Ajker Patrika

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন

তিন জেলাতেই এসেছে মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৪৭
তিন জেলাতেই এসেছে মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগ ও বিনিয়োগ বাড়াতে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা–এই তিন জেলা থেকেই মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে। জেলাভিত্তিক প্রবাসী আয়ের তথ্য পর্যালোচনায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলা মিলিয়ে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৫৩ শতাংশ দেশে এসেছে। অন্যদিকে দেশের বাকি ৬১টি জেলা ভাগাভাগি করেছে অবশিষ্টাংশ। উল্লেখিত সময়ে এই তিন জেলায় এসেছে ১ হাজার ৮৮২ কোটি ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ৫২ দশমিক ৯২ শতাংশ। রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে এরপরের অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে সিলেট, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, টাঙ্গাইল ও মুন্সিগঞ্জ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চিত্র দীর্ঘদিনের অভিবাসন প্রবণতা এবং প্রবাসী নেটওয়ার্কের ফল। এই প্রবণতা শুধু আঞ্চলিক বৈষম্যের ইঙ্গিতই নয়, বরং দেশের অভিবাসন, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও তুলে ধরে। তাঁদের মতে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা থেকে বহু দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া ও উত্তর আমেরিকায় শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীদের অভিবাসনের ধারা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি আজকের পত্রিকাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এই তিন জেলার বিদেশে যাওয়া লোকের সংখ্যা বেশি। এ কারণে এসব এলাকায় প্রবাসী আয়ও বেশি।

তিনি বলেন, একবার কোনো এলাকায় অভিবাসনের পথ তৈরি হলে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মাধ্যমে একই এলাকা থেকে নতুন অভিবাসীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে রেমিট্যান্সও সেই অঞ্চলেই বেশি কেন্দ্রীভূত হয়।

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, রেমিট্যান্সের এই ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবনের ফলে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ভোক্তা ব্যয়ের পরিমাণ তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে ব্যাংক আমানত ও স্থানীয় বিনিয়োগও বাড়ে। তবে এর বিপরীতে যেসব জেলা থেকে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কম, সেসব এলাকায় অর্থনৈতিক গতিশীলতা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক নেটওয়ার্ক বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকা শুধু নিজ জেলার বাসিন্দাদের নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। ফলে অনেক রেমিট্যান্স ঢাকার ব্যাংক শাখার মাধ্যমে হিসাবভুক্ত হয়।

৭১ শতাংশ রেমিট্যান্স ১০ জেলায়

প্রবাসী আয় পাঠানোয় শীর্ষ ১০ জেলায় বিদায়ী অর্থবছরে ২ হাজার ৫৪২ কোটি ডলার এসেছে। যা মোট প্রবাসী আয়ের ৭১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা জেলায় এসেছে ১ হাজার ৩৪৭ কোটি ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রামে ৩২৭ কোটি ৪৪ লাখ এবং তৃতীয় কুমিল্লায় ২০৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এ ছাড়া সিলেটে ১৫৮ কোটি, নোয়াখালী ১০৭ কোটি ৫৫ লাখ, ফেনীতে ৯৯ কোটি ৫৪ লাখ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৯১ কোটি ৫৫ লাখ, চাঁদপুর ৭৯ কোটি, টাঙ্গাইল ৬৪ কোটি ১৮ লাখ ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় ৬০ কোটি ৬৮ লাখ ডলার এসেছে।

১০ জেলায় এক শতাংশের কম

৫ কোটিরও কম রেমিট্যান্স এসেছে চারটি জেলা থেকে। এসব জেলাসহ সর্বনিম্ন প্রবাসী আয় আসা ১০টি জেলায় এসেছে ৩৩ কোটি ২২ লাখ ডলার। মোট রেমিট্যান্সের যা প্রায় শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ। এ তালিকার সবচেয়ে কম ১ কোটি ৮৩ লাখ ডলার এসেছে লালমনিরহাট জেলায়। পঞ্চগড়ে ২ কোটি, রাঙামাটি ২ কোটি ১০ লাখ ও বান্দরবান জেলায় এসেছে ২ কোটি ২৭ লাখ ডলার। এ ছাড়া খাগড়াছড়িতে ৩ কোটি ২৬ লাখ, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ কোটি ৩০ লাখ, শেরপুরে ৪ কোটি, নীলফামারীতে ৪ কোটি ৯৯ লাখ, জয়পুরহাটে ৪ কোটি ৫৭ লাখ ও কুড়িগ্রামে ৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, কোনো একটি এলাকার মানুষ একবার যেখানে যাওয়া শুরু করে আশপাশের লোকজনও সেই দেশে বেশি যায়। আবার কিছু এলাকা আছে, যেখানে মানুষ বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ দেখায় না। অনেক জেলার লোকসংখ্যা কম। সব মিলিয়ে রেমিট্যান্স আসায় জেলাভিত্তিক এত তারতম্য হয়। এতে মানুষের জীবনযাত্রায়ও তফাৎ দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারও কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামীতে এই বৈষম্য কমে আসবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্সের ভৌগোলিক ভারসাম্য আনতে কম রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত জেলাগুলোতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিদেশগামী কর্মীদের ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, নিরাপদ অভিবাসন এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়কে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করলে স্থানীয় কর্মসংস্থানও বাড়বে।

তাঁদের মতে, বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শুধু অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে কম রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত জেলাগুলোর জনশক্তিকে দক্ষ করে বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং প্রবাসী আয়কে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে রূপান্তর করার উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত