আছে বলেও মনে হয় না।

একটা স্বাধীন রাষ্ট্র, একটি নিজস্ব সংবিধান পেলেও জনগণের পরিবর্তন চাওয়াটা কিন্তু থেমে নেই। কারণটাও স্পষ্ট যে জনগণ যা চেয়েছিল, চাইছে তা কিন্তু আজও পায়নি; স্বাধীনতা অর্জনের ৫৫ বছর হলেও সেটা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, একটা স্বাধীন রাষ্ট্রে জনগণের পরাধীন ও অনিরাপদ থাকাটা। যাঁরা রাজনৈতিক দলের এবং কোনো না কোনো সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁরা সাফল্যের ঢেকুর তুললেও কথাটা অযৌক্তিক নয় যে একটা নিরাপদ ও সহনশীল সমাজব্যবস্থা তাঁরা জনগণকে দিতে পারেননি। রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের দলকে যতটা শক্তিশালী করেছে, দলের স্বার্থ রক্ষা করেছে, নিজেদের আখের গুছিয়েছে, দেশ ও দেশের জনগণের জন্য ততটা করেনি, যেটুকু করেছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। এতে জনগণের সন্তুষ্টি আসেনি, নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়নি।

সাধারণ জনগণ কী চায়? জনগণ চায় সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, মানব মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার। কথাটা মোটেও অযৌক্তিক নয় যে রাষ্ট্রে একটা শ্রেণি থাকছে, যারা জনগণের এই মৌলিক চাওয়াকে পুঁজি করে জন্ম নেয় ও বেড়ে ওঠে নিজেদের মতো করে। যারা একটা পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক ব্যানারে তারা তৎপর হয়। বলাবাহুল্য যে এ রকম মতাদর্শের ভিন্নতা নিয়ে রাষ্ট্রে একের অধিক রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয়েছে, হচ্ছে। বৈষম্যের বিরোধিতা, সমতার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হলেও আদতে এরা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চাকে সমর্থন করে, ক্ষমতায় আসীন হতে উন্মুখ হয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য—যেকোনোভাবে তারা ক্ষমতায় আসীন হলেও অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে দেখা যায়। অরাজকতার সৃষ্টি হয়। ফলে জনগণের চাওয়া পূরণ হয় না। একটা পর্যায়ে জনগণ আবার পরিবর্তন চাইতে শুরু করে। সুযোগসন্ধানীরা কিন্তু এটাকেও ইস্যু করে নতুন আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়।

সব আন্দোলনের লক্ষ্য হলো পরিবর্তন। কী পরিবর্তন হয় আন্দোলন পরবর্তী সময়ে—এমন প্রশ্নের মোটা দাগের কোনো জবাব নেই। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যের সঙ্গে চব্বিশের জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যের মধ্যে পার্থক্যটা কি খুব বেশি?

স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্ট শব্দ দুটির মধ্যকার আভিধানিক পার্থক্যটা বোধ হয় খুব বেশি নয়। আক্ষরিক অর্থে পার্থক্য থাকলেও গুণগত ও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তো একই। নব্বইয়ের আন্দোলনে পরিবর্তন চাওয়া হয়েছিল, চব্বিশের আন্দোলনেও সংস্কারের নামে পরিবর্তন চাওয়া হয়েছিল। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী সময়ের ঘটনা এবং চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরবর্তী সময়ের ঘটনা মোটামুটি সবাই জানে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যাঁদের তৎপর থাকতে দেখা গেছে, তাঁদের অনেককেই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ব্যানারে ঠাঁই নিতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এবং যার পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগঠনের সমর্থন রয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনের সঙ্গে তাঁদের ঐক্য গড়তে দেখে অনেকেই যেমন হতভম্ব হয়েছেন, তেমনি এমন বাস্তবতাকেও অনেকে মেনে নিয়েছেন। কারণ, ইতিহাস বলে সমতার দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হলেও শেষ অবধি সেটা টেকে না। যে ছাত্রসমাজ বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, সেই ছাত্রসমাজের অনেকেই নারীবিদ্বেষী, নারীকে গৃহবন্দী করে রাখার কথা বলে—এমন সংগঠনের সঙ্গে দেশ গড়ার আঁতাত করে—এই অভিযোগও অনেকে করছেন। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন পিছিয়ে পড়বে।

দেশের পরিবর্তন সম্ভবত কেউই চান না। দেশ প্রকৃত অর্থে বদলে গেলে লোভ, লালসা, দুর্নীতি, লুটপাট আর থাকে না। ক্ষমতার প্রভাব থাকে না, অপব্যবহার তো নয়ই। কোটিপতি পয়দার সুযোগও থাকে না। কে চাইবে এমন পরিস্থিতি? মুখে পরিবর্তনের কথা বলে বাস্তবে তাঁরা ঠিক বিপরীত দিকেই হাঁটেন অতীতের মতো। সাধারণ জনগণ ভেবেছিল, বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পর গোটা সমাজ সহনশীল হয়ে উঠবে। বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিল তাঁদের মধ্যেই বড় বৈষম্য দেখা গেছে বলে অনেকে দাবি করেন। আর্থিকভাবে তাঁদের অবস্থার পরিবর্তন কেবল ঘটেনি, তাঁরা ক্ষমতাসীনও হয়েছেন। সাধারণ মানুষের অনেকেই দাবি করেন যে এটাই তো তাঁদের চাওয়া ছিল!

বড় ক্ষতি হয়ে গেছে কিশোর-কিশোরী, যুবাদের। একটা দেশের সার্বিক পরিবর্তন যে গুণগত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর হওয়ার কথা, সেটা আর হতে দেখা যায় না। শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়েছে তরুণসমাজের অনেকেই। সঠিক জরিপ হলে সংখ্যাটা মনে হয় না সুখকর হবে। বরং আগামী বাংলাদেশের জন্য আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবিমুখতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সংশ্লিষ্টদের যথোপযুক্ত গুরুত্ব না দিতে পারা—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটা হযবরল অবস্থা বিরাজ করে আসছে। পরিবর্তন বা উন্নয়নের জন্য যদি মৌলিক পরিবর্তন চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস, মূল্যবোধে না আসে তাহলে যে পরিবর্তন হয় সেটা হয় ব্যক্তি-গোষ্ঠীকেন্দ্রিক পরিবর্তন, সমষ্টিগত নয়। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও জীবনমান উন্নয়ন সাধিত হলে তথা সহনশীল একটা সমাজে তাদের ঠিকানা হলেই ‘পরিবর্তন’ শব্দটার গুণগত মান উপলব্ধি করা সম্ভব।

স্বপ্না রেজা, কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত