Ajker Patrika

খাদ্য উৎপাদকের অর্ধেকের বেশি নিম্ন আয়ের ক্ষুদ্র কৃষক

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
খাদ্য উৎপাদকের অর্ধেকের বেশি নিম্ন আয়ের ক্ষুদ্র কৃষক

দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্যের জোগান যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁদের অর্ধেকের বেশি ক্ষুদ্র কৃষক। এই ক্ষুদ্র কৃষকদের বার্ষিক গড় নিট আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা, যা বৃহৎ উৎপাদকদের প্রায় ৪ ভাগের ১ ভাগ। প্রযুক্তি, পুঁজির ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে ক্ষুদ্র কৃষকদের শ্রমের উৎপাদনশীলতাও বড় উৎপাদকদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘ক্ষুদ্র মাপের খাদ্য উৎপাদকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা জরিপ ২০২৫’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ২.৩.১ ও ২.৩.২ সূচকের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য জরিপটি চালানো হয়। এতে দেশের ৮ বিভাগের ১২ হাজার ৮৭৯টি পরিবার এবং কৃষির ৫টি প্রধান খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট খাদ্য উৎপাদকের ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ ক্ষুদ্র উৎপাদক। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ নারী নেতৃত্বাধীন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ৫৯ দশমিক ৮১ এবং রংপুরে ৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ ক্ষুদ্র উৎপাদক রয়েছেন। অন্যদিকে সিলেটে বড় উৎপাদকদের সংখ্যা বেশি।

আয় ও উৎপাদনশীলতার ব্যবধান

জরিপের ফল বলছে, জাতীয় পর্যায়ে প্রতি শ্রম দিবসে কৃষি উৎপাদনশীলতার গড় মূল্য ১ হাজার ৮৬৮ টাকা। ক্ষুদ্র উৎপাদকদের ক্ষেত্রে তা ১ হাজার ৪৯৪ টাকা, আর বৃহৎ উৎপাদকদের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৩০১ টাকা। বার্ষিক নিট আয়ের ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। সব ধরনের উৎপাদকের জাতীয় গড় আয় ৭৮ হাজার ২৮৬ টাকা হলেও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের গড় আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। বিপরীতে বৃহৎ উৎপাদকদের গড় বার্ষিক আয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদনকারীদের উৎপাদনশীলতা সবচেয়ে বেশি রাজশাহীতে ২ হাজার ৯৩ টাকা। সবচেয়ে কম ময়মনসিংহে ১ হাজার ১৩৫ টাকা।

গবাদিপশুতে সবচেয়ে বেশি আয়

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস গবাদিপশু পালন। এই খাত থেকে তাঁদের মোট আয়ের প্রায় ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ আসে। খাতভিত্তিক হিসাবে গবাদিপশু পালন থেকে বছরে গড়ে ৭০ হাজার ৪৩২ টাকা নিট আয় হয়, যা অন্য কৃষি খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই খাত থেকে তাঁদের বার্ষিক আয় ২৮ হাজার ৪২১ টাকা।

এরপর রয়েছে মৎস্য চাষ খাতে বার্ষিক আয় ৫২ হাজার ৪৩৪ টাকা, বনজে ৩১ হাজার ১১৯, সাময়িক ফসল ২৩ হাজার ১৫৭ এবং স্থায়ী ফসল ১৯ হাজার ৬৮ টাকা।

সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা মাছে

শ্রম দিবসভিত্তিক উৎপাদনশীলতায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মৎস্য চাষ। এ খাতে প্রতিদিন একজন শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার মূল্য ১১ হাজার ৩৮২ টাকা। এরপর রয়েছে স্থায়ী ফসল, বনজ, সাময়িক ফসল এবং গবাদিপশু খাত। তবে একটি ব্যতিক্রমী চিত্রও উঠে এসেছে। স্থায়ী ফসল ও বনজ খাতে ক্ষুদ্র উৎপাদকদের উৎপাদনশীলতা বড় উৎপাদকদের চেয়ে বেশি। স্থায়ী ফসলে ৬ হাজার ৫৩০ টাকা, বনজে ৫ হাজার ৩৯০, সাময়িক ফসল ২ হাজার ৫৮৫ এবং গবাদিপশু ১ হাজার ৪৫৯ টাকা।

রাজশাহীতে আয় বেশি, সিলেটে কম

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র উৎপাদকদের বার্ষিক গড় আয় সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে। সেখানে একজন ক্ষুদ্র কৃষকের গড় আয় ৪৪ হাজার ৭০৭ টাকা। সবচেয়ে কম আয় সিলেট বিভাগে, মাত্র ২৪ হাজার ৬৩৬ টাকা।

এসডিজি অগ্রগতি পরিমাপের ভিত্তি

বিবিএস জানিয়েছে, এসডিজির ২.৩ নম্বর লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার অগ্রগতি পরিমাপের জন্য এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। নীতিনির্ধারণ, কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অগ্রগতি মূল্যায়নে এই প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, এসডিজি অর্জনে কৃষি খাতের অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তি এই জরিপ। এর মাধ্যমে দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা ও ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদনকারীদের আয় সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে, যা নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষিবিদ ড. মো মিজানুর রহমান বলেন, ‘ক্ষুদ্র কৃষকেরা এসডিজি অর্জনে অবদান রাখছেন। কিন্তু তাঁরা উন্নয়নের সঠিক সুফল পাচ্ছেন না। সুফল পাচ্ছেন পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। এ ছাড়াও পণ্য উৎপাদনে সার, ডিজেলসহ বিভিন্ন জিনিসের দাম বাড়ছে।’

মিজানুর রহমান বলেন, সরকারের উচিত সুফলের বৈষম্য দূর করা। কৃষি খাতের প্রণোদনা ক্ষুদ্র কষকদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। তাঁদের কম সুদে ঋণ দিতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো দরকার।

প্রতিবেদনের তথ্য সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাবেক কৃষিসচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ক্ষুদ্র কৃষকদের গড় আয় ৩৩ হাজার টাকা হলেও শস্য (যেমন ধান, আলু ও পাট) উৎপাদনকারী কৃষকদের আয়ের পরিমাণ অনেক কম। সরকারের উচিত তাঁদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত