‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে—ভীষণ ভালো লাগার একটা গান। মন উদাস করে। হারিয়ে যেতে হয় নীরবে অকৃত্রিম এক অনুভূতির মাঝে। যখন এই গানের সৃষ্টি, তখন যেন আকাশে কেবলই শ্রাবণের মেঘের আনাগোনা ছিল। সঙ্গে ছিল আমার মতো হাজারো মনের ভাব। কত দিন যে শুনেছি এই গান, আর উদাসী ভাব নিয়েছি, তার হিসাব করা এই মুহূর্তে কঠিন।
যা হোক, অনেক দিন পর হঠাৎ এই গান শুনলাম। অনেকটা সমবেত কণ্ঠে। মনে হলো, হারিয়ে যাওয়া একটা গান কীভাবে যেন ফিরে এল আচমকা এবং প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে। আর কে যেন মনে করিয়ে দিল, অসম্ভব প্রিয় একটা গান ছিল, যেটা মূলত হারিয়ে যায়নি। অনেক দিন পর একসঙ্গে তাই চারদিকে বেজে উঠছে। পার্থক্য হলো, অত্যন্ত আবেগঘন ও প্রেমময় একটা গান আজ হঠাৎ যেন কঠিন প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদের মূর্ছনায় ধ্বনিত হচ্ছে—আজ কেন মন উদাসী হলো? ভালোবাসার গানের মাঝে প্রতিবাদ কতটা মার্জিত ও সৃজনশীলতায় ঠাসা! এ-ও সম্ভব। এমন প্রতিবাদের সুর কত দিন শুনিনি! আহা!
যখন প্রায় প্রতিদিন আশাহত হই, আবার আশান্বিত হওয়ার তাগিদে অধীর হই, ঠিক এমন একটা অবস্থায় একটা ঘটনা ঘটে গেল এই পোড়খাওয়া ধুরন্ধর সমাজে। আর সেই বাস্তব ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা হিসেবে সদ্য স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল। ঘটনার গল্পটা হলো, অসম্ভব প্রিয় গানটি ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজিয়ে নীল শাড়ি পরে নিজের একটা রিল তিনি তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন। করতেই পারেন। এটা তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতা। ভালোবাসা ও ভালো লাগা আর সবার মতো তাঁরও আছে। যার বহিঃপ্রকাশ নিজের মতো করাটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু একটা শ্রেণি তাঁর এই রিল নিয়ে ট্রল করে বসে, সাইবার বুলিং করে বলে অভিযোগ করেছেন স্বয়ং শিক্ষিকা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অনেকেই। একে তো তিনি ভিন্নধর্মাবলম্বী এবং দ্বিতীয়ত, তিনি একজন নারী। ব্যস, শুরু হলো এটাকে কেন্দ্র করে তাঁকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করার অপতৎপরতা। কোন শ্রেণির লোক এমন কাজ করতে পারে, তা কিন্তু সহজেই অনুমেয়।
যা হোক, বিউটি রানী পালের এই রিল ঘুরতে ঘুরতে যখন আমার নজরে এল, তখন তো আমি সেই অতীতের দিনগুলোয় ফিরে গেছি! আহা, সেই আবেগময় তারুণ্যের জীবন! শাড়ির আঁচল উড়িয়ে হেঁটে ভালো লাগা গানে নিজেকে বিসর্জিত করার আনন্দই যে আলাদা! সেই আনন্দ তিনি প্রকাশ করেছেন মাত্র কয়েক সেকেন্ড এবং সেটা শালীনতা বজায় রেখে। সমাজের নিকৃষ্ট শ্রেণির আর তর সইল না। অসভ্য দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা শুরু করল সাইবার বুলিং ও ট্রল। এই অবস্থায় একটা সত্য বরাবরের মতো আমাদের বুঝতে হলো—ট্রল আর সাইবার বুলিং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা নেই, যেটা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য।
আশার আলো যে বিউটি রানী পালকে নিয়ে সাইবার বুলিং ও ট্রল শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে চারপাশে এবং সেটা অভিনব অভিব্যক্তিতে। যে গানে বিউটি নীল শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়িয়েছেন, সেই একই গানে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষক থেকে শুরু করে নানা পেশাজীবী নারী-পুরুষ নেচেছেন, হেঁটেছেন, বিউটির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। এই অভিনব প্রতিবাদ বলে দেয়, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে প্রতিবাদের উর্বরতা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ইতিহাস তার বড় সাক্ষী। মারণাস্ত্র নয়, নয় কুরুচিপূর্ণ অভিব্যক্তি, প্রতিশোধ, প্রতিহিংসাও নয়, সভ্য-সুন্দর আচরণে নোংরামির কঠিন জবাব দেওয়া ও প্রতিহত করা সম্ভব। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিউটি রানী পালের প্রতি সংহতি প্রকাশের যে বন্যা বয়ে গেছে, তা প্রতিপক্ষের জন্য একটি বড় বার্তা বৈকি।
মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গেল বিউটি পালের শিক্ষাজীবনের সাফল্য। আজ যারা তাঁর সমালোচনা করছে, তারা বিউটির কাছেধারে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে কি না, সেটাই প্রশ্ন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি (ফার্স্ট ক্লাস) অর্জনকারী বিউটি রানী বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। যে সুযোগ প্রাপ্তিতে ও পরিবেশে এবং সর্বোপরি যাদেরকে গড়ে তোলায় মত্ত হয়েছেন, তা অন্যদের পক্ষে কতটুকু সহজ হতো, বলা মুশকিল। তবে অভিজ্ঞতা বলে, পেশাজীবনে সবাই কমবেশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা চান। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে পড়াশোনা করে পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার আলো দেওয়ার স্বপ্নটা নিঃসন্দেহে ফেলনা নয়। দুর্বলতা তো নয়ই, বরং সৎ সাহস লাগে। আর বিউটি রানী পালের মতো একজনার পক্ষেই সেই সাহস দেখিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল। বলা যায়, তিনি একজন স্বপ্নবাজ শিক্ষক এবং বাংলাদেশের একজন সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব। আর সেই কারণেই তিনি ২০২৬ সালে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতি লাভ করেছেন।
যতটুকু জানি, সরকারি সম্মাননা, স্বীকৃতি বা পুরস্কার পেলে তার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। তাঁকে নিয়ে আপত্তিকর ট্রল কিংবা সাইবার বুলিংয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। উপরন্তু সরকারের আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে কি না দেখার জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের কথা উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন থেকে জানানো হয়। কিন্তু শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বিউটি রানী পালের রিলে কোনো রকম আপত্তিকর কোনো কিছু দেখেননি বলায় তদন্তের বিষয়টি স্তিমিত হয়ে যায় বলে জানা গেছে।
আর একটা কথা বলা দরকার যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বলতে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেহারা ও তার ব্যবস্থাপনা চোখের সামনে একটা সময় ভেসে ওঠে, সেটা এককথায় জরাজীর্ণ অবস্থা। গ্রামের বা মফস্বলের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক মানেই দুর্বল চেহারা, অভিব্যক্তি এমনটাই মনে করা হতো। দেখা যেত বলেই মনে করা হতো বৈকি। সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, যেটা বিউটি রানী ও তাঁর প্রতিবাদী সহকর্মীদের দেখেই বোঝা যায়। শিশুদের যেভাবে তাঁরা পাঠদান করছেন, তা অত্যন্ত আনন্দদায়ক এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রয়োজনীয়।
না বললেই নয় যে বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে যেভাবে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়, ধর্ষণ করা হয়, সেই সব নিয়ে কিন্তু যারা আজ বিউটি রানী পালের জনপ্রিয় গানের সঙ্গে সাধারণভাবে হেঁটে যাওয়া নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করছে, তারা কিন্তু ধর্ষণ করার সংবাদে মোটেও বিচলিত হয় না, কঠোর সমালোচনাও করে না। ধর্ষণের বিষয়ে এই শ্রেণির পক্ষ থেকে কখনো তীব্র প্রতিবাদ হয়েছে বলে জানা নেই।
যা হোক, একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা বলতে কেবল তাঁকে সুসজ্জিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দ্বারা নিরাপদ করা বোঝায় না, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সম্ভব না। সমাজে বিদ্যমান কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নির্মূল করতে না পারলে, শ্রদ্ধাপূর্ণ সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং তার চেষ্টা অব্যাহত না থাকলে কখনোই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিরাপদ হতে পারবে না। এককথায়, নিরাপত্তার বিষয়টি সমাজ কাঠামোতে প্রয়োগ করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে কেবল সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক সদিচ্ছাটাই থাকে না।
শিক্ষকদের মর্যাদা সুনিশ্চিত ও সুরক্ষিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এই দায়িত্ব পালনের ওপরই নির্ভর করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। শিক্ষকদের বলব, একজন সহকর্মী হেনস্তা হওয়ার কারণে আপনারা যেভাবে এবং যতটা প্রতিবাদমুখর হয়েছেন, প্রতিবাদের কৌশল অবলম্বন করেছেন, সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। অব্যাহত থাকুক আপনাদের সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধাবোধ। গোটা সমাজ না হলেও শিক্ষিত ও সুনাগরিক শ্রেণির মানুষ আপনাদের পাশে আছেন, থাকবেন। শ্রাবণের মেঘ হয়ে আজ বোধের যে বর্ষণ শুরু হয়েছে, তা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন পড়লে মন খারাপ হয়ে যায়; যেমন ২৯ জুলাই আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। যা পড়ে কারও মনে হতে পারে—কেউ কেউ পৃথিবীতে আসেন আনন্দে বাঁচতে, কিন্তু বেঁচেও যেন মৃতপ্রায়। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়ার অবস্থা এমনই শোচনীয়।
২ ঘণ্টা আগে
গত সপ্তাহের শনিবার আমার নিয়মিত কলামটি আমি লিখতে পারিনি। কারণ, আমার মা গত বৃহস্পতিবার রাতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। এটা অবশ্য কথার কথা। ৯৫ বছর বয়সেও তিনি আসলে এ পৃথিবী থেকে যেতে চাননি। প্রতিটি মুহূর্তেই তাঁর মধ্যে বাঁচার আকুতি দেখা যেত। তিনি জন্মেছিলেন গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে।
২ ঘণ্টা আগে
সমস্যা যতক্ষণ আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত না করে, ততক্ষণ এটাকে আমরা সমস্যা মনে করি না। হামের প্রকোপের কথাই ধরা যাক। জনস্বাস্থ্যবিদদের ক্রমাগত সতর্কতা সত্ত্বেও বিগত সরকারগুলো এটাকে উপেক্ষা করে গেছে। যার পরিণতি এখন আমরা ভোগ করছি। সরকারি হিসাবে প্রায় ৭৯৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে...
২ ঘণ্টা আগে
যে ঘটনা ঘটিয়েছেন যশোরের জামায়াতের এমপির মেয়ে, তা অবিশ্বাস্য। স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় গিয়ে কোমলমতি শিশুদের তিনি পিটিয়েছেন। অভিভাবকেরাও তাঁর মারের হাত থেকে রেহাই পাননি। পাড়াপড়শিদের কেউ কেউ বলছেন, এই কর্মসাধনের সময় এমপিকন্যা মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন।
১ দিন আগে