
পৃথিবীর ঘূর্ণন চক্রের সঙ্গে সঙ্গে সবই ঘোরে, কালের চক্রও। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে আবির্ভাব যেমন ঘটছে বা আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন প্রজাতির জীব, তেমনি এ গ্রহের বুক থেকে তাদের কেউ কেউ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন বিলুপ্তি। একসময় পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াত যে ডাইনোসর, তারাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্ত অর্থ হলো কোনো জীব প্রজাতির সর্বশেষ সদস্যটির মৃত্যু বা অবলোপ। অর্থাৎ সে প্রজাতির আর কোনো জীব যখন এ পৃথিবীর কোথাও আর থাকে না বা পাওয়া যায় না, তখন তাকে বিলুপ্ত বলে ধরে নেওয়া হয়।
এ রকম একটি উদ্ভিদ প্রজাতি ছিল আমাদের দেশে, যেটির সর্বশেষ সদস্য বা গাছটি বেঁচে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে গাছে প্রায় শত বছর পর জীবনে একবারই ফুল ফোটে। ফুল ফোটার পর তাতে ফল ধরে, এরপর গাছটি মারা যায়। তালিপাম নামের সে গাছটিতে যখন ফল ধরল তখন হা রে হা রে রব উঠল পরিবেশবাদীদের কণ্ঠে, হায় হায় হায়—পৃথিবী থেকে কি তাহলে চিরতরে হারিয়ে যাবে তালিপাম? বংশরক্ষায় এগিয়ে এলেন পরিবেশবাদীরা। অবশেষে তাঁদের প্রচেষ্টায় রক্ষা পেল সে প্রজাতির গাছটি। এখন সারা দেশে তার প্রায় ২০০ গাছ বিভিন্ন স্থানে লাগানো হয়েছে। এ গাছগুলো একই বছরে লাগানো হয়েছে। তাই গাছগুলো নিয়ে আবারও শঙ্কার যে বিষয়টি রয়ে গেছে, ভবিষ্যতে যদি সেসব গাছে একই সময়ে বা বছরে ফুল ফোটে, তাহলে সবগুলো গাছ আবার একই বছরে মারা যাবে না তো? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি পরিবেশবাদী না হয় বা রক্ষায় সচেষ্ট না হয়, তাহলে সেসব গাছও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে চলে যেতে পারে।
বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, বাংলাদেশে আছে প্রায় ৬ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ গ্রন্থে বাংলাদেশের ৩ হাজার ৮১৩টি উদ্ভিদ প্রজাতির বর্ণনা রয়েছে। ধারণা করা হয়, আবাসস্থল ধ্বংস ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে বাংলাদেশে ৮ থেকে ১০ শতাংশ উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ইউনিয়ন (আইইউসিএন) বাংলাদেশের ১ হাজার উদ্ভিদ প্রজাতির বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করে সেগুলোর স্ট্যাটাস প্রদান করেছে। সেসব তথ্য বৃহৎ দুটি খণ্ডে বাংলাদেশের উদ্ভিদ লাল তালিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। সে মূল্যায়নে ২৭১ প্রজাতির উদ্ভিদকে ন্যূনতম উদ্বেগজনক প্রজাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ এসব প্রজাতির উদ্ভিদ নিয়ে আপাতত আশঙ্কার কোনো কারণ নেই, ওগুলো এ দেশ থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে নেই। কিন্তু ৩৯৫ প্রজাতির উদ্ভিদকে চিহ্নিত করা হয়েছে সম্মিলিতভাবে বিলুপ্তির হুমকিগ্রস্ত হিসেবে। এর মধ্যে ৫টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে মহাবিপন্ন অবস্থায়। এরই মধ্যে ৭টি প্রজাতির উদ্ভিদ এ দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া ১২৭টি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে বিপন্নের তালিকায়।
দেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের স্বার্থে বিলুপ্ত ও বিপন্ন উদ্ভিদসহ সব উদ্ভিদ প্রজাতিকে রক্ষা করা দরকার। দেশের সব উদ্ভিদ সম্পদ তথা প্রজাতি রক্ষায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার বলে মনে করি, এগুলো হতে পারে:
১. দেশের সব প্রজাতির গাছের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়নের উদ্যোগ বা প্রকল্প গ্রহণ করা। আইইউসিএন এবং বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ১০০০ প্রজাতির উদ্ভিদের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করেছে। বাকি প্রজাতিগুলোর অবস্থাও জানা দরকার। দ্রুততম সময়ে বিস্তৃতভাবে কাজটি করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের উদ্ভিদ গবেষক দলকে সরকার নেতৃত্ব দিয়ে কাজটি করার পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভিদ গবেষক এমনকি আগ্রহী, দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ উদ্ভিদবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এমন না যে কাজটি এক বছর বা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে কাজটির ফ্রেমওয়ার্কে থাকতে হবে। প্রাথমিকভাবে এ কাজটি সম্পন্ন করা না গেলে, অনেক উদ্ভিদ প্রজাতি যেগুলো চরম বিপন্নতার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা যাবে না। ফলে সেগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এরূপ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আমরা উন্নত দেশগুলোতে উদ্ভিদ প্রজাতির অবস্থা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যেরূপ প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ড বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি নিরূপণ ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস প্রদান করা হয়, আমরা সেসব অভিজ্ঞতা ও পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারি।
২. মূল্যায়নের পর সেসব উদ্ভিদ প্রজাতির একটি ভূ-স্থানিক মানচিত্রায়ণ দরকার। ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস) ব্যবহার করে কোনো উদ্ভিদ প্রজাতির সুনির্দিষ্ট অবস্থান, বিস্তৃতি ও দখলকৃত এলাকার গতিপথ নির্ণয় করা যায়। এটি বর্তমানে একটি আধুনিক ব্যবস্থা। দেশের কোন অঞ্চলের কোথায় কী ধরনের উদ্ভিদ প্রজাতি ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তা জানা গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে সেগুলো রক্ষা করা তুলনামূলকভাবে সহজ ও সুবিধাজনক হবে।
৩. এ দেশের সব উদ্ভিদ প্রজাতির বর্তমান অবস্থা জানা বা মূল্যায়ন করা গেলে তার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র সেগুলো রক্ষার ব্যাপারে যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। প্রথম গুরুত্ব দিতে হবে বিপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে। এরূপ উদ্ভিদ প্রজাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে বিপন্ন, বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত, আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত, মহাবিপন্ন, বিপন্ন ও সংকটাপন্ন ইত্যাদি ক্যাটাগরির উদ্ভিদ প্রজাতি। এসব ক্যাটাগরির মধ্যে প্রথমত ভাবতে হবে সংকটাপন্ন প্রজাতিগুলোকে নিয়ে। সংকটাপন্ন হলো সেসব প্রজাতি, যেগুলো বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
৪. এ দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের সংস্কার দরকার। সে আইনের সংরক্ষিত উদ্ভিদের তালিকাটি পুনর্মূল্যায়নপূর্বক হালনাগাদ করা উচিত।
৫. যেসব উদ্ভিদ প্রজাতি বর্তমানে বিপন্ন বা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, সেসব উদ্ভিদের দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে প্রচুর চারা তৈরি করে প্রাকৃতিক ও লালিত পরিবেশে সেসব চারা রোপণ করা দরকার। রোপণ স্থান নির্বাচনে জিআইএস ম্যাপ সাহায্য করতে পারে। যেখানে যে প্রজাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল, সেখানে সে প্রজাতির গাছ লাগানোই শ্রেয়। এতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেসব উদ্ভিদ প্রজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি নিরসন হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টারসমূহ, বন বিভাগের নার্সারিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
৬. আদমশুমারির মতো এ দেশে কি কোনো বৃক্ষশুমারি করা হয়? মনে হয় না আমরা তা কখনো করেছি। হলে কোন উদ্যানে ও সংরক্ষিত বনে কোন প্রজাতির কতটি গাছ আছে, তা জানতে পারতাম। প্রতি ৫ থেকে ১০ বছর পরপর একবার এরূপ বৃক্ষশুমারি হওয়া উচিত। প্রাকৃতিক বনগুলোতে এ কাজ করা কঠিন মানি, কিন্তু তারও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে, যা সুন্দরবনের গাছপালা জরিপের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়। অন্তত নিয়ন্ত্রিত ও সংরক্ষিত স্থানে, গ্রামে, শহরে সে কাজ করতে পারলেও দেশের উদ্ভিদ সম্পদের একটি গতি-প্রকৃতির চিত্র পাওয়া যায়। প্রকৃতিবাদী অনেক সংগঠন ও ব্যক্তি এ কাজে সহায়ক হতে পারে। অংশীজনদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা এ কাজকে সফল করতে পারে। প্রাথমিক জরিপের কাজ করার পর জিপিআরএস ব্যবস্থায় তা নিয়ে এসে বাংলাদেশের উদ্ভিদের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার বা ডেটাবেইস গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সবার প্রবেশাধিকার থাকবে।
৭. এ দেশে উদ্ভিদ প্রজাতির তালিকাটিও অসম্পূর্ণ এবং একত্রে কোথাও পূর্ণাঙ্গ তালিকাটি পাওয়া যায় না। প্রতিবছরই নতুন নতুন গাছপালা এ দেশে বিদেশ থেকে আসছে। ফলে দেশের উদ্ভিদ সম্পদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান প্রতিবছর জাতীয় বৃক্ষমেলার পর বাংলাদেশের উদ্ভিদ তালিকাটি হালনাগাদ করে প্রকাশ করতে পারে। জাতীয় বৃক্ষমেলা শুধু চারা বিক্রি ও অর্থের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে না।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেছেন। ৪০ বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভূগর্ভস্থ পানি বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে
‘পরের জাগা পরের জমি, ঘর বানাইয়া আমি রই/আমি তো সেই ঘরের মালিক নই’—এমন সরল স্বীকারোক্তি দেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই যেমন, বাবুলাল টুডুর জমিতে ঘর বানিয়ে থাকে অন্য দুই পরিবার, যারা দাবি করে ওই জায়গা তাদের।
২ ঘণ্টা আগে
আজ বেদনাবিধুর ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে হত্যা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সপরিবারে তিনি নিহত হয়েছিলেন। বিদেশে ছিলেন বলে বেঁচে গিয়েছিলেন তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। যদিও বলা হয়ে থাকে, কয়েকজন বিপথগামী সেনাসদস্য হত্যা করেছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে...
১ দিন আগে
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাননীয় সংসদ সদস্যদের কাউকে কাউকে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে যাতায়াত করতে দেখা যেত। তাঁদের মধ্যে কারও কারও সাইকেলও ছিল। নিজ এলাকায়, এমনকি ঢাকা শহরেও তাঁরা সাইকেল চালাতেন। নিয়মিত বাজারে যেতেন, দোকানদারদের সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ে ঝগড়াঝাঁটিও করতেন।
১ দিন আগে