Ajker Patrika

সৌদি আরব-পাকিস্তান-তুরস্ক জোট

বদলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের ভূরাজনীতি

আব্দুর রহমান 
বদলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের ভূরাজনীতি
সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাকে শুধু নতুন সামরিক জোট হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য ধরা যাবে না। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরব-পাকিস্তান-তুরস্কের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাকে শুধু নতুন সামরিক জোট হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য ধরা যাবে না। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার একাংশেরও নিরাপত্তাকাঠামোর এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। এত দিন উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার মূল সমীকরণ ছিল সৌদি অর্থ ও জ্বালানিশক্তির সঙ্গে মার্কিন অস্ত্র ও সামরিক উপস্থিতির বিনিময়। কিন্তু গাজায় আগ্রাসন, ইরান সংঘাত এবং ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা সৌদি আরবকে বুঝিয়েছে যে, কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে রিয়াদ এখন যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ না দিয়েই, দেশটির ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার তৈরি করতে চাইছে।

এই জায়গাতেই সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের ত্রিভুজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিন দেশের সক্ষমতা এক রকম নয়, বরং পরস্পররের পরিপূরক। সৌদি আরবের হাতে রয়েছে বিপুল আর্থিক ও জ্বালানিশক্তি এবং আরব বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান। তুরস্কের রয়েছে বৃহৎ সামরিক শক্তি, দ্রুত বিকশিত প্রতিরক্ষাশিল্প, ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তির সক্ষমতা এবং ন্যাটো জোটের অভিজ্ঞতা। পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক বাহিনী, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং পারমাণবিক সক্ষমতা। ফলে এই তিন শক্তি যদি দীর্ঘ মেয়াদে একটি কার্যকর নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে সেটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণ নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তাকাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।

পাকিস্তানের জন্য এর গুরুত্ব অনেক গভীর। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, এখন সেই সম্পর্ক দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে যেতে পারে। সৌদির অর্থ, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করলে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার সীমাবদ্ধ ভূরাজনীতির বাইরে গিয়ে পারস্য উপসাগর, আরব সাগর ও দক্ষিণ এশিয়া করিডরের এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা খেলোয়াড়ে পরিণত হতে পারে।

ভারতের কাছে এটা হলো চিন্তার জায়গা। কারণ, সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। বড় বিষয় হলো, পাকিস্তান যদি একই সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো শক্তিশালী অংশীদারের সঙ্গে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে ভারতের পশ্চিম অংশের কৌশলগত পরিবেশ বদলে যেতে পারে।

তবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল হবে সৌদি আরবকে পাকিস্তানের শিবিরে চলে গেছে বলে ধরে নেওয়া। ভারত-সৌদি সম্পর্ক এখন শুধু তেল বা বাণিজ্যের সম্পর্ক নয়; বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং বিপুল ভারতীয় প্রবাসী জনগোষ্ঠীর কারণে দুই দেশের সম্পর্কের নিজস্ব কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরব সম্ভবত একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখবে। রিয়াদের কৌশল হবে একক কোনো শক্তির সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে না ফেলে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানো। ফলে দিল্লির উচিত হবে না রিয়াদকে নির্দিষ্ট কোনো একটি পক্ষকে বেছে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা; বরং সৌদি আরবের সঙ্গে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করা।

এই ত্রিভুজ সম্পর্কে তুরস্ক সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি। সৌদি আরব দিতে পারে মূলধন, পাকিস্তান দিতে পারে সামরিক জনশক্তি ও অভিজ্ঞতা, আর তুরস্ক দিতে পারে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও একটি ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা-শিল্পভিত্তি। ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ সক্ষমতা, বিমানপ্রযুক্তি ও সামরিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে তুরস্কের অগ্রগতি এই সহযোগিতাকে শুধু অস্ত্র কেনাবেচার সম্পর্কের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। কারণ, কোনো দেশ যখন অন্য দেশের কাছ থেকে অস্ত্র কেনে, সেটি একধরনের সম্পর্ক; কিন্তু কয়েকটি দেশ যখন একে অপরের সঙ্গে প্রযুক্তি, উৎপাদন, গবেষণা ও প্রতিরক্ষাশিল্পের সক্ষমতা ভাগাভাগি করতে শুরু করে, তখন সেটি অনেক বেশি স্থায়ী কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হয়। ভারতের জন্য তাই শুধু পাকিস্তান কী অস্ত্র কিনছে, সেটি দেখলেই হবে না; পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রতিরক্ষাশিল্প সহযোগিতা তৈরি হচ্ছে, সেটিও নজরে রাখতে হবে।

ইরানের ক্ষেত্রেও এই নতুন সমীকরণ সরল নয়। সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান কাঠামোকে সরাসরি ইরানবিরোধী জোট হিসেবে দেখা ভুল হবে। সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছে, তুরস্ক ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ফলে তিন দেশের সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে ইরানের ওপর সম্মিলিত চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা অর্জন করা, কিন্তু একই সঙ্গে আলোচনার দরজাও খোলা রাখা। এই দিকটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাষ্ট্রগুলো যদি নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়াতে পারে, তাহলে ইরান, ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।

ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বড়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভাজন বহুদিন ধরে ইসরায়েলের কৌশলগত সুবিধার অন্যতম উপাদান। আরব বনাম ইরান, সুন্নি বনাম শিয়া, উপসাগরীয় রাজতন্ত্র বনাম ইরান, আরব বনাম তুরস্ক, এই বিভাজনের মধ্যে প্রতিটি রাষ্ট্র আলাদাভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান কাঠামো যদি কার্যকর হয়, তাহলে অন্তত কিছু ক্ষেত্রে সেই বিভাজন অতিক্রম করে আরব অর্থনীতি, তুর্কি সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানি সামরিক সক্ষমতাকে একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা আলোচনায় আনা সম্ভব হবে। এটি হয়তো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কোনো সামরিক জোট তৈরি করবে না, কিন্তু ইসরায়েল যদি নতুন করে আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে সেই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য আগের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

এখানে ভারত মহাসাগরের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব থেকে লোহিতসাগর, বাব এল-মান্দেব, আরব সাগর হয়ে পাকিস্তান এবং ভারত মহাসাগর পর্যন্ত যে ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি হয়, তার সঙ্গে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় অবস্থান এবং সুয়েজ-লোহিতসাগর করিডরকে যুক্ত করলে এক বিস্তৃত কৌশলগত অঞ্চল সামনে আসে। ভারতের জন্য এর অর্থ হলো, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরকে আর আলাদা দুটি নিরাপত্তা ক্ষেত্র হিসেবে দেখা যাবে না। গালফ, পাকিস্তান, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগর এখন একই কৌশলগত থিয়েটারের অংশ হয়ে উঠছে। ভারতের পশ্চিম উপকূল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য এটি দীর্ঘ মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই ভারতের পাল্টা কৌশলও শুধু পাকিস্তানকে মোকাবিলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দিল্লিকে সৌদি আরবের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও জ্বালানি সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে হবে এবং মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও জর্ডানের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে আরও কৌশলগত করতে হবে। কারণ, ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্য সম্ভবত একটিমাত্র জোটের মধ্যপ্রাচ্য হবে না। বরং বিভিন্ন রাষ্ট্র বিভিন্ন ইস্যুতে একে অপরের সঙ্গে জোট করবে, আবার অন্য ইস্যুতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। অর্থাৎ এটি হবে ওভারল্যাপিং অ্যালায়েন্স বা পরস্পর সমন্বিত জোটের এক বহুমাত্রিক ব্যবস্থা।

এই তিন দেশের জোটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসলে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে। সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের সম্ভাব্য নিরাপত্তাকাঠামোকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এর অর্থ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চাইছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু একমাত্র নিরাপত্তাদাতা থাকবে না। পুরোনো সমীকরণ ছিল, মার্কিন সামরিক শক্তি উপসাগরীয় নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। নতুন সমীকরণ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিসর এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতার সমন্বয়। এর সঙ্গে চীন, ভারত ও অন্যান্য শক্তির সম্পর্কও যুক্ত হবে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য ধীরে ধীরে একটি বহুমেরু নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে এগোতে পারে।

ভারতের জন্য তাই সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা তাৎক্ষণিক সামরিক বিপদ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সতর্কবার্তা। কারণ, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু সীমান্তে বা যুদ্ধক্ষেত্রে হবে না; হবে বন্দর, জ্বালানি, বাণিজ্যিক করিডর, ড্রোন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক জোটের ওপর। ভারতের পুরোনো ‘পাকিস্তানকে ঠেকাও’ কৌশল তাই যথেষ্ট নয়। তাকে একই সঙ্গে রিয়াদকে ধরে রাখতে, আঙ্কারার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও যোগাযোগ দুটোই বজায় রাখতে, উপসাগরীয় অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে এবং ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক উপস্থিতি বাড়াতে হবে।

কারণ, আসল পরিবর্তনটি এখানে—সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক যদি একটি কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামোতে পরিণত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আর এমন একটি অঞ্চল থাকবে না, যেখানে বাইরের শক্তি এসে একতরফাভাবে নিরাপত্তার নিয়ম লিখে দেবে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেরাই সেই নিয়ম লেখার ক্ষমতা দাবি করবে। আর সেই নতুন ব্যবস্থায় ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়, বরং এমন এক আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের বাইরে পড়ে না যাওয়া, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য, আরব সাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভবিষ্যৎ একই সুতোয় বাঁধা হয়ে যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত