
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ব্যাংকিং খাত। মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকে জমা হয় এবং সেই অর্থ শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি, আবাসন ও উদ্যোক্তা খাতে ঋণ হিসেবে প্রবাহিত হয়। আমদানি-রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখতেও ব্যাংকের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে তার অভিঘাত শুধু ব্যাংক বা আমানতকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এমনই একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান, প্রভাবশালী মহলের ঋণ সুবিধা গ্রহণ, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং অতীতের নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে চাপে ফেলেছে।
পরিস্থিতির ব্যাপ্তি বোঝাতে কয়েকটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নন-পারফর্মিং লোন বা খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়ায় ৩২.৬ শতাংশ—দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ৭.৯ শতাংশের তুলনায় যা অত্যন্ত বেশি। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার capital-to-risk-weighted-assets ratio (CRAR) ছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের মোট আর্থিক খাতের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যাংকিং খাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে—সমস্যাটি কোনো একটি ব্যাংক, কয়েকজন ঋণগ্রহীতা বা একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যর্থতার ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো একটি শক্তিশালী আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা। কোনো ব্যাংক গুরুতর সংকটে পড়লে সেটিকে কীভাবে পুনর্গঠন, একীভূত অথবা প্রয়োজন হলে রেজ্যুলেশনের আওতায় আনা হবে—তা স্পষ্ট থাকা দরকার।
এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ এবং পরবর্তী ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন-২০২৬ গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের অধীনে অকার্যকর বা অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকের জন্য রেজ্যুলেশন প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের আইনি কাঠামো সেই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিয়েছে।
তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর নিরপেক্ষ প্রয়োগ। কোনো ব্যাংকের মালিক, পরিচালক, বড় ঋণগ্রহীতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যবসায়িক পরিচয় যেন নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের Bank Restructuring & Resolution Unit-ও ব্যাংক খাতের সংস্কার ও রেজ্যুলেশন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আস্থা। একজন সাধারণ আমানতকারী ব্যাংকের ঋণ অনিয়ম, দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার জন্য দায়ী নন। তাই ব্যাংকিং সংকটের সময় ক্ষুদ্র ও সাধারণ আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের Financial Sector Support Project II একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের আর্থিক খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। প্রকল্পটির আওতায় আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, Emergency Liquidity Assistance কাঠামো তৈরি, দুর্বল ব্যাংকের restructuring এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সময়সীমাভিত্তিক ফলাফল নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাংকিং সংকটে কখনো কখনো সরকারকে আর্থিক সহায়তা দিতে হতে পারে। কিন্তু সেই সহায়তা যেন নিঃশর্ত না হয়।
সরকারি অর্থে কোনো ব্যাংককে পুনঃ মূলধনীকরণ করা হলে এর সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ আদায়ের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালীকরণ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংস্কারের শর্ত যুক্ত করা উচিত। তা না হলে তৈরি হবে ‘মোরাল হ্যাজার্ড’—অর্থাৎ ব্যাংকের মালিক ও ব্যবস্থাপনা অতিরিক্ত ঝুঁকি নেবে এই ধারণায় যে শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ দিয়ে ব্যাংককে উদ্ধার করা হবে।
ব্যাংক খাতের সংস্কারের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নির্ণয়ে নিয়মিত, স্বাধীন ও ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি প্রয়োজন।
ব্যাংকের মূলধন, তারল্য, সম্পদের মান, ঋণের ঝুঁকি, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া ঋণ, প্রভিশন এবং প্রকৃত ক্ষতি—সবকিছু বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশেষ করে খেলাপি ঋণকে কাগজে-কলমে ভালো দেখানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। শুধু ঋণ পুনঃতফসিল করলেই একটি দুর্বল ঋণ ভালো ঋণে পরিণত হয় না। ঋণগ্রহীতা বাস্তবে কিস্তি পরিশোধ করতে সক্ষম কি না এবং ব্যবসাটি টেকসই কি না, তা বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় একটি মধ্যমেয়াদি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে, যেখানে কঠোর তদারকি, দ্রুত ঋণ আদায়, আইনি সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক মানের credit-loss framework-এর দিকে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা। কিন্তু শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোই যথেষ্ট নয়; কেন ঋণ খেলাপি হচ্ছে, সেই কারণও চিহ্নিত করতে হবে।
ব্যবসায়িক কারণে সাময়িক সমস্যায় পড়া একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ব্যক্তিকে একই দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। প্রকৃত উদ্যোক্তাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে হবে; অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
বড় ঋণ আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রয়োজন। মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে ব্যাংকের অর্থ আটকে থাকে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। তাই ঋণ আদায়, জামানত ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দ্রুততর করা জরুরি।
একটি ব্যাংক জনগণের আমানত নিয়ে ব্যবসা করে। তাই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জায়গা হতে পারে না।
পরিচালক নির্বাচনে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও আর্থিক খাত সম্পর্কে জ্ঞানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিচালকের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ব্যাংকের স্বার্থের মধ্যে সংঘাত থাকলে তা প্রকাশ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং ব্যবসার সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, সম্পদ, দায় এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য বিবেচনা করা উচিত।
ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সরকার যদি বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ কমে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাই সরকারি সিকিউরিটিজ ও বন্ড বাজারকে আরও গভীর ও কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সরকারি অর্থে মূলধন দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত থাকতে হবে।
মূলধন সহায়তার সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ কমানো, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা আনার মতো পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
ব্যাংক খাত কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির সম্পদ। তাই বিরোধী দলেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা ব্যাংক পুনঃ মূলধনীকরণে সরকারি অর্থের ব্যবহার, ব্যাংক পরিচালকদের নিয়োগ, বড় ঋণখেলাপি, ঋণ আদায় এবং সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তুলতে পারেন। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ যাচাই এবং বিকল্প সংস্কার প্রস্তাব দেওয়াও তাদের দায়িত্ব।
তবে বিরোধী দলের সমালোচনা অবশ্যই তথ্যভিত্তিক হতে হবে। যাচাইহীন অভিযোগ বা গুজব ছড়িয়ে কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা দায়িত্বশীল রাজনীতি নয়। কারণ ব্যাংক মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
তাই প্রয়োজন—ধ্বংসাত্মক বিরোধিতা নয়, গঠনমূলক বিরোধিতা।
ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে।
স্পেন: ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর স্পেনের ব্যাংক খাত, বিশেষ করে আবাসন খাতে অতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার কারণে, গুরুতর খেলাপি ও অকার্যকর সম্পদের সংকটে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১২ সালে স্পেন ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান যাচাই (Asset Quality Review) এবং ব্যাংকভিত্তিক স্ট্রেস টেস্টের মাধ্যমে প্রকৃত মূলধন ঘাটতি শনাক্ত করে। এরপর দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনঃ মূলধনীকরণ ও পুনর্গঠন করা হয় এবং অকার্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যাংকগুলোর ব্যালান্সশিট থেকে সরিয়ে SAREB নামে একটি বিশেষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। একই সঙ্গে অকার্যকর ব্যাংকগুলোর সুশৃঙ্খল পুনর্গঠন বা অবসান এবং ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রক, তদারকি ও সুশাসন কাঠামো শক্তিশালী করা হয়। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর মূলধন শক্তিশালীকরণ, সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ পৃথকীকরণ এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার করা হয়।
মিশর: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিশর বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেছে। IMF-এর ২০২৬ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মিশরের ব্যাংক খাতে gross NPL ratio প্রায় ২ শতাংশে নেমে আসে। তবে একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল এবং ব্যাংকের সম্পদের বড় অংশ সরকারি সিকিউরিটিজে কেন্দ্রীভূত ছিল—যা বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
দক্ষিণ কোরিয়া: ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ব্যাপক সংস্কার করে দক্ষিণ কোরিয়া। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত মূলধন, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা দেশটির আর্থিক ব্যবস্থাকে পরবর্তী সময়ে আরও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করে।
এই অভিজ্ঞতাগুলোর সারকথা হলো—সংকট দেখা দিলে শুধু টাকা দিয়ে ব্যাংককে বাঁচানো যায় না; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, বাস্তব ক্ষতি স্বীকার এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত সাতটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে—
১. প্রতিটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জানতে স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন Asset Quality Review সম্পন্ন করতে হবে।
২. প্রকৃত ক্ষতি স্বীকার করতে হবে। খেলাপি ঋণকে কৃত্রিমভাবে ভালো দেখানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
৩. অকার্যকর ব্যাংককে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন, একীভূতকরণ অথবা resolution-এর আওতায় আনতে হবে। শুধু এক ব্যাংকের সঙ্গে অন্য ব্যাংক একীভূত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
৪. ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
৫. আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষিত রাখতে হবে, কিন্তু ব্যাংকের মালিক, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির দায়ও নিশ্চিত করতে হবে।
৬. ব্যাংকের ঋণ আদায় ও আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দ্রুততর ও বিশেষায়িত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৭. ব্যাংকিং সংস্কারকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেও সংস্কার কর্মসূচি যেন থেমে না যায়।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি; তাই একদিনে এর সমাধানও সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, পেশাদার নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
সরকারকে সংস্কারের আইনগত ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীন ও কঠোর তদারকির ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়কে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল সংসদীয় নজরদারি করতে হবে। আর ব্যাংকের মালিক, পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও বড় ঋণগ্রহীতাদেরও নিজেদের দায় স্বীকার করতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে বাঁচানোর পথ তাই শুধু অর্থের পথ নয়; এটি আস্থা, সুশাসন ও জবাবদিহির পথ।
আমাদের এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে আমানতকারীর অর্থ নিরাপদ থাকবে, যোগ্য উদ্যোক্তা ন্যায্য শর্তে ঋণ পাবেন, ব্যাংক পরিচালিত হবে পেশাদারত্বের সঙ্গে এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না।
ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা শুধু ব্যাংকারদের বিষয় নয়—এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং জনগণের ভবিষ্যৎ আস্থার প্রশ্ন।
তাই এখন সময় দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার।
লেখক—
হেড অব ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি
তথ্যসূত্র:
World Bank, Financial Sector Support Project II, June 2026; World Bank, Bangladesh Development Update, 2026; Bangladesh Bank, Monetary Policy Statement and banking-sector regulatory information, 2026; IMF, Egypt: Fifth and Sixth Reviews, 2026; IMF country reports on financial-sector reforms; Bangladesh Bank, Bank Resolution Ordinance, 2025 /Bank Resolution Act, 2026.

‘দেশে সারের কোনো সংকট নেই’—এ কথা বলেছেন খোদ কৃষিমন্ত্রী। অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, যশোর কিংবা মেহেরপুরের মতো দেশের প্রধান কৃষি অঞ্চলগুলোতে আমন মৌসুমে সারের জন্য কৃষকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কারণ তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না।
১৩ ঘণ্টা আগে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রীতিমতো পণ্ড করে দিয়েছে স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। ১৮ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকায় পুলিশ লাইনস মাঠের ড্রিল শেডে অনুষ্ঠান চলাকালে মাদ্রাসার একদল শিক্ষার্থী তাতে বাধা দেয়। এর জের ধরে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও বাধে।
১৪ ঘণ্টা আগে
অনেক দার্শনিকই কথাটা বলে থাকেন, চেঞ্জ ইজ লাইফ বা পরিবর্তনই জীবন। পরিবর্তন আবার দুই রকমের। ‘ভালো’ অথবা ‘মন্দ’; এই দুই ধরনের পরিবর্তন সমাজকে দুদিক থেকে প্রভাবিত করে। যেমন ধরুন, মুক্তিযুদ্ধ; সে শুভ পরিবর্তন আমাদের দেশ জাতি ও সমাজকে কতভাবে প্রভাবিত করেছে! সে সময়ে আমাদের জীবন হয়ে উঠেছিল বাঙালিময়।
১৫ ঘণ্টা আগে
সাম্য, সামাজিক মর্যাদা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে ২৬৬ দিনের জীবনপণ যুদ্ধের ফলাফল আজকের বাংলাদেশ। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ দেশের সাধারণ মানুষের, কারণ আমজনতার স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব এ পর্যন্ত যাঁরা নিয়েছেন তাঁদের কারোই জনতার সে স্বপ্নের কথা মনে থাকেনি একেবারেই।
২ দিন আগে