Ajker Patrika

তরুণ অফিসাররা র‍্যাব থেকে এমন চরিত্র নিয়ে ফিরত যেন পেশাদার খুনি: ইকবাল করিম ভূঁইয়া

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ৫৯
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

‘তরুণ অফিসারদের র‍্যাবে পাঠানো হতো। সেখানে কিছুদিন কাজ করে তাঁরা এমন চরিত্র নিয়ে ফিরত যেন পেশাদার খুনি। একই প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছিল জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও), নন-কমিশন্ড অফিসার (এনসিও) এবং সৈনিকদের মধ্যেও।’

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর বিষয়টি তুলে ধরেন।

আজ বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শুনানি হয়। পরে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য ১৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করে দেন ট্রাইব্যুনাল।

ইকবাল করিম ভূঁইয়া বিচারের সময় ট্রাইব্যুনালে এসেও সাক্ষ্য দেবেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সাবেক সেনাপ্রধান মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘‘আমি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রীকে জানাই, পুলিশের সঙ্গে মিশে কাজ করতে গিয়ে আমাদের অফিসাররা কীভাবে নৈতিক বিচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। আমি চেয়েছিলাম, তাঁদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনা হোক। প্রধানমন্ত্রী আমার কথায় সম্মতিসূচক ইঙ্গিত দেন। এমনকি এও বলেন, র‍্যাব জাতীয় রক্ষীবাহিনী থেকেও খারাপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বাস্তবে রূপ নেয়নি। যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দিত, তা ছিল র‍্যাবে প্রেষণে থাকা আমাদের অফিসারদের দ্বারা সাধারণ নাগরিক, রাজনৈতিক কর্মী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অপহরণ ও হত্যা।”’

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘ইকবাল করিম ভূঁইয়া তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে বলেন, ‘‘কয়েক দিন পর আমি কর্নেল (পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও এসএসএফ ডিজি) মুজিবকে (তখন র‍্যাবের এডিজি ছিলেন) ডেকে বলি, তিনি যেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াকে (জিয়াউল আহসান) নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং আর যেন কোনো ক্রসফায়ার না ঘটে। কর্নেল মুজিব এ ব্যাপারে আমাকে কথা দেন এবং বিদায় নেওয়ার সময় তাঁকে বেশ উদ্বিগ্ন মনে হয়। পরের কয়েক দিন পত্রপত্রিকা লক্ষ্য করলাম, নতুন কোনো ক্রসফায়ারের খবর নেই। এতে মানসিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। এরপর কর্নেল মুজিব একাধিকবার আমাকে এসে জানিয়েছিলেন, সত্যিই ক্রসফায়ারের ঘটনা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর আমি বুঝতে পারি ঘটনা ঠিকই ঘটছে, কিন্তু সেগুলোর খবর চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে, যখন কর্নেল মুজিব র‍্যাব ছেড়ে অন্যত্র বদলি হয়ে যান। এরপর র‍্যাবের নতুন ডিজি হিসেবে বেনজীর আহমেদ যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই বাহিনীটির এডিজি হিসেবে দায়িত্ব নেন জিয়া।”’

ইকবাল করিম ভূঁইয়া জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘আর্মি নিরাপত্তা ইউনিট (এএসইউ) সূত্রে খবর পাই, লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়া নিজের আবাসিক টাওয়ারে একজন গার্ড রেখেছেন, বাসায় অস্ত্র রেখেছেন এবং পুরো ফ্ল্যাটে সিসিটিভি বসিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বলা হয় গার্ড সরিয়ে নিতে, ক্যামেরাগুলো খুলে ফেলতে, বাসায় অস্ত্র রাখা থেকে বিরত থাকতে এবং অফিশিয়াল কোয়ার্টারে যে সামরিক নিয়মকানুন আছে, সেগুলো মেনে চলতে। পরবর্তীতে তাঁর আচরণ আরও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে। ডিরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (ডিএমআই) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে জিয়া কোনো কর্ণপাত করেননি। পরে আর্মি নিরাপত্তা ইউনিটের (এএসইউ) কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল তাঁকে আলাপের জন্য ডাকেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল আমাকে পরে জানান, জিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, তিনি এমন একজনের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাঁর মস্তিষ্ক পাথর বা ইটের টুকরো দিয়ে ঠাসা।’

সাবেক সেনাপ্রধান জবানবন্দিতে বলেন, ‘নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী, তাঁর কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল (এখন মেজর জেনারেল) মাহবুবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে জিয়া আমার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু করেন। আমি তাঁকে রেললাইনের পশ্চিম পাশের ক্যান্টনমেন্টে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি। তবে পূর্ব পাশের আবাসনটিতে তাঁকে থাকতে ছাড় দিয়েছিলাম। লজিস্টিকস এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বলি। জিয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব তখনই পুরোপুরি বুঝলেন, যখন মিলিটারি পুলিশ তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে সেনানিবাসের ভেতরে সিএমএইচে যাওয়ার পথে চেকপোস্টে আটকে দেয়। তখন এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুব আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন, একজন চাকরিরত অফিসারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে পড়ে কি না, নাকি এটা বিশেষ কোনো পদক্ষেপ। আমি বললাম, এটা ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। যদি তুমিও চিফের আদেশ অমান্য কর, তাহলে তোমাকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। পরদিন তিনি আবার ফোন করে জিয়ার ওপর থেকে এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেন। ওই ঘটনার পর জিয়া কিছুটা নিয়মের মধ্যে আসেন। বুঝতে পারেন, তিনি এখনো সেনাবাহিনীর অধীনে আছেন। তবু আমি তাঁকে আমার অফিসে ঢুকতে দিইনি। কারণ জানতাম, তিনি শুধু এসে নিজের কাজের স্বপক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে আমার সময় নষ্ট করবেন।’

ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসানের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও তাঁর বোন আইনজীবী নাজনীন নাহার। তাঁরা অভিযোগ থেকে জিয়াউল আহসানের অব্যাহতির আবেদন করেন।

মুনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরে সজলসহ চারজনকে হত্যা। এটাতে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এখানে সজলের মাকে সাক্ষী করা হয়েছে। তিনি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি। ১৫ বছর পর এই অভিযোগ আনা হয়েছে। সাবেক বিজিবি সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিকসহ অর্ধশত ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। নজরুল ইসলাম মল্লিকের লাশ পাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী মামলা করেছিলেন। সেটারও ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বাদী জবানবন্দি দিলেও সেখানে জিয়াউল আহসানের কথা বলেননি।

পরে জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘১৫ বছরে কেন হয়নি, সেটা সবাই জানে। ১৫ বছরে লাশ পাওয়া যেত নদ-নদীতে। আর জিয়ার বিরুদ্ধে ওই সময় চার্জশিট দিত কেউ? এ জন্যই জুলাই-আগস্ট হয়েছে। শেখ মুজিবের হত্যার বিচার তারা কত দিন পর করেছিল?’

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের জন্য ১৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। শুনানির সময় জিয়াউল আহসান কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করলে তা আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্রে সড়কপথে জয়শঙ্করের ৪০০ মাইলের রুদ্ধশ্বাস যাত্রা, নেপথ্য কাহিনি

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: মূল নকশার বাইরে চারটি র‍্যাম্প নির্মাণের ভাবনা

ওয়াশিংটন সফরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, যা আলোচনা হলো মার্কিনদের সঙ্গে

আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই: ট্রাম্প

পাবনা ১ ও ২ আসনের নির্বাচন স্থগিত

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত