Ajker Patrika

শিশুদের বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন

শরীফ নাসরুল্লাহ, ঢাকা
শিশুদের বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন
প্রিয় লেখকের বই খুঁজছেন কয়েক তরুণী। গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণে। ছবি: আজকের পত্রিকা

বইমেলায় শিশুদের জন্য এবার আলাদা করে চত্বর করা হয়নি। মেলার একটি অংশে শিশুদের প্রকাশনার জন্য স্টল সাজানো হয়েছে। শিশুদের জন্য অনেক বই-ই বের হচ্ছে এখন। তুলনামূলকভাবে তাদের বই বিক্রির সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবে বেশির ভাগ বইয়ের মান নিয়ে অভিজ্ঞজনদের অভিযোগ আছে। সেসব অভিযোগ যে খুব অযৌক্তিক না, তা দৈবচয়ন ভিত্তিতে কিছু বই ঘাঁটলেই বোঝা সম্ভব। গতকাল বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদক একটা ছোট ‘সমীক্ষা’ও চালিয়েছেন।

মেলা ঘুরে দেখা গেছে, বইমেলার স্টলে স্টলে সাজানো শিশুদের বইয়ের অবস্থা খুব একটা সুবিধার নয়। বেশির ভাগ প্রকাশক পুরোনো বই নিয়েই হাজির। অনেক ক্ষেত্রে একই বই প্রচ্ছদ পালটে যেনতেন করে বের করা হয়েছে।

শিশুদের বইয়ের একটি স্টলে চোখ আটকে গেল ‘মৎস্য কন্যা’ নামের বইতে। প্রচ্ছদে বিদেশি কার্টুনের ছবি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছাপা নিম্নমানের। পুরো বইয়ের পাতায় পাতায় ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা ছবি। মৎস্য কন্যার যে ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা শিশুদের উপযোগীও নয়। কিন্তু স্টলে থাকা বইটির প্রকাশক দাবি করলেন, ‘ছবিগুলো ঠিক আছে। বাচ্চারা এগুলো বোঝে না!’

বাচ্চাদের ভূতের গল্পের একটি বইয়ের প্রথম গল্পটি দেখা গেল আসলে গ্রামীণ কিংবদন্তি। এক সাধকের আশীর্বাদে এক রাতের মধ্যেই দিঘি খোঁড়ার কাহিনি। গল্পটিতে ‘কুটির’ শব্দটি চারবার লেখা হয়েছে ‘কুঠির’। অলংকরণ শিল্পী ‘মফিজ মিয়া’ নামে একজনকে এঁকেছেন টি-শার্ট পরা তরুণের চেহারায়। ছবিতে অমাবস্যা রাতের পরের দিন আকাশে দেখা যাচ্ছে পূর্ণিমার মতো বড় চাঁদ! অর্থাৎ শিল্পী ভালো করে মাত্র ৩ পৃষ্ঠার গল্পটি পড়েননি। বিষয়টি এড়িয়ে গেছে স্বয়ং লেখক এবং প্রকাশকের চোখও।

একটি স্টলে রাখা বেশ কয়েকটি শিশুদের বইয়ের প্রচ্ছদ করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে। শিশুদের জন্য সৃজনশীল কাজ না করিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের উদ্দেশ্য কী—এ প্রশ্ন করলে দায়িত্বে থাকা কর্মী বললেন, ‘এখন এআইয়ের যুগ। বাচ্চারা বইয়ের দিকে আকৃষ্ট হবে। তাই করেছি।’

শিশুদের স্টল এলাকায় দেখা মিলল লেখিকা জাকিয়া খানের। তিনি তাঁর ভাইয়ের সন্তানের জন্য বই কিনছিলেন। মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন জাকিয়া খানও। বললেন, ‘শিশুদের বই শিশুদের মতো করে তৈরি করা হয় না। তাই বইয়ের প্রতি ওদের আগ্রহও বাড়ে না।’

সরকারি প্রতিষ্ঠান শিশু একাডেমি ও বাংলা একাডেমির পাশাপাশি কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের শিশু-কিশোরদের জন্য ভালো মানের বইও রয়েছে। প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে শিশুদের বই বের করা কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান ভালো বই আনছে।

নতুন বইয়ের খোঁজে: ‘আমেরিকার প্যারানরমাল গল্প’ নামে ভুতুড়ে ঘটনা নিয়ে গল্পের বই এসেছে পাঞ্জেরির স্টলে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ঘটা কিছু রহস্যজনক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে এর গল্পগুলো। বইটির লেখক আদনান সৈয়দ।

‘বাংলা গদ্যসাহিত্য বিবিধ বিকিরণ’ নামের আসমা উল হোসনা চৌধুরীর আলোচনামূলক প্রবন্ধের বই এনেছে চন্দ্রাবতী একাডেমি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্গা, তারিণী মাঝি, শওকত ওসমানের দরিয়া বিবিসহ বাংলা গদ্যসাহিত্যের বিভিন্ন চরিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে বইটিতে।

গতকাল বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ৯২টি। তথ্যকেন্দ্রের হিসাবে গতকাল পর্যন্ত মেলায় আসা মোট নতুন বই ৩৭৪টি।

অন্যান্য আয়োজন: ‘জন্মশতবর্ষ: সুকান্ত ভট্টাচার্য’ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান বক্তা সুমন সাজ্জাদ বলেন, বাংলা সাহিত্যে ‘কিশোর—কবি’ আখ্যা পেলেও সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা মোটেই কিশোরসুলভ চপলতায় আচ্ছন্ন নয়। ভাবাদর্শিকভাবে কবি সুকান্ত হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক। তাই তাঁর কবিতায় চিত্রিত হয়েছে কাশ্মীর, স্তালিনগ্রাদ ও প্যারিসের ঐতিহাসিক সংগ্রামের ছবি। আলোচনায় অংশ নেন আহমেদ মাওলা। সভাপতিত্ব করেন আবদুল হাই শিকদার।

‘লেখক বলছি’ মঞ্চে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন ও কবি আসাদ কাজল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন শোভা চৌধুরী। আবৃত্তি করেন শাকিলা মতিন মৃদুলা এবং সালমা সুলতানা। সংগীত পরিবেশন করেন আব্দুল লতিফ শাহ, এলাহী মাসুদ, ডলি মণ্ডল, শামীম সালাম, সাইফুল ইসলাম, মো. আলতাফ হোসেন ও জাকির হোসেন।

আজ ছুটির দিনে মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর, যাতে থাকে শিশুদের মজা দেওয়ার কিছু আয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত