Ajker Patrika

এআই দিয়ে বিচার করা কি অবৈধ

রাইসুল সৌরভ
এআই দিয়ে বিচার করা কি অবৈধ
প্রতীকী ছবি

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং আইনমন্ত্রী বিচারাঙ্গনে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তাঁরা যথার্থই অনুধাবন করেছেন যে এআই কোথায় কতটা ব্যবহার করা যাবে সে বিষয়ে আইন থাকা উচিত। অধুনাকালে এআইয়ের বিপুল বিস্তৃতি এবং নিত্য ব্যবহার, বিশেষত চ্যাটজিপিটির মতো জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সুনির্দিষ্টভাবে বললে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল অথবা এলএলএম চ্যাটবট বিনা মূল্যে ব্যবহারের সুযোগে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সুতরাং, এআইয়ের কার্যপদ্ধতি বা সীমাবদ্ধতা ভালোভাবে না জেনে যথেচ্ছ ব্যবহারে সীমারেখা টানার জন্য সুস্পষ্ট আইন প্রয়োজন। আইনের অনুপস্থিতিতে বা যত দিন পর্যন্ত আইন প্রণয়ন সম্ভব হচ্ছে না, তত দিন অন্তত এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

দেরিতে হলেও বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন এ প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন, জাতীয়ভাবে এআইয়ের ব্যবহারবিষয়ক একটি নীতিমালার খসড়া ইতিমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে, এখন যা চূড়ান্তকরণের অপেক্ষায় রয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসেই মন্ত্রী পর্ষদ বিভাগ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের এআই ব্যবহারে সতর্কতা জারি করা হয়েছে—এআই এমনভাবে ব্যবহার না করা হয় যাতে সরকারি গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে তৃতীয় পক্ষের হস্তগত হয়ে যায়। অপরদিকে, জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকও নোট লেখা, ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রতিবেদন তৈরির মতো দাপ্তরিক কাজের জন্য চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড, গ্রোক, ডিপসিক প্রভৃতি ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অন্যান্য সরকারি দপ্তর বা বাংলাদেশ ব্যাংকের মতোই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিচার বিভাগ এবং স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতের জন্য অদ্যাবধি এআই ব্যবহারসংক্রান্ত কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। সংসদ থেকে আইন পাস হওয়ার আগে বর্তমান শূন্যতা পূরণে প্রধান বিচারপতি উদ্যোগী হয়ে অন্তত বিচার বিভাগের জন্য বিচারক, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী সাধারণ জনগণ, আদালতে কর্মরত স্টাফদের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৭ অনুচ্ছেদানুসারে সুপ্রিম কোর্টে উভয় বিভাগ (আপিল বিভাগ এবং হাইকোর্ট বিভাগ) এবং অধস্তন আদালতের জন্য কার্যপদ্ধতি ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করতে পারে। তাই বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ) বিধিমালা, ১৯৭৩ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ) বিধিমালা, ১৯৮৮ অনুসারে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের জন্য আইনি কার্যধারা এবং মামলা-মোকদ্দমায় এআইয়ের ব্যবহারসংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করে দিতে পারেন।

বিশ্বের অনেক দেশে সর্বোচ্চ আদালত কিংবা বিচার বিভাগীয় সংস্থা ইতিমধ্যে সেসব দেশের আদালতে এআই ব্যবহার করার জন্য বিচারক, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী জনতা, আদালতে কর্মরত কর্মীদের জন্য নীতিমালা তৈরি করেছেন। যেমন ভারত (খসড়া), পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, হংকং, ফিলিপিন্স (প্রস্তাবিত), দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মরক্কো, আয়ারল্যান্ড, কেনিয়া (খসড়া), দক্ষিণ আফ্রিকা (খসড়া), যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, কলম্বিয়া, ইসরায়েল, নিউজিল্যান্ড, বেলিজে, বাহামাস, টার্কস এবং কাইকোস দ্বীপ, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো প্রভৃতি দেশে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা রয়েছে। কিছু কিছু দেশে অবশ্য আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাও আইনজীবীদের জন্য নীতিমালা তৈরি করে আইন পেশায় এআই ব্যবহারের পরিধি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যদিও এসব নীতিমালা কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে গবেষক মহলে প্রশ্ন রয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে এখনো এ রকম কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

অন্য যেকোনো পেশার মতো আইন পেশায়ও এই উদীয়মান প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু কোথায়, কখন, কীভাবে, কতটুকু ব্যবহৃত হতে পারে সে সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা থাকা জরুরি। সেই সঙ্গে আবশ্যক এই আধুনিক প্রযুক্তি উত্তমরূপে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। আরও প্রয়োজন আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিচার বিভাগের জনবল দক্ষ করে গড়ে তোলা। কেবল প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়, বরং এআইয়ের নৈতিক, সামাজিক, বিচারিক, মনস্তাত্ত্বিক বিবিধ আঙ্গিক থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি এআইয়ের ব্যবহার যেন দেশে বিদ্যমান ডিজিটাল বিভেদ বৃদ্ধি না করে এবং আইন পেশাজীবীদের যেন এআইয়ের মতো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর পক্ষপাত তৈরি না হয়, সেদিকেও সমান নজর রাখা অত্যাবশ্যক। আশা করি, প্রধান বিচারপতি এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন।

এ কথা সত্য যে বাংলাদেশে বর্তমানে বলবৎ কোনো আইনে নির্দিষ্ট করে রায় লিখতে বা বিচার করতে এআইয়ের প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আধুনিক এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিচার করা বা রায় লেখা বেআইনি নয়। যতক্ষণ না বিদ্যমান আইন, সাংবিধানিক নীতি এবং প্রতিষ্ঠিত আইনি রীতি পরিবর্তন করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ কথা ধরে নেওয়া যায় যে মানব বিচারকের মাধ্যমে বিচার পাওয়া মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এর বিচারকদের ওপর বিচারিক ক্ষমতা ন্যস্ত করেছে। অতএব, কেবল মানব বিচারকই আদালতে বিরোধ গ্রহণ, আইনের ব্যাখ্যা ও বলবৎযোগ্য রায় ঘোষণা করতে পারেন। কোনো যন্ত্র বা এআইকে সে ক্ষমতা দিতে চাইলে নতুন আইন প্রণয়ন করে ক্ষমতা দিতে হবে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধান এবং বিচারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এআইয়ের মাধ্যমে বিচার করা হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বা বলা যায় পরাস্ত হবে। তা ছাড়া এআইয়ের দ্বারা বিচার সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদানুসারে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতিরও পরিপন্থী।

স্যার এডওয়ার্ড কোকের সময় থেকে চলে আসা ‘কমন ল’ আইনের ঐতিহ্যে ‘স্বাভাবিক যুক্তি’ (যা যে কারও থাকে) এবং ‘কৃত্রিম যুক্তি’, যার অর্থ বিচারকদের ‘দীর্ঘ অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার’ মাধ্যমে অর্জিত পরিশীলিত বিচারবুদ্ধির মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। তাই এই ‘কৃত্রিম যুক্তি’কে আইনি ঐতিহ্যের একটি অনন্য ও মানবিক ফসল হিসেবে গণ্য করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যেহেতু এই মানবিক অভিজ্ঞতা নেই, ফলে এটি এই ধরনের যুক্তি প্রয়োগ করতে সমর্থ নয়। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি যেমনটি উল্লেখ করেছেন যে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য অপরিহার্য একজন বিচারকের বিবেক ও বুদ্ধিবৃত্তিকে এআই দ্বারা পাওয়া সম্ভব নয়।

এআইয়ের মাধ্যমে বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি ন্যায়বিচারের বেশ কিছু মৌলিক নীতি লঙ্ঘনও বটে, যা ‘কমন ল’ ব্যবস্থায় অলঙ্ঘনীয়; যেমন—বিচারকের বিচার শেষে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত বা রায় প্রদানের বাধ্যবাধকতা, যেন সংক্ষুব্ধ পক্ষ সেই যুক্তির বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে প্রতিকার চাইতে পারে এবং বিচারিক সুবিবেচনাবোধ ও প্রাসঙ্গিকতা আমলে নেওয়ার মানবীয় গুণাবলি অথবা যোগ্যতার সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি।

এ কারণে এআই বিচারকের বিমূর্ত ধারণাটি ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে গভীর সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের মতে, অর্থনৈতিক চাপের কারণে অত্যন্ত ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার অদূর ভবিষ্যতে প্রশ্ন সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হলেও হয়ে উঠতে পারে। তবে এটি কেবলই কারও কারও একটি অনুমান, বর্তমান আইনি ব্যবস্থার প্রতিফলন নয়। বর্তমানে পৃথিবীর উদার গণতান্ত্রিক দেশসমূহের আদালতে এআইয়ের ব্যবহার মূলত বিচারিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ‘সহায়ক হাতিয়ার’ বা প্রশাসনিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

পরিশেষে তাই বলা যায়, আইনে স্পষ্ট করে নিষিদ্ধ না হলেও এআই দিয়ে বিচার করা বা রায় লেখা আমাদের বিচারব্যবস্থায় কোনোভাবেই বৈধ বা অনুসরণীয় নয়।

কারণ, এর সঙ্গে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বিদ্যমান আইনের প্রক্রিয়াগত অপরিহার্যতা এবং সুদীর্ঘ আইনি ঐতিহ্য জড়িত। সুতরাং, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা এআই চালিত বিচারব্যবস্থার দিকে যেকোনো পদক্ষেপের জন্য দেশে কার্যকর সংবিধান সংশোধন এবং বিচারিক কার্যক্রমের আমূল পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন।

রাইসুল সৌরভ
ডক্টরাল গবেষক ইউনিভার্সিটি অব গলওয়ে

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত