Ajker Patrika

জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি না দিলে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো

র‍্যাবের টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি না দিলে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো
ছবি: সংগৃহীত

‘জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি না দিলে লাশ কেটে টুকরো করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অথবা বন্দী রেখে পাগল বানিয়ে ঢাকা শহরে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।’

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় র‍্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এ জবানবন্দি দেওয়ার সময় এ কথা বলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর (পল্টন) জোনের সহকারী সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম।

এই মামলায় ৪ নম্বর সাক্ষী হিসেবে শফিকুলের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তাঁকে ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি জাপান গার্ডেন সিটির কাছ থেকে মাইক্রোবাসে করে তুলে নেওয়া হয়। যারা তুলে নেয় তারা নিজেদের প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়েছিলেন।

শফিকুল ইসলাম জবানবন্দিতে বলেন, তাঁকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল তা ৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪ ফুট প্রস্থের। তিনি কোনো কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না সে বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিতে বলা হয়। স্বীকারোক্তি দিতে না চাইলে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। একপর্যায়ে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়, এই চেয়ারে বসিয়ে শায়খ আব্দুর রহমান, জসিম উদ্দিন রহমানীকে সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে তাদের পেট থেকে সবকিছু বের করা হয়েছে। জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি না দিলে কেটে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে অথবা এখানে রেখে পাগল বানিয়ে ঢাকা শহরে ছেড়ে দেওয়া হবে। আর ঢাকা শহরের অধিকাংশ পাগল তাদের তৈরি বলে জানান একজন।

শফিকুল ইসলাম বলেন, স্বীকারোক্তি না দেওয়ায় তাঁকে বসতে, শুতে, ঘুমাতে দেওয়া হতো না। বেশির ভাগ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। বলা হতো, যদি ঘুমাতে দেখা যায় তবে পেছন দিকে হাতকড়া লাগিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হবে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা হতো। শক্ত করে চোখ বেঁধে রাখায় প্রচণ্ড মাথাব্যথা হতো। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় ব্যথায় চোখ বের হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

শফিকুল বলেন, বন্দী থাকা অবস্থায় একদিন তাঁকে মাত্র তিন মিনিট সময় দেওয়া হয় ওয়াশ রুম ও গোসল শেষ করতে। গোসল করা অবস্থায় একজন ভেতরে ঢুকে পেটানো শুরু করেন। বাথরুমের দরজা খোলা রাখা হতো। দরজার বাইরে একজন রক্ষী দাঁড়িয়ে থাকত। পানি খেতে দেওয়া হতো বাথরুমের ট্যাপ থেকে। বাথরুম ও গোসলের জন্য একহাতের হাতকড়া খুলে দেওয়া হতো। আটক অবস্থায় দাঁত পরিষ্কারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বাথরুমে কোনো জানালা ছিল না। এমনকি যে কক্ষে তাঁকে রাখা হয়েছিল, সেখানে কোনো লাইট-ফ্যান ছিল না।

এই মামলায় ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তাঁরা হলেন র‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল কে এম আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল হাসান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম, সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম, সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল এবং সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন।

পলাতক আসামিরা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনার সাবেক প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এম খুরশিদ হোসেন, র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত