Ajker Patrika

সার মজুত থাকলে কৃষক পাচ্ছেন না কেন, সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১: ০০
সার মজুত থাকলে কৃষক পাচ্ছেন না কেন, সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন
ফাইল ছবি

দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার সরকারি দাবির মধ্যেই কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না—এ প্রশ্নে জাতীয় সংসদে সরকারের সমালোচনা করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, দেশে সারের ঘাটতি না থাকলেও সরবরাহ, ডিলার ব্যবস্থাপনা, কালোবাজারি ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষকেরা সংকটে পড়ছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চাহিদার তুলনায় দেশে অতিরিক্ত সার মজুত রয়েছে। ডিলার নিয়োগসহ সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধিতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের দেওয়া নোটিশের ওপর আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে।

‘দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া, কৃষকদের মধ্যে বিরাজমান আতঙ্ক এবং সম্ভাব্য খাদ্যসংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি নোটিশটি দেন। দেশে সার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় যৌথভাবে দেখভাল করে। এ দিন সংসদে দুই মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কোনো মন্ত্রী বক্তব্য দেননি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্বৈরাচার সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া অনেক ডিলার এখনো বহাল আছে। অনেকে পলাতক। এখনো প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি সারের ডিলার পয়েন্ট শূন্য। বিতরণে যাতে সমস্যা না হয় সে জন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলারের নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলারেরা বিভিন্নভাবে সরকারকে হেয় করার চেষ্টা করছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। এটি আর করতে পারবে না। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি সারের মজুতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, গত বছর মজুত অনেক কম ছিল। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং মিয়ানমারের সারের দাম অনেক বেশি। এই কারণে কিছু সার সেখানে পাচার হওয়ার প্রবণতার তথ্য প্রশাসনের কাছে রয়েছে। এ রকম দুটি ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার আছে বলেই কৃষকেরা আগামী মৌসুমের জন্য সার কিনতে পারছেন। এটা মাথায় রেখেই কৃষি বিভাগ ও সরকার প্রত্যেক জেলায় অতিরিক্ত সার মজুত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম বলেন, সার বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির প্রাণ। চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশে খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের এই সংকটে সরকারের তথ্যমতে সার অতিরিক্ত মজুত আছে। সার যদি অতিরিক্ত মজুত থাকে তবে কৃষকেরা সার পাচ্ছে না কেন এবং কেন তাদের কালোবাজারে যেতে হচ্ছে?

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও রৌমারীতে কৃষকদের গোডাউন লুটের ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের অসন্তোষের কথাও সংসদে তুলে ধরেন তিনি।

এই সংসদ সদস্যের অভিযোগ, সারের মজুত থাকার পরও কৃষকদের মধ্যে যে হাহাকার তৈরি হয়েছে, তা সরকারের ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। কালোবাজারি রোধ, ডিলারদের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ করেন তিনি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, সার ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ইতিমধ্যেই অনেক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে ৬৪টি জেলায় ৬৪টি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব ও দুজন উপসচিবের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের ডিলারদের পরিবর্তনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন শূন্য পদে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, যার আবেদনের শেষ তারিখ আগামীকাল। কিন্তু আবেদনের সময় শেষ হওয়ার আগেই অহেতুক অনিয়মের অভিযোগ তোলা অবান্তর।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যে সংসদ সদস্য সার নিয়ে কথা বলে সভা ত্যাগ করেছেন, উনার বক্তব্য শুনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উকিল আবদুস সাত্তারের কথা মনে পড়ে। উনার বেইমানির জন্য কপালে কী আছে তা আল্লাহই ভালো জানেন।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় আসা সার সংক্রান্ত ২০-২২টি বিশেষ এলাকার ছোটখাটো সমস্যাগুলোকে ভিত্তি করে অসন্তোষ ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে। স্যাবোটাজ না করে জনগণের পক্ষে কীভাবে কাজ করা যায় সেদিকে নজর দেওয়া উচিত।’

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশে সারের মোট পরিমাণ ৫১ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন, যা চাহিদা মেটানোর পরও ১৫ দশমিক ৮৪ লক্ষ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত থাকবে। কৃষকদের সম্মানিত করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টাঙ্গাইল জেলায় প্রথম কৃষক কার্ড উদ্বোধন করেন। এই কার্ডের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া অনেক সহজ হবে, উৎপাদন বাড়বে এবং সারের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে। বিরোধী দলকে আহ্বান জানানো হচ্ছে যে আস্থা রাখুন, কারণ বিএনপি যা বলে তা-ই পালন করে এবং কখনো জনগণের বিরুদ্ধে যায় না।’

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি যে, সারে নাকি আমাদের পুরো দেশ ভাসছে। ওকে ভাসছে, স্বীকার করলাম। প্রথম আলোর রিপোর্ট ‘ন্যায্য মূল্যের চেয়েও বেশি টাকা দিয়ে সার পাচ্ছে না কৃষক’ এটা জামাত বা বিরোধী দলের বট বাহিনীর কোনো রিপোর্ট না।

সার সংকটের মধ্যে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোডাউন ভর্তি—এমন অভিযোগ করে এর সমালোচনা করেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আবার সেই ২০০১-২০০৬ সালের সিনড্রোম। যখন এক বস্তা সারের পরিবর্তে কৃষককে গুলির মুখে জীবন দিতে হয়েছে।

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শরিফুল আলম শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে বলেন, দেশে পর্যাপ্ত সার উৎপাদন, আমদানি ও মজুত রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসি উৎপাদিত ও আমদানি করা সার কারখানা ও বাফার গুদামে রাখে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী তা ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে বিসিআইসির সাতটি সার কারখানার মধ্যে ঘোড়াশাল-পলাশ এবং শাহজালাল সার কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড গ্যাস পাওয়ার পর উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

শরিফুল আলম বলেন, ‘বর্তমানে সারের কোনো সংকট নাই। সারের পর্যাপ্ত উৎপাদন, আমদানি, মজুত রয়েছে। সংকট তীব্র নয়, সার আছে। ব্যবস্থাপনা ত্রুটি কিছু থাকতে পারে।’

জামায়াতের সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, তাঁরা সরকারের কথাই বিশ্বাস করতে চান। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। জ্বালানি সংকট যখন শুরু হলো, তখনো কিন্তু আমাদের বলা হয়েছিল দেশে কোথাও লোডশেডিং নেই। এখন কি আমরা ওনাদের বিশ্বাস করব, নাকি অবিশ্বাস করব?

নাজিব বলেন, ‘সরকারের সাফল্য এবং ব্যর্থতা তার ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। বলতে বাধ্য হচ্ছি, সরকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সার কারখানাগুলোকে বন্ধ রেখে বেশি দামে জনগণের টাকায় আপনারা সার কিনছেন, বলছেন মজুত আছে—ঠিকই আছে, কিন্তু এটা কৃষকের হাতে পৌঁছাতে পারছে না কেন? এটাই আপনাদের ব্যর্থতা। জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে যা লক্ষ্য করেছি, সারের সংকটের ক্ষেত্রেও আমরা একই বিপর্যয় লক্ষ্য করছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত