Ajker Patrika

বিশ্ব বাবা দিবস /ত্যাগের অপর নাম বাবা

শেখ সুলতানা মীম
ত্যাগের অপর নাম বাবা
প্রতীকী ছবি

পৃথিবীর প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব গুরুত্ব ও সৌন্দর্য রয়েছে। কিন্তু কিছু সম্পর্ক আছে, যা অন্য সব সম্পর্কের ঊর্ধ্বে স্থান করে নেয়। পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক তেমনই এক চিরন্তন ও অমূল্য সম্পর্ক। একজন সন্তানের জীবনে মায়ের অবদান যেমন অপরিসীম, তেমনি বাবার ভূমিকাও অনস্বীকার্য। একজন মা সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম আশ্রয় এবং প্রথম ভালোবাসা। অন্যদিকে বাবা হলেন সেই দৃঢ় ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে একটি সন্তান তার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। প্রতিটি সন্তানের কাছে তার বাবা একজন সুপারহিরো, একজন নির্ভরতার প্রতীক এবং একজন নীরব যোদ্ধা। সন্তানের কাছে মা হলেন শিকড়, যিনি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখেন, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখেন এবং সব বিপদ থেকে রক্ষা করেন। আর বাবা হলেন বিশাল এক বটবৃক্ষ, যার ছায়াতলে সন্তান নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায়।

জীবনের নানা ঝড়ঝঞ্ঝা, প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে বাবা শক্ত হাতে লড়াই করেন, যাতে তাঁর সন্তানকে কোনো কষ্ট স্পর্শ করতে না পারে। তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান। একজন বাবার জীবন আসলে ত্যাগের এক অনন্য গল্প। একজন মানুষ প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত সংগ্রাম করছেন, নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিচ্ছেন, সেই বাস্তবতা অনেক সময় সন্তানের চোখে ধরা পড়ে না। একজন বাবা হয়তো নিজের জন্য নতুন পোশাক কিনতে পারেন না, কিন্তু সন্তানের জন্য সাধ্যমতো সেরা পোশাকটি কিনে আনেন। তিনি হয়তো নিজের ইচ্ছাগুলো দমিয়ে রাখেন, কিন্তু সন্তানের ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে কত বাবা যে নিজের শারীরিক কষ্ট, অসুস্থতা কিংবা মানসিক চাপকে আড়াল করে রাখেন, তার কোনো হিসাব নেই। সন্তানের মুখে হাসি দেখাই যেন তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বাবার কাছে চাওয়ার আগেই বাবা সেই আবদার পূরণ করেন।

একজন বাবা সব সময় চান তাঁর সন্তান ভালো শিক্ষা লাভ করুক, সৎ ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করুক। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে এমন অসংখ্য বাবা রয়েছেন, যাঁরা নিজেরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হলেও সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার জন্য জীবনভর সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সন্তানের সাফল্যের মধ্য দিয়েই তাঁদের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূর্ণতা পাবে।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সমাজে অনেক ক্ষেত্রে এই ত্যাগ ও ভালোবাসার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। সন্তানেরা যখন বড় হয়, উচ্চশিক্ষা অর্জন করে, ভালো চাকরি পায় এবং নিজস্ব জীবন গড়ে তোলে, তখন অনেকেই ধীরে ধীরে তাদের পিতা-মাতার ত্যাগের কথা ভুলে যেতে শুরু করে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা এবং ভোগবাদী মানসিকতা অনেককে পরিবারের মূল ভিত্তি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আজকের সময়ে আমরা প্রায়ই দেখি, বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের ভালোবাসা ও যত্নের পরিবর্তে অবহেলা ও একাকিত্বের শিকার হচ্ছেন। যে বাবা একদিন সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, সেই বাবার হাত ধরার মতো সময় অনেক সন্তানের নেই। যে বাবা সন্তানের সামান্য কষ্টে রাত জেগে থাকতেন, সেই বাবার অসুস্থতার খবর নেওয়ার প্রয়োজনও অনেকে অনুভব করে না। এটি শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং একটি সামাজিক সংকট।

বর্তমান সময়ে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনেও এই মানসিকতার প্রভাব রয়েছে। অনেক পিতা-মাতা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজেদের ঘরেই পর হয়ে যান। এ রকম ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে যে সন্তানেরা চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও বৃদ্ধ মা-বাবার খোঁজ নেয় না। এটি নিঃসন্দেহে একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা ভালোবাসার অনেক প্রদর্শনী দেখি। বিশেষ দিবসগুলোতে বাবাকে নিয়ে ছবি পোস্ট করা হয়, আবেগঘন স্ট্যাটাস লেখা হয়। ফেসবুকজুড়ে সেদিন বাবাকে নিয়ে অনেক কথা লেখা হয়, যা শুধু একটা লোকদেখানো সংস্কৃতি। যারা ফেসবুকে লোক দেখিয়ে ভালোবাসা বলে বেড়ায়, বাস্তবে দেখা যায় তারা তাদের মা-বাবার খোঁজ পর্যন্ত রাখে না। শুধু বিশেষ দিবসে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এসব লোকদেখানো সংস্কৃতি এখন সমাজের ব্যাধি।

প্রকৃত ভালোবাসা শুধু প্রকাশে নয়, দায়িত্ব পালনের মধ্যেই নিহিত। একজন বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে কিছু সময় কাটানো, তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁর প্রয়োজনগুলো পূরণ করা কিংবা তাঁকে সম্মান দেওয়াই হলো প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন বাবা শুধু অর্থ উপার্জনকারী নন; তিনি পরিবারের অভিভাবক, পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর অভিজ্ঞতা, শিক্ষা এবং জীবনসংগ্রামের গল্প নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ। তাই তাঁদের অবহেলা করা মানে নিজেদের শিকড়কে অস্বীকার করা।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করতে হবে। একজন বাবা সন্তানের জীবনের প্রথম নায়ক, আর সন্তানের দায়িত্ব হলো সেই

নায়কের জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁর সবচেয়ে বড় অবলম্বন হয়ে দাঁড়ানো।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত