Ajker Patrika

কোনো কথার ‘অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাই রে’

সরকার সরাসরি স্বীকার না করলেও নাগরিকদের বুঝতে বাকি থাকে না অর্থ ও জ্বালানিসংকটের এই কঠিন সময়ে কেন সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এত উড়োজাহাজ কিনতে হচ্ছে। শুধু উড়োজাহাজ তো নয়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারের চেয়ে চড়া দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে হচ্ছে গম, এলএনজিসহ বিভিন্ন সামগ্রী।

আজাদুর রহমান চন্দন
কোনো কথার ‘অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাই রে’

চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী কথিত নতুন বাংলাদেশের নামে যে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’র সূচনা হয়েছিল, সে কাসুন্দি আর নাইবা ঘাঁটলাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালিয়ানাবিরোধী সেই ধারা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশায় বিএনপিকে পছন্দ না করা অনেক নাগরিকও যে বিগত সাধারণ নির্বাচনে দলটিকে ব্যাপক হারে ভোট দিয়ে জিতিয়েছেন, সে কথা সর্বজন স্বীকৃত। তবে নির্বাচিত এই সরকারের আমলেও নেতা-মন্ত্রীদের কথায় বা কাজে প্রকৃত বাংলাদেশপন্থী মানুষের আশান্বিত হওয়ার অবকাশ কম। কারণ অন্তর্বর্তী জমানার মব বা দঙ্গলবাজির অবসান দেখা যাচ্ছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন রূপে তা কায়েম আছে। অন্তর্বর্তী যুগে দিনদুপুরে মুখ না ঢেকে মব সৃষ্টি করে বাউল বাড়ি, মাজার, ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটত হরহামেশা। এখন কিছু ক্ষেত্রে মুখ ঢেকে আবার কখনো আড়াল ছাড়াই নানা রকম তাণ্ডব চালানো হচ্ছে। মাসখানেক আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খোদ জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রীতিমতো পণ্ড করে দিয়েছে স্থানীয় মাদ্রাসার একদল শিক্ষার্থী। গত ১৮ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকায় পুলিশ লাইনস মাঠের ড্রিল শেডে অনুষ্ঠান চলাকালে মাদ্রাসার একদল শিক্ষার্থী তাতে বাধা দেয়। এর জের ধরে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও বাধে। এতে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়। বিভিন্ন স্থানে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার খবর প্রায়ই দেখা যাচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ শুধু দুর্বৃত্তদের হামলার শিকারই হয়নি, রীতিমতো ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে সেবাকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দিয়ে আসছে প্রায় ৫০ বছর। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে মুখোশধারী ও সশস্ত্র ২০০-২৫০ দুর্বৃত্ত সেবাকেন্দ্রটিতে হামলা চালায়। তারা কেন্দ্রের নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে এক্সকাভেটরসহ ভারী যন্ত্রপাতি এনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবনগুলো সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলাকারীরা কেন্দ্রের মূল্যবান চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ, ভ্যাকসিন, কম্পিউটার ও টাকা লুট করে নিয়ে যায়। ভাঙচুর শেষে জায়গাটিতে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি ব্যানার ও সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হামলাকারীরা প্রথমে প্রতিষ্ঠানের পূর্ব পাশের প্রায় ২৮ ফুট দীর্ঘ ও ১৫ ফুট প্রস্থের একটি সেমিপাকা ঘর ভেকু দিয়ে ভেঙে ফেলে। এরপর পরিবার-পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার আরেকটি সেমিপাকা ঘর ও আসবাব ভাঙচুর করে। তাণ্ডব চালিয়ে ক্লিনিক ইনচার্জ, চিকিৎসক ও ডেপুটি ক্লিনিক ইনচার্জের ব্যবহৃত প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ ও ১৭ ফুট প্রস্থের সেমিপাকা ঘর এবং আসবাব ও চিকিৎসাসামগ্রী ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়া ভাঙচুর করা হয় প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ এবং ৪০ ফুট চওড়াবিশিষ্ট রেজিস্ট্রেশন শাখা। সর্বশেষে আলট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরির পাকা ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, ফ্রিজ, এসি, বিপুল ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী। স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে আসছিল বলে অভিযোগ আছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার সাংবাদিকদের বলেছেন, পাঁচ-ছয় বছর ধরে সমমনা সমবায় সমিতির নামে কিছু লোক জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে আসছিল। জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এ হামলা করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপির নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্বে আছেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।

এটি তো হলো ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের দখলদারির নমুনা। এবার আসা যাক জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দখলদারি ও দমন-পীড়নের ঘটনায়। রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয়ে শনিবার বিকেলে অভিযান চালিয়ে ২৮৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এই অভিযানে পুলিশের পাশাপাশি তৎপর দেখা গেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদেরও। ঘটনাস্থলে থাকা এক সাংবাদিক নেতাসহ জাসদ নেতা-কর্মীদের আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে গভীর রাতে অবশ্য বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে জাসদ নেতা-কর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হবে। এর আগে বিকেলে অভিযানের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের সদস্যরা জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হয়েছেন, এমন খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। তবে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের জড়ো হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে জাসদ। জাসদের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাসদ কার্যালয়ে আয়োজিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা ছিল পূর্বনির্ধারিত। জাসদের পক্ষ থেকে ডিএমপির কমিশনার, মতিঝিল জোনের ডিসি, পল্টন থানার ওসিকে অবগত করেই প্রতিনিধি সভার আয়োজন করা হয়। জাসদ নিষিদ্ধ দল নয়। জাসদের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই। জাসদের এই কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভায় অংশগ্রহণকারী সবাই জাসদের নেতা-সদস্য। এসব ঘটনা দেখে কোনটা ফ্যাসিবাদ আর কোনটা গণতন্ত্র, তা বোঝা মুশকিল।

অন্তর্বর্তী জমানা থেকে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সমমনা দলগুলোর নেতা-কর্মীরা বলে আসছেন, বাংলাদেশ এখন আর কারও তাঁবেদার নয়। সবশেষে গত শুক্রবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রীতিমতো হুংকার দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা রুখে দেওয়া হবে। জাতীয়তাবাদী ওলামা দল আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে বিএনপির এই পোড় খাওয়া নেতা বলেছেন, যারা বাংলাদেশকে উপনিবেশে পরিণত করতে কিংবা একটি তাঁবেদার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী ওলামা দল ও বিএনপি রাজপথে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। রিজভী যেদিন এই হুংকার ছেড়েছেন সেদিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির খবর। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকালে সেখানে এই চুক্তি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। এর আগে এপ্রিলেও বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

সরকার সরাসরি স্বীকার না করলেও নাগরিকদের বুঝতে বাকি থাকে না অর্থ ও জ্বালানিসংকটের এই কঠিন সময়ে কেন সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এত উড়োজাহাজ কিনতে হচ্ছে। শুধু উড়োজাহাজ তো নয়, প্রতিযোগিতামূলক বাজারের চেয়ে চড়া দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে হচ্ছে গম, এলএনজিসহ বিভিন্ন সামগ্রী। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) কারণেই এসব কিনতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর একতরফাভাবে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন কিছুই করতে হবে না। এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল শুল্কছাড়, মার্কিন শিল্পপণ্য রপ্তানিতে অশুল্ক বাধা অপসারণ এবং কৃষি ও জৈবপ্রযুক্তি পণ্যের অশুল্ক বাধা অপসারণসহ যুক্তরাষ্ট্রকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মতো সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়তি খরচে বাধ্যতামূলক পণ্য আমদানি, দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি ও সুরক্ষা দিতে বাধা, তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি ও বাণিজ্যে বাধার মাধ্যমে দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা-জালে জড়ানো হয়েছে আষ্টেপৃষ্ঠে। এরপরও বলা যায়, বাংলাদেশ তো আর কারও তাঁবেদার নয়! চোখে চোখ রেখে কথা বলার সামর্থ্য অর্জন করেছে! সরকার অন্যান্য দেশ থেকে যে দামে গম আমদানি করে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনতে সে তুলনায় প্রতি টনে ২৫ থেকে ৩০ মার্কিন ডলার বেশি খরচ হয়। এর ফলে এক মাসের ব্যবধানে দেশে আটা-ময়দার দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৫-২০ টাকা। সামনে আরও কত কী যে আছে!

সব দেখে-শুনে সারাক্ষণ মাথায় শুধু সত্যজিৎ রায়ের কথাগুলোই ঘুরেফিরে আসে। সত্যজিতের মতো সৃজনশীলতা দূরের কথা, তার ছিটেফোঁটাও থাকলে তবু না হয় দুই-একটা নতুন পদ মাথায় আসত। কিন্তু মাথায় তো তেমন কিছু নেই। তাই কোন দেশের গোলামি করলে তাঁবেদারি হয় আর কোন দেশেরটা হয় না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সত্যজিৎ রায়ের কথা-সুরের প্রতিধ্বনিই শুধু বাজে—‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়/ও ভাই রে, ও ভাই/কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়/আমি যেই দিকেতে চাই/দেখে অবাক বনে যাই/আমি অর্থ কোনো খুঁজে নাহি পাই রে, ও ভাই...।’

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত