আমাদের দেশে ছোট-বড় অনেক মাজার রয়েছে। সব মাজারেই আগত লোকজনের মধ্যে আপনি সেই বিশ্বাসটা দেখতে পাবেন। আমার নিজের সেই বিশ্বাস নেই, আমি যাই না। কিন্তু যাঁদের আছে, তাঁদের আপনি বাধা দেবেন কোন যুক্তিতে? অথচ সেই কাজটাই প্রায় দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে।

আমি একসময় মিরপুর এলাকায় থাকতাম। সেটা আমার পেশাগত জীবনের শুরুর দিকের কথা। তখন রিপোর্টার ছিলাম। বয়সও কম। যেকোনো বিষয় নিয়েই কৌতূহল, বিস্তারিত জানারও ইচ্ছা হতো। মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের শাহ আলীর মাজার নিয়ে একবার আগ্রহ জন্মাল। জানতে ইচ্ছা করল মাজারটি এত জমজমাট থাকে কেন? কারা যায় এখানে? কেন যায়? কী আছে সেখানে?
এক সকালে, এই ১০টা সাড়ে ১০টার দিকে চলে গেলাম। পুরো মাজার এলাকাটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এমন কিছুই চোখে পড়ল না, যা দেখে বিস্মিত হতে হয়। একটা কবর, সেটাকে কেন্দ্র করেই যত আয়োজন। শানবাঁধানো বেশ বড়সড় একটা চত্বর। অনেকে সেখানে শুয়ে আছে, ঘুমাচ্ছে। কয়েকজন গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমি আর আগ্রহ অনুভব করলাম না। চলে এলাম। আমার এক পরিচিত, যিনি ওই মাজারে নিয়মিত যান, তাঁকে বললাম আমার অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বললেন, রাতের বেলায়—বিশেষ করে বৃহস্পতিবার রাতে যান, পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন। দেখবেন কত জমজমাট থাকে, ভক্তরা জিকির করে, কেউবা ইবাদত করে। আবার অনেকে গানবাজনাও করে। অনেক লোক হয়, নানা কিসিমের লোক। কেউ যায় ভক্তি নিয়ে, কেউ যায় ধান্দা নিয়ে। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসে। কয়েক দিন পর এক বৃহস্পতিবার রাতে গেলাম। ওনার কথার মিল পেলাম। তার বাইরে আরও দুটো বিষয় চোখে লাগল। এক. অত রাতেও কিছু নারীর সাবলীল উপস্থিতি, আর গোল হয়ে বসে গাঁজা খাওয়ার ধুম। কেউ কেউ আবার গাঁজা কিনেও নিয়ে যাচ্ছিল।
একটা বড় মাজার দেখার প্রথম অভিজ্ঞতা আমার সেবারই হয়। এরপর মাজার নিয়ে আমার আরও কিছুদিন আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহের তোড়ে রাজস্থানের আজমিরে খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির মাজারে গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম মুম্বাইয়ের আরব সাগরের মধ্যে থাকা হাজি আলীর দরগাহে। হাজি আলীর মাজারে ভিড় কিছুটা কম, কিন্তু এটির ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থাপত্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। বিপরীত দিকে আজমিরে মঈনুদ্দীন চিশতির মাজারকে ঘিরে যে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চলে, সেটা দেখে হতাশ হয়েছি। দেশে কুষ্টিয়ায় লালন শাহের মাজারে বারদুয়েক গিয়েছি, একবার দিনে আর একবার রাতে। দিন ও রাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য, ভিন্ন পরিবেশ।
এত অভিজ্ঞতার বটম লাইন হচ্ছে, মাজার আমাকে টানে না। তবে যে কয়টি মাজার দেখেছি, একটা বিষয় আমাকে মুগ্ধ করেছে, সেটা হচ্ছে মাজারে যাঁরা যান, একটা ভক্তি নিয়ে যান। কিছু ধান্দাবাজ যে যান না, তা নয়। সে রকম ধান্দাবাজেরা তো মসজিদেও যান। কিন্তু মূলত যাঁরা যান, তাঁরা একটা প্রবল বিশ্বাস নিয়েই যান। তাঁদের চোখমুখে সে বিশ্বাস পড়া যায়। এ বিশ্বাসকে আপনি উপেক্ষা করবেন কীভাবে?
আমাদের দেশে ছোট-বড় অনেক মাজার রয়েছে। সব মাজারেই আগত লোকজনের মধ্যে আপনি সেই বিশ্বাসটা দেখতে পাবেন। আমার নিজের সেই বিশ্বাস নেই, আমি যাই না। কিন্তু যাঁদের আছে, তাঁদের আপনি বাধা দেবেন কোন যুক্তিতে? অথচ সেই কাজটাই প্রায় দুই বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে। ২০২৪-এর আগস্টে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই মাজারবিরোধীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫-এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে এক শর মতো মাজারে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুর করা হয়েছে। এই সময়টা ছিল ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল। একটা পরিবর্তন বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তারা মাজারের ওপর হামলাগুলোকে যেমন প্রতিরোধ করেনি, তেমনি তারা হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টাও করেনি। তারা এগুলো জাস্ট হতে দিয়েছে। কেবল মাজারই নয়, দেশজুড়ে থাকা বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা হয়েছে। বাউলগানের অনুষ্ঠানগুলোতে হামলা করে ভন্ডুল করে দেওয়া হয়েছে। তাহলে এই যে মাজারের ওপর হামলা, এটা কি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ?
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ছিল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি। এই প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ইউনূসের সরকার সে সময় অনেকটা নিঃশর্ত সমর্থন পেয়েছে। তবে কোন দল সরকারের কাছ থেকে বেশি আনুকূল্য পাচ্ছে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে একটা বিরোধ ছিল। বিএনপি বলত জামায়াত ও এনসিপি বেশি সুবিধা পাচ্ছে, বলতে গেলে তারাই চালাচ্ছে সরকার। আবার এর বিপরীতে জামায়াত বলত সরকার বিএনপিকে বেশি সুবিধা দিচ্ছে। বিএনপি যেভাবে চাইছে সেভাবেই নির্বাচনের আয়োজন করছে। তবে এই তিন দলের মধ্যে একটা বিষয়ে মিল ছিল, এরা কেউই অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো পদক্ষেপের সমালোচনা করত না। সে কারণেই মাজার বা মাজারপন্থীদের ওপর হামলায় সরকার যখন চুপ থাকত, তার কোনো প্রতিবাদ করত না এই দলগুলোর কেউই। আর আশকারা পেয়ে দুর্বৃত্তরা এই ভূখণ্ডে যে অপকর্ম কখনোই ঘটেনি, সেই আকামও করে দেখাল, কবর থেকে মৃতদেহ তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল। নিরুদ্বিগ্ন সরকার সেটাও চেয়ে চেয়ে দেখল, কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিল না।
মাজারে হামলার প্রতিটি ঘটনায় অবধারিতভাবে উচ্চারিত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতার কথা। জামায়াত অবশ্য প্রতিবারই সেসব অভিযোগকে অস্বীকার করেছে। কিন্তু তারপরও মানুষ জামায়াতের কথা ভেবেছে এই কারণে যে জামায়াত আদর্শিকভাবে এই মাজার সংস্কৃতির বিরোধিতা করে। ধর্মীয় বিচারেই তারা মাজারকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে সঠিক বলে মনে করে না। এ ছাড়া যত জায়গায় অঘটন ঘটেছে, স্থানীয় পর্যায়ে তার অনেক ক্ষেত্রেই জামায়াতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি দেখা গেছে। এমনকি ওই যে রাজবাড়ীতে কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানোর ঘটনা, সেখানেও। জামায়াতে ইসলামী একটা ক্যাডারভিত্তিক দল। কেন্দ্র থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত এই দলের নেতা-কর্মীরা একটা নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে চলে। চলতে হয়। হয়তো সে কারণেই কেন্দ্রীয় কমিটি যতই অস্বীকার করুক না কেন, সাধারণ মানুষ কিন্তু সেটা মেনে নিতে পারেনি।
অনাচার এখন দূর থেকে কেন্দ্রের দিকে আসছে। আগে দূরবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলে হয়েছে, এবার একেবারে খোদ রাজধানীতে। মিরপুরের শাহ আলী মাজারে যে হামলা হলো, এখানেও জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার কথা উচ্চারিত হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার বলেছেন, ‘রাত ১টার দিকে একদল লোক মাজারে গিয়ে মারধর করে। তারা জামায়াত-শিবিরের বলে জানতে পেরেছি!’ কেবল পুলিশের এমন কথাই নয়, বিষয়টিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের আচরণ ও বক্তব্য। এই এলাকার এমপি হচ্ছেন মীর আহমাদ বিন কাসেম। তিনি জামায়াতের লোক। আর সে কারণেই মানুষের মনে সন্দেহ আরও প্রবল হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এ কাজে তাঁর ইন্ধন থাকতে পারে। তিনি নিজে অবশ্য এমন ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে সেটা করতে গিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা আরও বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেছেন, ‘ঘটনাটি শোনার পর আমি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনারকে ফোন দিয়েছি। তিনি জানিয়েছেন, মাজারের সামনের গেটে ফেরি করে মাদক বিক্রি হয়। বৃহস্পতিবার রাতে এটা আরও বেড়ে যায়। এ জন্য পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছে। তবে আমার দলের নেতা-কর্মী কেউ সেখানে ছিল না। পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় কিছু লোকজন ছিল বলে শুনেছি।’
এমপি সাহেবের কথা থেকে মনে হতে পারে বৃহস্পতিবার রাতে আসলে যা কিছু ঘটেছে, সেটা পুলিশ ঘটিয়েছে। আর বিষয়টি পুলিশের খোদ উপকমিশনার তাঁকে জানিয়েছেন। পুলিশের যে কর্মকর্তার কথা তিনি বলেছেন, সেই উপকমিশনার মো. মোশতাক সরকার কিন্তু বলছেন উল্টো কথা। তিনি জানিয়েছেন বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার তাঁর সঙ্গে এমপি সাহেবের কোনো কথা হয়নি! তিনি আরও জানিয়েছেন, সেই রাতে মাজার এলাকায় পুলিশ কোনো অভিযানও চালায়নি! আমরা কার কথাকে সত্য বলে ধরব?
কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী, সে বিচারে না গিয়েও একটা প্রশ্ন কিন্তু আমরা করতেই পারি। ঘটনা ঘটার পর এমপি সাহেব কি সেখানে গিয়েছিলেন? শারীরিক বা মানসিকভাবে আহত মাজারভক্তদের কোনো অভয় বাণী দিয়েছেন? প্রতিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন? সন্দেহ নেই এই এমপি সাহেবের মাজারকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতি কোনোই আস্থা নেই। আস্থা না থাকাটা কোনো অন্যায় নয়। এসব কাজকর্ম ওনার ভালো না-ই লাগতে পারে। কিন্তু উনি এই এলাকার জনপ্রতিনিধি। এই এলাকার সব মানুষ, তা সে অন্য ধর্মের হোক, অন্য মাজহাবের হোক, তাদের বিশ্বাসজাত কর্মকাণ্ড অবাধে করতে পারার পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব কিন্তু ওনাকেই নিতে হবে। উনি কি সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন? এই প্রশ্নগুলো থাকবে। এই প্রশ্নগুলো যখন সরকারের কাছে, প্রশাসনের কাছে, সমাজপতিদের কাছে গুরুত্ব পাবে, কেবল তখনই আমরা আশা করতে পারব সুশাসনের।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

সম্প্রতি মাদ্রাসাগুলোতে শিশু ধর্ষণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ধর্মভিত্তিক এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের চরম গর্হিত অপরাধের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশুরা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মর্মে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ প্রচলিত আছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
শিক্ষকেরা যদি তাঁদের সম্মানের আসন অক্ষুণ্ন রাখতে না পারেন, তাহলে শিক্ষালয়ে সুশিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়। উচ্চশিক্ষা মানেই জ্ঞানের চর্চা, জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা। কোন বিশ্ববিদ্যালয় কতটা এগিয়ে গেল, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নতুন কী আবিষ্কার করলেন...
১৫ ঘণ্টা আগে
ড. রুশাদ ফরিদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তিনি ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। জাতীয় বাজেটে প্রত্যাশা এবং বিভিন্ন খাতে যথার্থ অর্থ বরাদ্দ ও তা যথাযথভাবে ব্যয় না হওয়ার কারণ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা...
২ দিন আগে
এবার যেভাবে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি দেখছি, কদম ফুল ফোটা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে বর্ষাকাল বুঝি এসে গেছে। এ বছর মে মাসে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মে মাসে দুই থেকে তিনটি তীব্র বজ্রঝড় ও এক-দুটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২ দিন আগে