
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তার নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং গত দুই দশকে এটি একধরনের প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন নয়, বরং পুরো অনুমোদনপ্রক্রিয়া, নীতিমালা এবং শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটিমাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দেওয়া হয়। যে কারণে এটার অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। কারণ, ওই সময়ে আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন চেয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়ায় সমালোচনা তীব্রভাবে হচ্ছে। এটি অনেকের কাছে বৈষম্যমূলক মনে হতে পারে। তবে প্রশ্নটি এখানেই শেষ নয়; বরং প্রশ্নের শুরু এখান থেকেই—কেন এই বিশ্ববিদ্যালয় এত দ্রুততম সময়ে অনুমোদন পেল, যেখানে আগে থেকে আবেদন করা আরও বহু প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনপ্রক্রিয়া বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ এবং বহুস্তরবিশিষ্ট। আবেদন, প্রাথমিক যাচাই, ইউজিসির পরিদর্শন, কমিটির সুপারিশ, মন্ত্রণালয়ের পুনঃ যাচাই এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের অনুমোদন—এগুলোই প্রধান ধাপ। সব মিলিয়ে অনুমোদন পেতে সাধারণত এক থেকে দুই বছর, কখনো তারও বেশি লেগে যায়। কিন্তু গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুততায় সম্পন্ন হয়েছে, যা জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি করেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনি প্রশ্ন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ন্যূনতম ৫ কোটি টাকা সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে জমা রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অনুমোদনপত্রে দেখা যাচ্ছে, সেখানে দেড় কোটি টাকার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আইনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। কেউ বলছেন বিষয়টি মনে নেই, কেউ বলছেন এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা; আবার কেউ কেউ বিশেষ বিবেচনার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করছেন। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কখনো বলছে, তারা আইনের ব্যত্যয় করেনি, আবার কখনো বলছে, ইউজিসির নির্দেশ অনুযায়ী তারা ৫ কোটি টাকাই জমা দিয়েছে। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শুধু বিভ্রান্তিই তৈরি করছে না, বরং স্বচ্ছতার বিষয় নিয়েও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে একটা মৌলিক প্রশ্ন যে আইন কেন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে না? যদি একটি প্রতিষ্ঠান বিশেষ বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে অনুমোদন পায় এবং সে ক্ষেত্রে আইনি শর্ত শিথিল করা হয়, তাহলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে একই সুযোগ কেন থাকবে না? রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি সমতা ও ন্যায়বিচারের নীতি ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগে থেকে আবেদন করা ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন কেন এখনো ঝুলে আছে? এদের মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে এবং তাদের সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত দেওয়া হয়েছে, তবু সেই প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদন পাচ্ছে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক।
গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—অবকাঠামোর বাস্তবতা। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ ক্যালেডোনিয়ান কলেজ অব নার্সিংয়ের সীমিত লাইব্রেরি, ক্লাসরুম ও অন্যান্য সুবিধাকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে। অথচ এই ক্যাম্পাস নিজস্ব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রয়োজন পূরণে কিছু সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই অবকাঠামো দিয়ে দুই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হলে শিক্ষার মান ও একাডেমিক পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষকসংক্রান্ত বিষয়েও কিছু উদ্বেগের কথা বিভিন্ন মহল থেকে পাওয়া গেছে। পর্যাপ্ত কর্মপরিবেশের অভাব, অপ্রতুল বেতন এবং উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়নের ঘাটতির মতো বিষয়গুলো অনেকের মতে একটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিদেশফেরত যোগ্য শিক্ষকদের নিম্নপদে নিয়োগ, স্বল্প বেতন এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে বাধ্যতামূলক চুক্তি করার অভিযোগ উঠেছে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এভাবে শিক্ষকদের আটকে রাখার কৌশল তাঁদের পেশাগত জীবনের স্বাধীনতাকে খর্ব করবে। ফলে প্রশ্ন হলো, এ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে চায়, নাকি মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায়? বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে অনুমোদন দিলে তা শেষ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই এখন সময় এসেছে সংখ্যা নয়, মানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।
তবে এ কথাও সত্য, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটি নিজেই ব্যতিক্রমধর্মী। জিরো দারিদ্র্য, জিরো বেকারত্ব এবং জিরো কার্বন—এই লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
এমনিতেই দেশের উচ্চশিক্ষা খাত ইতিমধ্যে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। যেমন মানের প্রশ্ন, কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযোগহীনতা, গবেষণার সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি। এই প্রেক্ষাপটে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক নীতি অনুসরণ করা জরুরি। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আসবে।
এই ঘটনার আলোকে কয়েকটি বিষয় পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল ও ট্র্যাকযোগ্য করা যেতে পারে, যাতে কোন আবেদন কোথায় আটকে আছে, তা সহজে জানা যায়। দ্বিতীয়ত, আইনের সঙ্গে কোনো অসামঞ্জস্য দেখা দিলে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত। তৃতীয়ত, ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে দায় এড়ানোর প্রবণতা কমে।
সার্বিক অর্থে এটি মনে রাখা জরুরি, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভবন কিংবা অবকাঠামোর নাম নয়; এটি একটি জাতির জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। সেখানে যদি সূচনাতেই প্রশ্ন থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান যত বড় নামেরই হোক না কেন, তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না।

একটি জাতির সর্বোচ্চ সম্পদ তার ভৌগোলিক আয়তন কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং তার দক্ষ মানবসম্পদ। এই সত্য আরও বেশি প্রযোজ্য হলো বাংলাদেশের জন্য এ কারণে যে আমাদের দেশ একটি বিশাল জনসংখ্যা এবং স্বল্প প্রাকৃতিক সম্পদসম্পন্ন। যেকোনো দেশের জন্য শ্রম ও উদ্যোক্তা হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
২ ঘণ্টা আগে
আরও একটি প্রতারণার ঘটনা ঘটল। কত ধরনের প্রতারণাই তো ঘটে চলেছে চারদিকে। এবারের ঘটনা গাইবান্ধার। সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কোটি টাকা। এ রকম লোভনীয় প্রলোভনের ফাঁদে পড়েছেন শতাধিক গ্রাহক।
২ ঘণ্টা আগে
বহু বছর ধরে একটা আলোচনা চলছে যে, দেশে কর-জিডিপির অনুপাত কিছুতেই বাড়ছে না। কোনো বছর সামান্য বাড়লেও, পরের বছর আবার তা কমে যায়। সে কারণে সেই অনুপাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি।
১ দিন আগে
মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বালাশুর গ্রামের একটি সাধারণ খামার। খামারি জি এম খালিদ পরম মমতায় তাঁর গবাদিপশুগুলোর পরিচর্যা করছেন। শখের বশে শুরু করা এই খামারটি আজ তাঁর জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে।
১ দিন আগে