Ajker Patrika

ফুটবল ও আবেগ

সম্পাদকীয়
ফুটবল ও আবেগ

বাঙালির অতি আবেগ প্রকাশের জন্য খ্যাতি আছে। খেলার প্রধান উদ্দেশ্য মূলত আনন্দ পাওয়া। কিন্তু আনন্দের সঙ্গে যখন আবেগ জড়িত হয়ে মৃত্যু ও সংঘর্ষের কারণ হয়, তখন খেলা বিষাদে পরিণত হয়। প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবলে দেশে খেলা নিয়ে নানা ধরনের অঘটনের খবর পাওয়া যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আমরা আজকের পত্রিকায় তিনটি খবরের দিকে চোখ রাখলে বুঝতে পারব খেলা কীভাবে বিষাদের কারণ হয়!

আর্জেন্টিনা-মিসরের খেলার দিন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের নিয়ে কটাক্ষ করায় শরিফুল ইসলাম (৩২) নামের ব্রাজিলের এক সমর্থক নিহত হয়েছেন। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অপরদিকে মানিকগঞ্জের ঘিওরে ব্রাজিলের পতাকা ছেঁড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির এক নেতার ঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া পিরোজপুরের নেছারাবাদে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। দুটি ঘটনা বাদ দিলে শুধু কুমিল্লায় খেলা নিয়ে একজনের মৃত্যু কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।

খেলা আনন্দ, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা আজ দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার দুটি দেশের খেলার জন্য বাংলাদেশের মানুষের কেন এই মাত্রাহীন উন্মাদনা এবং তার পরিণতি এতটা ভয়াবহ হচ্ছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আমাদের দেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি এই অন্ধ আবেগের পেছনে রয়েছে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা এবং পরিচয়ের সংকট। নিজেদের ফুটবল বিশ্বমঞ্চে অনুপস্থিত থাকায়, সাধারণ মানুষ অন্য দেশের দলের মধ্যে নিজেদের স্বপ্ন ও জয়ের আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করে। তবে এই সমর্থন যখন যুক্তির গণ্ডি পেরিয়ে অন্ধত্বে রূপ নেয়, তখনই বিপত্তি ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এই উগ্রতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। খেলার মাঠে খেলোয়াড়েরা যখন একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখছেন, তখন হাজার হাজার মাইল দূরে বসে আমাদের দেশের সমর্থকেরা সামান্য কটাক্ষের জেরে একে অপরের প্রাণ নিচ্ছে। এর পেছনে অন্ধ আবেগ ও সহনশীলতার সংকটকেই দায়ী করতে হবে। অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে খেলাকে শুধু খেলা হিসেবে না দেখে জীবনের চেয়েও বড় করে দেখার কারণে এই ঘটনাগুলো ঘটছে। এ জন্য তরুণদের মনস্তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

ভবিষ্যতে সংঘর্ষের ঘটনাগুলো প্রতিরোধ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা আছে। কুমিল্লায় নিহতের ঘটনায় প্রকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ অতি আবেগ দেখাতে গিয়ে জীবন বা সম্পদের ক্ষতি করার সাহস না পায়। একই সঙ্গে আমাদের দেশে সুস্থ ধারার দেশীয় ক্রীড়া সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে হবে। স্থানীয় ফুটবল ও অন্যান্য খেলাধুলার মান উন্নত করে যদি আমরা নিজেদের দলের প্রতি তরুণদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারি, তবে অন্য কোনো দেশের প্রতি অন্ধ আবেগ থাকবে না। খেলা হোক আনন্দের মাধ্যম, কারও কান্নার কারণ নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত