Ajker Patrika

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী: সংবিধানে আসতে পারে যেসব পরিবর্তন

  • দুই কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ
  • প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা
  • রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে
  • বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার
  • সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী: সংবিধানে আসতে পারে যেসব পরিবর্তন

সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। এই গণভোটের বিষয়বস্তু ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর স্বীকৃত সংবিধান সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব। ১২ ফেব্রুয়ারি যাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে (৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ) রায় দিয়েছেন। এর সুবাদে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অনুযায়ী সংস্কার আনবেন তাঁরা।

গণভোটে ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬ বৈধ ভোটের মধ্যে ৪ কোটি ৮২ হাজার ৬৬০ ছিল ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। অন্যদিকে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন ‘না’ ভোটের পক্ষে মত দিয়েছেন।

গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংবিধান সংস্কার আদেশ ২০২৫-এ স্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে।’

আলী রীয়াজ বলেন, ‘তাঁরা দুটি শপথ গ্রহণ করবেন—একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই পরিষদের মেয়াদ ১৮০ দিন।

ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও বলেন, ‘গণভোট এখন একটি জনরায়ে পরিণত হয়েছে। জনগণ চায় এগুলো বাস্তবায়ন হোক। আমরা আশা করি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং অন্যান্য সব দল জনরায়ের এই আকাঙ্ক্ষা বিবেচনা করবে।’

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক বছরের বেশি সময় বহুবার আলোচনায় বসে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদে ৮৪টি সংস্কারের বিষয়ে দলগুলো একমত হয়। এর মধ্যে ৪৮টি ছিল সংবিধানসম্পর্কিত প্রস্তাব। সনদের কিছু প্রস্তাবে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি ছাড়াও জামায়াত, এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত ছিল। পরে সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের কাছে দুটো সুপারিশ করে কমিশন। সেখানে দলগুলোর আপত্তি রাখা হয়নি। এর ভিত্তিতে গত বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে সরকার। সেখানে গণভোট করা এবং তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে নতুন জাতীয় সংসদকে ১৮০ কার্যদিবসের জন্য একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে।

আদেশের ‘ক’ অংশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান (পিএসসি, দুদক, ন্যায়পাল) জুলাই সনদের আলোকে গঠন করা হবে। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, পিএসসি, দুদক ও ন্যায়পাল গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির আপত্তি ছিল; কিন্তু আদেশে তা রাখা হয়নি।

‘খ’ অংশে দুই কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়। বলা হয়, সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে এই উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ ঐকমত্য হওয়া ৩০টি বিষয় বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে। বাকি বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী করতে পারবে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার ফলে আগামী সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হওয়ার কথা। সংবিধান সংশোধন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসবে। শুধু নির্বাচিত নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোনো দলের একক চাওয়ার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন হবে।

এখন নির্বাচিত এমপিরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এই সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর দিন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে পরিষদ নির্দিষ্ট সময়ে সংবিধান সংস্কার না করলে কী হবে, তা বাস্তবায়ন আদেশে স্পষ্ট করা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে। অসাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আগে কোনো এমপি তাঁর দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারতেন না। এখন এই আইন সংশোধন হতে যাচ্ছে। এর ফলে কোনো বিষয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ‘গণভোটে জনগণের সামনে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল বিদ্যমান সংবিধানের বড় রকমের সংস্কার প্রস্তাব বিষয়ে। চারটি ক্যাটাগরিতে ৪৮টি সুপারিশ জনগণের সামনে উত্থাপন করা হয়েছিল, জনগণ তা অনুমোদন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ইশতেহার দিয়েছে এটা যেমন সত্য, একই সঙ্গে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।’

মনির হায়দার আরও বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়া কেবল সরকারের অ্যাজেন্ডা নয়, এটি রাষ্ট্রের অ্যাজেন্ডা, নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব দলের অ্যাজেন্ডা। ইশতেহারের মাধ্যমে অনুমোদন করাটা পরোক্ষ; কিন্তু গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বড় রকমের সংস্কারের প্রস্তাব দেশের জনগণ সরাসরি অনুমোদন করেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত