জাহীদ রেজা নূর

১৭ এপ্রিল কী ঘটেছিল এই দেশে? ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল?
১৭ এপ্রিল তারিখটায় পৌঁছাতে হলে মেলে ধরতে হয় ইতিহাসের ডানা। এই দিনে বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে মুজিবনগর। কেন মুজিবনগর? মুজিব তো তখন নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরেছে ইয়াহিয়া। বিচারের নাম করে শেখ মুজিবকে হত্যা করার তোড়জোড় চলছে তখন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের শপথ নেওয়ার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো, তার নাম তো আর কিছুই হতে পারে না। তাই বৈদ্যনাথতলা রাতারাতি বদলে গিয়ে নাম ধারণ করল মুজিবনগর। মুজিব তখন প্রতিটি মানুষের প্রাণের শক্তি, মুজিব তখন নিজেই একটি দেশের প্রতিচ্ছবি।
সেই ইতিহাস কি ভুলে যাবে মানুষ?
কবিরা যদিও বলে থাকেন, ‘লোকে ভুলে যেতে চায়, সহজেই ভোলে।’ কিন্তু সবাই কি ভোলে? সবকিছু কি ভোলা যায়? ভুলিয়ে দিতে চাইলেও মনের কোনো সূক্ষ্ণ কোণে সত্য কি জেগে থাকে না? নাকি সবই গরল ভেল?
সেই প্রচণ্ড পৈশাচিকতার পর প্রতিদিন চলছিল বাঙালি নিধন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার। ১৭ এপ্রিল সেই সরকার কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত হয় এই সরকার।
২
ইয়াহিয়া ও তার সামরিক জান্তা বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল তার হানাদার বাহিনীকে, ২৫ মার্চ রাতে। সেই একাত্তরের কথাই তো বলছি। মুখে বলছিল আলোচনা চলছে। কেন এ রকম মিথ্যে বলছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট? অপারেশন সার্চলাইটের ঝান্ডা-বরদাররা ছিল ইয়াহিয়ার পাশেই। তারা অবিরত ইয়াহিয়ার কানে কানে বলে চলেছিল, ইয়াহিয়া যেন শেখ মুজিবকে বুঝতে না দেন তার মনের মধ্যে কী আছে। বলে চলেছিল, আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, পরিষদ বসার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখার ভান করাকে যেন প্রাধান্য দেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। সমস্যা-অন্তে আছে সমাধান—এ রকম কথাই তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজনীতির মঞ্চে।
কিন্তু তখন তো প্লেনভর্তি সৈন্য আসছে ঢাকায়।
কেন আসছে?
তখন তো পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা চলে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে।
কেন যাচ্ছে?
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানিদের আসতে দেওয়া হচ্ছে না বাংলায়।
কেন দেওয়া হচ্ছে না?
অন্ধকার যে ঘণীভূত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এ দেশের ভাগ্যে, সেটা কি আঁচ করা যাচ্ছিল তখন?
৩
১৭ এপ্রিলের মুজিবনগরে এসে দাঁড়াতে হলে আমাদের তো আগের কিছু কথা বলে নিতেই হবে। নইলে কীভাবে দিনটি এল, কীভাবে বাংলার মানুষ জানল, মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম হয়েছে, বাংলাদেশ তার নাম?
এই দেশের রাষ্ট্রপতির নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি তখন পাকিস্তানের জেলে। তার পরও তাঁকেই কেন প্রেসিডেন্ট করা হলো নবগঠিত এই দেশের?
এ প্রশ্ন কি জেগে ওঠে না আজকের তরুণের মনে?
কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে টিটকারি মেরে বলে থাকে, তিনি তো পালিয়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে!
ডাহা মিথ্যা কথা! মেরুদণ্ড সোজা রেখে এই সব অপপ্রচারকারীকে সিকান্দর আবু জাফরের ভাষায় বলতে হয়, ‘তুমি বাংলা ছাড়ো!’ কেন বলতে হয়? বলতে হয় এ কারণে যে, বাংলার ইতিহাস না জানলে এই ‘পালিয়ে যাওয়া’ তত্ত্বই গিলে খেতে হবে।
যে মানুষটিকে গ্রেপ্তার করতে পারলে বিচারিক প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলানো যায়, সেই মানুষটি কি জানতেন না, ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনী তাঁকে হত্যা করতে পারে? জানতেন না, স্বল্পকাল আগে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান তাঁকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দেওয়ার কত চেষ্টাই না করেছিল? প্রবল গণ-আন্দোলন, তথা গণ-অভ্যুত্থানই জেলের তালা ভেঙে শেখ মুজিবকে ফিরিয়ে এনেছিল মুক্ত পৃথিবীতে?
শেখ মুজিব নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
আর তাঁর নামেই এসেছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। তাই আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ।
৪
মুজিবনগর সরকার গঠনের কোনো পূর্ব প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছিল না। তবে ভারত শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে গেছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিবনগর সরকারকে যুদ্ধের শেষ সময়েই কেবল স্বীকৃতি দিয়েছে।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও যুদ্ধ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে মুজিবনগর সরকার কোনো বাধা পায়নি। আর এই স্বীকৃতি দেওয়া-না-দেওয়ার বিষয়টি ভারতকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। অর্থাৎ, একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র না হওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে একটি নতুন রাষ্ট্রকে মদদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনতে পারেনি পাকিস্তান।
একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব, পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা বাঙালিকে দলমত-নির্বিশেষে একাত্ম করেছে। পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খান আসন্ন পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তার রেশ অপারেশন সার্চলাইট পর্যন্তই চলে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই অসাধারণ ভাষণের পর আর কারও কোনো সন্দেহ থাকেনি যে, আজ হোক, কাল হোক বাংলাদেশের জন্ম একটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাকিস্তানিরাই বাঙালি হত্যাযজ্ঞ শুরু করে সেই সময়টিকে তৈরি করে দিল।
সত্তরের নির্বাচনে ৬ দফার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়লাভের পর শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল অবধারিত। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টো এবং তাদের সামরিক জান্তার দল ভিন্ন কৌশল নিয়েছিল। কৌশল না বলে বাঙালি হত্যার ষড়যন্ত্র বললেই তা লক্ষভেদী হবে। ইয়াহিয়া বিক্ষোভের জবাব দিতে চেয়েছিলেন অস্ত্রের ভাষায়। কিন্তু ততদিনে এই আন্দোলন হয়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্ত। মোটামুটি সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আন্দোলনে শরিক মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মেনে চলছিলেন। ২৫ মার্চ সামরিক বাহিনী যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাতে সেই রক্ষক্ষয়ী নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় অবস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যারা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের বিপরীত পক্ষ ছিল, তারাও এক হয়ে বাংলাদেশীদের এককাট্টা করে দেয়। ফলে পাকিস্তানিরা এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে প্রাথমিকভাবে নিজেদের জয়ী মনে করলেও মূলত তাদের এই জয় ছিল সাময়িক আর এই সময়ের ইতিহাসের ভ্রূণে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ সরকার।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায়ে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া শাসনতন্ত্র রচনা করার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান না করে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখে এবং আলাপ -আলোচনা চলাকালে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আরও ঘোষণা করেন, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এ সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকবেন। রাষ্ট্রপ্রধানের অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন এবং অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। যেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণা বা প্রক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস ১০ এপ্রিল হয়েছে, তাই আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণের তারিখ ১৭ এপ্রিল নির্ধারিত হয়।
১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেতার ভাষণে বলেন, ‘২৫ মার্চ মাঝরাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয় দিয়ে যে নরহত্যাযজ্ঞের শুরু করেন, তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার জন্য আমরা যেমন জীবন দিতে পারি, তেমনি আমাদের দেশ থেকে বিদেশি শত্রু সেনাদের চিরতরে হটিয়ে দিতে সক্ষম। আমাদের অদম্য সাহস ও মনোবলের কাছে শত্রু যত যত প্রবল পরাক্রম হোক না কেন, পরাজয় বরন করতে বাধ্য। আমরা যদি প্রথম আঘাত প্রতিহত করতে ব্যর্থ হতাম, তাহলে নতুন স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হয়তো কিছুদিনের জন্য হরেও পিছিয়ে যেত।’
তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ মুক্ত।’
বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়েছিল ১৩ এপ্রিল। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রীসভার অন্য সদস্যরা হলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
১৪ এপ্রিল জনসাধারণের প্রতি বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু নির্দেশাবলি জারি করেন। এবং এদিন অস্থায়ী সরকারের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কর্নেল ওসমানিকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়াও আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে মেজর খালেদ মোশাররফকে সিলেট কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মেজর জিয়াউর রহমানকে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম নোয়াখালী অঞ্চলের দায়িত্ব। ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল অঞ্চলের দায়িত্ব পান মেজর শফিউল্লাহ। আর মেজর এম এ ওসমান পান দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলের দায়িত্ব।
৫
এবার ১৭ এপ্রিলের ঘটনা শোনা যাক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে।
প্রথমেই পাবনার সাবেক ডিসি ও পরবর্তীকালে মুজিবনগর সরকারের অন্যতম সচিব মোহাম্মদ নূরুল কাদেরের কথা আলোচনায় আনতে পারি।
কেমন ছিল সেদিন বৈদ্যনাথতলা বা মুজিবনগর?
মোহাম্মদ নূরুল কাদেরের ভাষায়, ‘নির্ধারিত স্থানে মঞ্চ তৈরি হলো, আশপাশের বাড়ি থেকে চৌকি এবং বাঁশ আনা হলো। উন্মুক্ত মঞ্চ এটি। উপরে শামিয়ানা কিংবা ব্যনার কোনোটাই লাগানো সম্ভব হলো না। নিভৃত গ্রাম এলাকা। লোকবসতি শহরের তুলনায় অনেক কম। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে যে আয়োজন, তাতেও মানুষ হলো প্রচুর। দেখতে দেখতে সভাস্থলে অন্তত হাজার পাঁচেক লোক জমায়েত হলো।’
তিনি লিখছেন, ‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব ক্যাপ্টেন হাফিজ ও আমার ওপর অর্পিত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা যে সব পথ দিয়ে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারে, এমন জায়গাগুলোতে আমরা কড়া পাহারার ব্যবস্থা করি। তখন বেলা এগারোটা। আমগাছের ফাঁক দিয়ে এপ্রিলের সূর্যের নিশানা। আমবাগানের ভেতর কয়েক হাজার দর্শক। ক্ষণে ক্ষণে গগনবিদারী শ্লোগান, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ উত্তেজনা বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। কারণ উপস্থিত সবাই এমন এক দৃশ্য দেখতে যাচ্ছে, যা কারো পক্ষেই ইতিপূর্বে দেখা সম্ভব হয়নি। একটি জাতির জীবনে এ ধরনের অনুষ্ঠান অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এই বিরল ঘটনা প্রত্যক্ষ করল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় উপস্থিত প্রায় ৫ হাজার মানুষ। বৈদ্যনাথতলা হয়ে গেল মুজিবনগর। (একাত্তর আমার, মোহাম্মদ নূরুল কাদের, পৃষ্ঠা ৪৭)।
মোহাম্মদ নূরুল কাদের তার স্মৃতিচারণে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের কথা বলেছেন। হাফিজু উদ্দিন আহমদ তাঁর ‘সৈনিকের জীবন, গৌরবের একাত্তর, রক্তাক্ত পঁচাত্তর নামের বইয়ে লিখেছেন, ’ ১০ এপ্রিল ভারতের সহায়তায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল সে সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম বৈদ্যনাথতলা। তিনদিক থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড বেষ্টিত। এখানে বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে আমবাগান। সেখানে দুটি কাঠের চৌকি জোড়া দিয়ে মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো সাজসজ্জা বা জৌলুস নেই। হাজার হাজার জনতা সীমান্তের উভয় পার থেকে এসে আমবাগানে সমবেত হয়েছে। সবার চোখে মুখে ঔৎসুক্য।
‘আমরা বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বৈদ্যনাথ তলায় পৌঁছলাম। নেতারা যথাসময়েই সেখানে এসে পৌঁছুলেন। রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার দায়িত্ব ইপিআর সেনাদলের। কিন্তু আমাদের পৌঁছুতে কিছুটা দেরি হওয়ায় এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আটজন আনসারের সমন্বয়ে একটি দল নিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ‘গার্ড অব অনার’ দেন।
এখানেই দেখা হলো প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানির সঙ্গে। তিনি ব্রিটিশ সেনা বাহিনীতে আর্মি সার্ভিস কোরে কমিশনপ্রাপ্ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর চালচলন বা ম্যানারিজমে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য দৃশ্যমান। হালকা-পাতলা গড়ন, প্রখর ব্যক্তিতের অধিকারী। বিশাল গোঁফ তার মুখমণ্ডলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সহজেই সমীহ আদায় করে। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে তিনি পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত হন এবং প্রথম ইস্টবেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার রূপে দায়িত্ব পালন করেন। আমাকে দেখে ভারি খুশি হলেন প্রধান সেনাপতি ওসমানি। পিঠ চাপড়ে দিয়ে অভিনন্দন জানালেন, ‘ওহ মাই বয়! জলি গুড শো।’
‘থ্যাংক য়্যু, স্যার।’ আমি বললাম।
‘আমি পরদিন বেনাপোল যাব সিনিয়র টাইগারদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য।’ ওসমানি বললেন।
‘মোস্ট ওয়েলকাম স্যার। আমরা অপেক্ষায় থাকব।’ আমি বললাম।
উপস্থিত চারজন সেনা কর্মকর্তা মেজর ওসমান, ক্যাপ্টেন এ টি সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে পরিচিত হলেন প্রধান সেনাপতি। ছোটমঞ্চের পাশে ছয়টি ফোল্ডিং চেয়ারে উপবিষ্ট হলাম ভারতের লে. কর্ণেল মেঘ সিংসহ আমরা ছয় অফিসার।
একটু পরই অনুষ্ঠান শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হলো। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। ফলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি রুপে শপথ গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ মন্ত্রী রুপে শপথ নেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। কর্নেল ওসমানিকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক মুভি ক্যামেরা নিয়ে এই অনুষ্ঠান কাভার করেন। শপথগ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ইংরেজি ভাষায় চমৎকার একটি বক্তব্য দেন। বাঙালিদের বঞ্চনার ইতিহাস, ২৫ মার্চের গণহত্যা, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার কথা তিনি মর্মস্পর্শী ভাষায় উপস্থাপন করেন। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য আবেদন জানান। হাজার হাজার শ্রোতা-দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার সে বক্তব্য শোনেন। আম্রকাননের অনুষ্ঠান, পরিবেশ, পরিস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। হাজারো মুক্তিকামী মানুষের পদভারে প্রকম্পিত। কয়েক কিলোমিটার দূরেই পলাশীর আম্রকানন। ১৭৫৭ সালে সেখানেই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। আজ আরেক আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য আবার উদিত হলো।
মুজিবনগর সরকারের কেবিনেট সচিব হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচটি ইমাম নামেই তিনি পরিচিত) মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে বলছেন, ‘আমাদের সরকার মূলত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, যেটি আমরা বলতাম, তার প্রধান দপ্তর বা হেড কোয়ার্টার ছিল মুজিবনগর।
আপনারা সবাই জানেন যে, মুজিবনগর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মেহেরপুর জেলায় আমবাগানে। পলাশীর বিখ্যাত আমবাগানের কাছেই সেই জায়গাটিতেই মুজিবনগর। মুজিব নগরেই আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়। স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। আমাদের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নামেই মুজিবনগর করা হয়। আর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, অন্য মন্ত্রীরা ছিলেন এম মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ। আরও অনেক বড় নেতা ছিলেন।
যুদ্ধকালীন যে পরিস্থিতি, তাতে দ্বিতীয় মহাযুদবধ বা পরবর্তীকালেও যে সমস্ত প্রবাসী সরকার দেখেন, তারা কিন্তু নিরাপত্তার কারণে, রাজনৈতিক কারণে ঠিক একটি জায়গায় কোনো সময়েই থাকেননি। মুজিবনগর হেডকোয়ার্টার ছিল বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে। আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও ছিল। কিন্তু আমাদের মূল দপ্তর ছিল কোলকাতায়, থিয়েটার রোডে। সেখানেই আমাদের যৌথ বাহিনী, মিত্র বাহিনীর হেড কোয়াটার ছিল। (বাংলাদেশ ১৯৭১, সম্পাদনা আফসান চৌধুরী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১১)।
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের স্মৃতিচারণ এক্ষেত্রে খুব ভালো একটি সংযোজন হতে পারে। দীর্ঘ সে স্মৃতিচারণের নির্দিষ্ট একটি অংশই এখানে দেওয়া হলো:
‘আমরা বঙ্গবন্ধুকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আত্মগোপনের জন্য চাপ দিই। তিনি আত্মগোপনের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আত্মগোপনের জন্য তিনি পূর্ব থেকেই বঙ্গবন্ধুকে বলে আসছেন। তিনি কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, আমাকে নিয়ে তোরা কোথায় রাখবি? বাংলাদেশে আত্মগোপন সম্ভব নয়। আমার হয়তো মৃত্যু হবে, কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’
এরপর তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তাজউদ্দীন আহমদসহ তিনি সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছুলেন। তারপর বলছেন, ‘সীমান্ত থেকে কিছু দূরে একটি জঙ্গলের মাঝে ছোট্ট খালের ওপর একটি ব্রিটিশ যুগের তৈরি কালভার্ট। কালভার্টের ওপর তাজউদ্দীন ভাই ও আমি বসে আছি। আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে তৌফিক ও মাহবুবকে ওপারে পাঠাই। কিছুক্ষণ পর অন্ধকারে মানুষের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। অফিসারটি জানান, আমাদের তিনি যথোপযুক্ত সম্মান দিয়ে ছাউনিতে নিয়ে যেতে এসেছেন।’
‘কিছুক্ষণের মধ্যেই বিএসএফের আঞ্চলিকপ্রধান গোলক মজুমদার ছাউনিতে এসে পৌছলেন। তিনি জানান, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। তার সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন। তবে দিল্লির সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়।
মজুমদার নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তিনি জানান, আমাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে এই ফ্লাইটে দিল্লি থেকে একজন কর্মকর্তা আসবেন। বিমান থেকে ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা একজন লোক নেমে সোজা আমাদের গাড়িতে উঠলেন। মজুমদার তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি হলেন বিএসএফের প্রধান রুস্তমজি। রুস্তমজি একসময় ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর নিরাপত্তাপ্রধান ছিলেন। নেহরু পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর খুবই আস্থাভাজন।’
‘এদিকে আমার কাপড়-চোপড়ের অবস্থা একেবারেই শোচনীয়। গাড়িতেই শুরু হয় আলোচনা। রুস্তমজির প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কোথায়? মজুমদারের প্রথম প্রশ্নও ছিল এটাই। এর পরে আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সকলেরই প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কেমন আছে? এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা তৈরি ছিলাম। দলীয় নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের ব্যাপারে আমরা একই উত্তর দিয়েছি। আমরা যা বলতে চেয়েছি তা হলো বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাচ্ছি। তিনি জানেন, আমরা কোথায় আছি। তিনি আমাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন। সময় হলে বা প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি উপযুক্ত স্থানে আমাদের সাথে দেখা করবেন।’
‘একটি সুন্দর বাড়িতে (আসাম হাউস) আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। একটি ঘরে আমি আর তাজউদ্দীন ভাই, অন্য ঘরে রুস্তমজি। আমরা খুবই ক্লান্ত। স্নান করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সাথে অতিরিক্ত কোনো কাপড় নেই। রুস্তমজি আমার পরিধেয় বস্ত্রের অভাবের কথা জেনে তার ইস্ত্রি করা।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
“৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন ভাই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তাদের কোনো সহযোগী ছিল না। স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী প্রথম প্রশ্ন করেন। “হাউ ইজ শেখ মুজিব, ইজ হি অল রাইট?” (শেখ মুজিব কেমন আছেন?) মিসেস গান্ধীর প্রশ্নের জবাবে তাজউদ্দীন ভাই বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর স্থান থেকে আমাদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের বিশ্বাস, তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ২৫ মার্চের পর তাঁর সঙ্গে আমাদের আর যোগাযোগ হয়নি।’ সাক্ষাতে তাজউদ্দীন ভাই আরও বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যে কোনো মূল্যে এই স্বাধীনতা আমাদের অর্জন করতে হবে।”
“তাজউদ্দীন ভাই ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, পাকিস্তান আমাদের আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা চালাতে পারে। যে কোনো মূল্যে পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। আমাদের অস্ত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহের। মাতৃভূমির স্বাধীনতাযুদ্ধে তাজউদ্দীন ভাই ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। বাংলাদেশের নেতা জানান, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে জোটনিরপেক্ষ। সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়। সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ ও সরকারের সহায়তা আমরা চাই।”
ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ
‘পরদিন তাজউদ্দীন ভাই দ্বিতীয়বারের মতো ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জানান, বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য এই খবর পাকিস্তান সরকার তখনো সরকারিভাবে প্রকাশ করেনি।’
‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাজউদ্দীন ভাই বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, তাঁদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর প্রচারের জন্য একটি বেতার স্টেশন স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়। ...দিল্লিতে বসেই তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা টেপ করা হয়। বক্তৃতার পূর্বে আমার কণ্ঠ থেকে ঘোষণা প্রচারিত হয়-এখন তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা দেবেন। এর পর তাজউদ্দীন ভাই বক্তৃতা শুরু করেন।’
‘...মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শপথের স্থানের জন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা চিন্তা করি। কিন্তু ১৩ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। পাক দস্যুরা সেখানে বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে। আমরা চুয়াডাঙ্গা রাজধানী করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত তা আর গোপন থাকেনি। চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়ে আমাদের নতুন স্থানের কথা চিন্তা করতে হলো। এই নিয়ে গোলক মজুমদারের সাথে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে সবাই একমত হন যে, যেখানেই আমরা অনুষ্ঠান করি না কেন, পাক বাহিনীর বিমান হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত মানচিত্র দেখে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলাকে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।’
“স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের খসড়াটি কোনো একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে দেখাতে পারলে ভালো হতো। ইতোমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীরা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। এদের মধ্যে সুব্রত রায় চৌধুরীর নাম আমি শুনেছি। রায় চৌধুরীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। বিএসএফের মাধ্যমে রায় চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। তিনি রাজি হলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার যে আইনানুগ অধিকার, তা মানবাধিকারের একটা অংশ। এই কথা স্বাধীনতার সনদে ফুটে উঠেছে। তিনি জানান, তিনি এর ওপর একটা বই লিখবেন। এই ঘোষণাপত্রের একটা কপি তাকে দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। এর পর আইন ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর বই লেখা শুরু করেন। তার রচিত বইটির নাম হচ্ছে ‘জেনেসিস অব বাংলাদেশ’।’
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন
“এদিকে শপথ অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি তৈরি করা হচ্ছে। জানা গেল প্রধান সেনাপতি ওসমানীর সামরিক পোশাক নেই। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের জন্য তার সামরিক পোশাক প্রয়োজন। বিএসএফকে ওসমানীর জন্য এক সেট সামরিক পোশাক দিতে বললাম। তাদের স্টকে ওসমানীর গায়ের কোনো পোশাক পাওয়া গেল না। সেই রাতে কাপড় কিনে, দর্জি ডেকে তাঁর জন্য পোশাক তৈরি করা হলো। শপথ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের হাজির করার ভার আমার ও আবদুল মান্নানের ওপর ছিল। ১৬ এপ্রিল আমরা দুজনে কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুজন প্রতিনিধি বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে মিলিত হই। সমস্ত প্রেসক্লাব লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাঁই নেই।”
‘সমবেত সাংবাদিকদের পরদিন ১৭ এপ্রিল কাকডাকা ভোরে প্রেসক্লাবে হাজির হতে অনুরোধ জানাই। বললাম, তখন তাদের আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিশেষ বার্তা দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার জন্য আমাদের গাড়ি তৈরি থাকবে বলেও জানালাম। বিএসএফের চট্টোপাধ্যায়কে বলি আমাদের জন্য ১০০টি গাড়ির ব্যবস্থা করতে। এর ৫০টা থাকবে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের বহন করার জন্য। অবশিষ্ট ৫০টার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পৌছানো হবে।’
‘রাত ১২টা থেকে নেতাদের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। বলে দেওয়া হলো, কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করতে পারবেন না। সকালবেলা আমরা একত্র হব।
গাড়ির চালক নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেবেন। সাইক্লোস্টাইল করা স্বাধীনতা সনদের কপিগুলো গুছিয়ে নিলাম।
১৭ এপ্রিল জাতীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের দিন। সারা রাত ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ওসমানী একটি গাড়িতে রওনা হয়ে যান। আমি ও আবদুল মান্নান ভোরের দিকে পূর্ব কর্মসূচি অনুযায়ী কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। ভোরেও ক্লাবে লোক ধরেনি। ক্লাবের বাইরেও অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিল।’
‘সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে বিনীতভাবে বললাম, আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনাদের জন্য একটা বার্তা নিয়ে এসেছি। তাদের জানালাম স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথগ্রহণ করবে। আপনারা সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। কেউ জানতে চাইলেন কিভাবে যাবেন, কোথায় যাবেন। আমি পুনরায় বলি, আমি আপনাদের সঙ্গে রয়েছি, পথ দেখিয়ে দেব। আমাদের গাড়িগুলো তখন প্রেসক্লাবের সামনে। উৎসাহিত সাংবাদিকরা গাড়িতে ওঠেন। তাদের অনেকের কাঁধে ক্যামেরা। ৫০-৬০টা গাড়িযোগে রওনা হলাম গন্তব্যস্থানের দিকে। আমি ও আবদুল মান্নান দুজন দুই গাড়িতে। আমার গাড়িতে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন। পথে তাদের সাথে অনেক কথা হলো। শপথ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত স্থান আম্রকাননে পৌছতে বেলা ১১টা বেজে গেল। অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় শেষ। মাহবুব ও তৌফিক ইলাহী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। আগেই ঠিক করা হয়েছিল যে, চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সনদ পাঠ করবেন।’
আমবাগানে মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ
‘কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। একটি ছোট্ট মঞ্চে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, ওসমানী, আবদুল মান্নান ও আমি। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল অস্থায়ী সরকারের রাজধানী। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান প্রশ্ন ছিল সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়? জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। তাঁর সাথে আমাদের চিন্তার (বিস্তর) যোগাযোগ রয়েছে। আমরা জানতাম বঙ্গবন্ধু শত্রুশিবিরে বন্দি। কিন্তু আমরা তা বলতে চাইনি। পাক বাহিনী বলুক এটাই আমরা চাচ্ছিলাম। কারণ আমরা যদি বলি বঙ্গবন্ধু পাক শিবিরে, আর তারা যদি অস্বীকার করে তা হলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। আর আমরা যদি বলি তিনি দেশের ভেতরে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন হানাদাররা বলে বসবে তিনি বন্দি।’
‘আমবাগানের অনুষ্ঠানে ভরদুপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়। হাজারো কণ্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি স্লোগান। আমার কাজ ছিল দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করে সাংবাদিকদের ফেরত পাঠানো। দুপুরের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। সাংবাদিকদের গাড়িযোগে ফেরত পাঠানো হলো। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ফেরেন সন্ধ্যায়।’
(মুজিবনগর, কাঠামো ও কার্যকারণ, সম্পাদনা আফসান চৌধুরী, পৃষ্ঠা ১১৪-১২৫)
এই বর্ণনার পর নিশ্চয় যে কোনো বিবেচক পাঠক বুঝতে পারবেন, ১৭ এপ্রিল কীভাবে আমাদের হয়েছিল।

১৭ এপ্রিল কী ঘটেছিল এই দেশে? ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল?
১৭ এপ্রিল তারিখটায় পৌঁছাতে হলে মেলে ধরতে হয় ইতিহাসের ডানা। এই দিনে বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে মুজিবনগর। কেন মুজিবনগর? মুজিব তো তখন নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরেছে ইয়াহিয়া। বিচারের নাম করে শেখ মুজিবকে হত্যা করার তোড়জোড় চলছে তখন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের শপথ নেওয়ার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো, তার নাম তো আর কিছুই হতে পারে না। তাই বৈদ্যনাথতলা রাতারাতি বদলে গিয়ে নাম ধারণ করল মুজিবনগর। মুজিব তখন প্রতিটি মানুষের প্রাণের শক্তি, মুজিব তখন নিজেই একটি দেশের প্রতিচ্ছবি।
সেই ইতিহাস কি ভুলে যাবে মানুষ?
কবিরা যদিও বলে থাকেন, ‘লোকে ভুলে যেতে চায়, সহজেই ভোলে।’ কিন্তু সবাই কি ভোলে? সবকিছু কি ভোলা যায়? ভুলিয়ে দিতে চাইলেও মনের কোনো সূক্ষ্ণ কোণে সত্য কি জেগে থাকে না? নাকি সবই গরল ভেল?
সেই প্রচণ্ড পৈশাচিকতার পর প্রতিদিন চলছিল বাঙালি নিধন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার। ১৭ এপ্রিল সেই সরকার কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত হয় এই সরকার।
২
ইয়াহিয়া ও তার সামরিক জান্তা বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল তার হানাদার বাহিনীকে, ২৫ মার্চ রাতে। সেই একাত্তরের কথাই তো বলছি। মুখে বলছিল আলোচনা চলছে। কেন এ রকম মিথ্যে বলছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট? অপারেশন সার্চলাইটের ঝান্ডা-বরদাররা ছিল ইয়াহিয়ার পাশেই। তারা অবিরত ইয়াহিয়ার কানে কানে বলে চলেছিল, ইয়াহিয়া যেন শেখ মুজিবকে বুঝতে না দেন তার মনের মধ্যে কী আছে। বলে চলেছিল, আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, পরিষদ বসার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখার ভান করাকে যেন প্রাধান্য দেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। সমস্যা-অন্তে আছে সমাধান—এ রকম কথাই তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজনীতির মঞ্চে।
কিন্তু তখন তো প্লেনভর্তি সৈন্য আসছে ঢাকায়।
কেন আসছে?
তখন তো পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা চলে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে।
কেন যাচ্ছে?
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানিদের আসতে দেওয়া হচ্ছে না বাংলায়।
কেন দেওয়া হচ্ছে না?
অন্ধকার যে ঘণীভূত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এ দেশের ভাগ্যে, সেটা কি আঁচ করা যাচ্ছিল তখন?
৩
১৭ এপ্রিলের মুজিবনগরে এসে দাঁড়াতে হলে আমাদের তো আগের কিছু কথা বলে নিতেই হবে। নইলে কীভাবে দিনটি এল, কীভাবে বাংলার মানুষ জানল, মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম হয়েছে, বাংলাদেশ তার নাম?
এই দেশের রাষ্ট্রপতির নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি তখন পাকিস্তানের জেলে। তার পরও তাঁকেই কেন প্রেসিডেন্ট করা হলো নবগঠিত এই দেশের?
এ প্রশ্ন কি জেগে ওঠে না আজকের তরুণের মনে?
কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে টিটকারি মেরে বলে থাকে, তিনি তো পালিয়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে!
ডাহা মিথ্যা কথা! মেরুদণ্ড সোজা রেখে এই সব অপপ্রচারকারীকে সিকান্দর আবু জাফরের ভাষায় বলতে হয়, ‘তুমি বাংলা ছাড়ো!’ কেন বলতে হয়? বলতে হয় এ কারণে যে, বাংলার ইতিহাস না জানলে এই ‘পালিয়ে যাওয়া’ তত্ত্বই গিলে খেতে হবে।
যে মানুষটিকে গ্রেপ্তার করতে পারলে বিচারিক প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলানো যায়, সেই মানুষটি কি জানতেন না, ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনী তাঁকে হত্যা করতে পারে? জানতেন না, স্বল্পকাল আগে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান তাঁকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দেওয়ার কত চেষ্টাই না করেছিল? প্রবল গণ-আন্দোলন, তথা গণ-অভ্যুত্থানই জেলের তালা ভেঙে শেখ মুজিবকে ফিরিয়ে এনেছিল মুক্ত পৃথিবীতে?
শেখ মুজিব নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
আর তাঁর নামেই এসেছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। তাই আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ।
৪
মুজিবনগর সরকার গঠনের কোনো পূর্ব প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছিল না। তবে ভারত শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে গেছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিবনগর সরকারকে যুদ্ধের শেষ সময়েই কেবল স্বীকৃতি দিয়েছে।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও যুদ্ধ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে মুজিবনগর সরকার কোনো বাধা পায়নি। আর এই স্বীকৃতি দেওয়া-না-দেওয়ার বিষয়টি ভারতকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। অর্থাৎ, একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র না হওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে একটি নতুন রাষ্ট্রকে মদদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনতে পারেনি পাকিস্তান।
একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব, পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা বাঙালিকে দলমত-নির্বিশেষে একাত্ম করেছে। পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খান আসন্ন পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তার রেশ অপারেশন সার্চলাইট পর্যন্তই চলে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই অসাধারণ ভাষণের পর আর কারও কোনো সন্দেহ থাকেনি যে, আজ হোক, কাল হোক বাংলাদেশের জন্ম একটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাকিস্তানিরাই বাঙালি হত্যাযজ্ঞ শুরু করে সেই সময়টিকে তৈরি করে দিল।
সত্তরের নির্বাচনে ৬ দফার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়লাভের পর শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল অবধারিত। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টো এবং তাদের সামরিক জান্তার দল ভিন্ন কৌশল নিয়েছিল। কৌশল না বলে বাঙালি হত্যার ষড়যন্ত্র বললেই তা লক্ষভেদী হবে। ইয়াহিয়া বিক্ষোভের জবাব দিতে চেয়েছিলেন অস্ত্রের ভাষায়। কিন্তু ততদিনে এই আন্দোলন হয়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্ত। মোটামুটি সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আন্দোলনে শরিক মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মেনে চলছিলেন। ২৫ মার্চ সামরিক বাহিনী যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাতে সেই রক্ষক্ষয়ী নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় অবস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যারা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের বিপরীত পক্ষ ছিল, তারাও এক হয়ে বাংলাদেশীদের এককাট্টা করে দেয়। ফলে পাকিস্তানিরা এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে প্রাথমিকভাবে নিজেদের জয়ী মনে করলেও মূলত তাদের এই জয় ছিল সাময়িক আর এই সময়ের ইতিহাসের ভ্রূণে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ সরকার।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায়ে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া শাসনতন্ত্র রচনা করার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান না করে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখে এবং আলাপ -আলোচনা চলাকালে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আরও ঘোষণা করেন, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এ সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকবেন। রাষ্ট্রপ্রধানের অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন এবং অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। যেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণা বা প্রক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস ১০ এপ্রিল হয়েছে, তাই আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণের তারিখ ১৭ এপ্রিল নির্ধারিত হয়।
১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেতার ভাষণে বলেন, ‘২৫ মার্চ মাঝরাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয় দিয়ে যে নরহত্যাযজ্ঞের শুরু করেন, তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার জন্য আমরা যেমন জীবন দিতে পারি, তেমনি আমাদের দেশ থেকে বিদেশি শত্রু সেনাদের চিরতরে হটিয়ে দিতে সক্ষম। আমাদের অদম্য সাহস ও মনোবলের কাছে শত্রু যত যত প্রবল পরাক্রম হোক না কেন, পরাজয় বরন করতে বাধ্য। আমরা যদি প্রথম আঘাত প্রতিহত করতে ব্যর্থ হতাম, তাহলে নতুন স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হয়তো কিছুদিনের জন্য হরেও পিছিয়ে যেত।’
তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ মুক্ত।’
বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়েছিল ১৩ এপ্রিল। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রীসভার অন্য সদস্যরা হলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
১৪ এপ্রিল জনসাধারণের প্রতি বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু নির্দেশাবলি জারি করেন। এবং এদিন অস্থায়ী সরকারের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কর্নেল ওসমানিকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়াও আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে মেজর খালেদ মোশাররফকে সিলেট কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মেজর জিয়াউর রহমানকে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম নোয়াখালী অঞ্চলের দায়িত্ব। ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল অঞ্চলের দায়িত্ব পান মেজর শফিউল্লাহ। আর মেজর এম এ ওসমান পান দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলের দায়িত্ব।
৫
এবার ১৭ এপ্রিলের ঘটনা শোনা যাক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে।
প্রথমেই পাবনার সাবেক ডিসি ও পরবর্তীকালে মুজিবনগর সরকারের অন্যতম সচিব মোহাম্মদ নূরুল কাদেরের কথা আলোচনায় আনতে পারি।
কেমন ছিল সেদিন বৈদ্যনাথতলা বা মুজিবনগর?
মোহাম্মদ নূরুল কাদেরের ভাষায়, ‘নির্ধারিত স্থানে মঞ্চ তৈরি হলো, আশপাশের বাড়ি থেকে চৌকি এবং বাঁশ আনা হলো। উন্মুক্ত মঞ্চ এটি। উপরে শামিয়ানা কিংবা ব্যনার কোনোটাই লাগানো সম্ভব হলো না। নিভৃত গ্রাম এলাকা। লোকবসতি শহরের তুলনায় অনেক কম। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে যে আয়োজন, তাতেও মানুষ হলো প্রচুর। দেখতে দেখতে সভাস্থলে অন্তত হাজার পাঁচেক লোক জমায়েত হলো।’
তিনি লিখছেন, ‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব ক্যাপ্টেন হাফিজ ও আমার ওপর অর্পিত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা যে সব পথ দিয়ে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারে, এমন জায়গাগুলোতে আমরা কড়া পাহারার ব্যবস্থা করি। তখন বেলা এগারোটা। আমগাছের ফাঁক দিয়ে এপ্রিলের সূর্যের নিশানা। আমবাগানের ভেতর কয়েক হাজার দর্শক। ক্ষণে ক্ষণে গগনবিদারী শ্লোগান, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ উত্তেজনা বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। কারণ উপস্থিত সবাই এমন এক দৃশ্য দেখতে যাচ্ছে, যা কারো পক্ষেই ইতিপূর্বে দেখা সম্ভব হয়নি। একটি জাতির জীবনে এ ধরনের অনুষ্ঠান অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এই বিরল ঘটনা প্রত্যক্ষ করল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় উপস্থিত প্রায় ৫ হাজার মানুষ। বৈদ্যনাথতলা হয়ে গেল মুজিবনগর। (একাত্তর আমার, মোহাম্মদ নূরুল কাদের, পৃষ্ঠা ৪৭)।
মোহাম্মদ নূরুল কাদের তার স্মৃতিচারণে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের কথা বলেছেন। হাফিজু উদ্দিন আহমদ তাঁর ‘সৈনিকের জীবন, গৌরবের একাত্তর, রক্তাক্ত পঁচাত্তর নামের বইয়ে লিখেছেন, ’ ১০ এপ্রিল ভারতের সহায়তায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল সে সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম বৈদ্যনাথতলা। তিনদিক থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড বেষ্টিত। এখানে বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে আমবাগান। সেখানে দুটি কাঠের চৌকি জোড়া দিয়ে মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো সাজসজ্জা বা জৌলুস নেই। হাজার হাজার জনতা সীমান্তের উভয় পার থেকে এসে আমবাগানে সমবেত হয়েছে। সবার চোখে মুখে ঔৎসুক্য।
‘আমরা বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বৈদ্যনাথ তলায় পৌঁছলাম। নেতারা যথাসময়েই সেখানে এসে পৌঁছুলেন। রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার দায়িত্ব ইপিআর সেনাদলের। কিন্তু আমাদের পৌঁছুতে কিছুটা দেরি হওয়ায় এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আটজন আনসারের সমন্বয়ে একটি দল নিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ‘গার্ড অব অনার’ দেন।
এখানেই দেখা হলো প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানির সঙ্গে। তিনি ব্রিটিশ সেনা বাহিনীতে আর্মি সার্ভিস কোরে কমিশনপ্রাপ্ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর চালচলন বা ম্যানারিজমে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য দৃশ্যমান। হালকা-পাতলা গড়ন, প্রখর ব্যক্তিতের অধিকারী। বিশাল গোঁফ তার মুখমণ্ডলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সহজেই সমীহ আদায় করে। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে তিনি পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত হন এবং প্রথম ইস্টবেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার রূপে দায়িত্ব পালন করেন। আমাকে দেখে ভারি খুশি হলেন প্রধান সেনাপতি ওসমানি। পিঠ চাপড়ে দিয়ে অভিনন্দন জানালেন, ‘ওহ মাই বয়! জলি গুড শো।’
‘থ্যাংক য়্যু, স্যার।’ আমি বললাম।
‘আমি পরদিন বেনাপোল যাব সিনিয়র টাইগারদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য।’ ওসমানি বললেন।
‘মোস্ট ওয়েলকাম স্যার। আমরা অপেক্ষায় থাকব।’ আমি বললাম।
উপস্থিত চারজন সেনা কর্মকর্তা মেজর ওসমান, ক্যাপ্টেন এ টি সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে পরিচিত হলেন প্রধান সেনাপতি। ছোটমঞ্চের পাশে ছয়টি ফোল্ডিং চেয়ারে উপবিষ্ট হলাম ভারতের লে. কর্ণেল মেঘ সিংসহ আমরা ছয় অফিসার।
একটু পরই অনুষ্ঠান শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হলো। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। ফলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি রুপে শপথ গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ মন্ত্রী রুপে শপথ নেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। কর্নেল ওসমানিকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক মুভি ক্যামেরা নিয়ে এই অনুষ্ঠান কাভার করেন। শপথগ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ইংরেজি ভাষায় চমৎকার একটি বক্তব্য দেন। বাঙালিদের বঞ্চনার ইতিহাস, ২৫ মার্চের গণহত্যা, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার কথা তিনি মর্মস্পর্শী ভাষায় উপস্থাপন করেন। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য আবেদন জানান। হাজার হাজার শ্রোতা-দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার সে বক্তব্য শোনেন। আম্রকাননের অনুষ্ঠান, পরিবেশ, পরিস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। হাজারো মুক্তিকামী মানুষের পদভারে প্রকম্পিত। কয়েক কিলোমিটার দূরেই পলাশীর আম্রকানন। ১৭৫৭ সালে সেখানেই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। আজ আরেক আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য আবার উদিত হলো।
মুজিবনগর সরকারের কেবিনেট সচিব হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচটি ইমাম নামেই তিনি পরিচিত) মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে বলছেন, ‘আমাদের সরকার মূলত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, যেটি আমরা বলতাম, তার প্রধান দপ্তর বা হেড কোয়ার্টার ছিল মুজিবনগর।
আপনারা সবাই জানেন যে, মুজিবনগর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মেহেরপুর জেলায় আমবাগানে। পলাশীর বিখ্যাত আমবাগানের কাছেই সেই জায়গাটিতেই মুজিবনগর। মুজিব নগরেই আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়। স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। আমাদের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নামেই মুজিবনগর করা হয়। আর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, অন্য মন্ত্রীরা ছিলেন এম মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ। আরও অনেক বড় নেতা ছিলেন।
যুদ্ধকালীন যে পরিস্থিতি, তাতে দ্বিতীয় মহাযুদবধ বা পরবর্তীকালেও যে সমস্ত প্রবাসী সরকার দেখেন, তারা কিন্তু নিরাপত্তার কারণে, রাজনৈতিক কারণে ঠিক একটি জায়গায় কোনো সময়েই থাকেননি। মুজিবনগর হেডকোয়ার্টার ছিল বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে। আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও ছিল। কিন্তু আমাদের মূল দপ্তর ছিল কোলকাতায়, থিয়েটার রোডে। সেখানেই আমাদের যৌথ বাহিনী, মিত্র বাহিনীর হেড কোয়াটার ছিল। (বাংলাদেশ ১৯৭১, সম্পাদনা আফসান চৌধুরী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১১)।
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের স্মৃতিচারণ এক্ষেত্রে খুব ভালো একটি সংযোজন হতে পারে। দীর্ঘ সে স্মৃতিচারণের নির্দিষ্ট একটি অংশই এখানে দেওয়া হলো:
‘আমরা বঙ্গবন্ধুকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আত্মগোপনের জন্য চাপ দিই। তিনি আত্মগোপনের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আত্মগোপনের জন্য তিনি পূর্ব থেকেই বঙ্গবন্ধুকে বলে আসছেন। তিনি কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, আমাকে নিয়ে তোরা কোথায় রাখবি? বাংলাদেশে আত্মগোপন সম্ভব নয়। আমার হয়তো মৃত্যু হবে, কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’
এরপর তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তাজউদ্দীন আহমদসহ তিনি সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছুলেন। তারপর বলছেন, ‘সীমান্ত থেকে কিছু দূরে একটি জঙ্গলের মাঝে ছোট্ট খালের ওপর একটি ব্রিটিশ যুগের তৈরি কালভার্ট। কালভার্টের ওপর তাজউদ্দীন ভাই ও আমি বসে আছি। আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে তৌফিক ও মাহবুবকে ওপারে পাঠাই। কিছুক্ষণ পর অন্ধকারে মানুষের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। অফিসারটি জানান, আমাদের তিনি যথোপযুক্ত সম্মান দিয়ে ছাউনিতে নিয়ে যেতে এসেছেন।’
‘কিছুক্ষণের মধ্যেই বিএসএফের আঞ্চলিকপ্রধান গোলক মজুমদার ছাউনিতে এসে পৌছলেন। তিনি জানান, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। তার সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন। তবে দিল্লির সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়।
মজুমদার নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তিনি জানান, আমাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে এই ফ্লাইটে দিল্লি থেকে একজন কর্মকর্তা আসবেন। বিমান থেকে ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা একজন লোক নেমে সোজা আমাদের গাড়িতে উঠলেন। মজুমদার তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি হলেন বিএসএফের প্রধান রুস্তমজি। রুস্তমজি একসময় ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর নিরাপত্তাপ্রধান ছিলেন। নেহরু পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর খুবই আস্থাভাজন।’
‘এদিকে আমার কাপড়-চোপড়ের অবস্থা একেবারেই শোচনীয়। গাড়িতেই শুরু হয় আলোচনা। রুস্তমজির প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কোথায়? মজুমদারের প্রথম প্রশ্নও ছিল এটাই। এর পরে আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সকলেরই প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কেমন আছে? এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা তৈরি ছিলাম। দলীয় নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের ব্যাপারে আমরা একই উত্তর দিয়েছি। আমরা যা বলতে চেয়েছি তা হলো বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাচ্ছি। তিনি জানেন, আমরা কোথায় আছি। তিনি আমাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন। সময় হলে বা প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি উপযুক্ত স্থানে আমাদের সাথে দেখা করবেন।’
‘একটি সুন্দর বাড়িতে (আসাম হাউস) আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। একটি ঘরে আমি আর তাজউদ্দীন ভাই, অন্য ঘরে রুস্তমজি। আমরা খুবই ক্লান্ত। স্নান করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সাথে অতিরিক্ত কোনো কাপড় নেই। রুস্তমজি আমার পরিধেয় বস্ত্রের অভাবের কথা জেনে তার ইস্ত্রি করা।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
“৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন ভাই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তাদের কোনো সহযোগী ছিল না। স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী প্রথম প্রশ্ন করেন। “হাউ ইজ শেখ মুজিব, ইজ হি অল রাইট?” (শেখ মুজিব কেমন আছেন?) মিসেস গান্ধীর প্রশ্নের জবাবে তাজউদ্দীন ভাই বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর স্থান থেকে আমাদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের বিশ্বাস, তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ২৫ মার্চের পর তাঁর সঙ্গে আমাদের আর যোগাযোগ হয়নি।’ সাক্ষাতে তাজউদ্দীন ভাই আরও বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যে কোনো মূল্যে এই স্বাধীনতা আমাদের অর্জন করতে হবে।”
“তাজউদ্দীন ভাই ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, পাকিস্তান আমাদের আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা চালাতে পারে। যে কোনো মূল্যে পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। আমাদের অস্ত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহের। মাতৃভূমির স্বাধীনতাযুদ্ধে তাজউদ্দীন ভাই ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। বাংলাদেশের নেতা জানান, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে জোটনিরপেক্ষ। সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়। সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ ও সরকারের সহায়তা আমরা চাই।”
ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ
‘পরদিন তাজউদ্দীন ভাই দ্বিতীয়বারের মতো ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জানান, বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য এই খবর পাকিস্তান সরকার তখনো সরকারিভাবে প্রকাশ করেনি।’
‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাজউদ্দীন ভাই বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, তাঁদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর প্রচারের জন্য একটি বেতার স্টেশন স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়। ...দিল্লিতে বসেই তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা টেপ করা হয়। বক্তৃতার পূর্বে আমার কণ্ঠ থেকে ঘোষণা প্রচারিত হয়-এখন তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা দেবেন। এর পর তাজউদ্দীন ভাই বক্তৃতা শুরু করেন।’
‘...মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শপথের স্থানের জন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা চিন্তা করি। কিন্তু ১৩ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। পাক দস্যুরা সেখানে বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে। আমরা চুয়াডাঙ্গা রাজধানী করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত তা আর গোপন থাকেনি। চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়ে আমাদের নতুন স্থানের কথা চিন্তা করতে হলো। এই নিয়ে গোলক মজুমদারের সাথে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে সবাই একমত হন যে, যেখানেই আমরা অনুষ্ঠান করি না কেন, পাক বাহিনীর বিমান হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত মানচিত্র দেখে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলাকে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।’
“স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের খসড়াটি কোনো একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে দেখাতে পারলে ভালো হতো। ইতোমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীরা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। এদের মধ্যে সুব্রত রায় চৌধুরীর নাম আমি শুনেছি। রায় চৌধুরীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। বিএসএফের মাধ্যমে রায় চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। তিনি রাজি হলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার যে আইনানুগ অধিকার, তা মানবাধিকারের একটা অংশ। এই কথা স্বাধীনতার সনদে ফুটে উঠেছে। তিনি জানান, তিনি এর ওপর একটা বই লিখবেন। এই ঘোষণাপত্রের একটা কপি তাকে দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। এর পর আইন ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর বই লেখা শুরু করেন। তার রচিত বইটির নাম হচ্ছে ‘জেনেসিস অব বাংলাদেশ’।’
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন
“এদিকে শপথ অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি তৈরি করা হচ্ছে। জানা গেল প্রধান সেনাপতি ওসমানীর সামরিক পোশাক নেই। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের জন্য তার সামরিক পোশাক প্রয়োজন। বিএসএফকে ওসমানীর জন্য এক সেট সামরিক পোশাক দিতে বললাম। তাদের স্টকে ওসমানীর গায়ের কোনো পোশাক পাওয়া গেল না। সেই রাতে কাপড় কিনে, দর্জি ডেকে তাঁর জন্য পোশাক তৈরি করা হলো। শপথ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের হাজির করার ভার আমার ও আবদুল মান্নানের ওপর ছিল। ১৬ এপ্রিল আমরা দুজনে কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুজন প্রতিনিধি বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে মিলিত হই। সমস্ত প্রেসক্লাব লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাঁই নেই।”
‘সমবেত সাংবাদিকদের পরদিন ১৭ এপ্রিল কাকডাকা ভোরে প্রেসক্লাবে হাজির হতে অনুরোধ জানাই। বললাম, তখন তাদের আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিশেষ বার্তা দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার জন্য আমাদের গাড়ি তৈরি থাকবে বলেও জানালাম। বিএসএফের চট্টোপাধ্যায়কে বলি আমাদের জন্য ১০০টি গাড়ির ব্যবস্থা করতে। এর ৫০টা থাকবে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের বহন করার জন্য। অবশিষ্ট ৫০টার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পৌছানো হবে।’
‘রাত ১২টা থেকে নেতাদের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। বলে দেওয়া হলো, কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করতে পারবেন না। সকালবেলা আমরা একত্র হব।
গাড়ির চালক নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেবেন। সাইক্লোস্টাইল করা স্বাধীনতা সনদের কপিগুলো গুছিয়ে নিলাম।
১৭ এপ্রিল জাতীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের দিন। সারা রাত ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ওসমানী একটি গাড়িতে রওনা হয়ে যান। আমি ও আবদুল মান্নান ভোরের দিকে পূর্ব কর্মসূচি অনুযায়ী কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। ভোরেও ক্লাবে লোক ধরেনি। ক্লাবের বাইরেও অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিল।’
‘সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে বিনীতভাবে বললাম, আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনাদের জন্য একটা বার্তা নিয়ে এসেছি। তাদের জানালাম স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথগ্রহণ করবে। আপনারা সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। কেউ জানতে চাইলেন কিভাবে যাবেন, কোথায় যাবেন। আমি পুনরায় বলি, আমি আপনাদের সঙ্গে রয়েছি, পথ দেখিয়ে দেব। আমাদের গাড়িগুলো তখন প্রেসক্লাবের সামনে। উৎসাহিত সাংবাদিকরা গাড়িতে ওঠেন। তাদের অনেকের কাঁধে ক্যামেরা। ৫০-৬০টা গাড়িযোগে রওনা হলাম গন্তব্যস্থানের দিকে। আমি ও আবদুল মান্নান দুজন দুই গাড়িতে। আমার গাড়িতে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন। পথে তাদের সাথে অনেক কথা হলো। শপথ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত স্থান আম্রকাননে পৌছতে বেলা ১১টা বেজে গেল। অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় শেষ। মাহবুব ও তৌফিক ইলাহী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। আগেই ঠিক করা হয়েছিল যে, চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সনদ পাঠ করবেন।’
আমবাগানে মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ
‘কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। একটি ছোট্ট মঞ্চে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, ওসমানী, আবদুল মান্নান ও আমি। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল অস্থায়ী সরকারের রাজধানী। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান প্রশ্ন ছিল সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়? জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। তাঁর সাথে আমাদের চিন্তার (বিস্তর) যোগাযোগ রয়েছে। আমরা জানতাম বঙ্গবন্ধু শত্রুশিবিরে বন্দি। কিন্তু আমরা তা বলতে চাইনি। পাক বাহিনী বলুক এটাই আমরা চাচ্ছিলাম। কারণ আমরা যদি বলি বঙ্গবন্ধু পাক শিবিরে, আর তারা যদি অস্বীকার করে তা হলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। আর আমরা যদি বলি তিনি দেশের ভেতরে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন হানাদাররা বলে বসবে তিনি বন্দি।’
‘আমবাগানের অনুষ্ঠানে ভরদুপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়। হাজারো কণ্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি স্লোগান। আমার কাজ ছিল দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করে সাংবাদিকদের ফেরত পাঠানো। দুপুরের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। সাংবাদিকদের গাড়িযোগে ফেরত পাঠানো হলো। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ফেরেন সন্ধ্যায়।’
(মুজিবনগর, কাঠামো ও কার্যকারণ, সম্পাদনা আফসান চৌধুরী, পৃষ্ঠা ১১৪-১২৫)
এই বর্ণনার পর নিশ্চয় যে কোনো বিবেচক পাঠক বুঝতে পারবেন, ১৭ এপ্রিল কীভাবে আমাদের হয়েছিল।
জাহীদ রেজা নূর

১৭ এপ্রিল কী ঘটেছিল এই দেশে? ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল?
১৭ এপ্রিল তারিখটায় পৌঁছাতে হলে মেলে ধরতে হয় ইতিহাসের ডানা। এই দিনে বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে মুজিবনগর। কেন মুজিবনগর? মুজিব তো তখন নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরেছে ইয়াহিয়া। বিচারের নাম করে শেখ মুজিবকে হত্যা করার তোড়জোড় চলছে তখন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের শপথ নেওয়ার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো, তার নাম তো আর কিছুই হতে পারে না। তাই বৈদ্যনাথতলা রাতারাতি বদলে গিয়ে নাম ধারণ করল মুজিবনগর। মুজিব তখন প্রতিটি মানুষের প্রাণের শক্তি, মুজিব তখন নিজেই একটি দেশের প্রতিচ্ছবি।
সেই ইতিহাস কি ভুলে যাবে মানুষ?
কবিরা যদিও বলে থাকেন, ‘লোকে ভুলে যেতে চায়, সহজেই ভোলে।’ কিন্তু সবাই কি ভোলে? সবকিছু কি ভোলা যায়? ভুলিয়ে দিতে চাইলেও মনের কোনো সূক্ষ্ণ কোণে সত্য কি জেগে থাকে না? নাকি সবই গরল ভেল?
সেই প্রচণ্ড পৈশাচিকতার পর প্রতিদিন চলছিল বাঙালি নিধন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার। ১৭ এপ্রিল সেই সরকার কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত হয় এই সরকার।
২
ইয়াহিয়া ও তার সামরিক জান্তা বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল তার হানাদার বাহিনীকে, ২৫ মার্চ রাতে। সেই একাত্তরের কথাই তো বলছি। মুখে বলছিল আলোচনা চলছে। কেন এ রকম মিথ্যে বলছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট? অপারেশন সার্চলাইটের ঝান্ডা-বরদাররা ছিল ইয়াহিয়ার পাশেই। তারা অবিরত ইয়াহিয়ার কানে কানে বলে চলেছিল, ইয়াহিয়া যেন শেখ মুজিবকে বুঝতে না দেন তার মনের মধ্যে কী আছে। বলে চলেছিল, আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, পরিষদ বসার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখার ভান করাকে যেন প্রাধান্য দেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। সমস্যা-অন্তে আছে সমাধান—এ রকম কথাই তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজনীতির মঞ্চে।
কিন্তু তখন তো প্লেনভর্তি সৈন্য আসছে ঢাকায়।
কেন আসছে?
তখন তো পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা চলে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে।
কেন যাচ্ছে?
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানিদের আসতে দেওয়া হচ্ছে না বাংলায়।
কেন দেওয়া হচ্ছে না?
অন্ধকার যে ঘণীভূত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এ দেশের ভাগ্যে, সেটা কি আঁচ করা যাচ্ছিল তখন?
৩
১৭ এপ্রিলের মুজিবনগরে এসে দাঁড়াতে হলে আমাদের তো আগের কিছু কথা বলে নিতেই হবে। নইলে কীভাবে দিনটি এল, কীভাবে বাংলার মানুষ জানল, মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম হয়েছে, বাংলাদেশ তার নাম?
এই দেশের রাষ্ট্রপতির নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি তখন পাকিস্তানের জেলে। তার পরও তাঁকেই কেন প্রেসিডেন্ট করা হলো নবগঠিত এই দেশের?
এ প্রশ্ন কি জেগে ওঠে না আজকের তরুণের মনে?
কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে টিটকারি মেরে বলে থাকে, তিনি তো পালিয়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে!
ডাহা মিথ্যা কথা! মেরুদণ্ড সোজা রেখে এই সব অপপ্রচারকারীকে সিকান্দর আবু জাফরের ভাষায় বলতে হয়, ‘তুমি বাংলা ছাড়ো!’ কেন বলতে হয়? বলতে হয় এ কারণে যে, বাংলার ইতিহাস না জানলে এই ‘পালিয়ে যাওয়া’ তত্ত্বই গিলে খেতে হবে।
যে মানুষটিকে গ্রেপ্তার করতে পারলে বিচারিক প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলানো যায়, সেই মানুষটি কি জানতেন না, ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনী তাঁকে হত্যা করতে পারে? জানতেন না, স্বল্পকাল আগে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান তাঁকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দেওয়ার কত চেষ্টাই না করেছিল? প্রবল গণ-আন্দোলন, তথা গণ-অভ্যুত্থানই জেলের তালা ভেঙে শেখ মুজিবকে ফিরিয়ে এনেছিল মুক্ত পৃথিবীতে?
শেখ মুজিব নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
আর তাঁর নামেই এসেছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। তাই আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ।
৪
মুজিবনগর সরকার গঠনের কোনো পূর্ব প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছিল না। তবে ভারত শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে গেছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিবনগর সরকারকে যুদ্ধের শেষ সময়েই কেবল স্বীকৃতি দিয়েছে।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও যুদ্ধ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে মুজিবনগর সরকার কোনো বাধা পায়নি। আর এই স্বীকৃতি দেওয়া-না-দেওয়ার বিষয়টি ভারতকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। অর্থাৎ, একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র না হওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে একটি নতুন রাষ্ট্রকে মদদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনতে পারেনি পাকিস্তান।
একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব, পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা বাঙালিকে দলমত-নির্বিশেষে একাত্ম করেছে। পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খান আসন্ন পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তার রেশ অপারেশন সার্চলাইট পর্যন্তই চলে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই অসাধারণ ভাষণের পর আর কারও কোনো সন্দেহ থাকেনি যে, আজ হোক, কাল হোক বাংলাদেশের জন্ম একটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাকিস্তানিরাই বাঙালি হত্যাযজ্ঞ শুরু করে সেই সময়টিকে তৈরি করে দিল।
সত্তরের নির্বাচনে ৬ দফার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়লাভের পর শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল অবধারিত। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টো এবং তাদের সামরিক জান্তার দল ভিন্ন কৌশল নিয়েছিল। কৌশল না বলে বাঙালি হত্যার ষড়যন্ত্র বললেই তা লক্ষভেদী হবে। ইয়াহিয়া বিক্ষোভের জবাব দিতে চেয়েছিলেন অস্ত্রের ভাষায়। কিন্তু ততদিনে এই আন্দোলন হয়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্ত। মোটামুটি সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আন্দোলনে শরিক মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মেনে চলছিলেন। ২৫ মার্চ সামরিক বাহিনী যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাতে সেই রক্ষক্ষয়ী নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় অবস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যারা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের বিপরীত পক্ষ ছিল, তারাও এক হয়ে বাংলাদেশীদের এককাট্টা করে দেয়। ফলে পাকিস্তানিরা এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে প্রাথমিকভাবে নিজেদের জয়ী মনে করলেও মূলত তাদের এই জয় ছিল সাময়িক আর এই সময়ের ইতিহাসের ভ্রূণে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ সরকার।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায়ে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া শাসনতন্ত্র রচনা করার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান না করে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখে এবং আলাপ -আলোচনা চলাকালে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আরও ঘোষণা করেন, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এ সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকবেন। রাষ্ট্রপ্রধানের অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন এবং অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। যেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণা বা প্রক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস ১০ এপ্রিল হয়েছে, তাই আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণের তারিখ ১৭ এপ্রিল নির্ধারিত হয়।
১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেতার ভাষণে বলেন, ‘২৫ মার্চ মাঝরাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয় দিয়ে যে নরহত্যাযজ্ঞের শুরু করেন, তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার জন্য আমরা যেমন জীবন দিতে পারি, তেমনি আমাদের দেশ থেকে বিদেশি শত্রু সেনাদের চিরতরে হটিয়ে দিতে সক্ষম। আমাদের অদম্য সাহস ও মনোবলের কাছে শত্রু যত যত প্রবল পরাক্রম হোক না কেন, পরাজয় বরন করতে বাধ্য। আমরা যদি প্রথম আঘাত প্রতিহত করতে ব্যর্থ হতাম, তাহলে নতুন স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হয়তো কিছুদিনের জন্য হরেও পিছিয়ে যেত।’
তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ মুক্ত।’
বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়েছিল ১৩ এপ্রিল। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রীসভার অন্য সদস্যরা হলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
১৪ এপ্রিল জনসাধারণের প্রতি বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু নির্দেশাবলি জারি করেন। এবং এদিন অস্থায়ী সরকারের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কর্নেল ওসমানিকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়াও আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে মেজর খালেদ মোশাররফকে সিলেট কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মেজর জিয়াউর রহমানকে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম নোয়াখালী অঞ্চলের দায়িত্ব। ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল অঞ্চলের দায়িত্ব পান মেজর শফিউল্লাহ। আর মেজর এম এ ওসমান পান দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলের দায়িত্ব।
৫
এবার ১৭ এপ্রিলের ঘটনা শোনা যাক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে।
প্রথমেই পাবনার সাবেক ডিসি ও পরবর্তীকালে মুজিবনগর সরকারের অন্যতম সচিব মোহাম্মদ নূরুল কাদেরের কথা আলোচনায় আনতে পারি।
কেমন ছিল সেদিন বৈদ্যনাথতলা বা মুজিবনগর?
মোহাম্মদ নূরুল কাদেরের ভাষায়, ‘নির্ধারিত স্থানে মঞ্চ তৈরি হলো, আশপাশের বাড়ি থেকে চৌকি এবং বাঁশ আনা হলো। উন্মুক্ত মঞ্চ এটি। উপরে শামিয়ানা কিংবা ব্যনার কোনোটাই লাগানো সম্ভব হলো না। নিভৃত গ্রাম এলাকা। লোকবসতি শহরের তুলনায় অনেক কম। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে যে আয়োজন, তাতেও মানুষ হলো প্রচুর। দেখতে দেখতে সভাস্থলে অন্তত হাজার পাঁচেক লোক জমায়েত হলো।’
তিনি লিখছেন, ‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব ক্যাপ্টেন হাফিজ ও আমার ওপর অর্পিত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা যে সব পথ দিয়ে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারে, এমন জায়গাগুলোতে আমরা কড়া পাহারার ব্যবস্থা করি। তখন বেলা এগারোটা। আমগাছের ফাঁক দিয়ে এপ্রিলের সূর্যের নিশানা। আমবাগানের ভেতর কয়েক হাজার দর্শক। ক্ষণে ক্ষণে গগনবিদারী শ্লোগান, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ উত্তেজনা বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। কারণ উপস্থিত সবাই এমন এক দৃশ্য দেখতে যাচ্ছে, যা কারো পক্ষেই ইতিপূর্বে দেখা সম্ভব হয়নি। একটি জাতির জীবনে এ ধরনের অনুষ্ঠান অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এই বিরল ঘটনা প্রত্যক্ষ করল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় উপস্থিত প্রায় ৫ হাজার মানুষ। বৈদ্যনাথতলা হয়ে গেল মুজিবনগর। (একাত্তর আমার, মোহাম্মদ নূরুল কাদের, পৃষ্ঠা ৪৭)।
মোহাম্মদ নূরুল কাদের তার স্মৃতিচারণে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের কথা বলেছেন। হাফিজু উদ্দিন আহমদ তাঁর ‘সৈনিকের জীবন, গৌরবের একাত্তর, রক্তাক্ত পঁচাত্তর নামের বইয়ে লিখেছেন, ’ ১০ এপ্রিল ভারতের সহায়তায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল সে সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম বৈদ্যনাথতলা। তিনদিক থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড বেষ্টিত। এখানে বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে আমবাগান। সেখানে দুটি কাঠের চৌকি জোড়া দিয়ে মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো সাজসজ্জা বা জৌলুস নেই। হাজার হাজার জনতা সীমান্তের উভয় পার থেকে এসে আমবাগানে সমবেত হয়েছে। সবার চোখে মুখে ঔৎসুক্য।
‘আমরা বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বৈদ্যনাথ তলায় পৌঁছলাম। নেতারা যথাসময়েই সেখানে এসে পৌঁছুলেন। রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার দায়িত্ব ইপিআর সেনাদলের। কিন্তু আমাদের পৌঁছুতে কিছুটা দেরি হওয়ায় এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আটজন আনসারের সমন্বয়ে একটি দল নিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ‘গার্ড অব অনার’ দেন।
এখানেই দেখা হলো প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানির সঙ্গে। তিনি ব্রিটিশ সেনা বাহিনীতে আর্মি সার্ভিস কোরে কমিশনপ্রাপ্ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর চালচলন বা ম্যানারিজমে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য দৃশ্যমান। হালকা-পাতলা গড়ন, প্রখর ব্যক্তিতের অধিকারী। বিশাল গোঁফ তার মুখমণ্ডলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সহজেই সমীহ আদায় করে। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে তিনি পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত হন এবং প্রথম ইস্টবেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার রূপে দায়িত্ব পালন করেন। আমাকে দেখে ভারি খুশি হলেন প্রধান সেনাপতি ওসমানি। পিঠ চাপড়ে দিয়ে অভিনন্দন জানালেন, ‘ওহ মাই বয়! জলি গুড শো।’
‘থ্যাংক য়্যু, স্যার।’ আমি বললাম।
‘আমি পরদিন বেনাপোল যাব সিনিয়র টাইগারদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য।’ ওসমানি বললেন।
‘মোস্ট ওয়েলকাম স্যার। আমরা অপেক্ষায় থাকব।’ আমি বললাম।
উপস্থিত চারজন সেনা কর্মকর্তা মেজর ওসমান, ক্যাপ্টেন এ টি সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে পরিচিত হলেন প্রধান সেনাপতি। ছোটমঞ্চের পাশে ছয়টি ফোল্ডিং চেয়ারে উপবিষ্ট হলাম ভারতের লে. কর্ণেল মেঘ সিংসহ আমরা ছয় অফিসার।
একটু পরই অনুষ্ঠান শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হলো। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। ফলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি রুপে শপথ গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ মন্ত্রী রুপে শপথ নেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। কর্নেল ওসমানিকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক মুভি ক্যামেরা নিয়ে এই অনুষ্ঠান কাভার করেন। শপথগ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ইংরেজি ভাষায় চমৎকার একটি বক্তব্য দেন। বাঙালিদের বঞ্চনার ইতিহাস, ২৫ মার্চের গণহত্যা, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার কথা তিনি মর্মস্পর্শী ভাষায় উপস্থাপন করেন। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য আবেদন জানান। হাজার হাজার শ্রোতা-দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার সে বক্তব্য শোনেন। আম্রকাননের অনুষ্ঠান, পরিবেশ, পরিস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। হাজারো মুক্তিকামী মানুষের পদভারে প্রকম্পিত। কয়েক কিলোমিটার দূরেই পলাশীর আম্রকানন। ১৭৫৭ সালে সেখানেই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। আজ আরেক আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য আবার উদিত হলো।
মুজিবনগর সরকারের কেবিনেট সচিব হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচটি ইমাম নামেই তিনি পরিচিত) মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে বলছেন, ‘আমাদের সরকার মূলত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, যেটি আমরা বলতাম, তার প্রধান দপ্তর বা হেড কোয়ার্টার ছিল মুজিবনগর।
আপনারা সবাই জানেন যে, মুজিবনগর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মেহেরপুর জেলায় আমবাগানে। পলাশীর বিখ্যাত আমবাগানের কাছেই সেই জায়গাটিতেই মুজিবনগর। মুজিব নগরেই আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়। স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। আমাদের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নামেই মুজিবনগর করা হয়। আর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, অন্য মন্ত্রীরা ছিলেন এম মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ। আরও অনেক বড় নেতা ছিলেন।
যুদ্ধকালীন যে পরিস্থিতি, তাতে দ্বিতীয় মহাযুদবধ বা পরবর্তীকালেও যে সমস্ত প্রবাসী সরকার দেখেন, তারা কিন্তু নিরাপত্তার কারণে, রাজনৈতিক কারণে ঠিক একটি জায়গায় কোনো সময়েই থাকেননি। মুজিবনগর হেডকোয়ার্টার ছিল বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে। আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও ছিল। কিন্তু আমাদের মূল দপ্তর ছিল কোলকাতায়, থিয়েটার রোডে। সেখানেই আমাদের যৌথ বাহিনী, মিত্র বাহিনীর হেড কোয়াটার ছিল। (বাংলাদেশ ১৯৭১, সম্পাদনা আফসান চৌধুরী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১১)।
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের স্মৃতিচারণ এক্ষেত্রে খুব ভালো একটি সংযোজন হতে পারে। দীর্ঘ সে স্মৃতিচারণের নির্দিষ্ট একটি অংশই এখানে দেওয়া হলো:
‘আমরা বঙ্গবন্ধুকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আত্মগোপনের জন্য চাপ দিই। তিনি আত্মগোপনের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আত্মগোপনের জন্য তিনি পূর্ব থেকেই বঙ্গবন্ধুকে বলে আসছেন। তিনি কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, আমাকে নিয়ে তোরা কোথায় রাখবি? বাংলাদেশে আত্মগোপন সম্ভব নয়। আমার হয়তো মৃত্যু হবে, কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’
এরপর তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তাজউদ্দীন আহমদসহ তিনি সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছুলেন। তারপর বলছেন, ‘সীমান্ত থেকে কিছু দূরে একটি জঙ্গলের মাঝে ছোট্ট খালের ওপর একটি ব্রিটিশ যুগের তৈরি কালভার্ট। কালভার্টের ওপর তাজউদ্দীন ভাই ও আমি বসে আছি। আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে তৌফিক ও মাহবুবকে ওপারে পাঠাই। কিছুক্ষণ পর অন্ধকারে মানুষের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। অফিসারটি জানান, আমাদের তিনি যথোপযুক্ত সম্মান দিয়ে ছাউনিতে নিয়ে যেতে এসেছেন।’
‘কিছুক্ষণের মধ্যেই বিএসএফের আঞ্চলিকপ্রধান গোলক মজুমদার ছাউনিতে এসে পৌছলেন। তিনি জানান, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। তার সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন। তবে দিল্লির সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়।
মজুমদার নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তিনি জানান, আমাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে এই ফ্লাইটে দিল্লি থেকে একজন কর্মকর্তা আসবেন। বিমান থেকে ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা একজন লোক নেমে সোজা আমাদের গাড়িতে উঠলেন। মজুমদার তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি হলেন বিএসএফের প্রধান রুস্তমজি। রুস্তমজি একসময় ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর নিরাপত্তাপ্রধান ছিলেন। নেহরু পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর খুবই আস্থাভাজন।’
‘এদিকে আমার কাপড়-চোপড়ের অবস্থা একেবারেই শোচনীয়। গাড়িতেই শুরু হয় আলোচনা। রুস্তমজির প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কোথায়? মজুমদারের প্রথম প্রশ্নও ছিল এটাই। এর পরে আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সকলেরই প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কেমন আছে? এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা তৈরি ছিলাম। দলীয় নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের ব্যাপারে আমরা একই উত্তর দিয়েছি। আমরা যা বলতে চেয়েছি তা হলো বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাচ্ছি। তিনি জানেন, আমরা কোথায় আছি। তিনি আমাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন। সময় হলে বা প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি উপযুক্ত স্থানে আমাদের সাথে দেখা করবেন।’
‘একটি সুন্দর বাড়িতে (আসাম হাউস) আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। একটি ঘরে আমি আর তাজউদ্দীন ভাই, অন্য ঘরে রুস্তমজি। আমরা খুবই ক্লান্ত। স্নান করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সাথে অতিরিক্ত কোনো কাপড় নেই। রুস্তমজি আমার পরিধেয় বস্ত্রের অভাবের কথা জেনে তার ইস্ত্রি করা।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
“৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন ভাই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তাদের কোনো সহযোগী ছিল না। স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী প্রথম প্রশ্ন করেন। “হাউ ইজ শেখ মুজিব, ইজ হি অল রাইট?” (শেখ মুজিব কেমন আছেন?) মিসেস গান্ধীর প্রশ্নের জবাবে তাজউদ্দীন ভাই বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর স্থান থেকে আমাদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের বিশ্বাস, তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ২৫ মার্চের পর তাঁর সঙ্গে আমাদের আর যোগাযোগ হয়নি।’ সাক্ষাতে তাজউদ্দীন ভাই আরও বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যে কোনো মূল্যে এই স্বাধীনতা আমাদের অর্জন করতে হবে।”
“তাজউদ্দীন ভাই ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, পাকিস্তান আমাদের আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা চালাতে পারে। যে কোনো মূল্যে পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। আমাদের অস্ত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহের। মাতৃভূমির স্বাধীনতাযুদ্ধে তাজউদ্দীন ভাই ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। বাংলাদেশের নেতা জানান, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে জোটনিরপেক্ষ। সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়। সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ ও সরকারের সহায়তা আমরা চাই।”
ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ
‘পরদিন তাজউদ্দীন ভাই দ্বিতীয়বারের মতো ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জানান, বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য এই খবর পাকিস্তান সরকার তখনো সরকারিভাবে প্রকাশ করেনি।’
‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাজউদ্দীন ভাই বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, তাঁদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর প্রচারের জন্য একটি বেতার স্টেশন স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়। ...দিল্লিতে বসেই তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা টেপ করা হয়। বক্তৃতার পূর্বে আমার কণ্ঠ থেকে ঘোষণা প্রচারিত হয়-এখন তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা দেবেন। এর পর তাজউদ্দীন ভাই বক্তৃতা শুরু করেন।’
‘...মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শপথের স্থানের জন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা চিন্তা করি। কিন্তু ১৩ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। পাক দস্যুরা সেখানে বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে। আমরা চুয়াডাঙ্গা রাজধানী করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত তা আর গোপন থাকেনি। চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়ে আমাদের নতুন স্থানের কথা চিন্তা করতে হলো। এই নিয়ে গোলক মজুমদারের সাথে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে সবাই একমত হন যে, যেখানেই আমরা অনুষ্ঠান করি না কেন, পাক বাহিনীর বিমান হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত মানচিত্র দেখে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলাকে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।’
“স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের খসড়াটি কোনো একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে দেখাতে পারলে ভালো হতো। ইতোমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীরা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। এদের মধ্যে সুব্রত রায় চৌধুরীর নাম আমি শুনেছি। রায় চৌধুরীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। বিএসএফের মাধ্যমে রায় চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। তিনি রাজি হলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার যে আইনানুগ অধিকার, তা মানবাধিকারের একটা অংশ। এই কথা স্বাধীনতার সনদে ফুটে উঠেছে। তিনি জানান, তিনি এর ওপর একটা বই লিখবেন। এই ঘোষণাপত্রের একটা কপি তাকে দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। এর পর আইন ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর বই লেখা শুরু করেন। তার রচিত বইটির নাম হচ্ছে ‘জেনেসিস অব বাংলাদেশ’।’
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন
“এদিকে শপথ অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি তৈরি করা হচ্ছে। জানা গেল প্রধান সেনাপতি ওসমানীর সামরিক পোশাক নেই। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের জন্য তার সামরিক পোশাক প্রয়োজন। বিএসএফকে ওসমানীর জন্য এক সেট সামরিক পোশাক দিতে বললাম। তাদের স্টকে ওসমানীর গায়ের কোনো পোশাক পাওয়া গেল না। সেই রাতে কাপড় কিনে, দর্জি ডেকে তাঁর জন্য পোশাক তৈরি করা হলো। শপথ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের হাজির করার ভার আমার ও আবদুল মান্নানের ওপর ছিল। ১৬ এপ্রিল আমরা দুজনে কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুজন প্রতিনিধি বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে মিলিত হই। সমস্ত প্রেসক্লাব লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাঁই নেই।”
‘সমবেত সাংবাদিকদের পরদিন ১৭ এপ্রিল কাকডাকা ভোরে প্রেসক্লাবে হাজির হতে অনুরোধ জানাই। বললাম, তখন তাদের আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিশেষ বার্তা দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার জন্য আমাদের গাড়ি তৈরি থাকবে বলেও জানালাম। বিএসএফের চট্টোপাধ্যায়কে বলি আমাদের জন্য ১০০টি গাড়ির ব্যবস্থা করতে। এর ৫০টা থাকবে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের বহন করার জন্য। অবশিষ্ট ৫০টার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পৌছানো হবে।’
‘রাত ১২টা থেকে নেতাদের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। বলে দেওয়া হলো, কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করতে পারবেন না। সকালবেলা আমরা একত্র হব।
গাড়ির চালক নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেবেন। সাইক্লোস্টাইল করা স্বাধীনতা সনদের কপিগুলো গুছিয়ে নিলাম।
১৭ এপ্রিল জাতীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের দিন। সারা রাত ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ওসমানী একটি গাড়িতে রওনা হয়ে যান। আমি ও আবদুল মান্নান ভোরের দিকে পূর্ব কর্মসূচি অনুযায়ী কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। ভোরেও ক্লাবে লোক ধরেনি। ক্লাবের বাইরেও অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিল।’
‘সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে বিনীতভাবে বললাম, আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনাদের জন্য একটা বার্তা নিয়ে এসেছি। তাদের জানালাম স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথগ্রহণ করবে। আপনারা সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। কেউ জানতে চাইলেন কিভাবে যাবেন, কোথায় যাবেন। আমি পুনরায় বলি, আমি আপনাদের সঙ্গে রয়েছি, পথ দেখিয়ে দেব। আমাদের গাড়িগুলো তখন প্রেসক্লাবের সামনে। উৎসাহিত সাংবাদিকরা গাড়িতে ওঠেন। তাদের অনেকের কাঁধে ক্যামেরা। ৫০-৬০টা গাড়িযোগে রওনা হলাম গন্তব্যস্থানের দিকে। আমি ও আবদুল মান্নান দুজন দুই গাড়িতে। আমার গাড়িতে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন। পথে তাদের সাথে অনেক কথা হলো। শপথ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত স্থান আম্রকাননে পৌছতে বেলা ১১টা বেজে গেল। অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় শেষ। মাহবুব ও তৌফিক ইলাহী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। আগেই ঠিক করা হয়েছিল যে, চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সনদ পাঠ করবেন।’
আমবাগানে মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ
‘কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। একটি ছোট্ট মঞ্চে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, ওসমানী, আবদুল মান্নান ও আমি। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল অস্থায়ী সরকারের রাজধানী। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান প্রশ্ন ছিল সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়? জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। তাঁর সাথে আমাদের চিন্তার (বিস্তর) যোগাযোগ রয়েছে। আমরা জানতাম বঙ্গবন্ধু শত্রুশিবিরে বন্দি। কিন্তু আমরা তা বলতে চাইনি। পাক বাহিনী বলুক এটাই আমরা চাচ্ছিলাম। কারণ আমরা যদি বলি বঙ্গবন্ধু পাক শিবিরে, আর তারা যদি অস্বীকার করে তা হলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। আর আমরা যদি বলি তিনি দেশের ভেতরে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন হানাদাররা বলে বসবে তিনি বন্দি।’
‘আমবাগানের অনুষ্ঠানে ভরদুপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়। হাজারো কণ্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি স্লোগান। আমার কাজ ছিল দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করে সাংবাদিকদের ফেরত পাঠানো। দুপুরের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। সাংবাদিকদের গাড়িযোগে ফেরত পাঠানো হলো। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ফেরেন সন্ধ্যায়।’
(মুজিবনগর, কাঠামো ও কার্যকারণ, সম্পাদনা আফসান চৌধুরী, পৃষ্ঠা ১১৪-১২৫)
এই বর্ণনার পর নিশ্চয় যে কোনো বিবেচক পাঠক বুঝতে পারবেন, ১৭ এপ্রিল কীভাবে আমাদের হয়েছিল।

১৭ এপ্রিল কী ঘটেছিল এই দেশে? ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল?
১৭ এপ্রিল তারিখটায় পৌঁছাতে হলে মেলে ধরতে হয় ইতিহাসের ডানা। এই দিনে বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে মুজিবনগর। কেন মুজিবনগর? মুজিব তো তখন নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরেছে ইয়াহিয়া। বিচারের নাম করে শেখ মুজিবকে হত্যা করার তোড়জোড় চলছে তখন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের শপথ নেওয়ার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো, তার নাম তো আর কিছুই হতে পারে না। তাই বৈদ্যনাথতলা রাতারাতি বদলে গিয়ে নাম ধারণ করল মুজিবনগর। মুজিব তখন প্রতিটি মানুষের প্রাণের শক্তি, মুজিব তখন নিজেই একটি দেশের প্রতিচ্ছবি।
সেই ইতিহাস কি ভুলে যাবে মানুষ?
কবিরা যদিও বলে থাকেন, ‘লোকে ভুলে যেতে চায়, সহজেই ভোলে।’ কিন্তু সবাই কি ভোলে? সবকিছু কি ভোলা যায়? ভুলিয়ে দিতে চাইলেও মনের কোনো সূক্ষ্ণ কোণে সত্য কি জেগে থাকে না? নাকি সবই গরল ভেল?
সেই প্রচণ্ড পৈশাচিকতার পর প্রতিদিন চলছিল বাঙালি নিধন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার। ১৭ এপ্রিল সেই সরকার কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত হয় এই সরকার।
২
ইয়াহিয়া ও তার সামরিক জান্তা বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল তার হানাদার বাহিনীকে, ২৫ মার্চ রাতে। সেই একাত্তরের কথাই তো বলছি। মুখে বলছিল আলোচনা চলছে। কেন এ রকম মিথ্যে বলছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট? অপারেশন সার্চলাইটের ঝান্ডা-বরদাররা ছিল ইয়াহিয়ার পাশেই। তারা অবিরত ইয়াহিয়ার কানে কানে বলে চলেছিল, ইয়াহিয়া যেন শেখ মুজিবকে বুঝতে না দেন তার মনের মধ্যে কী আছে। বলে চলেছিল, আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, পরিষদ বসার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখার ভান করাকে যেন প্রাধান্য দেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। সমস্যা-অন্তে আছে সমাধান—এ রকম কথাই তখন ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজনীতির মঞ্চে।
কিন্তু তখন তো প্লেনভর্তি সৈন্য আসছে ঢাকায়।
কেন আসছে?
তখন তো পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা চলে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে।
কেন যাচ্ছে?
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানিদের আসতে দেওয়া হচ্ছে না বাংলায়।
কেন দেওয়া হচ্ছে না?
অন্ধকার যে ঘণীভূত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এ দেশের ভাগ্যে, সেটা কি আঁচ করা যাচ্ছিল তখন?
৩
১৭ এপ্রিলের মুজিবনগরে এসে দাঁড়াতে হলে আমাদের তো আগের কিছু কথা বলে নিতেই হবে। নইলে কীভাবে দিনটি এল, কীভাবে বাংলার মানুষ জানল, মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম হয়েছে, বাংলাদেশ তার নাম?
এই দেশের রাষ্ট্রপতির নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
তিনি তখন পাকিস্তানের জেলে। তার পরও তাঁকেই কেন প্রেসিডেন্ট করা হলো নবগঠিত এই দেশের?
এ প্রশ্ন কি জেগে ওঠে না আজকের তরুণের মনে?
কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে টিটকারি মেরে বলে থাকে, তিনি তো পালিয়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে!
ডাহা মিথ্যা কথা! মেরুদণ্ড সোজা রেখে এই সব অপপ্রচারকারীকে সিকান্দর আবু জাফরের ভাষায় বলতে হয়, ‘তুমি বাংলা ছাড়ো!’ কেন বলতে হয়? বলতে হয় এ কারণে যে, বাংলার ইতিহাস না জানলে এই ‘পালিয়ে যাওয়া’ তত্ত্বই গিলে খেতে হবে।
যে মানুষটিকে গ্রেপ্তার করতে পারলে বিচারিক প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলানো যায়, সেই মানুষটি কি জানতেন না, ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনী তাঁকে হত্যা করতে পারে? জানতেন না, স্বল্পকাল আগে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান তাঁকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দেওয়ার কত চেষ্টাই না করেছিল? প্রবল গণ-আন্দোলন, তথা গণ-অভ্যুত্থানই জেলের তালা ভেঙে শেখ মুজিবকে ফিরিয়ে এনেছিল মুক্ত পৃথিবীতে?
শেখ মুজিব নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
আর তাঁর নামেই এসেছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। তাই আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ।
৪
মুজিবনগর সরকার গঠনের কোনো পূর্ব প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছিল না। তবে ভারত শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করে গেছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিবনগর সরকারকে যুদ্ধের শেষ সময়েই কেবল স্বীকৃতি দিয়েছে।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও যুদ্ধ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে ভারতের দিক থেকে মুজিবনগর সরকার কোনো বাধা পায়নি। আর এই স্বীকৃতি দেওয়া-না-দেওয়ার বিষয়টি ভারতকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। অর্থাৎ, একটি স্বীকৃত রাষ্ট্র না হওয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে একটি নতুন রাষ্ট্রকে মদদ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনতে পারেনি পাকিস্তান।
একটু পেছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব, পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা বাঙালিকে দলমত-নির্বিশেষে একাত্ম করেছে। পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খান আসন্ন পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তার রেশ অপারেশন সার্চলাইট পর্যন্তই চলে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই অসাধারণ ভাষণের পর আর কারও কোনো সন্দেহ থাকেনি যে, আজ হোক, কাল হোক বাংলাদেশের জন্ম একটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাকিস্তানিরাই বাঙালি হত্যাযজ্ঞ শুরু করে সেই সময়টিকে তৈরি করে দিল।
সত্তরের নির্বাচনে ৬ দফার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়লাভের পর শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল অবধারিত। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টো এবং তাদের সামরিক জান্তার দল ভিন্ন কৌশল নিয়েছিল। কৌশল না বলে বাঙালি হত্যার ষড়যন্ত্র বললেই তা লক্ষভেদী হবে। ইয়াহিয়া বিক্ষোভের জবাব দিতে চেয়েছিলেন অস্ত্রের ভাষায়। কিন্তু ততদিনে এই আন্দোলন হয়ে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্ত। মোটামুটি সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আন্দোলনে শরিক মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মেনে চলছিলেন। ২৫ মার্চ সামরিক বাহিনী যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাতে সেই রক্ষক্ষয়ী নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় অবস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যারা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের বিপরীত পক্ষ ছিল, তারাও এক হয়ে বাংলাদেশীদের এককাট্টা করে দেয়। ফলে পাকিস্তানিরা এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে প্রাথমিকভাবে নিজেদের জয়ী মনে করলেও মূলত তাদের এই জয় ছিল সাময়িক আর এই সময়ের ইতিহাসের ভ্রূণে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ সরকার।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায়ে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া শাসনতন্ত্র রচনা করার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান না করে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখে এবং আলাপ -আলোচনা চলাকালে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আরও ঘোষণা করেন, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এ সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত থাকবেন। রাষ্ট্রপ্রধানের অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন এবং অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। যেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণা বা প্রক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস ১০ এপ্রিল হয়েছে, তাই আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণের তারিখ ১৭ এপ্রিল নির্ধারিত হয়।
১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেতার ভাষণে বলেন, ‘২৫ মার্চ মাঝরাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর লেলিয় দিয়ে যে নরহত্যাযজ্ঞের শুরু করেন, তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার জন্য আমরা যেমন জীবন দিতে পারি, তেমনি আমাদের দেশ থেকে বিদেশি শত্রু সেনাদের চিরতরে হটিয়ে দিতে সক্ষম। আমাদের অদম্য সাহস ও মনোবলের কাছে শত্রু যত যত প্রবল পরাক্রম হোক না কেন, পরাজয় বরন করতে বাধ্য। আমরা যদি প্রথম আঘাত প্রতিহত করতে ব্যর্থ হতাম, তাহলে নতুন স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হয়তো কিছুদিনের জন্য হরেও পিছিয়ে যেত।’
তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ মুক্ত।’
বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়েছিল ১৩ এপ্রিল। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রীসভার অন্য সদস্যরা হলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
১৪ এপ্রিল জনসাধারণের প্রতি বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু নির্দেশাবলি জারি করেন। এবং এদিন অস্থায়ী সরকারের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় কর্নেল ওসমানিকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়াও আঞ্চলিক কমান্ডার হিসেবে মেজর খালেদ মোশাররফকে সিলেট কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মেজর জিয়াউর রহমানকে দেওয়া হয় চট্টগ্রাম নোয়াখালী অঞ্চলের দায়িত্ব। ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল অঞ্চলের দায়িত্ব পান মেজর শফিউল্লাহ। আর মেজর এম এ ওসমান পান দক্ষিণ ও পশ্চিম অঞ্চলের দায়িত্ব।
৫
এবার ১৭ এপ্রিলের ঘটনা শোনা যাক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর কাছ থেকে।
প্রথমেই পাবনার সাবেক ডিসি ও পরবর্তীকালে মুজিবনগর সরকারের অন্যতম সচিব মোহাম্মদ নূরুল কাদেরের কথা আলোচনায় আনতে পারি।
কেমন ছিল সেদিন বৈদ্যনাথতলা বা মুজিবনগর?
মোহাম্মদ নূরুল কাদেরের ভাষায়, ‘নির্ধারিত স্থানে মঞ্চ তৈরি হলো, আশপাশের বাড়ি থেকে চৌকি এবং বাঁশ আনা হলো। উন্মুক্ত মঞ্চ এটি। উপরে শামিয়ানা কিংবা ব্যনার কোনোটাই লাগানো সম্ভব হলো না। নিভৃত গ্রাম এলাকা। লোকবসতি শহরের তুলনায় অনেক কম। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে যে আয়োজন, তাতেও মানুষ হলো প্রচুর। দেখতে দেখতে সভাস্থলে অন্তত হাজার পাঁচেক লোক জমায়েত হলো।’
তিনি লিখছেন, ‘পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব ক্যাপ্টেন হাফিজ ও আমার ওপর অর্পিত হয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা যে সব পথ দিয়ে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারে, এমন জায়গাগুলোতে আমরা কড়া পাহারার ব্যবস্থা করি। তখন বেলা এগারোটা। আমগাছের ফাঁক দিয়ে এপ্রিলের সূর্যের নিশানা। আমবাগানের ভেতর কয়েক হাজার দর্শক। ক্ষণে ক্ষণে গগনবিদারী শ্লোগান, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ উত্তেজনা বিরাজ করছে পুরো এলাকায়। কারণ উপস্থিত সবাই এমন এক দৃশ্য দেখতে যাচ্ছে, যা কারো পক্ষেই ইতিপূর্বে দেখা সম্ভব হয়নি। একটি জাতির জীবনে এ ধরনের অনুষ্ঠান অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এই বিরল ঘটনা প্রত্যক্ষ করল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় উপস্থিত প্রায় ৫ হাজার মানুষ। বৈদ্যনাথতলা হয়ে গেল মুজিবনগর। (একাত্তর আমার, মোহাম্মদ নূরুল কাদের, পৃষ্ঠা ৪৭)।
মোহাম্মদ নূরুল কাদের তার স্মৃতিচারণে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের কথা বলেছেন। হাফিজু উদ্দিন আহমদ তাঁর ‘সৈনিকের জীবন, গৌরবের একাত্তর, রক্তাক্ত পঁচাত্তর নামের বইয়ে লিখেছেন, ’ ১০ এপ্রিল ভারতের সহায়তায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল সে সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম বৈদ্যনাথতলা। তিনদিক থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড বেষ্টিত। এখানে বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে আমবাগান। সেখানে দুটি কাঠের চৌকি জোড়া দিয়ে মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো সাজসজ্জা বা জৌলুস নেই। হাজার হাজার জনতা সীমান্তের উভয় পার থেকে এসে আমবাগানে সমবেত হয়েছে। সবার চোখে মুখে ঔৎসুক্য।
‘আমরা বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বৈদ্যনাথ তলায় পৌঁছলাম। নেতারা যথাসময়েই সেখানে এসে পৌঁছুলেন। রাষ্ট্রপতিকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার দায়িত্ব ইপিআর সেনাদলের। কিন্তু আমাদের পৌঁছুতে কিছুটা দেরি হওয়ায় এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আটজন আনসারের সমন্বয়ে একটি দল নিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ‘গার্ড অব অনার’ দেন।
এখানেই দেখা হলো প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানির সঙ্গে। তিনি ব্রিটিশ সেনা বাহিনীতে আর্মি সার্ভিস কোরে কমিশনপ্রাপ্ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর চালচলন বা ম্যানারিজমে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য দৃশ্যমান। হালকা-পাতলা গড়ন, প্রখর ব্যক্তিতের অধিকারী। বিশাল গোঁফ তার মুখমণ্ডলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সহজেই সমীহ আদায় করে। পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে তিনি পদাতিক বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত হন এবং প্রথম ইস্টবেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার রূপে দায়িত্ব পালন করেন। আমাকে দেখে ভারি খুশি হলেন প্রধান সেনাপতি ওসমানি। পিঠ চাপড়ে দিয়ে অভিনন্দন জানালেন, ‘ওহ মাই বয়! জলি গুড শো।’
‘থ্যাংক য়্যু, স্যার।’ আমি বললাম।
‘আমি পরদিন বেনাপোল যাব সিনিয়র টাইগারদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য।’ ওসমানি বললেন।
‘মোস্ট ওয়েলকাম স্যার। আমরা অপেক্ষায় থাকব।’ আমি বললাম।
উপস্থিত চারজন সেনা কর্মকর্তা মেজর ওসমান, ক্যাপ্টেন এ টি সালাউদ্দিন, ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে পরিচিত হলেন প্রধান সেনাপতি। ছোটমঞ্চের পাশে ছয়টি ফোল্ডিং চেয়ারে উপবিষ্ট হলাম ভারতের লে. কর্ণেল মেঘ সিংসহ আমরা ছয় অফিসার।
একটু পরই অনুষ্ঠান শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হলো। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। ফলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি রুপে শপথ গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ মন্ত্রী রুপে শপথ নেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। কর্নেল ওসমানিকে মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। শতাধিক বিদেশি সাংবাদিক মুভি ক্যামেরা নিয়ে এই অনুষ্ঠান কাভার করেন। শপথগ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ইংরেজি ভাষায় চমৎকার একটি বক্তব্য দেন। বাঙালিদের বঞ্চনার ইতিহাস, ২৫ মার্চের গণহত্যা, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার কথা তিনি মর্মস্পর্শী ভাষায় উপস্থাপন করেন। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য আবেদন জানান। হাজার হাজার শ্রোতা-দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার সে বক্তব্য শোনেন। আম্রকাননের অনুষ্ঠান, পরিবেশ, পরিস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। হাজারো মুক্তিকামী মানুষের পদভারে প্রকম্পিত। কয়েক কিলোমিটার দূরেই পলাশীর আম্রকানন। ১৭৫৭ সালে সেখানেই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। আজ আরেক আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য আবার উদিত হলো।
মুজিবনগর সরকারের কেবিনেট সচিব হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচটি ইমাম নামেই তিনি পরিচিত) মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে বলছেন, ‘আমাদের সরকার মূলত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, যেটি আমরা বলতাম, তার প্রধান দপ্তর বা হেড কোয়ার্টার ছিল মুজিবনগর।
আপনারা সবাই জানেন যে, মুজিবনগর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মেহেরপুর জেলায় আমবাগানে। পলাশীর বিখ্যাত আমবাগানের কাছেই সেই জায়গাটিতেই মুজিবনগর। মুজিব নগরেই আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়। স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। আমাদের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নামেই মুজিবনগর করা হয়। আর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, অন্য মন্ত্রীরা ছিলেন এম মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ। আরও অনেক বড় নেতা ছিলেন।
যুদ্ধকালীন যে পরিস্থিতি, তাতে দ্বিতীয় মহাযুদবধ বা পরবর্তীকালেও যে সমস্ত প্রবাসী সরকার দেখেন, তারা কিন্তু নিরাপত্তার কারণে, রাজনৈতিক কারণে ঠিক একটি জায়গায় কোনো সময়েই থাকেননি। মুজিবনগর হেডকোয়ার্টার ছিল বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে। আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও ছিল। কিন্তু আমাদের মূল দপ্তর ছিল কোলকাতায়, থিয়েটার রোডে। সেখানেই আমাদের যৌথ বাহিনী, মিত্র বাহিনীর হেড কোয়াটার ছিল। (বাংলাদেশ ১৯৭১, সম্পাদনা আফসান চৌধুরী, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪১১)।
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের স্মৃতিচারণ এক্ষেত্রে খুব ভালো একটি সংযোজন হতে পারে। দীর্ঘ সে স্মৃতিচারণের নির্দিষ্ট একটি অংশই এখানে দেওয়া হলো:
‘আমরা বঙ্গবন্ধুকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আত্মগোপনের জন্য চাপ দিই। তিনি আত্মগোপনের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আত্মগোপনের জন্য তিনি পূর্ব থেকেই বঙ্গবন্ধুকে বলে আসছেন। তিনি কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, আমাকে নিয়ে তোরা কোথায় রাখবি? বাংলাদেশে আত্মগোপন সম্ভব নয়। আমার হয়তো মৃত্যু হবে, কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’
এরপর তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তাজউদ্দীন আহমদসহ তিনি সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছুলেন। তারপর বলছেন, ‘সীমান্ত থেকে কিছু দূরে একটি জঙ্গলের মাঝে ছোট্ট খালের ওপর একটি ব্রিটিশ যুগের তৈরি কালভার্ট। কালভার্টের ওপর তাজউদ্দীন ভাই ও আমি বসে আছি। আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে তৌফিক ও মাহবুবকে ওপারে পাঠাই। কিছুক্ষণ পর অন্ধকারে মানুষের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। অফিসারটি জানান, আমাদের তিনি যথোপযুক্ত সম্মান দিয়ে ছাউনিতে নিয়ে যেতে এসেছেন।’
‘কিছুক্ষণের মধ্যেই বিএসএফের আঞ্চলিকপ্রধান গোলক মজুমদার ছাউনিতে এসে পৌছলেন। তিনি জানান, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। তার সঙ্গে কলকাতা যাওয়ার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন। তবে দিল্লির সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়।
মজুমদার নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাদের বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তিনি জানান, আমাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে এই ফ্লাইটে দিল্লি থেকে একজন কর্মকর্তা আসবেন। বিমান থেকে ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা একজন লোক নেমে সোজা আমাদের গাড়িতে উঠলেন। মজুমদার তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি হলেন বিএসএফের প্রধান রুস্তমজি। রুস্তমজি একসময় ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর নিরাপত্তাপ্রধান ছিলেন। নেহরু পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর খুবই আস্থাভাজন।’
‘এদিকে আমার কাপড়-চোপড়ের অবস্থা একেবারেই শোচনীয়। গাড়িতেই শুরু হয় আলোচনা। রুস্তমজির প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কোথায়? মজুমদারের প্রথম প্রশ্নও ছিল এটাই। এর পরে আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সকলেরই প্রথম প্রশ্ন ছিল বঙ্গবন্ধু কেমন আছে? এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমরা তৈরি ছিলাম। দলীয় নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধাসহ সকলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের ব্যাপারে আমরা একই উত্তর দিয়েছি। আমরা যা বলতে চেয়েছি তা হলো বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাচ্ছি। তিনি জানেন, আমরা কোথায় আছি। তিনি আমাদের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন। সময় হলে বা প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি উপযুক্ত স্থানে আমাদের সাথে দেখা করবেন।’
‘একটি সুন্দর বাড়িতে (আসাম হাউস) আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। একটি ঘরে আমি আর তাজউদ্দীন ভাই, অন্য ঘরে রুস্তমজি। আমরা খুবই ক্লান্ত। স্নান করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সাথে অতিরিক্ত কোনো কাপড় নেই। রুস্তমজি আমার পরিধেয় বস্ত্রের অভাবের কথা জেনে তার ইস্ত্রি করা।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ
“৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন ভাই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তাদের কোনো সহযোগী ছিল না। স্বাগত সম্ভাষণ জানিয়ে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী প্রথম প্রশ্ন করেন। “হাউ ইজ শেখ মুজিব, ইজ হি অল রাইট?” (শেখ মুজিব কেমন আছেন?) মিসেস গান্ধীর প্রশ্নের জবাবে তাজউদ্দীন ভাই বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর স্থান থেকে আমাদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের বিশ্বাস, তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ২৫ মার্চের পর তাঁর সঙ্গে আমাদের আর যোগাযোগ হয়নি।’ সাক্ষাতে তাজউদ্দীন ভাই আরও বলেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যে কোনো মূল্যে এই স্বাধীনতা আমাদের অর্জন করতে হবে।”
“তাজউদ্দীন ভাই ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, পাকিস্তান আমাদের আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা চালাতে পারে। যে কোনো মূল্যে পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। আমাদের অস্ত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহের। মাতৃভূমির স্বাধীনতাযুদ্ধে তাজউদ্দীন ভাই ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন। বাংলাদেশের নেতা জানান, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে জোটনিরপেক্ষ। সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি শত্রুতা নয়। সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ ও সরকারের সহায়তা আমরা চাই।”
ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ
‘পরদিন তাজউদ্দীন ভাই দ্বিতীয়বারের মতো ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জানান, বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য এই খবর পাকিস্তান সরকার তখনো সরকারিভাবে প্রকাশ করেনি।’
‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাজউদ্দীন ভাই বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, তাঁদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর প্রচারের জন্য একটি বেতার স্টেশন স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা হয়। ...দিল্লিতে বসেই তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা টেপ করা হয়। বক্তৃতার পূর্বে আমার কণ্ঠ থেকে ঘোষণা প্রচারিত হয়-এখন তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে বক্তৃতা দেবেন। এর পর তাজউদ্দীন ভাই বক্তৃতা শুরু করেন।’
‘...মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শপথের স্থানের জন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা চিন্তা করি। কিন্তু ১৩ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। পাক দস্যুরা সেখানে বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করে। আমরা চুয়াডাঙ্গা রাজধানী করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত তা আর গোপন থাকেনি। চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়ে আমাদের নতুন স্থানের কথা চিন্তা করতে হলো। এই নিয়ে গোলক মজুমদারের সাথে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে সবাই একমত হন যে, যেখানেই আমরা অনুষ্ঠান করি না কেন, পাক বাহিনীর বিমান হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত মানচিত্র দেখে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলাকে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।’
“স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের খসড়াটি কোনো একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে দেখাতে পারলে ভালো হতো। ইতোমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীরা আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। এদের মধ্যে সুব্রত রায় চৌধুরীর নাম আমি শুনেছি। রায় চৌধুরীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। বিএসএফের মাধ্যমে রায় চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। তিনি রাজি হলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার যে আইনানুগ অধিকার, তা মানবাধিকারের একটা অংশ। এই কথা স্বাধীনতার সনদে ফুটে উঠেছে। তিনি জানান, তিনি এর ওপর একটা বই লিখবেন। এই ঘোষণাপত্রের একটা কপি তাকে দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। এর পর আইন ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর বই লেখা শুরু করেন। তার রচিত বইটির নাম হচ্ছে ‘জেনেসিস অব বাংলাদেশ’।’
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন
“এদিকে শপথ অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি তৈরি করা হচ্ছে। জানা গেল প্রধান সেনাপতি ওসমানীর সামরিক পোশাক নেই। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের জন্য তার সামরিক পোশাক প্রয়োজন। বিএসএফকে ওসমানীর জন্য এক সেট সামরিক পোশাক দিতে বললাম। তাদের স্টকে ওসমানীর গায়ের কোনো পোশাক পাওয়া গেল না। সেই রাতে কাপড় কিনে, দর্জি ডেকে তাঁর জন্য পোশাক তৈরি করা হলো। শপথ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের হাজির করার ভার আমার ও আবদুল মান্নানের ওপর ছিল। ১৬ এপ্রিল আমরা দুজনে কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুজন প্রতিনিধি বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে মিলিত হই। সমস্ত প্রেসক্লাব লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাঁই নেই।”
‘সমবেত সাংবাদিকদের পরদিন ১৭ এপ্রিল কাকডাকা ভোরে প্রেসক্লাবে হাজির হতে অনুরোধ জানাই। বললাম, তখন তাদের আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিশেষ বার্তা দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার জন্য আমাদের গাড়ি তৈরি থাকবে বলেও জানালাম। বিএসএফের চট্টোপাধ্যায়কে বলি আমাদের জন্য ১০০টি গাড়ির ব্যবস্থা করতে। এর ৫০টা থাকবে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের বহন করার জন্য। অবশিষ্ট ৫০টার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পৌছানো হবে।’
‘রাত ১২টা থেকে নেতাদের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। বলে দেওয়া হলো, কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করতে পারবেন না। সকালবেলা আমরা একত্র হব।
গাড়ির চালক নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেবেন। সাইক্লোস্টাইল করা স্বাধীনতা সনদের কপিগুলো গুছিয়ে নিলাম।
১৭ এপ্রিল জাতীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের দিন। সারা রাত ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ওসমানী একটি গাড়িতে রওনা হয়ে যান। আমি ও আবদুল মান্নান ভোরের দিকে পূর্ব কর্মসূচি অনুযায়ী কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। ভোরেও ক্লাবে লোক ধরেনি। ক্লাবের বাইরেও অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিল।’
‘সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে বিনীতভাবে বললাম, আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনাদের জন্য একটা বার্তা নিয়ে এসেছি। তাদের জানালাম স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথগ্রহণ করবে। আপনারা সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। কেউ জানতে চাইলেন কিভাবে যাবেন, কোথায় যাবেন। আমি পুনরায় বলি, আমি আপনাদের সঙ্গে রয়েছি, পথ দেখিয়ে দেব। আমাদের গাড়িগুলো তখন প্রেসক্লাবের সামনে। উৎসাহিত সাংবাদিকরা গাড়িতে ওঠেন। তাদের অনেকের কাঁধে ক্যামেরা। ৫০-৬০টা গাড়িযোগে রওনা হলাম গন্তব্যস্থানের দিকে। আমি ও আবদুল মান্নান দুজন দুই গাড়িতে। আমার গাড়িতে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন। পথে তাদের সাথে অনেক কথা হলো। শপথ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত স্থান আম্রকাননে পৌছতে বেলা ১১টা বেজে গেল। অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় শেষ। মাহবুব ও তৌফিক ইলাহী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। আগেই ঠিক করা হয়েছিল যে, চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সনদ পাঠ করবেন।’
আমবাগানে মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ
‘কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। একটি ছোট্ট মঞ্চে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, ওসমানী, আবদুল মান্নান ও আমি। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল অস্থায়ী সরকারের রাজধানী। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান প্রশ্ন ছিল সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়? জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। তাঁর সাথে আমাদের চিন্তার (বিস্তর) যোগাযোগ রয়েছে। আমরা জানতাম বঙ্গবন্ধু শত্রুশিবিরে বন্দি। কিন্তু আমরা তা বলতে চাইনি। পাক বাহিনী বলুক এটাই আমরা চাচ্ছিলাম। কারণ আমরা যদি বলি বঙ্গবন্ধু পাক শিবিরে, আর তারা যদি অস্বীকার করে তা হলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। আর আমরা যদি বলি তিনি দেশের ভেতরে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন হানাদাররা বলে বসবে তিনি বন্দি।’
‘আমবাগানের অনুষ্ঠানে ভরদুপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়। হাজারো কণ্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি স্লোগান। আমার কাজ ছিল দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করে সাংবাদিকদের ফেরত পাঠানো। দুপুরের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। সাংবাদিকদের গাড়িযোগে ফেরত পাঠানো হলো। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ফেরেন সন্ধ্যায়।’
(মুজিবনগর, কাঠামো ও কার্যকারণ, সম্পাদনা আফসান চৌধুরী, পৃষ্ঠা ১১৪-১২৫)
এই বর্ণনার পর নিশ্চয় যে কোনো বিবেচক পাঠক বুঝতে পারবেন, ১৭ এপ্রিল কীভাবে আমাদের হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বেলা পৌনে ১১টায় উপকণ্ঠ থেকে মূল ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন বিজয়ী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সেনারা। অন্যদিকে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যায়ে চলতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি।
২ ঘণ্টা আগে
কালো ফ্রেমে বাঁধাই করা একটি জামা। হলুদ জমিনের মাঝে লাল রং। জামাটি রেহানা নামের এক দুধের শিশুর। একাত্তরের যুদ্ধদিনে তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। রেহানার বাবা আবদুস সালাম খান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই অপরাধে পাক সেনারা বাড়িতে হানা দিয়ে শিশু রেহানাকে নির্মমভাবে আছাড় মেরে এবং বুটের তলায় পিষে হত্যা করে।
২ ঘণ্টা আগে
আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি এবার। এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন ১৬ ডিসেম্বর। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে জন্ম নেয়...
২ ঘণ্টা আগে
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশব্যবস্থা গঠনের দীর্ঘদিনের জনদাবিকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যত লোকদেখানো ও অর্থহীন উদ্যোগ।
৩ ঘণ্টা আগেনিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বেলা পৌনে ১১টায় উপকণ্ঠ থেকে মূল ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন বিজয়ী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সেনারা। অন্যদিকে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যায়ে চলতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি।
১৫ ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সদর্প বিচরণের শেষ দিন। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর চূড়ান্ত অভিযানে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই কার্যত ঢাকায় পাকিস্তানি দুর্গের পতনের ক্ষণগণনা চলছিল। উপায় না দেখে পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান আবদুল্লাহ খান নিয়াজি শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ১৫ তারিখ আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার জন্য ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল জ্যাকব ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকা এসে পৌঁছান। বিকেল ৪টার আগেই বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর দুটি ইউনিটসহ মোট চার ব্যাটালিয়ন সেনা ঢাকায় প্রবেশ করে। সঙ্গে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকার এত দিনের জনবিরল সড়কগুলো ক্রমেই জনাকীর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে। সবার মুখে একাত্তরের পরিচিতি রণধ্বনি’ জয় বাংলা’।
কারফিউ জারি থাকলেও মানুষ তার পরোয়া না করে রাস্তায় বেরিয়ে উল্লাস করতে থাকেন। পাকিস্তানি বাহিনীর নয় মাসের গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের পর মুক্তির আনন্দে তাঁরা তখন আত্মহারা। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর কয়েক লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে তাঁরা পেয়েছেন নতুন দেশ—বাংলাদেশ। বিজয়ের আনন্দ, স্বজন হারানোর শোক আর অজানা আগামীর প্রত্যাশায় সবার মনে এক বিচিত্র অনুভূতি। এর মধ্যেও ঘটে কিছু দুঃখজনক ঘটনা। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পলায়নপর কিছু পাকিস্তানি সেনা ও বিহারি এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে অনেক বাঙালিকে হতাহত করে।
বিকেল ৪টায় বাংলাদেশের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খোন্দকার, ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও অন্য সামরিক কর্মকর্তারা বিমানে ঢাকা অবতরণ করেন। এর কিছু সময় পরই ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল উৎফুল্ল জনতার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ-ভারত মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানি সমরাধিনায়ক লে. জেনারেল নিয়াজি। পাকিস্তানি বাহিনীর দখল থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হলো বাংলাদেশ। সগর্বে জায়গা করে নিল বিশ্বের মানচিত্রে।
ঢাকায় ১৬ ডিসেম্বরই ধীরে ধীরে সবাই জানতে পারেন আগের কয়েক দিনে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখকসহ বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর। নিয়ে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি সেনাদের এদেশীয় সহযোগীরা তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল; কিন্তু কেউই আর ফিরে আসেননি। দেশের এই মেধাবী, কৃতী সন্তানদের পরিণতির কথা ভেবে জনমনে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ। পরদিনই মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমির বীভৎস দৃশ্যের খবর। রাজধানীর রায়েরবাজার ও মিরপুরের বিভিন্ন জায়গার অনেক বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় নির্যাতিত মানুষের ক্ষতবিক্ষত দেহ। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের অনেকের হাত বা চোখ বাঁধা, বেয়নেট বা গুলিতে বিদ্ধ লাশের খোঁজ মেলে রায়েরবাজারে। বিজয়ের আনন্দের মধ্যে এই শোকের খবর, বধ্যভূমির ভয়াবহ দৃশ্য স্তম্ভিত করে মানুষকে।
এদিকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই কাজে লেগে যায় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার। ১৬ ডিসেম্বরই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় অবস্থিত প্রবাসী সরকার সদর দপ্তর থেকে গোটা দেশে বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসকদের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি পাঠানো শুরু হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ায় শুরু হয় পুরো সরকারের দেশে ফেরার প্রক্রিয়াও। ৭ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই উনিশটি জেলার জন্য জেলা প্রশাসকদের মনোনয়ন ও নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছিল। শুরু হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনের নতুন কঠিন যুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বেলা পৌনে ১১টায় উপকণ্ঠ থেকে মূল ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন বিজয়ী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সেনারা। অন্যদিকে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যায়ে চলতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি।
১৫ ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সদর্প বিচরণের শেষ দিন। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর চূড়ান্ত অভিযানে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই কার্যত ঢাকায় পাকিস্তানি দুর্গের পতনের ক্ষণগণনা চলছিল। উপায় না দেখে পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান আবদুল্লাহ খান নিয়াজি শীর্ষ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ১৫ তারিখ আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার জন্য ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল জ্যাকব ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকা এসে পৌঁছান। বিকেল ৪টার আগেই বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর দুটি ইউনিটসহ মোট চার ব্যাটালিয়ন সেনা ঢাকায় প্রবেশ করে। সঙ্গে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকার এত দিনের জনবিরল সড়কগুলো ক্রমেই জনাকীর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে। সবার মুখে একাত্তরের পরিচিতি রণধ্বনি’ জয় বাংলা’।
কারফিউ জারি থাকলেও মানুষ তার পরোয়া না করে রাস্তায় বেরিয়ে উল্লাস করতে থাকেন। পাকিস্তানি বাহিনীর নয় মাসের গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের পর মুক্তির আনন্দে তাঁরা তখন আত্মহারা। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর কয়েক লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে তাঁরা পেয়েছেন নতুন দেশ—বাংলাদেশ। বিজয়ের আনন্দ, স্বজন হারানোর শোক আর অজানা আগামীর প্রত্যাশায় সবার মনে এক বিচিত্র অনুভূতি। এর মধ্যেও ঘটে কিছু দুঃখজনক ঘটনা। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পলায়নপর কিছু পাকিস্তানি সেনা ও বিহারি এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে অনেক বাঙালিকে হতাহত করে।
বিকেল ৪টায় বাংলাদেশের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খোন্দকার, ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও অন্য সামরিক কর্মকর্তারা বিমানে ঢাকা অবতরণ করেন। এর কিছু সময় পরই ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল উৎফুল্ল জনতার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ-ভারত মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানি সমরাধিনায়ক লে. জেনারেল নিয়াজি। পাকিস্তানি বাহিনীর দখল থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হলো বাংলাদেশ। সগর্বে জায়গা করে নিল বিশ্বের মানচিত্রে।
ঢাকায় ১৬ ডিসেম্বরই ধীরে ধীরে সবাই জানতে পারেন আগের কয়েক দিনে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখকসহ বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর। নিয়ে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি সেনাদের এদেশীয় সহযোগীরা তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল; কিন্তু কেউই আর ফিরে আসেননি। দেশের এই মেধাবী, কৃতী সন্তানদের পরিণতির কথা ভেবে জনমনে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ। পরদিনই মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমির বীভৎস দৃশ্যের খবর। রাজধানীর রায়েরবাজার ও মিরপুরের বিভিন্ন জায়গার অনেক বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় নির্যাতিত মানুষের ক্ষতবিক্ষত দেহ। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের অনেকের হাত বা চোখ বাঁধা, বেয়নেট বা গুলিতে বিদ্ধ লাশের খোঁজ মেলে রায়েরবাজারে। বিজয়ের আনন্দের মধ্যে এই শোকের খবর, বধ্যভূমির ভয়াবহ দৃশ্য স্তম্ভিত করে মানুষকে।
এদিকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই কাজে লেগে যায় বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার। ১৬ ডিসেম্বরই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় অবস্থিত প্রবাসী সরকার সদর দপ্তর থেকে গোটা দেশে বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসকদের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি পাঠানো শুরু হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ায় শুরু হয় পুরো সরকারের দেশে ফেরার প্রক্রিয়াও। ৭ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই উনিশটি জেলার জন্য জেলা প্রশাসকদের মনোনয়ন ও নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছিল। শুরু হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনের নতুন কঠিন যুদ্ধ।

১৭ এপ্রিল তারিখটায় পৌঁছুতে হলে মেলে ধরতে হয় ইতিহাসের ডানা। এই দিনটিতে বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে মুজিবনগর। কেন মুজিবনগর? মুজিব তো তখন নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরেছে ইয়াহিয়া। বিচারের নাম করে শেখ মুজিবকে হত্যা করার তোড়জোড় চলছে তখন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের শপথ নেওয়ার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো...
১৭ এপ্রিল ২০২৫
কালো ফ্রেমে বাঁধাই করা একটি জামা। হলুদ জমিনের মাঝে লাল রং। জামাটি রেহানা নামের এক দুধের শিশুর। একাত্তরের যুদ্ধদিনে তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। রেহানার বাবা আবদুস সালাম খান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই অপরাধে পাক সেনারা বাড়িতে হানা দিয়ে শিশু রেহানাকে নির্মমভাবে আছাড় মেরে এবং বুটের তলায় পিষে হত্যা করে।
২ ঘণ্টা আগে
আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি এবার। এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন ১৬ ডিসেম্বর। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে জন্ম নেয়...
২ ঘণ্টা আগে
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশব্যবস্থা গঠনের দীর্ঘদিনের জনদাবিকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যত লোকদেখানো ও অর্থহীন উদ্যোগ।
৩ ঘণ্টা আগেশরীফ নাসরুল্লাহ, ঢাকা

কালো ফ্রেমে বাঁধাই করা একটি জামা। হলুদ জমিনের মাঝে লাল রং। জামাটি রেহানা নামের এক দুধের শিশুর। একাত্তরের যুদ্ধদিনে তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। রেহানার বাবা আবদুস সালাম খান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই অপরাধে পাক সেনারা বাড়িতে হানা দিয়ে শিশু রেহানাকে নির্মমভাবে আছাড় মেরে এবং বুটের তলায় পিষে হত্যা করে। একটি ছবিও না থাকায় মেয়ের চিহ্ন বলতে বাবার কাছে রয়ে যায় এ জামা।
বিজয়ের ভোর আনতে রেহানার মতো ঝরেছে কত প্রাণ। একাত্তরকে ঘিরে আছে কত সাহস, বীরত্ব আর আত্মত্যাগের কাহিনি। তারই বেশ কিছু নমুনা রয়েছে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারিগুলোতে। একে একে চারটি গ্যালারি পেরিয়ে এলে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো যেন চোখের সামনে তাজা হয়ে ফিরে আসে।
খুলনার সেনহাটিতে বাসা ছিল মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম খানের। যুদ্ধের শুরুর দিকে, ৩০ এপ্রিল পাক সেনারা স্থানীয় দালালদের সহায়তায় তাঁর বাসা ঘেরাও করে। সালামকে না পেয়ে তারা শিশু রেহানাকে হত্যা করে। রাতের আঁধারে বাবা গোপনে বাড়িতে এসে লাশটি ধুয়েমুছে রূপসা নদীতে ভাসিয়ে দেন। স্বাধীনতার পরে মেয়ের জামাটিই হয়ে ওঠে তাঁর বুকের ধন। জামাটি তিনি ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখেন দীর্ঘ ২৫ বছর। একপর্যায়ে তাঁর কাছ থেকে এটি সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কার্যত এক মহাকাব্যিক ঘটনা। এ রকম কত ঘটনাই না তখন ঘটেছে। দেশের প্রায় সব মানুষ যার যার সাধ্যমতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির লড়াইয়ে। কেউ রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে লড়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে, খাবার খাইয়ে, শত্রুর গতিবিধি জানিয়ে কিংবা উদ্দীপনামূলক গান শুনিয়ে যে যেভাবে পেরেছেন সহায়তা করেছেন।
গ্যালারি-২-এ ঢুকতেই চোখে পড়বে একটা লুবিটেল-২ ক্যামেরা। আলোকচিত্রী শুকুর মিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ছবি তুলেছিলেন এই ক্যামেরা দিয়ে। একটু এগোলেই ভয় ধরানো এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃদু আলো জ্বলছে। ওপরে লেখা, ‘অপারেশন সার্চলাইট: গণহত্যার নীল নকশা ও পঁচিশ মার্চের কালরাত্রি’।
পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর সেই ভয়ানক রাতের কথা ডায়েরিতে লিখেছিলেন কবি, নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী সুফিয়া কামাল। আরও অনেকের মতো নাখালপাড়ার বাড়িতে বসে নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছিল তখনকার ৭ম শ্রেণির ছাত্রী স্বাতী চোধুরী। সুফিয়া কামালের ডায়েরি আর স্বাতীর স্কুলের সেই খাতা আছে এখানে।
সবুজের মাঝে লাল বৃত্ত আর তার ভেতরে বাংলাদেশের হলুদ মানচিত্র। প্রথম নকশার বাংলাদেশের এই জাতীয় পতাকা ৭ মার্চ উড়েছিল লে. সিকান্দার আলীর বাড়িতে। পতাকাটি আছে জাদুঘরের এই গ্যালারিতে। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান অসামান্য। ঢাকার রাজপথে ডামি রাইফেল হাতে নারীদের মিছিলের আলোকচিত্রও আছে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। ২৫ মার্চ রাতের প্রথম শহীদদের অন্যতম তিনি। তাঁর ব্যবহৃত বাইনোকুলার আর পোশাক রাখা হয়েছে জাদুঘরে। দেখা যাবে শহীদ অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, আব্দুল মুকতাদির, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, কবি মেহেরুন্নেসাসহ অনেকের স্মৃতিবিজড়িত ব্যবহৃত জিনিস। রয়েছে জাতীয় চার নেতার ব্যবহৃত কোট, লাইটার, চশমা ইত্যাদি। গ্যালারি-২-এ আরও দেখা মিলবে একটি টাইপরাইটারের। জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর চালানো গণহত্যা বন্ধের আবেদন করা হয়েছিল এই টাইপরাইটারে লিখে।
গ্যালারি-৩-এ বিশাল আলোকচিত্রে একাত্তরের শরণার্থী শিবিরের কষ্টকর জীবনের দৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছিল ১ কোটি মানুষ। এখানে আছে শরণার্থীদের নিয়ে করা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিকস, টাইম, নিউইয়র্ক টাইমস, ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনের আলোকচিত্র। আছে সে সময়ের সাংস্কৃতিক দলের কার্যক্রমের বিভিন্ন ছবি।
এই গ্যালারিতে দেখা মিলবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের বিভিন্ন চিত্র, একুশের গানের স্রষ্টা শহীদ আলতাফ মাহমুদের ইলেকট্রিক শেভিং রেজার। একটি জায়গায় দেখা যায়, একটি বাড়ির জানালা। জানালার অন্যপাশে একটি ছবিতে অন্ধকারে অস্ত্র হাতে মুক্তিসেনা। ছবিটি এমনভাবে রাখা হয়েছে, দেখে মনে হবে, সত্যিই যেন জানালার ওপারে অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধা। গ্যালারি-৩-এর শেষ দিকে চোখ আটকে যাবে একটি কালো রঙের গাড়িতে। শহীদ ডা. ফজলে রাব্বির এই গাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে ব্যবহৃত হতো। ১৫ ডিসেম্বর আল-বদরের সদস্যরা তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।
জাদুঘরের নারী নির্যাতন অংশে চোখ বুলালে শিউরে উঠতে হয়। সিলেটের পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পের দেয়ালে আঁকা ছবি রাখা হয়েছে এখানে। বাঙালি মেয়েদের নির্যাতন শিবিরের দেয়াল বুঝিয়ে দেয় কী ভয়াবহ নির্যাতন ঘটেছিল সেখানে।
একটি ছবিতে দেখা মেলে দুই কিশোরীর। তারা ঝুড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে কচুরিপানা। সেই কচুরিপানার আড়ালে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রেনেড।
গ্যালারি-৪-এ দেখা মেলে বাঙালির বিজয়ের স্মৃতির নমুনা। দেখা মেলে মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধের আলোকচিত্র ও স্মৃতিবিজড়িত বস্তু। এর মধ্যে রয়েছে বিলোনিয়া, পরশুরাম, চিথলিয়া, ফুলগাজী, ফেনী, মন্দভাগ, কসবা-সালদা নদী, নারায়ণগঞ্জ-কামরাঙ্গীরচর, শেরপুর, কামালপুর যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন। ঢাকা শহরে ট্রাকে চড়ে মানুষের বিজয় উল্লাস।
গ্যালারি-১-এ আছে একাত্তর পর্যন্ত এ ভূখণ্ডের বিভিন্ন শাসনামলের ইতিহাস। বাকি তিনটি গ্যালারিজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক। বিজয় দিবসের ঠিক আগের দিনে জাদুঘরে দেখা গেল সপরিবারে আসা মোহা. আসলাম উদ্দিনকে। তিনি বললেন, ‘বিজয়ের মাসে হঠাৎ করেই জাদুঘরে ঘুরতে আসা। এসে ঘুরতে ঘুরতে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনার যেন সাক্ষী হয়ে গেলাম।’
দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে যায়। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের ম্লান আলো পড়ছে জাদুঘরের সামনে টাঙানো লাল-সবুজ পতাকায়। রাত পেরোলেই দেখা দেবে নতুন সূর্য। সে সূর্য মুক্তির, বিজয়ের।

কালো ফ্রেমে বাঁধাই করা একটি জামা। হলুদ জমিনের মাঝে লাল রং। জামাটি রেহানা নামের এক দুধের শিশুর। একাত্তরের যুদ্ধদিনে তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। রেহানার বাবা আবদুস সালাম খান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই অপরাধে পাক সেনারা বাড়িতে হানা দিয়ে শিশু রেহানাকে নির্মমভাবে আছাড় মেরে এবং বুটের তলায় পিষে হত্যা করে। একটি ছবিও না থাকায় মেয়ের চিহ্ন বলতে বাবার কাছে রয়ে যায় এ জামা।
বিজয়ের ভোর আনতে রেহানার মতো ঝরেছে কত প্রাণ। একাত্তরকে ঘিরে আছে কত সাহস, বীরত্ব আর আত্মত্যাগের কাহিনি। তারই বেশ কিছু নমুনা রয়েছে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারিগুলোতে। একে একে চারটি গ্যালারি পেরিয়ে এলে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো যেন চোখের সামনে তাজা হয়ে ফিরে আসে।
খুলনার সেনহাটিতে বাসা ছিল মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম খানের। যুদ্ধের শুরুর দিকে, ৩০ এপ্রিল পাক সেনারা স্থানীয় দালালদের সহায়তায় তাঁর বাসা ঘেরাও করে। সালামকে না পেয়ে তারা শিশু রেহানাকে হত্যা করে। রাতের আঁধারে বাবা গোপনে বাড়িতে এসে লাশটি ধুয়েমুছে রূপসা নদীতে ভাসিয়ে দেন। স্বাধীনতার পরে মেয়ের জামাটিই হয়ে ওঠে তাঁর বুকের ধন। জামাটি তিনি ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখেন দীর্ঘ ২৫ বছর। একপর্যায়ে তাঁর কাছ থেকে এটি সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কার্যত এক মহাকাব্যিক ঘটনা। এ রকম কত ঘটনাই না তখন ঘটেছে। দেশের প্রায় সব মানুষ যার যার সাধ্যমতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির লড়াইয়ে। কেউ রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে লড়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে, খাবার খাইয়ে, শত্রুর গতিবিধি জানিয়ে কিংবা উদ্দীপনামূলক গান শুনিয়ে যে যেভাবে পেরেছেন সহায়তা করেছেন।
গ্যালারি-২-এ ঢুকতেই চোখে পড়বে একটা লুবিটেল-২ ক্যামেরা। আলোকচিত্রী শুকুর মিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ছবি তুলেছিলেন এই ক্যামেরা দিয়ে। একটু এগোলেই ভয় ধরানো এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃদু আলো জ্বলছে। ওপরে লেখা, ‘অপারেশন সার্চলাইট: গণহত্যার নীল নকশা ও পঁচিশ মার্চের কালরাত্রি’।
পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর সেই ভয়ানক রাতের কথা ডায়েরিতে লিখেছিলেন কবি, নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী সুফিয়া কামাল। আরও অনেকের মতো নাখালপাড়ার বাড়িতে বসে নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছিল তখনকার ৭ম শ্রেণির ছাত্রী স্বাতী চোধুরী। সুফিয়া কামালের ডায়েরি আর স্বাতীর স্কুলের সেই খাতা আছে এখানে।
সবুজের মাঝে লাল বৃত্ত আর তার ভেতরে বাংলাদেশের হলুদ মানচিত্র। প্রথম নকশার বাংলাদেশের এই জাতীয় পতাকা ৭ মার্চ উড়েছিল লে. সিকান্দার আলীর বাড়িতে। পতাকাটি আছে জাদুঘরের এই গ্যালারিতে। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান অসামান্য। ঢাকার রাজপথে ডামি রাইফেল হাতে নারীদের মিছিলের আলোকচিত্রও আছে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। ২৫ মার্চ রাতের প্রথম শহীদদের অন্যতম তিনি। তাঁর ব্যবহৃত বাইনোকুলার আর পোশাক রাখা হয়েছে জাদুঘরে। দেখা যাবে শহীদ অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, আব্দুল মুকতাদির, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, কবি মেহেরুন্নেসাসহ অনেকের স্মৃতিবিজড়িত ব্যবহৃত জিনিস। রয়েছে জাতীয় চার নেতার ব্যবহৃত কোট, লাইটার, চশমা ইত্যাদি। গ্যালারি-২-এ আরও দেখা মিলবে একটি টাইপরাইটারের। জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর চালানো গণহত্যা বন্ধের আবেদন করা হয়েছিল এই টাইপরাইটারে লিখে।
গ্যালারি-৩-এ বিশাল আলোকচিত্রে একাত্তরের শরণার্থী শিবিরের কষ্টকর জীবনের দৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছিল ১ কোটি মানুষ। এখানে আছে শরণার্থীদের নিয়ে করা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিকস, টাইম, নিউইয়র্ক টাইমস, ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনের আলোকচিত্র। আছে সে সময়ের সাংস্কৃতিক দলের কার্যক্রমের বিভিন্ন ছবি।
এই গ্যালারিতে দেখা মিলবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের বিভিন্ন চিত্র, একুশের গানের স্রষ্টা শহীদ আলতাফ মাহমুদের ইলেকট্রিক শেভিং রেজার। একটি জায়গায় দেখা যায়, একটি বাড়ির জানালা। জানালার অন্যপাশে একটি ছবিতে অন্ধকারে অস্ত্র হাতে মুক্তিসেনা। ছবিটি এমনভাবে রাখা হয়েছে, দেখে মনে হবে, সত্যিই যেন জানালার ওপারে অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধা। গ্যালারি-৩-এর শেষ দিকে চোখ আটকে যাবে একটি কালো রঙের গাড়িতে। শহীদ ডা. ফজলে রাব্বির এই গাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে ব্যবহৃত হতো। ১৫ ডিসেম্বর আল-বদরের সদস্যরা তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।
জাদুঘরের নারী নির্যাতন অংশে চোখ বুলালে শিউরে উঠতে হয়। সিলেটের পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পের দেয়ালে আঁকা ছবি রাখা হয়েছে এখানে। বাঙালি মেয়েদের নির্যাতন শিবিরের দেয়াল বুঝিয়ে দেয় কী ভয়াবহ নির্যাতন ঘটেছিল সেখানে।
একটি ছবিতে দেখা মেলে দুই কিশোরীর। তারা ঝুড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে কচুরিপানা। সেই কচুরিপানার আড়ালে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রেনেড।
গ্যালারি-৪-এ দেখা মেলে বাঙালির বিজয়ের স্মৃতির নমুনা। দেখা মেলে মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধের আলোকচিত্র ও স্মৃতিবিজড়িত বস্তু। এর মধ্যে রয়েছে বিলোনিয়া, পরশুরাম, চিথলিয়া, ফুলগাজী, ফেনী, মন্দভাগ, কসবা-সালদা নদী, নারায়ণগঞ্জ-কামরাঙ্গীরচর, শেরপুর, কামালপুর যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন। ঢাকা শহরে ট্রাকে চড়ে মানুষের বিজয় উল্লাস।
গ্যালারি-১-এ আছে একাত্তর পর্যন্ত এ ভূখণ্ডের বিভিন্ন শাসনামলের ইতিহাস। বাকি তিনটি গ্যালারিজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক। বিজয় দিবসের ঠিক আগের দিনে জাদুঘরে দেখা গেল সপরিবারে আসা মোহা. আসলাম উদ্দিনকে। তিনি বললেন, ‘বিজয়ের মাসে হঠাৎ করেই জাদুঘরে ঘুরতে আসা। এসে ঘুরতে ঘুরতে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনার যেন সাক্ষী হয়ে গেলাম।’
দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে যায়। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের ম্লান আলো পড়ছে জাদুঘরের সামনে টাঙানো লাল-সবুজ পতাকায়। রাত পেরোলেই দেখা দেবে নতুন সূর্য। সে সূর্য মুক্তির, বিজয়ের।

১৭ এপ্রিল তারিখটায় পৌঁছুতে হলে মেলে ধরতে হয় ইতিহাসের ডানা। এই দিনটিতে বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে মুজিবনগর। কেন মুজিবনগর? মুজিব তো তখন নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরেছে ইয়াহিয়া। বিচারের নাম করে শেখ মুজিবকে হত্যা করার তোড়জোড় চলছে তখন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের শপথ নেওয়ার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো...
১৭ এপ্রিল ২০২৫
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বেলা পৌনে ১১টায় উপকণ্ঠ থেকে মূল ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন বিজয়ী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সেনারা। অন্যদিকে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যায়ে চলতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি।
২ ঘণ্টা আগে
আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি এবার। এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন ১৬ ডিসেম্বর। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে জন্ম নেয়...
২ ঘণ্টা আগে
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশব্যবস্থা গঠনের দীর্ঘদিনের জনদাবিকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যত লোকদেখানো ও অর্থহীন উদ্যোগ।
৩ ঘণ্টা আগেনিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি এবার। এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন ১৬ ডিসেম্বর। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে জন্ম নেয় নতুন এক দেশ—বাংলাদেশ। দিনটি একই সঙ্গে বিজয়ের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও শহীদের স্মরণে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করবে দেশবাসী।
জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতনে বাংলাদেশে এখন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। স্বৈরশাসককে বিদায় জানানোর পাশাপাশি ঘুণে ধরা রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাতে চায় জনগণ। এমন ভিন্ন ধরনের এক প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিতর্কহীন, অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনে দেশবাসী তাদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অপেক্ষায়। এবারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অতীতের ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতাকে কাটিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাধ্যমতো সচেষ্ট হবেন– এটিই এবারের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা।
এই আনন্দের দিনে জাতি পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর সন্তানদের। শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে উঠবে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এ উপলক্ষে লাল-সবুজে সেজেছে দেশ। সর্বত্র উড়ছে জাতীয় পতাকা। বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রথামতো বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। রাষ্ট্রপতি বাণীতে বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিনে আমরা অর্জন করি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। বিজয়ের এই দিনে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সকল বীর শহীদ, যুদ্ধাহতসহ সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, সম্ভ্রমহারা মা-বোন, শহীদ পরিবারের সদস্য ও আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান রাখা সকল সংগ্রামী যোদ্ধাকে, যাঁদের ত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।’
রাষ্ট্রপতি আরও বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বিগত পাঁচ দশকের পথচলায় জনগণের পূর্ণ রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মুক্তি এখনো অর্জিত হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে নতুন আশা জাগিয়েছে।
একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘তাঁদের এই আত্মদান আমাদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা ও সাহস জোগায়, সকল সংকটে-সংগ্রামে দেখায় মুক্তির পথ।’ প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল, বিগত বছরগুলোতে তা বারবার স্বৈরাচার আর অপশাসনে ম্লান হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার একটি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশের শক্তিশালী ভিত গড়ে তুলতে যে বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, দেশের আপামর জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আজ আমরা সে কর্মযজ্ঞের সফল পরিসমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছি।’
বিজয় দিবস উপলক্ষে সারা দেশে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনাকেন্দ্রিক বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। রাজধানী ঢাকা থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত সড়কে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পোশাকধারী বাহিনীর পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
আজ ভোরে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বিদেশি কূটনীতিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাবেন।
বিজয় দিবসে সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়েছে।
আজ বিকেলে বঙ্গভবনে মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এ ছাড়া মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘর বিনা টিকিটে সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকবে। সিনেমা হলে বিনা মূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখানো হবে। দেশের সব জেলা ও উপজেলায় দিনব্যাপী বিজয় মেলার আয়োজন করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতেও দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি এবার। এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন ১৬ ডিসেম্বর। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে জন্ম নেয় নতুন এক দেশ—বাংলাদেশ। দিনটি একই সঙ্গে বিজয়ের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও শহীদের স্মরণে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করবে দেশবাসী।
জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতনে বাংলাদেশে এখন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। স্বৈরশাসককে বিদায় জানানোর পাশাপাশি ঘুণে ধরা রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার করে নতুন সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাতে চায় জনগণ। এমন ভিন্ন ধরনের এক প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিতর্কহীন, অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনে দেশবাসী তাদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অপেক্ষায়। এবারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অতীতের ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতাকে কাটিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাধ্যমতো সচেষ্ট হবেন– এটিই এবারের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা।
এই আনন্দের দিনে জাতি পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর সন্তানদের। শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে উঠবে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এ উপলক্ষে লাল-সবুজে সেজেছে দেশ। সর্বত্র উড়ছে জাতীয় পতাকা। বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রথামতো বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। রাষ্ট্রপতি বাণীতে বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিনে আমরা অর্জন করি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। বিজয়ের এই দিনে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সকল বীর শহীদ, যুদ্ধাহতসহ সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, সম্ভ্রমহারা মা-বোন, শহীদ পরিবারের সদস্য ও আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান রাখা সকল সংগ্রামী যোদ্ধাকে, যাঁদের ত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।’
রাষ্ট্রপতি আরও বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বিগত পাঁচ দশকের পথচলায় জনগণের পূর্ণ রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মুক্তি এখনো অর্জিত হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে নতুন আশা জাগিয়েছে।
একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘তাঁদের এই আত্মদান আমাদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা ও সাহস জোগায়, সকল সংকটে-সংগ্রামে দেখায় মুক্তির পথ।’ প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল, বিগত বছরগুলোতে তা বারবার স্বৈরাচার আর অপশাসনে ম্লান হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার একটি উন্নত ও সুশাসিত বাংলাদেশের শক্তিশালী ভিত গড়ে তুলতে যে বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, দেশের আপামর জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আজ আমরা সে কর্মযজ্ঞের সফল পরিসমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছি।’
বিজয় দিবস উপলক্ষে সারা দেশে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনাকেন্দ্রিক বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। রাজধানী ঢাকা থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত সড়কে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পোশাকধারী বাহিনীর পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
আজ ভোরে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বিদেশি কূটনীতিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাবেন।
বিজয় দিবসে সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়েছে।
আজ বিকেলে বঙ্গভবনে মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এ ছাড়া মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘর বিনা টিকিটে সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকবে। সিনেমা হলে বিনা মূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখানো হবে। দেশের সব জেলা ও উপজেলায় দিনব্যাপী বিজয় মেলার আয়োজন করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতেও দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

১৭ এপ্রিল তারিখটায় পৌঁছুতে হলে মেলে ধরতে হয় ইতিহাসের ডানা। এই দিনটিতে বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে মুজিবনগর। কেন মুজিবনগর? মুজিব তো তখন নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরেছে ইয়াহিয়া। বিচারের নাম করে শেখ মুজিবকে হত্যা করার তোড়জোড় চলছে তখন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের শপথ নেওয়ার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো...
১৭ এপ্রিল ২০২৫
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বেলা পৌনে ১১টায় উপকণ্ঠ থেকে মূল ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন বিজয়ী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সেনারা। অন্যদিকে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যায়ে চলতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি।
২ ঘণ্টা আগে
কালো ফ্রেমে বাঁধাই করা একটি জামা। হলুদ জমিনের মাঝে লাল রং। জামাটি রেহানা নামের এক দুধের শিশুর। একাত্তরের যুদ্ধদিনে তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। রেহানার বাবা আবদুস সালাম খান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই অপরাধে পাক সেনারা বাড়িতে হানা দিয়ে শিশু রেহানাকে নির্মমভাবে আছাড় মেরে এবং বুটের তলায় পিষে হত্যা করে।
২ ঘণ্টা আগে
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশব্যবস্থা গঠনের দীর্ঘদিনের জনদাবিকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যত লোকদেখানো ও অর্থহীন উদ্যোগ।
৩ ঘণ্টা আগেনিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশব্যবস্থা গঠনের দীর্ঘদিনের জনদাবিকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যত লোকদেখানো ও অর্থহীন উদ্যোগ। সংস্থাটির মতে, প্রস্তাবিত এই কমিশন স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা—কোনোটিই নিশ্চিত করতে পারবে না; বরং এটি হবে আত্মঘাতী ও জনগণের অর্থ অপচয়ের আরেকটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো।
আজ সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগের কথা জানায় টিআইবি। এতে বলা হয়, রক্তক্ষয়ী জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন গঠিত হলে তা স্বাধীন হওয়ার বদলে সরকারের আজ্ঞাবহ অবসরপ্রাপ্ত এবং প্রেষণে নিয়োজিত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব চর্চার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
অধ্যাদেশটি ধারণাগত, কৌশলগত ও কাঠামোগতভাবে গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই অধ্যাদেশ পুলিশের পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনিক ও পুলিশি আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করবে। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির যে সংকট থেকে পুলিশের জনআস্থার অবনতি হয়েছে, তার উত্তরণ তো হবেই না; বরং তা বৈধতা পাবে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘যে স্বাধীন পুলিশ কমিশনের জন্য জনগণ ও নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে, তার অপরিহার্য শর্ত হলো, সরকারের প্রভাবমুক্ত স্বাধীনতা। অথচ অধ্যাদেশে “স্বাধীনতা” শব্দটি পর্যন্ত অনুপস্থিত।’
কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়াকে স্বার্থসংঘাতপূর্ণ উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করার বিধান কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে। তাঁর মতে, বিশ্বের কোথাও এভাবে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মকর্তার জন্য কমিশনকে বাধ্যতামূলকভাবে উন্মুক্ত রাখার নজির নেই।
অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। বিশেষ করে ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার ভারসাম্য’-এর অস্পষ্ট ব্যাখ্যাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বৈধতার ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। পাশাপাশি নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং পুলিশ অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটিতে একই কমিশনের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির বিধান অভিযোগ নিষ্পত্তিকে প্রভাবিত করবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
টিআইবির মতে, অধ্যাদেশের ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাব প্রস্তাবিত কমিশনকে কার্যত সরকারের একটি অধীনস্থ দপ্তরে পরিণত করবে। বর্তমান কাঠামো বহাল থাকলে বাংলাদেশে প্রকৃত পুলিশ সংস্কারের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসবে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের ভেতরে সক্রিয় সংস্কারবিরোধী চক্রের কাছে নতজানু অবস্থান পরিহার করে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ সংশোধনের মাধ্যমে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, শুধু সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং সরকারি ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ কমিশনই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশব্যবস্থা গঠনের দীর্ঘদিনের জনদাবিকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যত লোকদেখানো ও অর্থহীন উদ্যোগ। সংস্থাটির মতে, প্রস্তাবিত এই কমিশন স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা—কোনোটিই নিশ্চিত করতে পারবে না; বরং এটি হবে আত্মঘাতী ও জনগণের অর্থ অপচয়ের আরেকটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো।
আজ সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই উদ্বেগের কথা জানায় টিআইবি। এতে বলা হয়, রক্তক্ষয়ী জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন গঠিত হলে তা স্বাধীন হওয়ার বদলে সরকারের আজ্ঞাবহ অবসরপ্রাপ্ত এবং প্রেষণে নিয়োজিত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব চর্চার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
অধ্যাদেশটি ধারণাগত, কৌশলগত ও কাঠামোগতভাবে গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই অধ্যাদেশ পুলিশের পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনিক ও পুলিশি আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করবে। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির যে সংকট থেকে পুলিশের জনআস্থার অবনতি হয়েছে, তার উত্তরণ তো হবেই না; বরং তা বৈধতা পাবে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘যে স্বাধীন পুলিশ কমিশনের জন্য জনগণ ও নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে, তার অপরিহার্য শর্ত হলো, সরকারের প্রভাবমুক্ত স্বাধীনতা। অথচ অধ্যাদেশে “স্বাধীনতা” শব্দটি পর্যন্ত অনুপস্থিত।’
কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়াকে স্বার্থসংঘাতপূর্ণ উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করার বিধান কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে। তাঁর মতে, বিশ্বের কোথাও এভাবে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মকর্তার জন্য কমিশনকে বাধ্যতামূলকভাবে উন্মুক্ত রাখার নজির নেই।
অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। বিশেষ করে ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার ভারসাম্য’-এর অস্পষ্ট ব্যাখ্যাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বৈধতার ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। পাশাপাশি নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং পুলিশ অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটিতে একই কমিশনের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির বিধান অভিযোগ নিষ্পত্তিকে প্রভাবিত করবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
টিআইবির মতে, অধ্যাদেশের ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাব প্রস্তাবিত কমিশনকে কার্যত সরকারের একটি অধীনস্থ দপ্তরে পরিণত করবে। বর্তমান কাঠামো বহাল থাকলে বাংলাদেশে প্রকৃত পুলিশ সংস্কারের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে আসবে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের ভেতরে সক্রিয় সংস্কারবিরোধী চক্রের কাছে নতজানু অবস্থান পরিহার করে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ সংশোধনের মাধ্যমে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, শুধু সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং সরকারি ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ কমিশনই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে।

১৭ এপ্রিল তারিখটায় পৌঁছুতে হলে মেলে ধরতে হয় ইতিহাসের ডানা। এই দিনটিতে বৈদ্যনাথতলা হয়ে ওঠে মুজিবনগর। কেন মুজিবনগর? মুজিব তো তখন নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ভরেছে ইয়াহিয়া। বিচারের নাম করে শেখ মুজিবকে হত্যা করার তোড়জোড় চলছে তখন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের শপথ নেওয়ার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো...
১৭ এপ্রিল ২০২৫
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বেলা পৌনে ১১টায় উপকণ্ঠ থেকে মূল ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন বিজয়ী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সেনারা। অন্যদিকে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যায়ে চলতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি।
২ ঘণ্টা আগে
কালো ফ্রেমে বাঁধাই করা একটি জামা। হলুদ জমিনের মাঝে লাল রং। জামাটি রেহানা নামের এক দুধের শিশুর। একাত্তরের যুদ্ধদিনে তার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। রেহানার বাবা আবদুস সালাম খান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এই অপরাধে পাক সেনারা বাড়িতে হানা দিয়ে শিশু রেহানাকে নির্মমভাবে আছাড় মেরে এবং বুটের তলায় পিষে হত্যা করে।
২ ঘণ্টা আগে
আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি এবার। এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন ১৬ ডিসেম্বর। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে জন্ম নেয়...
২ ঘণ্টা আগে