Ajker Patrika

প্রশাসন: অস্থিরতা কাটেনি, যোগ হয়েছে অবসর-আতঙ্ক

  • পদোন্নতি, পদায়ন, চুক্তিতে নিয়োগ নিয়ে কর্মকর্তারা অসন্তুষ্ট।
  • ৮২ সিনিয়র সচিব-সচিবের ২১ জনকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ।
  • সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদেও রাজনীতিকদের নিয়োগ।
  • আন্তক্যাডার বৈষম্য নিয়ে বিরোধ নিরসনের উদ্যোগ নেই।
শাহরিয়ার হাসান, ঢাকা
প্রশাসন: অস্থিরতা কাটেনি, যোগ হয়েছে অবসর-আতঙ্ক
ফাইল ছবি

দুই বছর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তা কাটেনি। পদোন্নতি, পদায়ন, চুক্তিতে নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষের পাশাপাশি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসনেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নীতিবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রশাসন এবং পুলিশ ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। ওই সরকারের আমলে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা অনেকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেসব সরকারি কর্মকর্তা রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তার মধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরের আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সবশেষ গত ২৭ জুলাই আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকারী ৩২ সাবেক জেলা প্রশাসককে (সর্বশেষ যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর আগে গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসন ক্যাডারের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) রেখে চাকরি থেকে স্বাভাবিক অবসরে পাঠানো হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন মেধা-ভিত্তিক নিয়োগ-পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ার সুপারিশ করেছিল। জুলাই ঘোষণাপত্র এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও একই বিষয়ে বলা আছে।

বিএনপি সরকার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদেও দলের নেতাদের চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে। গত ২৩ জুলাই ১১টি সরকারি দপ্তরের শীর্ষপর্যায়ের পদে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের গ্রেড-২ পদমর্যাদায় এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৮২ জন সিনিয়র সচিব ও সচিবের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবসহ ২১ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রয়েছেন। ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া মো. সামসুল আলম বিএনপির নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম-সংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সামসুল আলমের এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

৯ জুলাই ১৭৯ উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকায় দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা থাকলেও ২৪তম ও ২৫তম বিসিএস ব্যাচের মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চার কর্মকর্তা পদোন্নতি পাননি।

সূত্র বলেছে, চুক্তিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তুষ্টি দেখা দিয়েছে।

আন্তক্যাডার বৈষম্য নিয়ে বিরোধ দুই বছরেও নিরসন হয়নি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এই বৈষম্য নিরসনের দাবিতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করেন প্রশাসন ক্যাডার এবং অন্য ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তারা। আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের সমন্বয়ক মুহম্মদ মফিজুর রহমান বলেন, কোনো বৈষম্য নিরসন হয়নি, বরং বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সুবিধা আরও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান সরকারের কাছে ক্যাডার বৈষম্য নিরসনের দাবি জানাতে তাঁরা আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

পুলিশ প্রশাসনেও এখন বড় আলোচনার বিষয় বাধ্যতামূলক অবসর। সর্বশেষ ২৩ জুলাই তিনজন উপমহাপরিদর্শকসহ (ডিআইজি) ১৭ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ১৪১ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ইউনিটে বর্তমানে আরও ১১৩ জন কর্মকর্তা সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকেও পর্যায়ক্রমে কয়েকজনকে অবসরে পাঠানো হতে পারে বলে পুলিশ বাহিনীতে আলোচনা চলছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা বলেন, এখন চাকরির অনিশ্চয়তাই বেশি তাড়া করে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন, বদলি, মামলা, প্রশাসনিক রদবদল এবং জবাবদিহির চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসর যোগ হওয়ায় বাহিনীতে অস্থিরতা বেড়েছে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আশরাফুল হুদা আজকের পত্রিকাকে বলেন, চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার আইন অনুযায়ী যেকোনো কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে। তবে অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, প্রশাসনে অস্থিরতা কাটেনি, অনেক ক্ষেত্রে তা বেড়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর যেভাবে প্রশাসন সাজানো দরকার ছিল, সেভাবে সাজানো হয়নি। দলীয়করণের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ফলে নিরপেক্ষ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তারা মূল্যায়িত হচ্ছেন না। পুলিশ ও প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বাধ্যতামূলক অবসর-আতঙ্কে থাকায় অস্থিরতা আরও বাড়ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত