অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বাহ্যিক চাপ
আব্দুর রহমান

গত বছর ব্যাপক সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতিগত বিপর্যয়ের পর অর্থনৈতিক অবসাদ এবং রাষ্ট্রের ওপর জনগণের ব্যাপক আস্থাহানির কারণে সম্ভবত ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন বছর হতে যাচ্ছে ২০২৬। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। বিক্ষোভে প্রাণহানি জনগণের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং বাহ্যিক চাপ—বিশেষত মার্কিন চাপ বর্তমান রেজিমের পতন ঘটাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।
চলমান বিক্ষোভকে স্রেফ অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং একাধিক সংকটের সমাপতনের অভ্যন্তরীণ প্রকাশ হিসেবে পাঠ করাই যথাযথ। বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিচ্ছিন্নতা, সামরিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক চাপ—এসবই এখন বর্তমান রেজিমের টিকে থাকার মূল সূত্র।
তেহরানের হয়তো ধারণা ছিল, জনগণ অর্থনৈতিকভাবে কষ্ট করলেও, নিরাপত্তা বাহিনীকে অর্থায়ন করে সক্রিয় রাখা যাবে। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানে বর্তমান অস্থিরতা সেই ধারণাকে পরীক্ষায় ফেলেছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন এখন আর কেবল ‘রাষ্ট্র বিক্ষোভ দমন করতে পারবে কি না’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং, প্রশ্নটি হলো—দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপে ইরানি রেজিম এত দিন যেভাবে জন-অসন্তোষ ‘দমন’ করেছে, সেই পন্থা আদৌ টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল-মার্কিন সামরিক আঘাতের মুখে পড়ে ইরান। লক্ষ্য ছিল, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো। এই সংঘাত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে না দিলেও এটি ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা, জনগণের নিরাপদ আশ্রয় ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ধারণাগুলোকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। যুদ্ধের পর রাষ্ট্রের টিকে থাকাকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু টিকে থাকা মানেই পুনরুদ্ধার নয়।
বাড়তি বিপদ হয়ে এসেছে মার্কিন হুমকি। চলমান বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান যদি বিক্ষোভকারীদের মারতে থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপের জন্য ‘প্রস্তুত হয়ে আছে’। এর পরপরই মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ট্রাম্পের এক ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে ট্রাম্পকে ‘মেক ইরান গ্রেট অ্যাগেইন বা ইরানকে আবার মহান করে তুলুন’ লেখা ক্যাপ ধরে থাকতে দেখা যায়। ক্যাপশনে গ্রাহাম লেখেন, ‘ঈশ্বর ইরানের সেই সাহসী মানুষদের সহায় হোন এবং রক্ষা করুন, যারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।’ এই ঘটনা ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নতুন বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালানোর পর ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের ইরানকে হুমকি দেওয়ায় প্রশ্ন জাগে, ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা আসলে কী? তবে, এখনো কোন সামরিক বিকল্প যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ভাবছে, তা অপ্রকাশ্য। অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, বাহ্যিক চাপ—বিশেষ করে, পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা, ইসরায়েলের তরফ থেকে সামরিক হুমকি, তেহরান সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষে’র দুর্বল হওয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্কের মাত্রায় পরিবর্তনসহ সব মিলিয়ে ইরানের সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এগুলো কোনোটিই অবশ্যম্ভাবীভাবে রেজিম পতনের ইঙ্গিত দেয় না। দেশটি অতীতেও সংকট সামলেছে—২০০৯ সালে এবং ২০২২ সালে। এ সময় মূলত তাদের কৌশল ছিল—দমন, বিরোধী শক্তির বিভাজন এবং কৌশলগত ধৈর্য।
তবে বর্তমান অস্থিরতার সঙ্গে অতীতের অস্থিরতাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। চলমান বিক্ষোভ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের ফল নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। দমন বিক্ষোভ থামাতে পারলেও অনির্দিষ্টকাল ধরে অর্থনৈতিক দুর্বলতা ঢাকতে পারে না। ১৯৭৮ সালে ইরানের তেল খাতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়নি, দমনব্যবস্থাও তখনই ভেঙে পড়েনি। ভেঙে পড়েছিল রাষ্ট্রের কার্যকরভাবে পরিচালিত হওয়ার সক্ষমতা—যখন রাজস্ব কমে যায় এবং প্রশাসনিক সংহতি ক্ষয় হতে থাকে।
এই তুলনাকে অতিরঞ্জিত করা ঠিক হবে না। তবে এটি এক পরিচিত ধারা তুলে ধরে, সাধারণত রেজিম দমনক্ষমতার চূড়ায় গিয়ে ভেঙে পড়ে না; তারা হোঁচট খায় তখনই, যখন রেজিমের বস্তুগত ভিত্তি এমনভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় যে, কর্তৃত্ব আর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইসলামি প্রজাতন্ত্র সেই পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ভুল করার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
রেজিমের ক্ষমতার কাঠামো যতই দুর্বল হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট—যতক্ষণ এক পক্ষ সশস্ত্র এবং অন্য পক্ষ নিরস্ত্র, ততক্ষণ কোনো রেজিম উৎখাত সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, ইরানিরা কি পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধে নামতে প্রস্তুত? যদি প্রস্তুত হয়, তবে কে বিদ্রোহের সমন্বয় করবে, কারা বিদ্রোহীদের অস্ত্র জোগাবে, আর যোগাযোগব্যবস্থায় সহায়তা করবে?
অবশ্য সীমান্তের দিকে থাকা কুর্দি অঞ্চলগুলো সীমান্তের ওপার থেকে সহজেই অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে, একইভাবে ইরানি আজারিরাও পারে। যদি তারা তা করতে চাইত তাহলে আগেই করত, কিন্তু করেনি। কেন করেনি? এখানেই আসল বিষয়টি। এখানেই বোঝা যায়, কেন ইরানে শাসন পরিবর্তন ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক কঠিন। বর্তমান রেজিম জানে, চরম সংকটে তারা জাতীয়তাবাদের তাস খেলতে পারবে। একটা বিষয় প্রায় নিশ্চিত, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ইরানি জাতি এক অলীক কল্পনা। ইরান জাতিগতভাবে বিভক্ত, যা সুযোগ পেলে ভেঙে পড়তে চায়। আর তাই সামান্যতম বিচ্ছিন্নতাবাদের ইঙ্গিত পেলেই, বর্তমান রেজিম চোখ বন্ধ করে ফার্সিভাষী ইরানিদের ভরসা করবে। কারণ, তারাই ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা তেহরান রেজিমের পক্ষে দাঁড়াবে।
আরেক জটিলতা হলো—বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর কাছে ইরানের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব। ইরান চীনের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশীদার। রাশিয়ার কাছে ইরান শাহেদ ড্রোন সরবরাহকারী, যা ইউক্রেনের রণাঙ্গনে মস্কোকে ব্যাপক সুবিধা দিচ্ছে। এর বাইরে, ইরান ককেশাসে কৌশলগত ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করছে—আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও চেচনিয়াকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন রেখে এবং মধ্য এশিয়ার ‘স্তান’ দেশগুলোকে স্থলবেষ্টিত করে রেখে। এর ফলে চীন ও রাশিয়া পুরো সিল্ক রোডে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাই নিজ স্বার্থেই রাশিয়া-চীন কেউই ইরানকে পশ্চিমা গণতন্ত্রপন্থী দেশে পরিণত হতে দেবে না। তারা দুর্বল শাসন মেনে নিতে পারে—যার অর্থ সস্তা তেল ও সস্তা শাহেদ ড্রোন—কিন্তু শাসন পরিবর্তন তারা সহ্য করবে না। বাস্তবে রাশিয়া, চীন ও বেলারুশের কার্গো বিমান জরুরি সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ইরানের বন্দর ও বিমানবন্দরে নামছে—এমন অপ্রমাণিত খবরও রয়েছে। সারকথা, ইরানের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় তাদের বিনিয়োগ এতটাই গভীর যে রেজিম পরিবর্তন তারা হতে দেবে না।
এর সঙ্গে রয়েছে আঞ্চলিক শক্তির জটিল টানাপোড়েন। এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক ইরানের আজারিদের আজারবাইজানের সঙ্গে যুক্ত করে মধ্য পুরোনো তুর্কি প্রভাববলয়ের ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন করতে চায়। সমস্যা হলো, ইরান ভেঙে পড়লে ইরানি কুর্দিরা তুরস্কের কুর্দিদের সঙ্গে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করবে, যা তুরস্ককেই ভাঙনের মুখে ফেলবে। বিদ্রূপাত্মক হলেও সত্য, ইসরায়েল উভয় দৃশ্যপটই সমর্থন করে—ইরান-তুরস্ক দুটি দেশই ভেঙে পড়ুক। কারণ, এতে হামাসকে সমর্থনকারী শক্তিগুলো দুর্বল হবে। এ কারণে ইসরায়েল আজারবাইজানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। এমনকি আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়েও সহায়তা করেছে। তবে এর চূড়ান্ত লক্ষ্য—ইরানে আজারি বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দেওয়া।
এ পর্যায়ে স্পষ্ট নয় যে ইরানে বর্তমান রেজিমের পতন হবে কি না, গৃহযুদ্ধ শুরু হবে কি না, দেশ অখণ্ড থাকবে কি না কিংবা রাশিয়া ও চীন সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কি না। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে পক্ষ নেবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের পরিণতিও এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

গত বছর ব্যাপক সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতিগত বিপর্যয়ের পর অর্থনৈতিক অবসাদ এবং রাষ্ট্রের ওপর জনগণের ব্যাপক আস্থাহানির কারণে সম্ভবত ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন বছর হতে যাচ্ছে ২০২৬। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। বিক্ষোভে প্রাণহানি জনগণের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং বাহ্যিক চাপ—বিশেষত মার্কিন চাপ বর্তমান রেজিমের পতন ঘটাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে।
চলমান বিক্ষোভকে স্রেফ অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং একাধিক সংকটের সমাপতনের অভ্যন্তরীণ প্রকাশ হিসেবে পাঠ করাই যথাযথ। বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিচ্ছিন্নতা, সামরিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক চাপ—এসবই এখন বর্তমান রেজিমের টিকে থাকার মূল সূত্র।
তেহরানের হয়তো ধারণা ছিল, জনগণ অর্থনৈতিকভাবে কষ্ট করলেও, নিরাপত্তা বাহিনীকে অর্থায়ন করে সক্রিয় রাখা যাবে। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানে বর্তমান অস্থিরতা সেই ধারণাকে পরীক্ষায় ফেলেছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন এখন আর কেবল ‘রাষ্ট্র বিক্ষোভ দমন করতে পারবে কি না’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং, প্রশ্নটি হলো—দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপে ইরানি রেজিম এত দিন যেভাবে জন-অসন্তোষ ‘দমন’ করেছে, সেই পন্থা আদৌ টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না।
গত বছরের জুনে ইসরায়েল-মার্কিন সামরিক আঘাতের মুখে পড়ে ইরান। লক্ষ্য ছিল, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো। এই সংঘাত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে না দিলেও এটি ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা, জনগণের নিরাপদ আশ্রয় ও উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ধারণাগুলোকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। যুদ্ধের পর রাষ্ট্রের টিকে থাকাকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু টিকে থাকা মানেই পুনরুদ্ধার নয়।
বাড়তি বিপদ হয়ে এসেছে মার্কিন হুমকি। চলমান বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান যদি বিক্ষোভকারীদের মারতে থাকে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপের জন্য ‘প্রস্তুত হয়ে আছে’। এর পরপরই মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ট্রাম্পের এক ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে ট্রাম্পকে ‘মেক ইরান গ্রেট অ্যাগেইন বা ইরানকে আবার মহান করে তুলুন’ লেখা ক্যাপ ধরে থাকতে দেখা যায়। ক্যাপশনে গ্রাহাম লেখেন, ‘ঈশ্বর ইরানের সেই সাহসী মানুষদের সহায় হোন এবং রক্ষা করুন, যারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।’ এই ঘটনা ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নতুন বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালানোর পর ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের ইরানকে হুমকি দেওয়ায় প্রশ্ন জাগে, ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা আসলে কী? তবে, এখনো কোন সামরিক বিকল্প যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ভাবছে, তা অপ্রকাশ্য। অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, বাহ্যিক চাপ—বিশেষ করে, পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা, ইসরায়েলের তরফ থেকে সামরিক হুমকি, তেহরান সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষে’র দুর্বল হওয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্কের মাত্রায় পরিবর্তনসহ সব মিলিয়ে ইরানের সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এগুলো কোনোটিই অবশ্যম্ভাবীভাবে রেজিম পতনের ইঙ্গিত দেয় না। দেশটি অতীতেও সংকট সামলেছে—২০০৯ সালে এবং ২০২২ সালে। এ সময় মূলত তাদের কৌশল ছিল—দমন, বিরোধী শক্তির বিভাজন এবং কৌশলগত ধৈর্য।
তবে বর্তমান অস্থিরতার সঙ্গে অতীতের অস্থিরতাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। চলমান বিক্ষোভ কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের ফল নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। দমন বিক্ষোভ থামাতে পারলেও অনির্দিষ্টকাল ধরে অর্থনৈতিক দুর্বলতা ঢাকতে পারে না। ১৯৭৮ সালে ইরানের তেল খাতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়নি, দমনব্যবস্থাও তখনই ভেঙে পড়েনি। ভেঙে পড়েছিল রাষ্ট্রের কার্যকরভাবে পরিচালিত হওয়ার সক্ষমতা—যখন রাজস্ব কমে যায় এবং প্রশাসনিক সংহতি ক্ষয় হতে থাকে।
এই তুলনাকে অতিরঞ্জিত করা ঠিক হবে না। তবে এটি এক পরিচিত ধারা তুলে ধরে, সাধারণত রেজিম দমনক্ষমতার চূড়ায় গিয়ে ভেঙে পড়ে না; তারা হোঁচট খায় তখনই, যখন রেজিমের বস্তুগত ভিত্তি এমনভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় যে, কর্তৃত্ব আর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইসলামি প্রজাতন্ত্র সেই পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ভুল করার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
রেজিমের ক্ষমতার কাঠামো যতই দুর্বল হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট—যতক্ষণ এক পক্ষ সশস্ত্র এবং অন্য পক্ষ নিরস্ত্র, ততক্ষণ কোনো রেজিম উৎখাত সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, ইরানিরা কি পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধে নামতে প্রস্তুত? যদি প্রস্তুত হয়, তবে কে বিদ্রোহের সমন্বয় করবে, কারা বিদ্রোহীদের অস্ত্র জোগাবে, আর যোগাযোগব্যবস্থায় সহায়তা করবে?
অবশ্য সীমান্তের দিকে থাকা কুর্দি অঞ্চলগুলো সীমান্তের ওপার থেকে সহজেই অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে, একইভাবে ইরানি আজারিরাও পারে। যদি তারা তা করতে চাইত তাহলে আগেই করত, কিন্তু করেনি। কেন করেনি? এখানেই আসল বিষয়টি। এখানেই বোঝা যায়, কেন ইরানে শাসন পরিবর্তন ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক কঠিন। বর্তমান রেজিম জানে, চরম সংকটে তারা জাতীয়তাবাদের তাস খেলতে পারবে। একটা বিষয় প্রায় নিশ্চিত, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ইরানি জাতি এক অলীক কল্পনা। ইরান জাতিগতভাবে বিভক্ত, যা সুযোগ পেলে ভেঙে পড়তে চায়। আর তাই সামান্যতম বিচ্ছিন্নতাবাদের ইঙ্গিত পেলেই, বর্তমান রেজিম চোখ বন্ধ করে ফার্সিভাষী ইরানিদের ভরসা করবে। কারণ, তারাই ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা তেহরান রেজিমের পক্ষে দাঁড়াবে।
আরেক জটিলতা হলো—বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর কাছে ইরানের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব। ইরান চীনের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশীদার। রাশিয়ার কাছে ইরান শাহেদ ড্রোন সরবরাহকারী, যা ইউক্রেনের রণাঙ্গনে মস্কোকে ব্যাপক সুবিধা দিচ্ছে। এর বাইরে, ইরান ককেশাসে কৌশলগত ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করছে—আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও চেচনিয়াকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন রেখে এবং মধ্য এশিয়ার ‘স্তান’ দেশগুলোকে স্থলবেষ্টিত করে রেখে। এর ফলে চীন ও রাশিয়া পুরো সিল্ক রোডে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাই নিজ স্বার্থেই রাশিয়া-চীন কেউই ইরানকে পশ্চিমা গণতন্ত্রপন্থী দেশে পরিণত হতে দেবে না। তারা দুর্বল শাসন মেনে নিতে পারে—যার অর্থ সস্তা তেল ও সস্তা শাহেদ ড্রোন—কিন্তু শাসন পরিবর্তন তারা সহ্য করবে না। বাস্তবে রাশিয়া, চীন ও বেলারুশের কার্গো বিমান জরুরি সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ইরানের বন্দর ও বিমানবন্দরে নামছে—এমন অপ্রমাণিত খবরও রয়েছে। সারকথা, ইরানের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় তাদের বিনিয়োগ এতটাই গভীর যে রেজিম পরিবর্তন তারা হতে দেবে না।
এর সঙ্গে রয়েছে আঞ্চলিক শক্তির জটিল টানাপোড়েন। এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক ইরানের আজারিদের আজারবাইজানের সঙ্গে যুক্ত করে মধ্য পুরোনো তুর্কি প্রভাববলয়ের ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন করতে চায়। সমস্যা হলো, ইরান ভেঙে পড়লে ইরানি কুর্দিরা তুরস্কের কুর্দিদের সঙ্গে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করবে, যা তুরস্ককেই ভাঙনের মুখে ফেলবে। বিদ্রূপাত্মক হলেও সত্য, ইসরায়েল উভয় দৃশ্যপটই সমর্থন করে—ইরান-তুরস্ক দুটি দেশই ভেঙে পড়ুক। কারণ, এতে হামাসকে সমর্থনকারী শক্তিগুলো দুর্বল হবে। এ কারণে ইসরায়েল আজারবাইজানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। এমনকি আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়েও সহায়তা করেছে। তবে এর চূড়ান্ত লক্ষ্য—ইরানে আজারি বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দেওয়া।
এ পর্যায়ে স্পষ্ট নয় যে ইরানে বর্তমান রেজিমের পতন হবে কি না, গৃহযুদ্ধ শুরু হবে কি না, দেশ অখণ্ড থাকবে কি না কিংবা রাশিয়া ও চীন সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কি না। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে পক্ষ নেবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের পরিণতিও এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

এটি একটি পরিত্যক্ত ভবন এবং এর আঙিনা ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। কিন্তু না, ভবনটি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর আঙিনা ময়লা ফেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ছবিটি যে কথাই বলুক না কেন, প্রকাশিত খবর বলছে, ওই ভবনটি একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের এবং স্থানান্তরিত নতুন ভবনে চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হলেও পুরোনো ভবনটিতে...
২ মিনিট আগে
নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে ‘মতান্তরের জেরে’ তরুণদের স্বপ্নের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সামনের সারির বেশ কয়েকজন নেতা। সেই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পদত্যাগ করলেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা। এ নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন এই দলটি থেকে...
৪ মিনিট আগে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশ একটা জটিল ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, খুন-রাহাজানি, রাজনৈতিক ও অ্যাকটিভিস্ট ব্যক্তিত্বদের নিরাপত্তাহীনতাসহ নানান সংকটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে যাবতীয়...
১৪ মিনিট আগে
রাজশাহীর নওহাটা কলেজ মোড়ের একটি রাস্তার কাজে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে মার খেয়েছেন একজন বিএনপি নেতা। তিনি কার কাছে চাঁদা চাইতে গিয়েছিলেন? স্থানীয় যুবদল কর্মীর কাছে। যুবদল কর্মী কি নিজেই ঠিকাদারির কাজটা পেয়েছিলেন? না। তিনি পাননি। মূল ঠিকাদার রাস্তার কাজের অংশ মাটি কাটার কাজটি দিয়েছিলেন এই যুবদল কর্মীকে।
১ দিন আগে