Ajker Patrika

সংসদে ব্যাংক রেজল্যুশন বিল পাস, রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরে হট্টগোল

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ২৩
সংসদে ব্যাংক রেজল্যুশন বিল পাস, রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরে হট্টগোল
সংসদে রুমিন ফারহানা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

জাতীয় সংসদে ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল পাস হয়েছে। এরপর বিলের আলোচনায় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরে সংসদে হট্টগোলও তৈরি হয়। রুমিন ফারহানা বিএনপির সমালোচনা করে বক্তব্য দিলে সরকারি দলের সদস্যরা হইচই-হট্টগোল করে প্রতিবাদ জানান।

বিলের জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবের আলোচনায় রুমিন ফারহানা বলেন, প্রতিটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট হবে না, এটা হতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আবার সারের সংকট হবে না, গরিব কৃষক সার কারখানায় গিয়ে সেটা লুট করবেন না, সেটাও হতে পারে না।

রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটাও হওয়া সম্ভব না, মাননীয় স্পিকার।’

এ সময় বিএনপির সংসদ সদস্যরা হইচই শুরু করেন।

রুমিন ফারহানা বলতেই থাকেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেইটাও হইতে পারে না। সুতরাং, বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে—ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ হওয়া, ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার ওপরে ঋণখেলাপি হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি...।’

সংসদ সদস্যরা হইচই শুরু করলে রুমিন বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, এত অসহিষ্ণু সংসদ! মনে হয় যেন আবারও আওয়ামী লীগের আমলে ফিরে গেছি আমরা। মজা! মন্দ না। আওয়ামী লীগকে যখন বলতাম, তখন তারাও হট্টগোল করত। এখন বিএনপি একই ধরনের আচরণ করছে। আরও খারাপ আচরণ।’

হইচইয়ের মধ্যেই বিলের বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এই সংসদে বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের আগে নামটা কাটানোর জন্য হাইকোর্টে গিয়ে রিট করা, এগুলো আমাদের পুরোনো সংস্কৃতি। এগুলো আমরা বহুত দেখছি।’

এ সময় রুমিন ফারহানার জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হলে মাইক বন্ধ হয়ে যায়। তবে সংসদে হইচই-হট্টগোল চলতেই থাকে। রুমিনও মাইক ছাড়া কথা বলতে থাকেন। এ সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ রুমিন ফারহানার উদ্দেশে অশালীন শব্দ চয়ন করেছেন বলেও অভিযোগ এসেছে।

সরকারি দলের সদস্যদের হইচইয়ের পাল্টায় বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্যও রুমিনের পক্ষে মাইক ছাড়া কথা বলেন। সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বারবার সংসদ সদস্যদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কেউ থামছিলেন না। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও দাঁড়িয়ে কিছু বলছিলেন। ডেপুটি স্পিকার সব সদস্যকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করেন।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘একজন মাননীয় সদস্য বক্তব্য দিচ্ছেন, তাঁর কথা বলার স্বাধীনতা আছে; কিন্তু অন্য মাননীয় সদস্যদের উনার বক্তব্য প্রদানে বাধা প্রদান, সেটা কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে।’ রুমিন ফারহানা তখনো দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইছিলেন। তাঁকে বসার অনুরোধ করেন ডেপুটি স্পিকার।

চিফ হুইপের উদ্দেশে কায়সার কামাল বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের প্রত্যেকের এখানে লিবার্টি আছে, তাঁরা তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। আপনাদের টার্ন যখন আসে, আপনারা তখন সেটা খণ্ডন করবেন। কিন্তু বক্তব্য প্রদানে বাধা প্রদান করা কোনো অবস্থায়ই কাম্য না।’

এরপর বিলের আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য আরও এক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বান জানানো হয়। তবে তখনো হইচই চলছিল। এ সময় রুমিন ফারহানা ও হান্নান মাসউদকে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে দেখা যায়। স্পিকার তাঁদের বসতে অনুরোধ করেন। এরপর শেখ মুজিবুর রহমান বক্তব্য দেন।

হান্নান মাসউদের প্রতিবাদ

রুমিন ফারহানা যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন তাঁকে লক্ষ্য করে হইচই করতে থাকেন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা। একপর্যায়ে তাঁকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়। এতে ক্ষিপ্ত হন বিরোধীদলীয় কয়েকজন সদস্য। মাইক ছাড়াই রুমিন ফারহানা দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁকে অশালীন ভাষায় গালি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করতে থাকেন। স্পিকার তাঁকে বারবার বসার অনুরোধ জানালেও তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদও দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্যকে এভাবে গালি দেওয়া যায় না। তিনি বিরোধী দলের অন্য সদস্যদের প্রতিবাদ করতে অনুরোধ জানান। একপর্যায়ে হান্নান মাসউদ সংসদ থেকে বেরিয়ে যান। এরপর বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। পরে হান্নান মাসউদ আবার সংসদকক্ষে প্রবেশ করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংসদ সদস্যের বক্তব্য অসংসদীয় হলে সেটা স্পিকার রুলিং দিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জবাব দিতে পারেন। হতে পারে তাঁর (রুমিন) কথা সবগুলো সংগত নয়। আবার হতে পারে যে, কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কিছুই শুনতে পারলাম না। উনি কী বললেন, সব তো হারিয়ে গেল।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আজকে উনি কী বললেন, আমরা বুঝতেই পারলাম না। উনি কি গালি দিলেন, না দোয়া দিলেন, কিছুই বুঝলাম না। আসলেই কি তিনি বক্তব্য রাখতে পারলেন? সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর যে অধিকার, সেটা কি অ্যাস্টাবলিশ হয়েছে? এটা মূলত আমি আপনার (স্পিকার) কাছেই জানতে চাচ্ছি। এর প্রতিকারটা কী হবে? রেকর্ড হবে কীভাবে?’

পরে এনসিপির আরও এক সদস্য আখতার হোসেন বক্তব্য দিতে দাঁড়ান। তিনি ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের সংশোধনী আনায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান। সংসদে যখন এমন অবস্থা চলছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদকক্ষে উপস্থিত ছিলেন না।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘সংসদে আমরা সবাই কথা বলতেছি আর আমরা চাই সংসদে সকল সমস্যার সমাধান। কিন্তু সংসদে সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে যদি আমরা সমস্যা তৈরি করি, সেটা একটা প্রবলেম। আমরা চাই, এখানে হেলদি আলোচনা হোক।’

বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও রাজনীতি পেয়েছে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, একজন সদস্য যখন কথা বলেন, তাঁর নিজেরও দৃষ্টি রাখা দরকার। মাত্র কয়েক দিন আগে উনি (রুমিন) বিএনপির পক্ষে কথা বলেছেন।

এরপর ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় চিফ অ্যাট দ্য সেইম টাইম, এজ আ চিফ হুইপ, আপনারও কিন্তু রেসপনসিবিলিটি আছে। হুইপিং দ্য মেম্বারস অব দ্য পার্লামেন্ট। একজন অনারেবল মেম্বার কথা বলতে পারবেন, আন-পার্লার্মেন্টারি হলে সেটা এই চেয়ার থেকে এক্সপাঞ্জ করা হবে। বাট সেটাকে বাধা দেওয়া ঠিক না। আর চিফ হুইপ হিসেবে আপনার মূল দায়িত্ব হাউসের শৃঙ্খলা বজায় রাখা।’

পরে বিলের আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি তো বিষয় কী, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি কী বললাম, আলোচনা কী হলো? দুঃখজনক।’

প্রসঙ্গত, সংসদে বিলটি পাসের সময়ে সরকারি দল ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়। তবে বিরোধী দল চুপ ছিল। তারা পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেয়নি। বিলটি পাসের সময়ে রুমিন ফারহানা সংসদকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তার আগে সংসদের সাপোর্ট স্টাফের মাধ্যমে আবদুল হান্নান মাসউদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। পরে হান্নান মাসউদও সংসদকক্ষ থেকে বের হন।

পরে রুমিন ফারহানা বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগালি করেছেন। চিফ হুইপের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত