Ajker Patrika

বেলুচিস্তানের তথাকথিত স্বাধীনতার আন্দোলন আদৌ কি বাস্তবসম্মত

আব্দুর রহমান 
বেলুচিস্তানের তথাকথিত স্বাধীনতার আন্দোলন আদৌ কি বাস্তবসম্মত
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচিস্তান প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা বেড়েছে। ছবি: এএফপি

সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে পাকিস্তানের সবচেয়ে ‍বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান। আলোচনা মূলত বেলুচিস্তান স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে—এমন ইস্যুতে। যদিও আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটা নিয়ে বেশ শোরগোল হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বেলুচিস্তান কি আসলেই স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে? এর সহজ কোনো উত্তর নেই। তবে সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে অনুমান করা যায়, নিকট ভবিষ্যতে বেলুচিস্তান স্বাধীন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

পাকিস্তানের সবচেয়ে সংঘাত ও প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ প্রদেশ এই বেলুচিস্তান। তাই এই প্রদেশের স্বাধীনতা বা বিচ্ছিন্নতাবাদসংক্রান্ত বিষয় পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ, পাকিস্তানের কাছে এটি কেবল একটি প্রদেশ নয়, বরং নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি, সমুদ্রপথ, জ্বালানি ও জাতীয় সংহতির সঙ্গে জড়িত এক কৌশলগত অঞ্চল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রদেশটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা বেড়েছে, কিন্তু তা এখনো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভাঙার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও নেই।

পাকিস্তানের কাছে বেলুচিস্তানের গুরুত্ব অসামান্য। বেলুচিস্তান পাকিস্তানের ভূখণ্ডের বড় অংশজুড়ে বিস্তৃত পাকিস্তানের মোট আয়তনের প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি এই প্রদেশের। এই প্রদেশে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ উপকূল, গদর ও ওরমারা গভীর সমুদ্রবন্দর, সম্ভাব্য পাইপলাইন রুট এবং আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দিকে প্রবেশদ্বার।

এ ছাড়া এই অঞ্চল চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গদর বন্দর ও উপকূলীয় অবকাঠামো চীনের সাপ্লাই লাইনের অংশ। এ ছাড়া এই সংযোগ চীনকে ভারত মহাসাগরে উপস্থিতির সুযোগ দেয় এবং চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরকে (সিপিইসি) শক্তিশালী করে। ফলে বেলুচিস্তান হারানো মানে পাকিস্তানের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান একসঙ্গে দুর্বল হওয়া।

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই গুরুত্বের বড় অংশই এখনো সম্ভাবনাভিত্তিক। প্রদেশটি পাকিস্তানের সবচেয়ে খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল। এখান থেকেই দেশের বড় অংশ গ্যাস উৎপাদিত হয়। পাকিস্তানের গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই পূরণ করে বেলুচিস্তান। আর গদর বন্দর ও সিপিইসির কারণে এর কৌশলগত অর্থনৈতিক ওজন আরও বেড়েছে।

বেলুচিস্তানের খনিজ খাত বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বিচারে খুব বড় নয়, কিন্তু দেশটির জন্য সম্ভাব্য লাভজনক একটি খাত। বেলুচিস্তানের খনিজ খাতের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য আনুমানিক ১ বিলিয়ন ডলার এবং খনিজ উৎপাদন ৫০ শতাংশ বাড়লে পাকিস্তানের জিডিপি প্রায় ২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। বেলুচিস্তানে বিরল মৃত্তিকা খনিজের মধ্যে কপার বা তামা, ক্রোমাইট, মার্বেল, ব্যারাইট ও ফ্লুরাইটের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা আছে।

প্রদেশটি পাকিস্তানের মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি হলেও এই প্রদেশের জনসংখ্যা তুলনামূলক কম এবং দারিদ্র্য বেশি। আর স্থানীয় অসন্তোষের মূলেও আছে সম্পদ আহরণ, রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ এবং উন্নয়নের সুফল স্থানীয়দের কাছে না পৌঁছানো। ফলে বেলুচিস্তান প্রশ্নটি শুধু ‘সার্বভৌমত্ব’ নয়, ‘বণ্টন ও বঞ্চনার’ প্রশ্নও বটে।

এখন প্রশ্ন হলো, বেলুচিস্তান কী আদৌ স্বাধীন হবে এবং হলে কীভাবে? এই প্রশ্নে বাস্তবতা হলো, কেবল কাগজ-কলমে ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। কার্যকর স্বাধীনতার জন্য দরকার মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, জনগণের টেকসই সমর্থন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি—আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এখন পর্যন্ত যে তথাকথিত ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামে অসমর্থিত যে স্বাধীনতা ঘোষণার খবর এসেছে, সেগুলো মূলত প্রতীকী বা রাজনৈতিক বার্তা। বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রতিবেদন বা প্রমাণ দেখা যায় না যে অঞ্চলটি বাস্তবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

বেলুচিস্তান কেন এখনই স্বাধীন হবে না—তার সবচেয়ে বড় কারণ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এখনো কার্যকর। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেলুচিস্তানে বিদ্রোহী-সন্ত্রাসীদের হামলার জবাবে বড় নিরাপত্তা অভিযান চালাচ্ছে, হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং সেনা মোতায়েন করছে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখছে। বিদ্রোহীরা সহিংসতা বাড়ানোর দাবি করলেও তারা এখনো পুরো প্রদেশকে স্থায়ীভাবে শাসন করতে পারছে না। তাই বাস্তব সার্বভৌমত্বের শর্ত পূরণ হয়নি। এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বালুচরা সামগ্রিকভাবে স্বাধীনতার জন্য কতটা প্রস্তুত এবং এটি তাদের কাছে কতটা আকাঙ্ক্ষিত।

কারণ, ২০১২ সালে গ্যালাপের এক জরিপ দেখিয়েছিল, ৩৭ শতাংশ বালুচ বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা চান। এরপর গ্রহণযোগ্য আর কোনো জরিপ দেখা যায়নি। ফলে আসলে ঠিক বালুচদের কতজন স্বাধীনতা চান, সেই বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ছবি নেই। আর বেলুচিস্তানে স্বাধীনতা আন্দোলন ঠিক কতটা জনমানসে গ্রহণযোগ্য, সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ নেই।

আরেকটি বড় বাধা হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি। বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো বড় দেশ বা বহুপক্ষীয় সংস্থা এখনো সামনে আসেনি। কারণ, একটি নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু ‘স্বাধীনতার নৈতিক সমর্থন’ নয়, এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত পরিবর্তনের ফলাফল, পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক, ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত, পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ক এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের বিস্তার—এসব ঝুঁকিও জড়িয়ে যায়। তাই আন্তর্জাতিক মহল সাধারণত এমন দাবির প্রতি সতর্ক থাকে, বিশেষ করে যখন দাবিটি সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে করা হয়।

কিন্তু তারপরও এই সংঘাত টিকে আছে। কারণ, ক্ষোভের শিকড় গভীর। বেলুচিস্তানের ক্ষোভ কেবল পরিচয়ের প্রশ্ন নয়, শাসনব্যবস্থার প্রশ্নও। বহু বছর ধরে যে অনুভূতি তৈরি হয়েছে তা হলো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কম, সম্পদের ভাগ কম, নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর আর ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সীমিত। এই অবস্থায় বিদ্রোহী রাজনীতি টিকে যায়, এমনকি দুর্বল হলেও।

বেলুচিস্তানের মানুষ দীর্ঘদিন গুম-খুন ও দমননীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছে। কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যখন নিজেদের ‘স্বাধীন বেলুচিস্তানের’ জন্য লড়ছে বলে দাবি করে, তখন একই সঙ্গে পাকিস্তান একে বিদেশি-সমর্থিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে দেখছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সমঝোতা কঠিন হয়ে উঠেছে।

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার আলাপে ভারতের ভূমিকার প্রশ্নটি আলাদা করে দেখা দরকার। ভারতীয় কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, বেলুচিস্তান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে পাকিস্তানকে চাপের মধ্যে রাখা যায়, সিপিইসিকে চাপে রাখা যায় এবং চীনের প্রভাবের বিপরীতে এটি এক জিওপলিটিক্যাল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে ভারতের অনুকূলে। অন্যদিকে, পাকিস্তানি সূত্রগুলো দাবি করে ভারত বালুচ বিদ্রোহীদের সহায়তা করে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে চায়। এ ক্ষেত্রে তারা কুলভূষণ যাদব-সংক্রান্ত ঘটনার মতো উদাহরণ তুলে ধরে। তবে তথ্যভিত্তিক সতর্ক বিশ্লেষণ বলে, ভারত বেলুচিস্তানকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করতে সরাসরি ও আনুষ্ঠানিক নীতি গ্রহণ করেছে—এমন নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃত প্রমাণ নেই। আর দুই দেশই পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ায় এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না, যার ফলে দুই দেশের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যায়। একই সঙ্গে, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার অস্তিত্বও।

তাই বেলুচিস্তান নিকট ভবিষ্যতে স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু এর সংঘাত আরও তীব্র ও সংবেদনশীল হচ্ছে। পাকিস্তানের কাছে এর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক মূল্য এত বেশি যে অঞ্চলটি হাতছাড়া হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বন্দর অর্থনীতি, জ্বালানিনিরাপত্তা এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই নড়বড়ে হয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশের সরাসরি রাস্তাটাও বন্ধ হয়ে যাবে।

তাই বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ এখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট, দমননীতি এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সক্ষমতার ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। গায়ের জোরে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়, করতে হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত