Ajker Patrika

কৃষিও গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎস, করণীয় কী

মৃত্যুঞ্জয় রায় 
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮: ১৪
কৃষিও গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎস, করণীয় কী
বাংলাদেশে শুধু ধানখেত থেকে নির্গত হয় কৃষিক্ষেত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস। ছবি: লেখক

এখন আর কোনো সন্দেহ নেই যে পৃথিবীর জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। গত এক মাসে যদি আমরা পৃথিবীর দিকে তাকাই তাহলে তা বুঝতে মোটেই অসুবিধা হবে না। এক মাস ধরে বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে হিমবাহের ধসজনিত ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, প্রচণ্ড ঝড় ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। গত মাসে সংঘটিত নেপাল-তিব্বতের হিমবাহের ধস ও আকস্মিক বন্যায় অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছে হাজারো মানুষ, ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট ও বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। মৌসুমি ঝড় ও প্রবল বর্ষণের ফলে জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চলের ২০ লাখের বেশি বাসিন্দাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বন্যা দেখা দেয়। অন্যদিকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ইন্দোনেশিয়ায় মাউন্ট আনাক ক্রাকাতাউ আগ্নেয়গিরিতে একটানা ও বিপর্যয়কর অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। এর ফলে নির্গত ঘন ছাইয়ের কারণে ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর ও স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বিমান চলাচল ও যাতায়াতব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

এগুলো বড় বড় ঘটনার কয়েকটি। বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্নভাবে আরও ছোট ছোট অনেক ঘটনা ঘটছে। প্রায় সব দেশেই তুলনামূলকভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে, সময়-অসময় বৃষ্টি হচ্ছে, ঝড় হচ্ছে। এতে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। গণমাধ্যমে খবর এসেছে যে আগামী বছর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট বর্তমান ‘এল নিনো’ আমাদের জীবদ্দশায় দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। এ মর্মে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্যের মেট অফিস তথা আবহাওয়া দপ্তর। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে এটি গত ৫০০ থেকে ১০০০ বছরের মধ্যে তীব্রতম আকার ধারণ করতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। বর্তমান বাস্তবতায় তাই আমাদের দ্রুত কিছু পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর এই খামখেয়ালিপনার পেছনের শক্তিশালী কারণটি হলো বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। তাপমাত্রা বাড়ছে গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ার কারণে। কিন্তু কেন তা বাড়ছে? তার জন্য আমরা কতটুকু দায়ী, আর প্রকৃতি কতটুকু দায়ী? গত মাসে ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইফাদ কর্তৃক আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীলতা ও স্বল্প-নির্গমন কৃষিব্যবস্থার লক্ষ্যে মিথেন নিঃসরণ হ্রাস ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে মূল প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ ও নেপালের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হুমনাথ ভান্ডারি জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষি কতটা সংকট তৈরি করছে, সেসব সংকটকে কমানোর জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেগুলো করতে আমাদের কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে আমরা কৃষিক্ষেত্র থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে মিথেন কতটুকু কমাতে পারি ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করেন।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ও বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বায়ুমণ্ডলে যেসব গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবী থেকে নিঃসরিত হয়ে মিশছে, সেগুলোর মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও মিথেন গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎস হলো বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও শক্তি উৎপাদন, যা থেকে বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ প্রায় ৩১ শতাংশ। দ্বিতীয় হলো শিল্প খাত। কৃষি খাত রয়েছে পঞ্চম অবস্থানে, যার অবদান ৬.৬ শতাংশ। কৃষিক্ষেত্র থেকে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণের একটি বড় উৎস হলো বেপরোয়াভাবে ইউরিয়া ও নাইট্রোজেনঘটিত সার প্রয়োগ।

বাংলাদেশের ফসলের মাঠ, জলাভূমি ও মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্র, প্রাণী পালন ইত্যাদি থেকে মিথেন নির্গমন ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা হিসাব করেছেন যে প্রতিবছর প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন মিথেন বাংলাদেশ থেকে নির্গমন হয়, যা বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মোট পরিমাণের প্রায় ০.৪২-০.৪৩ শতাংশের সমান। শতকরা হিসাবে এটি আধা শতাংশের কম, যা নগণ্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, তার প্রায় ৪৪ শতাংশ আসে কৃষিক্ষেত্র থেকে, যার মধ্যে শুধু ধানখেত থেকে নির্গত হয় কৃষিক্ষেত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ। তাই গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা ফসল উৎপাদন তথা ধান চাষ করতে এমন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন, যেগুলো ব্যবহার বা প্রয়োগ করলে ধানখেত ও অন্যান্য ফসলের খেত থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমবে।

হুমনাথ ভান্ডারি এ সম্পর্কে তাঁর উপস্থাপনায় সুস্পষ্টভাবে তিন পর্যায়ে করণীয় ব্যবস্থার একটি রূপরেখা দিয়েছেন। তিনি বলেন, মাঠে ফসল চাষ করতে গিয়ে কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষকেরা যা করতে পারেন, সেগুলো হলো ফসলের এমন কিছু জাত উদ্ভাবন করা, যেগুলো কম মিথেন নিঃসরণ করে, এমন কিছু ফসল চাষ করা, যার ফলে সেসব খেত থেকে কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। ফসলের চাষ ব্যবস্থাপনায়ও কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন, ফসলের চাষ করতে গিয়ে সেসব ফসলের খেতে দীর্ঘ সময় ধরে সেচের পানি আটকে না রাখা ও সেসব জমি পর্যায়ক্রমে ভিজিয়ে ও শুকিয়ে ধান চাষ করা, সেচসাশ্রয়ী প্রযুক্তি যেমন ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচ ব্যবহার করা, ইউরিয়া সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার ও বায়োচার ব্যবহার করা, চারা রোপণ না করে সরাসরি বীজ বুনে ধান চাষ করা, গোড়া থেকে ধানগাছ না কেটে তার কিছু খড় জমিতে রেখে তা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া, রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বা পরিহার করা। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফলন ঠিক রেখেও গুটি ইউরিয়া, ন্যানো-ইউরিয়া ও বায়োফার্টিলাইজার ব্যবহার করে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নাইট্রোজেন-সার ব্যবহার কমানো যায়।

একইভাবে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য পালনের ক্ষেত্রেও এমন কিছু উপযুক্ত জাত ও জুতসই প্রযুক্তি ব্যবহার করা, যেগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে সাহায্য করতে পারে। যেমন, জলবায়ু সহনশীল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ জাত উদ্ভাবন ও পালন (খরা ও রোগ সহনশীল জাত), এমন খাদ্য খাওয়ানো, যা থেকে কম কার্বন নিঃসরণ ঘটে, প্রাণিবর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা, গোখাদ্যের চারণভূমি সংরক্ষণ ইত্যাদি। কৃষক ও খামারিদের এসব প্রযুক্তিগত সহায়তা বা সেবা পরামর্শ এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এমনকি এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হলে তা একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে নিয়মিত পরিমাপপূর্বক নির্ভরযোগ্যভাবে সেগুলো যাচাই করতে পারলে তা বৈশ্বিক কার্বন বাজারে বিক্রি করে তহবিল আসতে পারে, যা থেকে কৃষকদের সহায়তা, প্রণোদনা দিতে পারলে তা এ কাজে এসব কলাকৌশল বাস্তবায়নকে আরও গতিশীল করবে।

তবে সেসব কিছু করার জন্য দরকার এ সম্পর্কে নিজেদের দক্ষতা উন্নয়ন, সততার সঙ্গে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার মনিটরিং ও তথ্য যাচাই এবং নিয়মিতভাবে প্রতিবেদন তৈরি। আগামী দিনে এসব কাজকে আরও আধুনিক করতে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক ফসল ব্যবস্থাপনার জন্য পরামর্শ সেবাদানব্যবস্থা; বীজ বোনা, সার ও পানি ছিটানোর জন্য আইওটি সেন্সরসহ স্বয়ংক্রিয় ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার ইত্যাদি। সামগ্রিকভাবে এখন ফসল উৎপাদনব্যবস্থাকে এমনভাবে আধুনিকায়ন করতে হবে যে ব্যবস্থাপনায় শুধু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিই না, কার্বন উৎপাদন হ্রাসের বিষয়টিকেও জোরদারভাবে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য হলো, ২০৩৫ সালের মধ্যে শর্তহীন পরিস্থিতিতে ২৬.৭৪ মিলিয়ন টন এবং শর্তসাপেক্ষে ৫৮.২৩ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করা, যা মোট নিঃসরণের যথাক্রমে ৬.৩৯ ও ১৩.৯২ শতাংশ। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতা এক না। এর বড় উদাহরণ হলো, এনডিসিতে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩১২ হেক্টর, যা ১ শতাংশের কম। বাস্তবায়নের জন্য দরকার দক্ষতা, অর্থায়ন, প্রণোদনা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ম্যাজারমেন্ট, রিপোর্টিং ও ভেরিফিকেশন (এমআরভি)।

লেখক: মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত