Ajker Patrika

অভিযানের নামে ৪০ ভরি সোনা ছিনতাই, কনস্টেবল জাকিরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু

রিমন রহমান, রাজশাহী
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ৪৮
অভিযানের নামে ৪০ ভরি সোনা ছিনতাই, কনস্টেবল জাকিরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু
অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে কর্মরত থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযানের নামে প্রায় ৪০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর তিনি এক মাসের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি চলে যান। ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগদান করলে তাঁকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানও শুরু করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ।

অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবলের জাকির হোসেনের বাড়ি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামে। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার্স মেসে কর্মরত ছিলেন।

গত ৮ আগস্ট বেলা ৩টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে মরা পাগলা নদীর কালীনগর ব্রিজের পাশে স্বর্ণ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি ঘটে। গলিত অবস্থায় ৪০ ভরি স্বর্ণ রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কাছে পাঠিয়েছিলেন নিঝুম নামের এক ব্যবসায়ী।

জানা গেছে, রাজশাহী থেকে স্বর্ণগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে যান নিঝুমেরই দুলাভাই মোহাম্মদ আলী। তাঁর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চকআলমপুরে। মোহাম্মদ আলীর ছেলে মো. নয়নের বন্ধু কনস্টেবল জাকির হোসেন। মোহাম্মদ আলী স্বর্ণের চালানটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওই ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়ার দুই মিনিটের মধ্যে সেখানে হাজির হন জাকির। পরে পুলিশ পরিচয়ে তিনি তাঁর কাছ থেকে ওই স্বর্ণ নিয়ে চলে যান।

ঘটনার পর ওই ব্যবসায়ী বিষয়টি নিঝুমকে জানান। নিঝুমের অভিযোগ, তাঁর দুলাভাই মোহাম্মদ আলী ও ভাগনে মো. নয়ন পুলিশ কনস্টেবল জাকিরকে ব্যবহার করেছেন। জাকির অভিযানের নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৪০ ভরি স্বর্ণ হাতিয়ে তিনজনে ভাগ-বাঁটোয়ারা করেছেন।

নিঝুমের ভাইয়ের রাজশাহীতে জুয়েলার্সের দোকান আছে। ব্যবসায়ীদের অর্ডার অনুযায়ী সেখান থেকে স্বর্ণ বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এমন একটি চালান নিঝুম চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাঠিয়েছিলেন। ৪০ ভরি স্বর্ণ পুলিশ সদস্য হাতিয়ে নেওয়ায় তিনি একেবারে পথে বসেছেন। কিন্তু এই ঘটনায় পুলিশের পাশাপাশি আপন দুলাভাই ও ভাগনে জড়িত থাকায় মামলা করেননি বলেও জানিয়েছেন নিঝুম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর এক মাসের ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যান কনস্টেবল জাকির। ছুটি শেষে তিনি সদর পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার্স মেসে যোগদানও করেন। এরপর তাঁকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। আর অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য জেলা পুলিশের সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াসির আরাফাতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করেছেন।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী নিঝুম জানান, ৮ আগস্ট মোহাম্মদ আলীর হাত দিয়েই ৪০ ভরি স্বর্ণ চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাঠান তিনি। মোহাম্মদ আলী ও তাঁর ছেলে নয়ন এই স্বর্ণ আত্মসাৎ করতে কনস্টেবল জাকিরকে ঠিক করেছিলেন। মোহাম্মদ আলী স্বর্ণের চালানটি হস্তান্তরের পরপরই সাদাপোশাকে পুলিশ কনস্টেবল জাকির আরেকজনকে নিয়ে গিয়ে ওই স্বর্ণ হাতিয়ে নেন।

এ ঘটনার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে কালীনগর ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানের ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন নিঝুম। এতে দেখা যায়, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে জাকির মোটরসাইকেলে করে আরেকজনকে নিয়ে ব্রিজের দিকে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেলে জাকিরের সঙ্গে অপরজন কে ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কনস্টেবল জাকির হোসেন সেদিন কালীনগর ব্রিজের দিকে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে কি উদ্দেশে গিয়েছিলেন তা স্পষ্ট করেননি। স্বর্ণ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘নিঝুম কারণ ছাড়াই এ ঘটনায় আমাকে জড়াচ্ছেন। আমি জড়িত নই। বিষয়টি তাদের নিজেদের। ওদের মীমাংসার জন্য বসারও কথা ছিল। পরে তারা বসেনি।’

তবে কনস্টেবল জাকির, নয়ন ও তাঁর বাবা মোহাম্মদ আলীর মোবাইলের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘটনার আগে-পরে নয়ন ও তাঁর বাবার সঙ্গে অসংখ্যবার মোবাইলে কথোপকথন হয়েছে জাকিরের। এর মধ্যে ঘটনার দুই দিন আগে ৬ আগস্ট জাকির তাঁর মোবাইল নম্বর থেকে নয়নের সঙ্গে ১০ বার কথা বলেছেন। ৭ আগস্ট একই নম্বরে জাকির ও নয়নের ২৫ বার কথা হয়। সেদিন নয়নের বাবার নম্বরেও কথা বলেছেন ৭ বার। ঘটনার দিন ৮ আগস্ট জাকির ও নয়নের মধ্যে মোবাইলে কথা হয়েছে ১০ বার। একই দিন মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে জাকিরের কথা হয় ১১ বার। মোহাম্মদ আলী স্বর্ণের চালানটি পৌঁছে দেওয়ার দিন কনস্টেবল জাকিরের সঙ্গে অনেকবার কথা বলেছেন। তবে ঘটনার পরদিন নয়ন কিংবা তাঁর বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে জাকিরের কোনো কথা হয়নি।

ফোনকলের লোকেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বর্ণ নিয়ে মোহাম্মদ আলী যখন কালীনগর ব্রিজের আশপাশে ছিলেন, তখন ওই এলাকাতে জাকিরও ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকবার মুঠোফোনে কথাও হয়। এই কথোপকথনের ব্যাপারে জানতে চাইলে কনস্টেবল জাকির হোসেন শুধু নয়নের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি দাবি করে বলেন, অনেক দিন ধরেই নয়ন তাঁর পরিচিত। তাঁর সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হয়, দেখা হয়। তবে নয়নের বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে মোবাইলে এতবার কী কথা হয়েছে সে প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।

স্বর্ণের চালানটি চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন নয়নের বাবা মোহাম্মদ আলী। আর তাঁর ছেলে নয়ন বলেন, ‘আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটা লাইব্রেরি চালাই, রাজশাহীতে পড়াশোনা করি। বেশির ভাগ সময় রাজশাহীতেই থাকি। আমি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না। মামা কেন আমার কথা বলছে জানি না।’

জেলা পুলিশের সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াসির আরাফাত জানান, অভিযুক্ত কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ১০ দিনের মধ্যে তিনি পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেবেন। ইতিমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছেন। এখন সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করছেন। অভিযোগ সত্য হলে জাকিরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত