বর্তমান সময়ে সবচেয়ে যে আলোচনার বিষয় সেটি হলো বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ হতে পারে দুই প্রকার—দেশি এবং বিদেশি। প্রথমেই আসা যাক বিদেশি বিনিয়োগের আলাপে। আমাদের দেশে বিদেশিরা সাধারণত বিনিয়োগ করে থাকে বস্ত্র খাতে। বেশির ভাগ সময় বিনিয়োগ এ খাতেই বেশি এসেছে। বস্ত্র খাতের বিনিয়োগ হয় আবার দুই খাতে—টেক্সটাইল এবং তৈরি পোশাকে। এসব খাতে বিনিয়োগের প্রধানতম কারণ হলো, প্রথমত আমাদের দেশে সস্তা শ্রম পাওয়া যায়, দ্বিতীয়ত সরকার থেকেই শিল্প স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়। বিভিন্ন ইপিজেড অথবা শিল্পপার্ক তৈরি করে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয় নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য।
যে দুটি কারণ উল্লেখ করলাম, শুধু এসবই কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নয়। অন্য যে ব্যবস্থাগুলো থাকতে হবে, তার মধ্যে প্রধানতম হলো, জ্বালানির ব্যবস্থা। বলতে গেলে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা দাম নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, পণ্য আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য খালাসের ও জাহাজীকরণের মধ্যবর্তী সময়ের যে যাতায়াতব্যবস্থা দরকার সেগুলো ভালো হতে হবে; সেটা সড়কপথে হোক, নৌপথে হোক অথবা রেলপথেই হোক না কেন। যোগাযোগব্যবস্থা হতে হবে নির্বিঘ্ন ও নির্ঝঞ্ঝাট।
তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলার উন্নত ব্যবস্থা। দেশের আইনশৃঙ্খলা যদি সঠিক মানের হয় অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানের, তাহলে বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছন্দে বিনিয়োগ করবে। আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে কোনো রকম সন্দেহ থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবে না। চতুর্থত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সরকার যাবে, সরকার আসবে কিন্তু বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ অটুট থাকবে সব সময়, এরকম পরিস্থিতি তৈরি হলেই বিদেশি বিনিয়োগ আসবে।
পঞ্চমত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আমাদের দেশে বিনিয়োগ করতে হলে বিভিন্ন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, মন্ত্রণালয়ের যে ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, বিনিয়োগকারীদের জন্য তা মোটেই সুখকর নয়। এই জটিলতা একটি ছাতার নিচে অর্থাৎ এক অফিসে বসেই যেন সম্পন্ন করা যায়, সেই ব্যাপারে রাষ্ট্রেরই ব্যবস্থা নিতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ লাভসহ ফেরত নিয়ে যেতে পারে সেই ব্যাপারে নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
এখন আমাদের দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে, বিদ্যুতের সংকট আছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ঘাটতি দেখবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথাযথভাবে নেই। দেশীয় মুদ্রার ক্রমাবনতি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ। শ্রমিক অসন্তোষ, আন্দোলন-সংগ্রাম, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা তো ঘটেই। এসব বাধা-বিপত্তি দূর করতে হলে সরকারকে স্থায়ীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রথমে জ্বালানির সমস্যার সমাধান, এরপর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শ্রমিকদের পাওনা, ট্রেড ইউনিয়নসহ সব ব্যাপারেই স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে।
ওপরের সমস্যাগুলোর সমাধান না করে এ দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা যাবে না। কোনো বিনিয়োগকারী সংস্থা অথবা দেশ শুধু মুখের কথার ওপর বিশ্বাস করে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ এই পরিবেশে বিনিয়োগ করবে না। তাই আমাদের সরকারের উচিত আগে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।
দেশীয় বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি নেই সে সম্পর্কে একটু বিশ্লেষণ করা যাক। দেশি বিনিয়োগের প্রধান শর্ত হলো, প্রথমেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা এবং ব্যাংকের ঋণের সহজলভ্যতা। এরপর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আমরা পূর্বে লক্ষ করেছি, দেশীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে শর্তের বিনিময়ে যে অঙ্কের টাকা ঋণ নেওয়া হয়, তা অনেকাংশেই পালিত হয় না। ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ সম্পদের বন্ধক রাখতে হবে, তা মোটেই পালিত হয় না। উপরন্তু যত অঙ্কের টাকা ঋণ নেওয়া হয়, তার থেকেও একটা অংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ হয় না। যার কারণে যত শতাংশের টাকা লাভ হওয়ার কথা, তা হয় না; শ্রমিকদের বেতন সঠিকভাবে দেওয়া যায় না। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ব্যাংকের কিস্তি ঠিকমতো দেওয়া যায় না, ব্যাংকের টাকা খেলাপি হয়ে যায়, শিল্প রুগ্ণ হতে থাকে। প্রায় সময়ই আমাদের দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি দেখা যায়। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে—শিল্প স্থাপনের প্রথম দিন থেকেই। এই একটি ব্যাপারে লক্ষ রাখলে আমাদের শিল্প নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।
ইপিজেডগুলোতে বন্ডের লাইসেন্সের মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা হয়। বন্ড অফিসারদের গাফিলতির কারণে অথবা যোগসাজশের কারণে বন্ডের মাধ্যমে বিনা শুল্কে আমদানি করা পণ্য গোপনে খোলা বাজারে বিক্রি হওয়া। বিনা শুল্কের পণ্য যখন খোলা বাজারে বিক্রি হয় তখন সস্তা দামে বিক্রি হয়। এভাবে হতে থাকলে দেশীয় শিল্প তার বাজার হারায়। তাই দেশীয় বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে হলে এইসব ব্যাপারে সরকারকে নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। আমাদের দেশের বহু ডায়াসপোরা আছে, যারা নিজের দেশে বিনিয়োগ না করে অন্য দেশে বিনিয়োগ করে। কারণ, তাদের কষ্টের উপার্জিত অর্থের নিশ্চয়তার ঘাটতি রয়েছে। সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে বিদেশে বসবাসকারী ডায়াসপোরাদের বিনিয়োগ দেশের জন্য আরও লাভজনক ও ভালো। এই ব্যাপারটি নিয়ে সরকারের আরও কাজ করা উচিত। বিদেশে যেসব ব্যক্তি আছেন, যাঁদের বিনিয়োগ করার মতো অর্থ আছে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে বিনিয়োগ করতে দেশে আমন্ত্রণ জানানো উচিত।
এ সবকিছুর জন্যই দরকার আস্থা। আস্থার সংকট দূর না হলে দেশি বা বিদেশি কোনো বিনিয়োগই আসবে না। আমাদের এই শ্রমঘন সমাজে বেকারত্ব দূর করতে হলে, ন্যূনতম টিকে থাকতে হলে, আমাদের শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের এই ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাথাপিছু খুবই কম। আবহাওয়ার পরিবর্তন, খরা, বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টিসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয় চলতেই থাকে এই ছোট্ট ভূখণ্ডে। ১৮ কোটি মানুষের খাওয়া-পরার নিশ্চয়তার জন্য শুধু কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক কিছু নয়, শিল্প খাতে বিনিয়োগ করতেই হবে।
আমাদের দেশে পোশাক খাতেই শ্রমিক বেশি। তাঁরা অন্য কাজে তেমন দক্ষও নন। এই অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে অন্য কোনো শিল্প এগিয়ে নেওয়া যায় না। ইলেকট্রনিকস পণ্যসামগ্রী তৈরি, কম্পিউটার পরিচালনাকেন্দ্রিক শিল্প, এআই দ্বারা পরিচালিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ইত্যাদির জন্য দেশের পরিবেশ এখনো উপযুক্ত হয়নি। এ রকম বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে যে ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার কথা ছিল, তার থেকে আমরা পিছিয়ে আছি, শুধু তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান সীমিত থাকার কারণে।
আমরা আশা করব, রাষ্ট্রই জনগণকে তথ্য ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন বিদ্যায় অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানাবে। সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে তুলবে যেন বাস্তবমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত হয় বর্তমান জনগোষ্ঠী। ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের লোন দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় খরচে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে এ ব্যাপারে অগ্রসর হতেই হবে। নইলে আধুনিক বিশ্ব থেকে আমরা পিছিয়ে পড়ব। তথাকথিত শিল্প উদ্যোগ নিয়ে আমরা হয়তো কিছুদিনের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারব, কিন্তু আর্থিকভাবে উন্নতিসহ আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।
লেখক: প্রকৌশলী

সেবার মান ও দক্ষতা ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরেরও যে কিছুটা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রয়োজন, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। একটি সফল বাণিজ্যিক এয়ারলাইনসের নিয়মিতভাবে নতুন উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপন করা, নতুন লাভজনক রুট চালু করা এবং যাত্রী ও কার্গো পরিবহন বাড়ানো অপরিহার্য
১৮ ঘণ্টা আগে
জাতীয় অর্থনীতির পরিমাপকগুলো যখন পরিসংখ্যানের খাতায় প্রবৃদ্ধির হিসাব কষে, ঠিক তখনই রান্নাঘরের কাঠের হাঁড়ি কিংবা বাজারের থলিতে এসে ধাক্কা খায় বাস্তব চিত্র। গত কয়েক বছরে নিত্যপণ্যের বাজারে যে হারে অগ্নিমূল্য তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এমন এক সময়ে সরকারি কর্মচারীদের
১৮ ঘণ্টা আগে
সনাতন হিন্দু ধর্মানুসারীরা শ্রীকৃষ্ণকে ভগবান জ্ঞানের উচ্চাসনের মান্যতা দিয়ে এঁর আরাধনা করেন। এখন থেকে প্রায় সোয়া ৫ হাজার বছর আগে অথবা খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় সোয়া ৩ হাজার অব্দের কথা। ভাদ্রের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির রোহিণী নক্ষত্রযোগে তাঁর আবির্ভাব, এই ধরাধামে। তবে মুক্ত কোনো স্বাভাবিক ও সাধারণ আঁতুড়ঘরে
১৯ ঘণ্টা আগে
মেসার্স খোকন ব্রিকসের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম খোকনকে ‘মজুতদার’ আখ্যা দিলে নিশ্চয়ই ভুল বলা হবে না। কারণ তিনি অবৈধভাবে সার মজুত করে রেখেছিলেন। এই অপরাধের শাস্তিও তিনি পেয়েছেন। ১৬ বস্তা ইউরিয়া এবং ৭ বস্তা ডিএপি সার মজুত করে রাখার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন।
১৯ ঘণ্টা আগে