
ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী থাকা অবস্থায় জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে ১৫০ থেকে ২০০ জনকে হত্যা করতে দেখেছেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস, যাঁদের গুলি করে ও ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস এ তথ্য জানান। তিনি বলেছেন, বিবেকের তাড়নায়, সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে এবং সে সঙ্গে কোনো সৈনিককে কখনোই যেন তাঁর মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়, সে জন্য তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউলের বিরুদ্ধে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। গত ১৪ জানুয়ারি এই মামলায় অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
ইমরুল কায়েস জবানবন্দিতে জানান, তিনি ২০০১ সালের ৫ এপ্রিল সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব সদর দপ্তরে প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। তাঁর ২০১০ সালের ১০ আগস্ট র্যাবে পোস্টিং হয়। জিয়াউল আহসানের রানার (দেহরক্ষী) থাকা অবস্থায় তাঁর কাজ ছিল সব সময় জিয়াউল আহসানের সঙ্গে থাকা। তাঁর সঙ্গে ইমরুল জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি সদর দপ্তর, ডিবিপ্রধানের কার্যালয় (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনিরুল ইসলাম)—এসব স্থানে যেতেন। মাঝেমধ্যে সচিবালয়ে যেতেন। এ ছাড়া মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা) বাসায় যেতেন।
ইমরুল বলেন, তারিক আহমেদ সিদ্দিকের সঙ্গে জিয়াউলের ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁর প্রধানমন্ত্রীর (তৎকালীন) সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক ছিল। জিয়াউল যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন, তখন তাঁর গাড়িতে অস্ত্র-গুলি থাকত। কিন্তু তা তল্লাশি করা হতো না। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ, আমির হোসেন আমু ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গেও জিয়াউল আহসানের ভালো সম্পর্ক ছিল।
ইমরুল কায়েস জানান, তিনি রানার হিসেবে যোগদানের ২০-২৫ দিন পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে জিয়াউল আহসান তাঁকে ফোন করে র্যাব-১-এর সামনে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে গাড়িতে ওঠার পর জিয়াউল আহসান তাঁকে বলেন, পেছনে একটি বস্তা আছে। বস্তাটি ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে র্যাব-১-এর সিও রাশেদ ও ক্যাপ্টেন কাউসার ছিলেন। তাঁরা র্যাব-১ থেকে বের হয়ে টঙ্গীর আহসান উল্লাহ ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে রেলক্রসিংয়ে যান। তখন জিয়াউল আহসান বস্তা বের করতে বলেন ইমরুলকে। নামানোর পর দেখা যায়, বস্তায় ঠান্ডা একটি মরদেহ। পরে কয়েকজন ধরে মরদেহটি রেললাইনের ওপরে রাখেন। কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন চলে গেলে তাঁরাও চলে যান।
ইমরুল বলেন, কয়েকবার জিয়াউল আহসান সুন্দরবন অভিযানে যান। সঙ্গে ইমরুলকেও নেওয়া হয়। একবার তাঁদের সঙ্গে র্যাব-৮-এর সদস্যরাও ছিলেন। তাঁদের বোট (নৌযান) থামার পর জঙ্গলের ভেতর থেকে দুই-তিনটি গুলির শব্দ আসে। তখন নির্দেশ দেওয়া হলে তাঁরাও গুলি করেন। ভাটা থাকার কারণে কাদায় হাঁটু পর্যন্ত দেবে যাচ্ছিল। সেখানে জিয়াউল আহসান, র্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব, কমান্ডার সোহায়েল এবং গণমাধ্যমের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জঙ্গলের ভেতরের দিকে গেলে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুই থেকে তিনটি লাশ পড়ে আছে। এই অভিযান সাজানো মনে হয়েছিল ইমরুলের কাছে।
ইমরুল জানান, ২০১১ সালে রমজান মাসে এক দিন ইফতারের আগমুহূর্তে জিয়াউল আহসান ফোন দিয়ে ইমরুলকে ক্যামেরা নিয়ে উত্তরা নর্থ টাওয়ারে যেতে বলেন। তিনি গিয়ে দেখেন, চারজন লোককে ক্রসফায়ারে (কথিত বন্দুকযুদ্ধ) দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যাঁরা ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এটাও সাজানো ছিল।
১১ জনকে হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইমরুল বলেন, ২০১২ সালে তিনটি মাইক্রোবাসে করে তাঁরা ১১ জন আসামিকে নিয়ে জিয়াউলের নেতৃত্বে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্প এলাকায় যান। সেখানে ১১ জনকে বোটে (নৌযান) ওঠানো হয়। ইমরুল কাছে গিয়ে দেখেন, এটি সেই বোট, যেটি সুন্দরবন অভিযানে জলদস্যুরা ব্যবহার করেছিল। বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে আগের মতো এই ১১ জনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ওই অভিযানে জিয়াউল, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ, কমান্ডার সোহায়েল ও এডিজি (অপস) মুজিব ছিলেন।
ইমরুল আরও বলেন, র্যাব-৪-এর সেফ হাউস থেকে দুজন আসামিকে দুটি মাইক্রোবাসে নেওয়া হয়। প্রায় আধা ঘণ্টা চলার পর গাড়িটি তিন মাথার মোড়ে এক জায়গায় থামানো হয়। একজন আসামিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জিয়াউল আহসান তাঁর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করেন। ওই আসামির মাথায় অনেক চুল থাকার কারণে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তাঁদের পাঠিয়ে দিয়ে জিয়াউল আহসান অপর আসামিকে নিয়ে চলে যান। জিয়াউল যখন র্যাব-৪-এ ফেরত আসেন, তখন ওই আসামি তাঁর সঙ্গে ছিলেন না। কিছু কিছু অভিযানে ইমরুলকে নিতেন না জিয়াউল।
জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস জানান, জিয়াউল আহসান তাঁকে একবার ফোন করে র্যাব-১-এর সামনে গিয়ে মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। তিনি গাড়িতে গিয়ে মেজর নওশাদ ও দুজন আসামিকে জমটুপি পরা অবস্থায় দেখতে পান। কিছুক্ষণ পর জিয়াউল আহসান গাড়িতে এসে ওঠেন। তাঁরা টঙ্গীর আহসান উল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর ব্রিজের ওপরে গিয়ে দাঁড়ান। জিয়াউল একজন আসামিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পরপর দুটি গুলি করেন। আর ব্রিজ থেকে ফেলে দেওয়ার সময় তাঁর লুঙ্গি খুলে দেন। একইভাবে মেজর নওশাদ অপরজনকে গুলি করে হত্যা করেন এবং লুঙ্গি খুলে পানিতে ফেলে দেন।
ইমরুল জানান, তিনি বেশ কয়েকবার জিয়াউল আহসানের সঙ্গে বরিশালে গিয়েছেন। সেখানে র্যাব-৮-এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চরদুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদের ভেতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনো দুজন, কখনো তিনজন, কখনো চারজন টার্গেটকে (আসামি) হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। তাঁদের সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যার পর নদীতে ফেলার আগে কমান্ডো নাইফ দিয়ে পেট চিরে ফেলা হতো।
জবানবন্দিতে ইমরুল জানান, ২০১২ সালের মাঝামাঝি র্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামি নিয়ে তাঁরা জিয়াউলের নেতৃত্বে জাফলং সীমান্তে যান। দুজন আসামিরই হাত বাঁধা ও মাথায় জমটুপি পরানো ছিল। রাত ২টার দিকে সেখানে পৌঁছালে ভারত থেকে দুজন আসামি নিয়ে সিভিল পোশাকে ৪-৫ জন লোক তাঁদের কাছে হস্তান্তর করেন। আর টিএফআই সেল থেকে নেওয়া দুজনকে ভারতীয়দের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ভারত থেকে প্রাপ্ত দুজনকে নিয়ে জিয়াউল আহসান ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। জাফলং সীমান্ত থেকে ২৫-৩০ কিলোমিটার আসার পর গাড়ি থেকে একজনকে নামানো হয় এবং জিয়াউল তাঁকে গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন। অন্যজনকে আরও ১০-১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর একইভাবে গুলি করে ফেলে দেন জিয়াউল।
ইমরুল কায়েস জানান, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরতে। ওই সময় জিয়াউল ৮-১০ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করেন। তাঁদের ইনজেকশন পুশ করে এবং পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে আর্মি ক্যাম্পের পাশে থাকা নদীতে নিয়ে সিমেন্ট ভরা দুই বস্তার সঙ্গে বেঁধে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর বিষয়ে জবানবন্দিতে ইসরুল বলেন, ২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল র্যাব সদর দপ্তর থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়াউল, মেজর নওশাদ, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফসহ তাঁরা মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যান। কাকে গাড়িতে পিক করা হবে, তা তিনি জানতেন না। জিয়াউল গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন—টার্গেট কখন আসবে, তা জানতে। একপর্যায়ে জানা যায়, টার্গেট আসবে না। পরে সেখান থেকে তাঁরা চলে যান। পরদিন ইমরুল ৯ দিনের ছুটিতে যান। ছুটিতে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমে জানতে পারেন, ইলিয়াস আলী নামের বিএনপি দলীয় এক নেতাকে মহাখালী ওভারব্রিজ এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ছুটি শেষে কাজে ফিরে অন্যদের মাধ্যমে জানতে পারেন, কোতের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার ও সিসিটিভি ফুটেজ জিয়াউল আহসান নষ্ট করে ফেলেছেন।
ইমরুল বলেন, একদিন জিয়াউল ফোনে তারেক আহমেদ সিদ্দিককে বলেন, ‘স্যার আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে? এরচেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠিয়ে দেন, এটাই আমার ভালো।’
ইমরুল তাঁর জবানবন্দিতে জানান, দেহরক্ষী থাকা অবস্থায় তিনি লক্ষ করেছেন, জিয়াউল আহসান বিভিন্নভাবে আসামিদের গুম করতেন। তিনি র্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের গুলি ও ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করতেন। এই ইনজেকশন প্রয়োগ করার কাজটি কখনো টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনো গাড়িতে করা হতো। ইমরুল র্যাব থেকে চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি।
জবানবন্দির এ পর্যায়ে ইমরুল কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি। তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসেবে দেখেছি, তিনি (জিয়াউল আহসান) ওই সময়কালে ১৫০-২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনো সৈনিককে কখনোই যেন আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।’

দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ রোববার রাতে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেশটিতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন তিনি...
৫ মিনিট আগে
জাতীয় সংসদে নিজেকে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ দাবি করে দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুল মুনতাকিমের বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আজ রোববার একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা জানান তিনি। স্পিকার জানান, সংসদ সদস্যের ওই...
২ ঘণ্টা আগে
প্রধানমন্ত্রী অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন—এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদের এমন বক্তব্যে সংসদে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজকে এখানে নেই। উনি যখন বিভিন্ন ভাষণে গিয়ে অসত্য তথ্য দিয়ে বলেন—বিরোধী দল মিছিল করতেছে...
২ ঘণ্টা আগে
দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ রোববার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে...
২ ঘণ্টা আগে