Ajker Patrika

অন্তঃসত্ত্বা ১১ বছরের শিশু: পলাতক মাদ্রাসাশিক্ষকের ভিডিও ভাইরাল, খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
আপডেট : ০৬ মে ২০২৬, ০০: ১৫
অন্তঃসত্ত্বা ১১ বছরের শিশু: পলাতক মাদ্রাসাশিক্ষকের ভিডিও ভাইরাল, খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ
প্রতীকী ছবি

নেত্রকোনার মদনে ১১ বছরের মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষককে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তাঁকে খুঁজে না পাওয়া গেলেও এরই মধ্যে অজ্ঞাত স্থান থেকে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন ওই শিক্ষক; যা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং নেটিজেনদের মধ্যে নানা প্রশ্নের উদ্রেক ঘটিয়েছে।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, ‘মেয়েটি একসময় আমার মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছে, তবে ঘটনার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হোক, আমিও সেটাই চাই।’

তবে অপরাধী না হলে ওই শিক্ষক পালাবেন কেন—এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ধর্ষণের ঘটনায় ওই মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার মামলা করেন শিশুটির মা।

পুলিশ বলছে, আসামিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়েও তাঁর অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর চার বছর আগে একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ভুক্তভোগী শিশুটি নানার বাড়িতে থেকে সেখানে পড়াশোনা করত। গত বছরের ২ নভেম্বর মাদ্রাসা ছুটির পর শিক্ষক তাকে মসজিদে ঝাড়ু দিতে ডেকে নিয়ে যান এবং পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। পরে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি অসুস্থতা ও শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে শিশুটির মা বিষয়টি জানতে পারেন। গত ১৮ এপ্রিল মদন উপজেলা শহরের একটি ক্লিনিকে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা। পরে এ ঘটনায় শিশুর মা গত বৃহস্পতিবার বাদী হয়ে ওই শিক্ষককে আসামি করে থানায় ধর্ষণ মামলা করেন।

শিশুটির স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন গাইনি চিকিৎসক সায়মা আক্তার। তিনি বলেন, ‘শিশুটি মায়ের সঙ্গে ক্লিনিকে আসে। জানায়, তার পেট ভার ভার লাগে। কী যেন হঠাৎ করে নড়াচড়া করে। পরে পরীক্ষা করে দেখতে পাই, বাচ্চাটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শিশুটিকে যখন বারবার জিজ্ঞাসা করি, “মা, তোমাকে এ কাজ কে করেছে?” তখন তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। শুধু বলে, “হুজুর, হুজুর এই কাজ করেছে।”’

ওই চিকিৎসক জানান, ১১ বছর বয়সী মেয়েটির উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম এবং ওজন মাত্র ২৯ কেজি। শিশুটির সরু কোমরের তুলনায় গর্ভস্থ বাচ্চার মাথার মাপ অনেক বেশি। এটি বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৮ দশমিক ২। এমন অবস্থায় স্বাভাবিক প্রসবে মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই শিশুর শরীরে সিজারিয়ান সেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেসথেসিয়া বা ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরীক্ষার রিপোর্টে মেয়েটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা গেছে।

শিশুটির মা বলেন, ‘আমাকে আমার স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। ছোট তিন ছেলে ও এক মেয়ে লইয়া খুব কষ্ট করি। জীবিকার তাগিদে সিলেটে মানুষের বাসায় কাম করি। মেয়েডারে আমার বাপের বাড়িতে রাইখ্যা কষ্ট কইরা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করাতে দিছিলাম। কিন্তু হুজুর আমার এই বাচ্চাটার সঙ্গে এমন পিশাচের মতো কাজ করতে পারল, আমি স্বপ্নেও ভাবিছিলাম না। এই ঘটনায় আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মদন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আখতারুজ্জামান জানান, থানায় মামলা করার পর পুলিশের উদ্যোগে জেলা সদর হাসপাতালেও মেডিকেল পরীক্ষা করানো হলে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আসামি গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে, তবে এখন পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুতই তাঁকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত