
আবার কি পৃথিবী অশান্ত হয়ে উঠল? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবসভ্যতা অনেকবার এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে অন্য সময়ের চেয়ে উদ্বেগ কিছুটা বেশিই বলে মনে হচ্ছে। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া এবং গাজা হত্যাকাণ্ড, পৃথিবীব্যাপী বাজার দখলের রাজনীতি, বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতি এমনিতেই টালমাটাল অবস্থা। সবশেষ সেই আগুনে ঘি ঢেলে দিল মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত।
গত শনিবার ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে আবারও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। এরপর তিন দেশকে ঘিরে যে সংঘাত শুরু হলো, তা কেবল আঞ্চলিক কোনো সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকল না, বরং এর প্রভাব ক্রমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল। এখন দিন যত যাচ্ছে, যুদ্ধের তীব্রতাও যেন তত বাড়ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের ভেতরের সব খবর হয়তো বাইরের পৃথিবীর মানুষ সঠিকভাবে পাচ্ছে না। তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ, সামরিক গোপনীয়তা এবং প্রচারযুদ্ধ—সব মিলিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি অনেকটাই অস্পষ্ট। তবে যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, দিনে দিনে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। কেউ জানে না এ অবস্থা কবে, কোথায় গিয়ে শেষ হবে।
তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—এই যুদ্ধে আদৌ কেউ লাভবান হবে? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় বড় যুদ্ধ শেষে বিজয়ের ঘোষণা থাকলেও প্রকৃত অর্থে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধ মানেই মানুষের প্রাণহানি, অবকাঠামোর ধ্বংস, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল—যেই পক্ষই শক্তি প্রদর্শন করুক না কেন, এই সংঘাত থেকে এককভাবে কারও নিরঙ্কুশ বিজয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, যুদ্ধে দুই পক্ষেরই ক্ষতি সাধন হয়।
বরং যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই এর মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা দেশগুলোর জনগণ যেমন কষ্ট পাবে, তেমনি দূরের দেশগুলো, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। জ্বালানির দাম বাড়বে, পণ্যের মূল্য বাড়বে, বাণিজ্য ব্যাহত হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এসব দেশ সাধারণত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝড় সামাল দেওয়ার মতো শক্ত অবস্থানে থাকে না। ফলে বড় শক্তিগুলোর সংঘাতের প্রভাব তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে। নড়বড়ে অর্থনৈতিক কাঠামো, বিদেশি ঋণ, সীমিত সম্পদ, বেকার সমস্যাসহ নানা চাপে তারা দ্বিগুণ সংকটে পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা বিরাজমান। আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে। সেই সঙ্গে আমাদের জ্বালানি আমদানির বড় অংশও আসে এই অঞ্চল থেকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আমাদের অর্থনীতি, জ্বালানিনিরাপত্তা এবং শ্রমবাজার— সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এ সময়ে হরমুজ প্রণালি কতটা সক্রিয় থাকতে পারবে। কারণ, এটার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। আর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের জাহাজ চলাচল করে। যদি এই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বা নৌপরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, তাহলে তার অভিঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে তার তীব্র ধাক্কা লাগবে। ইতিমধ্যে খবর পাওয়া যাচ্ছে যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌপরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে বা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং জ্বালানি সংকটের ছায়া পড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন দেশে। ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব সব সময় বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। শিল্পোন্নত দেশগুলো হয়তো কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, কিন্তু উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর জন্য তা হয়ে ওঠে বড় সংকট।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইনসহ বহু দেশের লাখ লাখ মানুষ জীবিকার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করে। এসব দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে যদি মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় অথবা নিরাপত্তাজনিত কারণে বিদেশি কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে এসব দেশের ওপর।
হাজার হাজার শ্রমিক ও পেশাজীবী হঠাৎ করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন। অনেকেই হয়তো দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন। তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারগুলো বিপদে পড়বে, আর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও চাপ তৈরি হবে। বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে প্রবাসী আয়ের ওপর অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে, সেখানে এই সংকট গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
একটা সময় মনে হয়েছিল, শীতল যুদ্ধের অবসানের পর পৃথিবী হয়তো তুলনামূলক শান্তির দিকে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে সংঘাতের নতুন রূপ দেখা দেয়। এখন আবার সেই শক্তির রাজনীতি সামনে এসেছে। বড় শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার নিয়ে ব্যস্ত, আর তার মাঝখানে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বনেতাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের উত্তেজনা যত দ্রুত সম্ভব কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরে আসা এখন সময়ের দাবি। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যুদ্ধের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান খুব কমই আসে। বরং সংলাপ, সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমেই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ তৈরি হয়।
বিশ্ব এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন একটির পর একটি সংকট মানবসভ্যতাকে চাপে ফেলছে—মহামারি, অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট। এর মধ্যে আবার বড় আকারের সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই বাস্তবতায় যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়া মানবতার জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
আমরা আশা করি, বিশ্বনেতাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হবে। শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা থেকে সরে এসে তাঁরা সংলাপ ও কূটনীতির পথে ফিরবেন। উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
কারণ, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের আগুনে কেউ সত্যিকার অর্থে জয়ী হয় না। বরং পরাজিত হয় মানবতা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশ্ব অর্থনীতি, আর বিপর্যস্ত হয় সাধারণ মানুষের জীবন। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—যুদ্ধ থামানো, উত্তেজনা কমানো এবং শান্তির পথে ফিরে আসা।
তবে ইতিহাস আরেকটা কথাও বলে—বিশ্ব যতবার বড় সংকটে পড়েছে, ততবারই শেষ পর্যন্ত মানুষ শান্তির পথ খুঁজেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় না, কারণ তার মূল্য খুব বেশি। অর্থনীতি, মানবিকতা, সভ্যতা—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত শান্তির দিকে মানুষকে ঠেলে দেয়।
তাই পৃথিবী আজ অশান্ত মনে হলেও আশার জায়গাটা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কূটনীতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মানুষের শান্তির আকাঙ্ক্ষা—এই তিন শক্তি অনেক সময় যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছে। হয়তো এবারেও তাই হবে। আমাদের প্রত্যাশা সেটাই হোক, দ্রুত থেমে যাক যুদ্ধের নামে মানুষের প্রাণহানির অশুভ খেলা। মানবতার জয় হোক।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, আজকের পত্রিকা

ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি নিজ দেশের সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে চীন সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশে নতুন সরকার আসার পর এটাই দুই দেশের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক।
৪ ঘণ্টা আগে
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। তারেক রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন, তখন দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর। আওয়ামী রেজিমের ব্যাংক লুটপাটের ধকল সামলে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি ১০টি ব্যাংক। ৫ আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সীমার অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে...
৫ ঘণ্টা আগে
কাউকে না জেনে না বুঝে কোনো ‘ট্যাগ’ দেওয়ার আগে ভাবুন—এক ট্যাগেই ঘটে যেতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা। যেমনটা হয়েছে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীকে নির্দিষ্ট ট্যাগ দিয়ে তাঁকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহযোগী অধ্যাপিকাকে হত্যা...
৫ ঘণ্টা আগে
রাজনীতির ময়দানটাকে কি হত্যার মাঠে পরিণত করার বাসনা মনে পুষছেন কেউ কেউ? এই তো রংপুরের এক যুবদল নেতা যখন কেব্ল প্রতিষ্ঠানের একজন জিএমকে ফোন করে বউ-বাচ্চাসহ গুলি করে আসার হুমকি দেন, তখন বুঝতে হয় এই রাজনৈতিক ধারা থেকে নৈতিকতাই উধাও হয়ে গেছে। ইউনূস সরকারের শাসনের সময় মবতন্ত্র-আতঙ্ক জাগাত...
১ দিন আগে