Ajker Patrika

৯২ সেলাই

সম্পাদকীয়
৯২ সেলাই

ঠাকুরগাঁওয়ের সালেকিন ফেরদৌস ভাবতেই পারেননি, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বখাটেদের দ্বারা আক্রান্ত হবেন। আরও ভাবতে পারেননি যে ৫০ হাজার টাকা না পেয়ে এই বখাটেরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং ধারালো ব্লেডের উপর্যুপরি আঘাতে তাঁর হাত ক্ষতবিক্ষত হবে। অবস্থা কতটা আশঙ্কাজনক, তা বুঝতে হলে জানতে হবে, সালেকিন ফেরদৌসের হাতে মোট ৯২টি সেলাই দিতে হয়েছে।

কবিরা দ্রষ্টা, তাই তাঁরা লিখতে পারেন, ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।’ কিংবা লিখতে পারেন, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।’ ঘটনার বিবরণ পড়লে মনে হয়, সত্যিই অদ্ভুত এক আঁধার এসেছে এই দেশে। সত্যিই উদ্ভট উটের পিঠেই উঠে বসেছে স্বদেশ। নইলে কেন এলাকার কিছু বখাটে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দেওয়ার দাবি জানাবে? বখাটেদের নজরে রাখার দায়িত্ব যাদের, তারা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে? চাঁদা চাইছে তারা অনেক দিন ধরেই। চাঁদা না দিলে সন্তানের ক্ষতি করারও হুমকি দিয়েছে। অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে তারা সালেকিন ফেরদৌসকে আক্রমণ করে বসেছে।

এখানে কয়েকটি ব্যাপার দেখার আছে। প্রথমত, দিনের পর দিন বখাটেরা চাঁদা চাইবার মতো সাহস দেখাতে পেরেছে। অর্থাৎ, এরা জানত, চাঁদা চাওয়ার মতো গর্হিত কাজ করলেও কেউ তাদের বাধা দেবে না। দ্বিতীয়ত, প্রকাশ্যে প্রেসক্লাবের মতো জনবহুল এলাকায় তারা অস্ত্র বের করতে পারে, অর্থাৎ কাউকেই তারা ভয় করে না। অবশ্য আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে অস্ত্র উঁচিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তারা পালিয়ে যায়। তৃতীয়ত, আহতের বোন মামলা করার পরও আসামিরা দ্রুত ধরা পড়েনি। পুলিশ যদি দ্রুত এদের গ্রেপ্তার করতে না পারে, তাহলে পুরো সালেকিন পরিবারই অরক্ষিত অবস্থায় থাকবে।

ধরা যাক, এই বখাটেরা কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে রইল। এরপর কি পুলিশ ভুলে যাবে এদের অস্তিত্বের কথা? কিংবা আইনশৃঙ্খলাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এরা আবার ফিরে আসবে পাড়ায়, আবার কারও কাছে চাঁদার আবদার করবে? আবার খুনোখুনি করার হুমকি দেবে? কিছুই

বলা যায় না। এলাকার নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর না থাকে, তাহলে এই বখাটেদের দিয়েই পূর্ণ হয়ে যাবে দেশ। তখন বখাটের সংখ্যা এত বাড়বে যে দেশের যেকোনো নাগরিকই ‘চাহিবামাত্র’ চাঁদা দিতে ‘বাধ্য থাকিবেন’। সতর্ক না হলে সে রকম দিনও আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের হারলেম এলাকায় গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে এ রকম বখাটেদের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং অপরাধ একে অপরের হাত ধরে বেড়ে উঠেছিল তখন। ডাকাতিও বাড়ছিল। সেই অপরাধপ্রবণ হারলেমে কীভাবে আইনের শাসন ফিরে এল, তা জানার চেষ্টা করতে পারে আমাদের পুলিশ। ৯২টি সেলাই নিয়ে যে অসহায় ভদ্রলোক পড়ে আছেন হাসপাতালে, তিনি উপযুক্ত চিকিৎসার পাশাপাশি নিরাপত্তাও যেন পান, আমরা সেই কামনা করি। অন্য আর কেউ যেন ৯২টি সেলাইয়ের যন্ত্রণা ভোগ না করেন, সেটাও আমাদের চাওয়া।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত