Ajker Patrika

মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার নিয়ে ফজলুর রহমানের বক্তব্যে সংসদে উত্তেজনা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৪২
মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার নিয়ে ফজলুর রহমানের বক্তব্যে সংসদে উত্তেজনা
জাতীয় সংসদে ফজলুর রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। কোনো শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না। করলে এটা ডাবল অপরাধ। বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সংসদে ১০ মিনিটের মতো চরম উত্তেজনা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কাউকে নিবৃত্ত করতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে যান। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার সরকারি ও বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, সারা জাতি দেখছে। সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না। সদস্যদের কর্মকাণ্ডে শিশুরাও লজ্জা পাবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যাঁরা এরই মধ্যে দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাঁদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছে। তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে?’

আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ-সম্পর্কিত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বক্তব্য দেওয়ার সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধকে ৫ আগস্টের সঙ্গে তুলনা করার কথা উল্লেখ করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি বলব, এই কথা বলাই অন্যায়। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের তুলনা করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা করা।’

বিরোধী দলের উদ্দেশে ফজলুর রহমান বলেন, ‘তারা বলেছিল, কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। সাত চল্লিশে যুদ্ধ হইছে, সেই দিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আলবদরের বাচ্চারা, এখনো কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হইছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।’

ফজলুর রহমান বলেন, ‘অনেক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ইলেকশন হইছে, সেই ইলেকশনে তারা কী করেছে। আজকে যারা আমার ডান দিকে (বিরোধী দল) বসে আছে, তারা কী করেছে। তারা যা করেছে, সেটা কল্পনা করার মতো না। সেই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে যখন তারা প্রচার করতে শুরু করল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে তারা পাস করবে। আমি ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। তারা কখনো যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। তাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই। যত দিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, তত দিন রাজাকার এ দেশে কখনো জয় লাভ করতে পারবে না।’

এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে ফজলুর রহমান স্পিকারের কাছে আরও পাঁচ মিনিট সময় চান। স্পিকার তিন মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন।

ফজলুর রহমান বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার বক্তব্যের পরে বলবে, আমরা কী মুক্তিযুদ্ধ করি নাই? যেমন বিরোধী দলের নেতা বলেন, উনাকে আমি অসম্মান করি না, সব সময় মাননীয় বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘‘ফজা পাগলা’’ বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য, তারা ইসলাম...।’ এ সময় সবাই হেসে ওঠেন। ফজলুর রহমান বলেন, ‘(বিরোধীদলীয় নেতা) উনি বলেন, আমার দাঁড়ি পাকা... উনি আমার ১০ বছরের ছোট। আমার বয়স ৭৮ বছর। আমি উনাকে...।’

এ পর্যায়ে ফজলুর রহমানের কাছে স্পিকার জানতে চান, ‘আপনাকে কেউ ‘‘ফজা পাগলা’’ এই ধরনের উক্তি করেছে? এ রকম সংসদে কেউ বলে নাই তো। আপনি কেন নিজের...।’

ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না। শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না।’ তখন ব্যাপক হইচই শুরু করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।

স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় সদস্যবৃন্দ, উনাকে বলতে দিন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, অর্ডার অর্ডার। আপনারা শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন।’ তখন ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করছেন।’

এ বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে একযোগে হইচই ও প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এ পর্যায়ে ফজলুর রহমান বক্তব্য চালিয়ে যেতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যরা আরও প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকেন।

ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি উনাদের কিন্তু খারাপ কিছু বলি নাই।’ এ সময় স্পিকার ফজলুর রহমানকে বসার ও একটু অপেক্ষা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।

ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সময় জামায়াত ও তাদের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিসের এমপিদের দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখা যায়। সরকারি দলের এমপিদেরও দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখা যায়। এ সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে সরকারদলীয় এমপিদের দাঁড়াতে ইশারা করলে অনেকেই দাঁড়িয়ে যান।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সবাইকে বসার অনুরোধ করতে দেখা যায়। পরে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে সবাইকে বসার অনুরোধ করতে দেখা যায়।

তবে সংসদে উপস্থিত থাকা এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ), আব্দুল্লাহ আল আমিন ও আতিকুর রহমান মোজাহিদ বসে ছিলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজ আসন থেকে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। পরে তিনি বসে পড়েন।

এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইলে তাঁর উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বসুন। আমি বললে তারপর আপনি বলুন।’ এ সময় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে স্পিকার কথা বলেন। পরে জামায়াত নেতারা বসে পড়েন। পরে স্পিকার ফজলুর রহমানকে তিন মিনিট সময়ের মধ্যে বক্তব্য শেষ করার অনুরোধ করেন।

হইচই আরও তীব্র হলে স্পিকার সদস্যদের বসতে বলেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় সদস্যবৃন্দ, একটু মনোযোগ দিয়ে আমার কথাটি শোনার চেষ্টা করুন। স্পিকারের কথা শোনার চেষ্টা করুন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, একটা কথা, আপনারা মনোযোগ দিয়ে শোনেন।’ স্পিকার বলেন, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। এখানে প্রত্যেকেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।

স্পিকার বলেন, ‘সারা জাতি দেখছে। সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে। আপনারা নির্বাচিত সদস্য, এখানে সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্য। আমি প্রতিদিনই বলি যে, কার্যপ্রণালিবিধির বইটা একটু পড়েন। যদি এই সংসদ বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না। অতীতে জাতীয় সংসদ সম্পর্কে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। প্রথমে নজমুল হুদা তৎকালীন মাননীয় সদস্য একটা বক্তব্য দিলেন, সদস্যরা ওয়াকআউট করে চলে গেলেন। আমরা ভাবলাম যে, আধা ঘণ্টা পরে আসবে। ওই বয়কট দুই বছর চলেছে। সুতরাং, সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি করা ঠিক নয়। প্রত্যেকেরই বাক্‌স্বাধীনতা আছে। প্রত্যেক সদস্য এখন ইভেন্ট ৩৭০ বিধিতে দলীয় নেগলেক্ট করে, উপেক্ষা করেও ব্যক্তিগত মতামত এখন সবাই দিতে পারেন।’

স্পিকার বলেন, ‘এখানে প্রত্যেকেরই বাক্‌স্বাধীনতা আছে। কোনো সদস্যকে সরকার দলের সদস্য আর বিরোধ দলের সদস্যের মতো হবে, এমন তো হতে পারে না। এ জন্য একটি সরকারি দল, একটি বিরোধী দল এখানে আছে। জনগণ এভাবে নির্ধারিত করে দিয়েছে। যদি সরকারি দলের কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপনাদের আপত্তি থাকে, আপনারা তাঁর বিরুদ্ধে, তিনি যা বলেছেন, সেই যুক্তি খণ্ডন করুন... এই ধরনের যদি শ্মশ্রুমণ্ডিত বয়স্ক ব্যক্তি, যাঁরা অলরেডি দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাঁদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছে; তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে?’

স্পিকার বলেন, ‘সংসদের স্পিকার যখন দাঁড়ায়, তখন এটি অবশ্যই কর্তব্য, সবাই এখানে বসে পড়বেন। আমাকে তো আপনারাই স্পিকার বানিয়েছেন। সংসদের অভিভাবকের প্রতি যদি সম্মান আপনাদের না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোনো রেসপেক্ট থাকবে না আগামী দিনে।’

স্পিকার বলেন, ‘ফজলুর রহমান সাহেব যা বলেছেন, এর পরেই আপনাদের একজনকে টাইম দেব। প্রয়োজন হলে টাইম বাড়িয়ে দেব। তাঁর যুক্তি খণ্ডন করুন। তিনি যদি অসংসদীয় কোনো কথা বলে থাকেন, সেটা আমরা পরীক্ষা করে এক্সপাঞ্জ করে দেব; কিন্তু বক্তব্যের সময় তাঁকে ডিস্টার্ব করবেন না। জনাব সদস্য ফজলুর রহমান, আপনি তিন মিনিটে আপনার বক্তব্য শেষ করেন। তারপর আমি বিরোধী দলের নেতার বক্তব্য শুনব।’

পরে আবার বক্তব্য দেন ফজলুর রহমান। এ সময় ফজলুর রহমান ১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের বিষয়ে কথা বলেন। তখন তিনি বলেন, ‘বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারীদের বলা হয় আলবদর। সেই আলবদর কারা, আপনারা জানেন। আমার দুর্ভাগ্য, প্রথম দিন (১২ মার্চ)... আমি কিছু শুনতে পারি নাই। এ হাউসে তাদের ব্যাপারেও শোক প্রস্তাব হয়েছিল। আমি একা হলেও এটার প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু আমার দল এটা করেছে, তাই চুপ করে ছিলাম। আমার কথাটা পরিষ্কার। কিন্তু এ সংসদ সম্পর্কে আজকে না হলেও কালকে, কালকে না হলেও পরশু ইতিহাসে ভুল বার্তা যাবে, যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে শোক প্রস্তাব আনি।’

ফজলুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের ব্যাপারে যে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সে পুলিশ ৫ আগস্ট পর্যন্ত একরকম; কিন্তু ৫ আগস্টের পরে...আমি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলাম, ১৬ ডিসেম্বরের পরে শত শত রাজাকার আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি কাউকে হত্যা করি নাই, সবাইকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি। ৫ আগস্টের পরে এত থানা লুট হয়েছে, পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে, তখন তো পুলিশ যুদ্ধ করে নাই, তারা তো নিরাপরাধ। এত অস্ত্র গেল কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার নেতা। ৫ আগস্টের পরে এত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কোনো আইনে দায়মুক্তি হওয়ার কথা না।’

ফজলুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে যদি পুলিশ হত্যা হয়ে থাকে, থানা লুট হয়ে থাকে, সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত, দোষীদের বিচার হওয়া উচিত। ৫ আগস্টের পরে পুলিশ যা করেছে, তারা রাষ্ট্রীয় বাহিনী, তারা যদি অন্যায় করে থাকে, মরে গেছে, বিচার হোক। তবে আমি মনে করি, তারাও এ দেশের নাগরিক, পুলিশেরও মা-বাবা আছে, তাদেরও সন্তান আছে, তারাও এতিম হয়েছে, অন্তত রাষ্ট্রের বলা উচিত, তোমার সন্তান যেভাবেই নিহত হোক, আমরা তোমাদের দেখব।’

ফজলুর রহমানের এমন বক্তব্যের সময় সরকারি দলের একাধিক সংসদ সদস্যকে বিরক্ত প্রকাশ করতে দেখা যায়। দু-একজনকে হাতের ইশারা দিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করতে দেখা যায়।

জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়ে ইঙ্গিত করে ফজলুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী মহান কাজ করেছেন। ৭৮ জনকে ২২২ জনের সমান ভাগ দিয়ে কমিটি করেছেন। সিরাজউদ্দৌলা ও মোহাম্মদী বেগ কিন্তু এক না। মোহাম্মদী বেগ কিন্তু সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত