
সমস্যা যতক্ষণ আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত না করে, ততক্ষণ এটাকে আমরা সমস্যা মনে করি না। হামের প্রকোপের কথাই ধরা যাক। জনস্বাস্থ্যবিদদের ক্রমাগত সতর্কতা সত্ত্বেও বিগত সরকারগুলো এটাকে উপেক্ষা করে গেছে। যার পরিণতি এখন আমরা ভোগ করছি। সরকারি হিসাবে প্রায় ৭৯৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ২১ জুলাই ২০২৬)। হাসপাতালের বাইরে কতজন মারা গেছে সেই পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই।
হয়তো সংখ্যাটা আরেকটু বেশি। বাস্তবতা হচ্ছে, এই সমস্যাটা তো এক দিনে তৈরি হয়নি। তাহলে গলদ কোথায় হলো? আমাদের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর অব্যবস্থাপনা এবং ক্রমাগত গাফিলতিই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো যেভাবে চলছে, তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরেকটি বিপর্যয়ের আশঙ্কা আমরা করতেই পারি।
আশঙ্কা বললে ভুল হবে, হাম-পরবর্তী নিশ্চিত আরেকটি বিপর্যয় আমরা দেখতে পাচ্ছি। গত অন্তর্বর্তী সরকারের ভালো কাজ যেমন আছে, তেমনি অনেক কাজ আছে, যা সমালোচনার যোগ্য। এর মধ্যে একটি হলো সরকারি পর্যায়ের প্রায় সব কটি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া। এই কাজটি প্রতিহিংসা থেকে করা হলো, নাকি অজ্ঞতার কারণে, তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ফলে যে আরেকটি স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে, তা আমাদের কর্তাব্যক্তিরা বুঝতে পারছেন কি না, তা আমাদের জানা নেই। আমাদের জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ দরিদ্র ও অশিক্ষিত, শিশু বিকাশ সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণাই নেই। দৃশ্যমান কোনো রোগ জটিল পর্যায়ে না গেলে তারা ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। শিশু গায়েগতরে বাড়তে থাকলেই মা-বাবা মনে করেন সবকিছু ঠিক আছে।
বয়স অনুপাতে শিশু চলাফেরা করতে পারছে কি না, ভাষার বিকাশ ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, সবার সঙ্গে মিশতে পারছে কি না, বয়স অনুযায়ী আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না, ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেহের ফাইন মটর ও গ্রোস মটর বিকশিত হচ্ছে কি না—ইত্যাদি বিষয়গুলো অধিকাংশ অভিভাবকই বুঝতে পারেন না। শিশুর বিকাশজনিত সমস্যা হলে কোথায় চিকিৎসা করাতে হবে, সেটাও তাঁরা জানেন না। শিক্ষিত মানুষের মধ্যে কত শতাংশ এই বিষয়গুলো জানেন, এটা নিয়েও সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এসব সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যেই শিশু বিকাশ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মা-বাবা সাধারণত শিশুর শারীরিক কোনো সমস্যা নিয়ে হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে যান। চিকিৎসক যদি বিকাশজনিত কোনো ত্রুটি বা অসংগতি দেখতে পান, তাহলে শিশু বিকাশ কেন্দ্রে রেফার করে দেন। অধিকাংশ অভিভাবক ডাক্তারদের পরামর্শে এভাবেই শিশু বিকাশ কেন্দ্রে এসে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।
শিশু বিকাশ কেন্দ্রে এসে আপনি শিশু ডাক্তার, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট এবং শিশু মনোবিজ্ঞানীর সেবা পেতে পারেন। এক জায়গায় তিন ধরনের সেবা। অল্প খরচে অভিভাবকেরা শিশুর শারীরিক, মানসিক এবং বিকাশজনিত ত্রুটির চিকিৎসা করাতে পারছেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসাও এখান থেকে দেওয়া হতো। আচরণগত সমস্যা, অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, অতি চঞ্চলতা, খিঁচুনি, মৃগীরোগ ইত্যাদি।
সরকারি পর্যায়ে যে কয়েকটি (আনুমানিক ৩৫টি) শিশু বিকাশ কেন্দ্র ছিল, তিন-চারটি বাদে প্রায় সবই ঢাকার বাইরে। সব কেন্দ্রই সরকারি জেলা হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করে সেবা দিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা—এখানে এসে এমন কিছু সমস্যা শনাক্ত হয়েছে, যা হয়তো আর কিছুদিন দেরি হলে সারিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব বা খুব কঠিন হয়ে যেত।
স্বাধীনতার পর থেকে স্বাস্থ্য খাতে যে কয়েকটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কার্যক্রম অন্যতম। নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ। কিন্তু আমাদের দুঃখ হলো, সরকার বদল হলে অনেক ভালো কাজ বা উদ্যোগ এ দেশে বন্ধ হয়ে যায়। আমরা উন্নত বিশ্বের মতো ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারি না।
উন্নত বিশ্বে প্রায় প্রতিটি হাসপাতালেই এ ধরনের সেবা পাওয়া যায়। তারা জানে, শিশুরাই তাদের বড় সম্পদ। সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করতে হলে শিশুদের বিকাশের দিকে মনোযোগ দিতে হবে সবার আগে। তাই তারা আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ শুরু করেছে। বিষয়গুলোকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে এই সেবাগুলোকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
আমাদের দেশে সরকারি পর্যায়ে এ ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে অনেক পরে। দেরিতে হলেও এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের মধ্যে আশা সঞ্চার করছিল। যেহেতু শুরু হয়েছে, তাই আমাদের বিশ্বাস ছিল সরকার হয়তো প্রতিটি জেলায় এ ধরনের কার্যক্রমকে বিস্তৃত করবে। নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, বিস্তৃত না হয়ে উল্টো পুরো কার্যক্রমটি বন্ধ হয়ে গেল।
শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার ফলে ভবিষ্যতে যে বিপর্যয় দেখা দেবে, সে সম্পর্কে আমাদের কর্তাব্যক্তিরা কি অবহিত আছেন? এই বিপর্যয় হামের মতো দৃশ্যমান না হলেও নীরবে অসংখ্য শিশুর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেবে।
প্রতিবছর আমাদের দেশে অসংখ্য শিশু জন্মগ্রহণ করছে, যা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। বেশি শিশুর জন্ম মানে তাদের চিকিৎসার জন্য বেশি সেবাকেন্দ্র প্রয়োজন। শিশুর সংখ্যা বেশি হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর সংখ্যাও বাড়বে। ২০২৩ সালের ইউনিসেফের একটি রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার কমলেও প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এটা আমাদের জন্য অশনিসংকেত।
প্রশ্ন হচ্ছে, অভিভাবকেরা শিশুদের চিকিৎসা কোথায় করাবেন? আমার জানা মতে, কয়েকটি বিভাগীয় শহর বাদে অন্যত্র এখনো বেসরকারি উদ্যোগে এই ধরনের চিকিৎসার জন্য ভালো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। কিছু জেলা শহরে শিশু বিকাশ কেন্দ্রই একমাত্র ভরসা। যে কয়েকটি জেলায় শিশু বিকাশ কেন্দ্র ছিল, তা-ও প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা প্রকট হওয়া, অটিজম চিকিৎসা বিঘ্নিত হওয়া, সর্বোপরি প্রতিবন্ধী ও মানসিক সমস্যাগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। শুরুতে চিকিৎসা করাতে পারলে যে শিশুরা জনসম্পদে পরিণত হতে পারত, সেখানে তারা পরিণত হবে রাষ্ট্রের জন্য বোঝায়। নিঃসন্দেহে তা রাষ্ট্রের অগ্রগতিকে পেছনের দিকে টেনে ধরবে।
তাই যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নিতে হবে। আশা করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারকেরা এদিকে বিশেষ মনোযোগ দেবেন।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন পড়লে মন খারাপ হয়ে যায়; যেমন ২৯ জুলাই আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। যা পড়ে কারও মনে হতে পারে—কেউ কেউ পৃথিবীতে আসেন আনন্দে বাঁচতে, কিন্তু বেঁচেও যেন মৃতপ্রায়। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়ার অবস্থা এমনই শোচনীয়।
২ ঘণ্টা আগে
গত সপ্তাহের শনিবার আমার নিয়মিত কলামটি আমি লিখতে পারিনি। কারণ, আমার মা গত বৃহস্পতিবার রাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। এটা অবশ্য কথার কথা। ৯৫ বছর বয়সেও তিনি আসলে এ পৃথিবী থেকে যেতে চাননি। প্রতিটি মুহূর্তেই তাঁর মধ্যে বাঁচার আকুতি দেখা যেত। তিনি জন্মেছিলেন গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে।
২ ঘণ্টা আগে
‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে—ভীষণ ভালো লাগার একটা গান। মন উদাস করে। হারিয়ে যেতে হয় নীরবে অকৃত্রিম এক অনুভূতির মাঝে। যখন এই গানের সৃষ্টি, তখন যেন আকাশে কেবলই শ্রাবণের মেঘের আনাগোনা ছিল। সঙ্গে ছিল আমার মতো হাজারো মনের ভাব। কত দিন যে শুনেছি এই গান, আর উদাসী ভাব নিয়েছি...
২ ঘণ্টা আগে
যে ঘটনা ঘটিয়েছেন যশোরের জামায়াতের এমপির মেয়ে, তা অবিশ্বাস্য। স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় গিয়ে কোমলমতি শিশুদের তিনি পিটিয়েছেন। অভিভাবকেরাও তাঁর মারের হাত থেকে রেহাই পাননি। পাড়াপড়শিদের কেউ কেউ বলছেন, এই কর্মসাধনের সময় এমপিকন্যা মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন।
১ দিন আগে