Ajker Patrika

নিরাপদ তন্দ্রার অধিকার চাই

মামুনুর রশীদ
নিরাপদ তন্দ্রার অধিকার চাই

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাননীয় সংসদ সদস্যদের কাউকে কাউকে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে যাতায়াত করতে দেখা যেত। তাঁদের মধ্যে কারও কারও সাইকেলও ছিল। নিজ এলাকায়, এমনকি ঢাকা শহরেও তাঁরা সাইকেল চালাতেন। নিয়মিত বাজারে যেতেন, দোকানদারদের সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ে ঝগড়াঝাঁটিও করতেন। সেসব এখন ইতিহাস। এখন সংসদ সদস্যরা নিজেরাই ব্যবসায়ী। তাঁদের বাসে ওঠার প্রশ্নই ওঠে না। সাইকেল চালানো তো দূরের কথা। তাঁদের বাড়ির কাজের লোকটাও সাইকেল চালায় না।

মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা নিজেরাই বড় বড় পরিবহনের মালিক। একই অবস্থা বিরাজ করছে বাড়িওয়ালাদের ক্ষেত্রেও। কোনো জনপ্রতিনিধিই ভাড়া বাড়িতে থাকেন না। নিজেরাই বড় বড় বাড়ির মালিক। মোদ্দা কথায় ভাড়াটে ও যাত্রীদের পক্ষে কোনো শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নেই। বর্তমান সরকার আগের এক সংসদে ক্ষমতায় থাকার সময় সিএনজিতে ভাড়ার মিটার বসিয়েছিল। সেটা নিয়ে বেশ কড়াকড়িও হয়েছিল। এখন আর তা নেই। বাসভাড়ার ব্যাপারে একটা কিলোমিটারভিত্তিক চুক্তিও হয়েছিল। তারপর তেলের জায়গায় যখন গ্যাস চলে এল, তবু বাসভাড়া কমল না। বড় বড় ধর্মঘট করে ভাড়া বাড়তেই থাকল।

ট্যাক্সির মিটার অতীতে কখনোই নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। তবে উবার, পাঠাও এসবে ভাড়া নিয়ন্ত্রণের একটা ব্যবস্থা থাকলেও তা সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। বর্তমানে শহরের কিছু কিছু জায়গায় ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছে। ক্যামেরা এবং এআইয়ের ভয় দেখিয়ে ড্রাইভারদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গিয়েছিল। কিন্তু দিন দিন তা শিথিল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর সংখ্যা সারা দেশে ৬০ লাখ অতিক্রম করে গেছে। লাইসেন্সবিহীন এই যানবাহনটির চালকেরও লাইসেন্স নেই। ইতিমধ্যে তাঁরা যথেষ্ট সংঘবদ্ধও হয়েছেন। ট্রাফিক পুলিশেরা রীতিমতো এদের কাছে ভীতসন্ত্রস্ত। সারা দেশের শহরগুলোকে বর্তমানে তাঁরা শাসন করছেন।

বাড়িমালিকেরা তাঁদের ইচ্ছেমতো বছর শেষে ভাড়া বাড়িয়ে দেন এবং দ্রুত উচ্ছেদ করার কায়দা-কানুনও তাঁদের জানা আছে। কোনো আইনকানুন এ ক্ষেত্রে প্রায় অকার্যকর। দেশের নাগরিকদের দুর্দশা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি।

বাংলাদেশের মানুষ সহনশীলতার জন্য পৃথিবীতে প্রথম পুরস্কারটি পেতে পারে। কত কষ্ট করে যে তাদের জীবনযাপন করতে হয়, তার তুলনা নেই। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিপুল কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র নজর দেয়নি। তারা দেশকে নানাবিধ চুক্তির বন্ধনে আবদ্ধ করায় ব্যস্ত ছিল। সবচেয়ে গুরুতর সংকট সৃষ্টি করে গেছে শিক্ষাব্যবস্থায়। ছাত্রদের একবারও বলেনি তোমরা ক্লাসরুমে ফিরে যাও। বরং উল্টো তাদেরকে অটোপাস দিয়ে শিক্ষকদেরকে অবমাননার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতে এসব সমস্যার সমাধানের কোনো ব্যবস্থাও দৃশ্যমান হচ্ছে না। বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমাগতভাবে বাড়ছেই।

বহুবার বলা হয়েছে মানুষকে অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে সংস্কৃতিচর্চা। সেখানেও মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার স্কুল-কলেজে সংস্কৃতিচর্চাকে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। যদিও বর্তমান সরকার শিক্ষায় সংগীত, নাটক, নৃত্যকলা, চারুকলা—এসব পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছে।

পাকিস্তান আমলের ২৩ বছরে সংস্কৃতি সংকোচনের রীতিনীতি আমরা দেখেছি। তার বিরুদ্ধে উত্তাল আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ও আমরা দেখেছি। যেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। সেই পাকিস্তানের ভূতকে আবার স্থান করে দিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর সামনে ছিল কতিপয় ছাত্র, যারা মৌলবাদী এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে স্থায়ী করার সংকল্পে মাঠে নেমেছিল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার বিষয়টি আর থাকছে না। পরমতসহিষ্ণুতা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় এবং জীবনযাপনের নিরাপত্তার বিষয়টিও গৌণ হয়ে উঠছে। অর্থনীতিতে একটা বড় ধরনের ধাক্কা এসেছিল করোনা মহামারিকে কেন্দ্র করে। তারপর অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা দেশকে এক প্রবল অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাকে সংহত করা এবং গণবিরোধী চুক্তির বিরুদ্ধে দেশকে সামাল দেওয়ার কাজেই সময় ব্যয় করছে।

এখন জনগণ কী করবে? এসএসসি পরীক্ষায় বিপুল শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। কলেজগুলোতে অর্ধেকের বেশি সিট খালি থাকবে। সেখানেও একধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ছাড়া এবং একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু না করলে জাতীয় ঐক্যের কোনো সম্ভাবনা দেখা দেবে না। দেশে অনেকগুলো শিল্পকলা একাডেমি ভবন চালু আছে। কিন্তু সেই দালান-কোঠাগুলোতে সংস্কৃতির সঠিক চর্চা কখনো হয়নি। এখনো হচ্ছে না।

ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়মিত নাট্যচর্চা এবং দর্শকের উপস্থিতি আগের মতো সরব নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এসবকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল।

এসব তো গেল বাস্তব অবস্থা। কিন্তু সমাজের অভ্যন্তরে কী ঘটেছে? যে মূল্যবোধ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ একটা সামাজিক জীবনযাপন করত, সেখানেও আঘাত এসেছে। সমাজের যে গতিময়তা মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, সেই গতিময়তার পথ রুদ্ধ করে কিছু ব্যক্তি মহান হওয়ার আশায় নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের অকস্মাৎ বিদায়ে কাজগুলো অসমাপ্ত রয়ে গেছে এবং ন্যারেটিভের স্রষ্টা উল্টো কথা বলতে শুরু করেছে। পুরো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টা ছিল সাধারণ মানুষের কাছে বিভ্রান্তির কাল। এই বিভ্রান্তি থেকে ফিরে আসাও সহজ কাজ নয়। বাংলাদেশ শত দারিদ্র্য ও নানা সংকটে নিমজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও একটা স্বচ্ছ পথে অগ্রসর হচ্ছিল। সেই পথ বিঘ্নিত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও আগের জায়গায় চলে আসা দুরূহ ব্যাপার।

সম্প্রতি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অধিবাসী বলেছেন। অবশ্যই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু তাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে। তাদের জীবনযাপন, কৃষিব্যবস্থা, বয়নশিল্প, খাদ্যাভ্যাস, সবকিছুই আলাদা। তারা যুগ যুগ ধরে তাদের সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে আছে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে। তাদের ভূমিব্যবস্থা একবারেই আলাদা। হাজার বছর ধরে তারা নিজস্ব কাস্টমারি ল্যান্ড রাইট নিয়ে বেঁচে আছে। তারা এ দেশের অধিবাসী—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য হচ্ছে তারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং মূল জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা। এর জন্য তারা দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে আসছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই তারা সংগ্রামরত।

বাংলাদেশের দৃশ্যমান সংগ্রামের পটভূমিতে একটি পার্বত্য চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তির ধারাগুলোর অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়নি। পাহাড়ে এবং সমতলে সর্বত্রই একটি অস্থিতিশীল ব্যবস্থা বিরাজ করছে। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, অধিবাসী হিসেবে তাদের যেমন সমান অধিকার রয়েছে, তেমনি মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যে শত-সহস্র লঙ্ঘন হয়েছে, তা তিনি অবশ্যই নজরে আনবেন।

আবারও বলতে হয়, সংসদ সদস্যরা এমনকি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংসদ সদস্যরাও দলীয় প্রয়োজনের বাইরে নিজেদের এলাকায় যে সহিংসতা চলছে, তারও একটা বিহিত করবেন। একই দেশের অধিবাসী হয়ে রাজধানীতে থেকেও এই পরিস্থিতি আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে।

সত্তরের নির্বাচনে এবং মুক্তিযুদ্ধে নানা রাজনীতিক ও মুক্তিযোদ্ধার চেহারা দেখেছি। জীবন্মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নানা স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তাঁরা। কথা ছিল একটি শোষণমুক্ত ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নির্মাণ হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি গণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা দেখতে পাব। কিন্তু আজকের বাস্তবতা আমাদের স্বপ্ন কেড়ে নেয়। একটা অনিশ্চয়তায় আমাদের ঘুম নেই। তাই একটি নিরাপদ তন্দ্রার মধ্যে আমাদের দেশ ফিরে আসুক।

লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত