Ajker Patrika

গ্যাসের আশায় ৫ কিমি গভীর কূপ খনন

ফয়সাল আতিক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে
আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ২২: ১৮
গ্যাসের আশায় ৫ কিমি গভীর কূপ খনন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কাছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অদূরে খনিজ জ্বালানির খোঁজে তিতাস অঞ্চলে শুরু হয়েছে কূপ খনন। ছবি: আজকের পত্রিকা

তিতাস অঞ্চলে প্রায় দুই টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) খনিজ জ্বালানির সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে মাটির সাড়ে ৫ কিলোমিটার গভীরে কূপ খনন শুরু হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এলে চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে তা বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কাছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অদূরে তিতাস-৩১ নম্বর এই কূপকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীর কূপ। চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি সিসিডিসির প্রকৌশল সহযোগিতায় ২১০ দিনে মাটির ৫ হাজার ৬০০ মিটার গভীরে যাওয়ার লক্ষ্য।

সাধারণত বাংলাদেশে ২ হাজার ৭০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। ৪ হাজার মিটারের কিছু বেশি গভীরতায়ও নামার ঘটনা আছে।

কিন্তু তিতাস-৩১ নম্বর কূপে এত গভীরে যাওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল জলিল প্রামাণিক বলেন, বরাইল বালুর উপস্থিতির কারণে এত নিচে যেতে হয়েছে। অনেক কূপে আরও অনেক কম গভীরতায় বরাইল স্যান্ড পাওয়া যাচ্ছে। এই কূপে ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ মিটার—এই লেয়ারের মধ্যে চারটি সম্ভাব্য হাইড্রোকার্বন স্তর আশা করা যাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী প্রায় ২ টিসিএফ মজুত রয়েছে।

গত ১৯ এপ্রিল থেকে এই কূপের খননকাজ শুরু করেছেন চীন ও বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা। গতকাল সোমবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চীনা কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশিরা। মাটির বুক চিরে নিরবচ্ছিন্ন শব্দে ঘুরছে ২ হাজার ৬৮২ হর্স পাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক রিগ (খননযন্ত্র)। দেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত কূপ খননের ইতিহাস রয়েছে। এবার সেই সীমা পেরোনোর চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, এই কূপ খনন শেষে একই রিগ ব্যবহার করে বাখরাবাদেও আরেকটি গভীর কূপ খনন করা হবে। যার গভীরতা ৪ হাজার ৩০০ মিটার। দুই কূপে ব্যয় হবে ৫৯৪ কোটি টাকা। সবকিছু ঠিক থাকলে কূপ দুটিতে ২ টিসিএফ মজুত পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। খনন শেষে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই জানা যাবে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে আর কতটুকুই-বা উত্তোলন করা যাবে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে গড়ে ৮০-৮৫ কোটি ঘনফুট আসে উচ্চমূল্যের আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে।

দেশীয় গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসায় দিন দিন জ্বালানি সংকট বাড়ছে। চাপ বাড়ছে আমদানি ব্যয়ের। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ২ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তিতাস-৩১ কূপটি খনন করতে সময় লাগবে ২১০ দিন। এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। আর বাখরাবাদ-২১ ফিল্ডের খননে সময় ধরা হয়েছে ১৮০ দিন। কূপ খনন শেষে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হলেই শুরু হবে গ্যাস উত্তোলন। এরপর সরবরাহ হবে জাতীয় গ্রিডে।

সম্ভাবনার চার স্তর

সাধারণত ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ মিটারের মধ্যে গ্যাসের অস্তিত্ব বেশি থাকে। তিতাস অঞ্চলেও মাটির নিচে মোট চারটি স্তরে গ্যাসের সম্ভাবনা দেখছেন কর্মকর্তারা। প্রথম স্তরটি ৩ হাজার ৭৩৬ থেকে ৩ হাজার ৭৬৫ মিটার গভীরে। শেষ স্তর ৫ হাজার ৩১৫ থেকে ৫ হাজার ৩৪৪ মিটার গভীরে। মাঝখানে রয়েছে আরও দুটি সম্ভাবনাময় স্তর।

যত সম্ভাবনা তত ঝুঁকি

তবে মাটির নিচে ৩ হাজার ৭৫০ মিটার পার হলেই শুরু হয় উচ্চ চাপের এলাকা। এই চাপ সামাল দিতে না পারলে পুরো ড্রিলিং প্রক্রিয়া ভন্ডুল হয়ে যেতে পারে। তাই বাড়তি সতর্কতা হিসেবে এবার ব্যবহার করা হচ্ছে ১৫ হাজার পিএসআই সক্ষমতার ব্লো-আউট প্রিভেন্টর। অতীতের ১০ হাজার পিএসআইয়ের সীমাবদ্ধতা ভেঙে এবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানান, এমন উচ্চ ক্ষমতার রিগ আগে দেশে ছিল না। প্রযুক্তিও এত উন্নত ছিল না। এই প্রকল্পে শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, আছে বড় প্রত্যাশাও। চীনা প্রতিষ্ঠানটির তাদের দেশে ১০ হাজার মিটার গভীরে কূপ খননের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

২০১০-১২ সালের দিকে এই এলাকায় থ্রিডি সার্ভে হয়েছিল। ২০১৮ সালে আরেকটি সার্ভে হয়। সবকিছু মিলিয়ে এই খননের স্থান ও গভীরতা নির্ণয় করা হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত