Ajker Patrika

উত্তরের চার সীমান্তে এক দিনে আরও ৬০ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা বিএসএফের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
উত্তরের চার সীমান্তে এক দিনে আরও ৬০ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা বিএসএফের
ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে তারা প্রবেশ করতে পারেনি। গতকাল পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তে। ছবি: আজকের পত্রিকা

লালমনিরহাট, নওগাঁ ও পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে গতকাল শুক্রবার আরও ৬০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য এবং স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে তারা সফল হয়নি। ঠেলে পাঠানো ওই ব্যক্তিরা বর্তমানে সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরাও রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা ও আদিতমারী উপজেলার চার সীমান্ত দিয়ে গতকাল ভোরে বিএসএফ সদস্যরা নারী-পুরুষ, শিশুসহ ৩৩ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করেন।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের প্রধান পিলার ৮৪৬ নম্বরের ১ নম্বর উপপিলারের একদিকে পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের কামাতটারী এলাকা। এর উল্টো দিকে (বিপরীতে) ভারতের কোচবিহার রাজ্যের মাথাভাঙ্গা থানার পানিশালা সীমান্ত।

এ সীমান্ত দিয়ে গতকাল ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে ভারতের ৯৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মহানদী ক্যাম্পের টহল দলের সদস্যরা পাঁচ নারী, তিন পুরুষ ও দুই ছেলেশিশুকে ঠেলে দেয়। এলাকাবাসী তাঁদেরকে (ঠেলে পাঠানো) জিজ্ঞেস করলে তাঁরা জানান, বিএসএফ মারপিট করতে করতে কাঁটাতারের বেড়ার গেট দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাঁরা আরও জানান, শিশুসন্তানদের নিয়ে অসহায় অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

তখন স্থানীয়রা দায়িত্বপূর্ণ এলাকার বিজিবি ৬১ ব্যাটালিয়নের (তিস্তা-২) পঁয়ষট্টিবাড়ি ক্যাম্প কমান্ডারকে জানান। বিজিবি স্থানীয়দের নিয়ে ঠেলে পাঠানো ব্যক্তিদের ওই সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ফটকের শূন্যরেখার কাছে পাঠিয়ে দেয়। এ সময় বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়ার ফটক দিয়ে এসে আবারও ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে। তখন বিজিবি ও স্থানীয়রা মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে এই চেষ্টা প্রতিহত করে।

বর্তমানে ভারত থেকে শূন্যরেখার ২০ গজের মধ্যে অবস্থান নিয়েছেন ঠেলে পাঠানো ওই ব্যক্তিরা।

একই দিনে হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের সীমান্তের প্রধান পিলার ৮৮৬ নম্বরের ভারতের বুড়াসারডুবি এলাকা দিয়ে ১৫৭ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের ছোটমধুসূদন ক্যাম্পের সদস্যরা তিনজন পুরুষ ও আটজন নারীকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেন। ওই সময় একই ব্যাটালিয়নের বড়খাতা ক্যাম্পের বিজিবির সদস্যরা ওই চেষ্টা প্রতিহত করেন।

একই দিন ভোরে আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর সীমান্তের প্রধান পিলার ৯২৫ নম্বর এলাকা দিয়ে একজন পুরুষ, চারজন নারী ও এক শিশুকে এবং ৭ নম্বর উপপিলারের শূন্যরেখা দিয়ে চারজন পুরুষ, দুজন নারী এবং একজন শিশুকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তখন ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের দিঘলটারী ক্যাম্পের টহল দলের সদস্যরা স্থানীয়দের নিয়ে বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টা প্রতিহত করেন।

গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুশ ইনের শিকার নারী-পুরুষ ও শিশুরা ভারতীয় শূন্যরেখায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে শিশুরা বেশ কষ্টে রয়েছে।

এ ব্যাপারে বিজিবি রংপুর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম শফিকুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘১৫ ও ৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের চারটি জায়গাতে তারা (বিএসএফ) পুশ ইন করার চেষ্টা করেছে। আমরা (বিজিবি) এটা শক্তভাবে রুখে দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের কমিউনিকেশন (যোগাযোগ) চলতেছে বিএসএফের সাথে। তারা যেন এই লোকগুলোকে (পুশ ইনের শিকার) তাদের ভেতরে নিয়ে যায়। যথাযথ নিয়মের মাধ্যমে সরকারি যে স্টাবলিশড প্রসিডিউর (নির্ধারিত প্রক্রিয়া) আছে, সে অনুযায়ী আমাদের মিনিস্ট্রি, হাইকমিশনের সাথে তাদের মিনিস্ট্রি অব এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স (ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) নাম-ঠিকানা দিয়ে যোগাযোগ করে সে প্রসিডিউর মোতাবেক যেন রিপ্যাট্রিয়েট (প্রত্যাবাসন বা ফেরত পাঠানো) করে। যদি আমাদের লোক হয়, তাহলে ভেরিফাই (যাচাই) হবে। এভাবেই তাঁদেরকে পাঠানোর জন্য আমরা বলেছি।’

বিজিবি লালমনিরহাট ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, বিএসএফ পুশ ইনের চেষ্টা করে উল্টো আমাদের ওপর দায় চাপানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকে পুশ ইনের শিকার লোকজন বিএসএফের সামনে বলেছেন, ‘তারা ভারতীয় এবং ভারত থেকে এসেছে। এরপরও তারা তাদের নাগরিককে সরিয়ে না নিয়ে শূন্যরেখায় আটকে রেখেছে। আমরা পুশ ইনসহ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’ সীমান্তবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে বিজিবিকে তথ্য দিয়ে সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।

নওগাঁ সীমান্তে ১৭ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা

নওগাঁর সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে নারী-পুরুষ, শিশুসহ ১৭ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। বিজিবির তাৎক্ষণিক তৎপরতায় বাংলাদেশে ঢুকতে পারেনি তারা। গতকাল সকাল সাড়ে সাতটার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

নওগাঁ ব্যাটালিয়ন (১৬ বিজিবি) সূত্রে জানা যায়, হাঁপানিয়া সীমান্তের ২৩৮/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে ৮৮ বিএসএফ পান্নাছাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা ১৭ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। সংবাদ পাওয়ার পর হাঁপানিয়া বিওপির টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁদের ভারতীয় শূন্যরেখার অভ্যন্তরে অবস্থানরত অবস্থায় শনাক্ত করে। ১৭ জনের মধ্যে ৬ জন পুরুষ, ৬ জন নারী এবং ৫ জন শিশু। বর্তমানে তাঁরা শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।

নওগাঁ ব্যাটালিয়ান ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, সংবাদ পাওয়ার পরে ওই এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাউকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তাদেরকে ভারতীয় ভূখণ্ডে পাঠানোর (পুশ ব্যাক) কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

পঞ্চগড় সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা ১০ জনকে

পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্ত দিয়ে ১০ জন নারী-পুরুষকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। গতকাল ভোরে নীলফামারী ব্যাটালিয়নের ৫৬ বিজিবির বড়বাড়ি বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার সীমান্ত পিলার ৭৫৮/৫-এর কাছাকাছি ভারতের প্রধান পাড়া এলাকায় বিএসএফের ৯৩ টিয়াপাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা ১০ জন নারী ও পুরুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে বিজিবির তাৎক্ষণিক তৎপরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে তারা সবাই ভারতের অভ্যন্তরে শূন্যরেখায় অবস্থান করছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সীমান্তের উভয় পাশে বিজিবি ও বিএসএফের টহল দল সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়েছে।

এ বিষয়ে ৫৬ বিজিবির নীলফামারী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বড়বাড়ি ক্যাম্পের বিপরীতে বিএসএফ ১০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করে। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও বিএসএফ তাঁদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বর্তমানে তাঁরা ভারতের অভ্যন্তরে ভারতীয় ভূখণ্ডেই অবস্থান করছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ঠেলে পাঠানো ২৮ জন খোলা আকাশের নিচে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ২৮ জন এখনো সীমান্তের শূন্যরেখা এলাকায় অবস্থান করছেন। বিজিবির বাধার মুখে তাঁরা বাংলাদেশে ঢুকতে না পারায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খোলা আকাশের নিচে অবস্থানরত এসব নারী-পুরুষ ও শিশুদের তেমন খাবার নেই। বৃষ্টিতে ভিজে দুর্ভোগে পড়েছেন তাঁরা।

বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শারিকুল ইসলাম জানান, ওই ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি পাঠিয়েছেন।

শূন্যরেখা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএসএফের পক্ষ থেকে কিছু খাবার দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাঁদের মধ্যে একজন বয়স্ক নারী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, বুধবার দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে সীমান্তের ২০৩/৬-আর পিলার-সংলগ্ন এলাকা দিয়ে বিএসএফের ১২ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা ২৮ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী ও ৬ জন শিশু। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তাঁরা বাংলাদেশে ঢুকতে পারেনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত