Ajker Patrika

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানে ভর করে আইএমএফের ঋণ থেকে মুক্তি চায় পাকিস্তান

আব্দুর রহমান
আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৫৪
জেএফ–১৭ থান্ডারব্লক যুদ্ধবিমানের ব্যাপক বিক্রির কারণে পাকিস্তান আশা করছে, তাদের আর আইএমএফ–এর ঋণ লাগবে না। ছবি: সংগৃহীত
জেএফ–১৭ থান্ডারব্লক যুদ্ধবিমানের ব্যাপক বিক্রির কারণে পাকিস্তান আশা করছে, তাদের আর আইএমএফ–এর ঋণ লাগবে না। ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের জর্জরিত অর্থনীতির মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো এক চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি দাবি করেছেন, লিবিয়া, আজারবাইজান, বাংলাদেশ এবং নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ও সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমানের যে বিপুল অর্ডার আসছে, তা পাকিস্তানকে সম্ভবত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেইলআউট বা ঋণ সহায়তার হাত থেকে চিরতরে মুক্তি দেবে। এই দেশগুলো পাকিস্তানের তৈরি যুদ্ধবিমান কিনলে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার পাবে ইসলামাবাদ।

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের ক্যাপিটাল টক অনুষ্ঠানে দেশটির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হামিদ মীরকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আসিফ এই প্রতিরক্ষা রপ্তানির রূপান্তরমূলক সম্ভাবনার কথা জোর দিয়ে তুলে ধরেন।

বাস্তবে ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পের পারফরম্যান্সে ভালো জোয়ার লক্ষ করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো দেশটির সামরিক রপ্তানিকে এক নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে একাধিক দেশের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে। এই বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহকে সরকারি কর্মকর্তারা আইএমএফের বারবার নেওয়া ঋণ কর্মসূচির এক টেকসই বিকল্প হিসেবে দেখছেন। উল্লেখ্য, আইএমএফের ঋণগুলো প্রায়ই কঠোর শর্তাবলির সঙ্গে দেওয়া হয়, যা দেশের রাজস্ব সার্বভৌমত্বকে প্রভাবিত করে।

ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে বারবার আইএমএফের কাছে ধরনা দিয়েছে। এই আর্থিক সহায়তাগুলো সব সময়ই কঠোর শর্ত সাপেক্ষে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ছিল রাজস্ব সংস্কার, ভর্তুকি ছাঁটাই এবং আয় বৃদ্ধির নানা পদক্ষেপ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আইএমএফ পাকিস্তানের জন্য তাদের এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটির (ইএফএফ) আওতায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বেইলআউট অনুমোদন করে। এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে জলবায়ু সহনশীলতা তহবিলের আওতায় আরও ১.৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দেওয়া হয়, যার লক্ষ্য ছিল দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জলবায়ু মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু পাকিস্তান এখন আইএমএফের ঋণের দিকে বেশি একটা আগ্রহী নয়।

এই আশাবাদের কেন্দ্রে রয়েছে আজারবাইজানের সঙ্গে ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের একটি মাইলফলক চুক্তি। এই চুক্তির অধীনে আজারবাইজান ৪০টি জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি যুদ্ধবিমান কিনবে, যা পাকিস্তানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ একক রপ্তানি। চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি এই চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট বা বহুমুখী যুদ্ধবিমানের প্রধান ক্রেতা হিসেবে আজারবাইজান এখন নিজের আকাশসীমার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এই চুক্তি কেবল রাজস্বই বাড়াবে না, বরং ককেশাস অঞ্চলে পাকিস্তানের কৌশলগত অংশীদারত্বকেও আরও মজবুত করবে।

ঠিক একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলারের চুক্তিটি, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। এই প্যাকেজে ১৬টি জেএফ-১৭ জেটের পাশাপাশি ১২টি সুপার মুশাক ট্রেইনার এবং অন্যান্য সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে চূড়ান্ত হওয়া চুক্তিটি উন্নত যুদ্ধবিমানের জন্য আরব্য বাজারে পাকিস্তানের প্রবেশের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশটি আগের অনেক বাধা অতিক্রম করে প্রথাগত মিত্রদের বাইরেও রপ্তানি গন্তব্য বহুমুখী করতে সক্ষম হলো।

বাংলাদেশের সঙ্গেও আলোচনা বেশ গতি পেয়েছে। দুই দেশের বিমানবাহিনীর প্রধানদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জেএফ-১৭ সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ তার বিমানবহর আধুনিকায়ন করতে চায় এবং পাকিস্তানের প্রস্তাবটি দেশ দুটির প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিবরণ এখনো গোপন রাখা হয়েছে, তবে সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ঢাকা যুদ্ধবিমান এবং প্রশিক্ষণ বিমান—উভয় ক্ষেত্রেই আগ্রহী, যা পাকিস্তানের অর্ডারের তালিকায় বড় অঙ্কের জোগান দিতে পারে।

নাইজেরিয়া আগে থেকেই জেএফ-১৭ ব্যবহার করছে এবং তারা এখন আরও বিমান কেনার পাশাপাশি প্রাথমিক প্রশিক্ষণের জন্য সুপার মুশাক এয়ারক্র্যাফটের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। খাজা আসিফ যে ১০ বিলিয়ন ডলারের কথা বলেছেন, তার মধ্যে এসব চলমান আলোচনা এবং চূড়ান্ত হওয়া চুক্তিগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক প্রশিক্ষক বিমান হিসেবে সুপার মুশাকও জেএফ-১৭-এর সাফল্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি তুরস্কে ৫২টি ইউনিট সরবরাহ এবং জিম্বাবুয়ের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া অর্ডার এর বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে। সাশ্রয়ী ও কার্যকর হওয়ায় অনেক বিমানবাহিনীর কাছেই এটি পছন্দের তালিকায় প্রথমে থাকে, যা প্রায়ই বড় যুদ্ধবিমান কেনার পথ প্রশস্ত করে দেয়।

এদিকে রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, পাকিস্তান ও সৌদি আরব তাদের প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের সাবেক সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তর করার জন্য আলোচনা করছে। এটি এই দুই মুসলিম রাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতাকে আরও গভীর করবে। গত বছরই পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছিল। যখন পাকিস্তান চরম অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে এবং সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব পুনরায় সাজাচ্ছে, ঠিক তখনই এই আলোচনা প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনৈতিকভাবে এই রপ্তানি আয় পাকিস্তানের জন্য এমন এক সন্ধিক্ষণে এসেছে, যখন দেশটি লেনদেনের ভারসাম্যের জন্য আইএমএফের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিরক্ষা খাত থেকে আসা এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তবে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং অর্থ পরিশোধের ওপর। কারণ, কিছু ক্রেতা দেশের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত।

খাজা আসিফের এই মন্তব্যগুলো টেকসই অর্থনৈতিক কৌশল এবং দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে স্বনির্ভরতার ওপর নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এই রপ্তানি জোয়ারকে সম্ভব করেছে, যা দেশটিকে বিশ্ব অস্ত্রের বাজারে একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যে বাজারটি ঐতিহ্যগতভাবে বড় শক্তিগুলোর দখলে ছিল।

প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রতিযোগিতার মতো চ্যালেঞ্জগুলো এখনো থাকলেও ২০২৫-২০২৬ সালের এই গতিধারা একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই অর্ডারগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে তা সত্যিই আইএমএফের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সহায়ক হবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইসলামাবাদ টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত