Ajker Patrika

প্রথম রিটার্নেই ২ কোটি টাকার ঘোষণা এপিএসের গাড়িচালক ভাইয়ের

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকা
প্রথম রিটার্নেই ২ কোটি টাকার ঘোষণা এপিএসের গাড়িচালক ভাইয়ের
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন ও রিয়াজুল ইসলামদের বাড়িতে নতুন ভবন হচ্ছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

একসময় ভাড়ায় গাড়ি চালাতেন রিয়াজুল ইসলাম। মাস শেষে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত সংসার। কিন্তু মাত্র আট মাসে বদলে গেছে তাঁর জীবনের হিসাব-নিকাশ। এখন তিনি দুটি গাড়ির মালিক, ব্যাংকে রয়েছে মোটা অঙ্কের আমানত, কোটি টাকার ব্যবসায়িক মূলধন। সব মিলিয়ে প্রায় দুই কোটির সম্পদের ঘোষণা দিয়েছেন আয়কর নথিতে। এর বাইরেও তাঁর নামে-বেনামে রয়েছে সম্পদ।

এই উত্থানের নেপথ্য খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, রিয়াজুল ইসলাম অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের আপন বড় ভাই। ভাইয়ের নিয়োগের পর থেকেই যেন ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে তাঁর। এলাকায় রিয়াজুল ইসলামকে সবাই চেনেন ইলিয়াস মণ্ডল নামে।

একজন সাধারণ গাড়িচালক, যিনি আগে কখনো আয়কর দেননি, প্রথম রিটার্নেই তিনি প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদের ঘোষণা দিয়েছেন। বিপুল এই সম্পদ অর্জনে সময়ের ব্যবধান মাত্র আট মাস। দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব সম্পদ অর্জনের পক্ষে রিয়াজুল ইসলাম ওরফে ইলিয়াস মণ্ডল কোনো বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি।

এনবিআরের আয়কর নথির তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ কর বর্ষে দাখিল করা আয়কর রিটার্নে রিয়াজুল ইসলাম তাঁর ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছেন। নথি অনুযায়ী, অর্জিত সম্পদের পুরোটাই তিনি অর্জন করেছেন ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে। কারণ, এই আট মাস তাঁর ছোট ভাই মোয়াজ্জেম সাবেক উপদেষ্টার এপিএসের দায়িত্ব পালন করেন।

এ ছাড়া আয়কর নথিতে রিয়াজুল তাঁর ব্যবসায়িক মূলধন উল্লেখ করেন ৯৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। নথি ঘেঁটে দেখা যায়, রাজধানীর শ্যামলী শাখায় ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক পিএলসির ১৪৮১৫৮০০৮৪২৭৫ হিসাব নম্বরে তাঁর ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৭২৮ টাকা এফডিআর রয়েছে। এই এফডিআরে থাকা অর্থ অর্জনের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে গত বছরের ১০ নভেম্বর। এর ঠিক দুই দিন আগে একই হিসাব নম্বরের একটি সঞ্চয়ী আমানতে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৮৬৭ টাকা অর্জনের তারিখ উল্লেখ করেন তিনি।

গত বছরের ৩০ জুন রিয়াজুলের হাতে নগদ ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯৩১ টাকা অর্জনের তথ্য দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ডেলটা লাইফ ইনস্যুরেন্সে তাঁর জমা রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৩৯২ টাকা।

আজকের পত্রিকার কাছে রিয়াজুল ও তাঁর স্ত্রী সাথী খাতুনের নামে থাকা দুটি গাড়ি কেনার তথ্য রয়েছে। আর এই দুটি গাড়ি তিনি কিনেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে। রিয়াজুল তাঁর নিজের নামে কেনা (নোয়া মাইক্রোবাস ঢাকা মেট্রো গ-৩১-৫২৯৮) গাড়িটির মূল্য আয়কর নথিতে দেখিয়েছেন ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। গাড়িটি তিনি কিনেছেন ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর।

এ ছাড়া রিয়াজুলের স্ত্রী সাথী খাতুনের নামে থাকা আরেকটি প্রাইভেট কার রয়েছে, যার নম্বর ঢাকা মেট্রো চ-১২-৬৮৯৭। আয়কর নথিতে গাড়িটির মূল্য দেখিয়েছেন ১২ লাখ ৯০ হাজার ৫০০ টাকা; যেটি কেনা হয়েছে গত বছরের ৩০ জুন।

মোয়াজ্জেম হোসেনের গ্রামের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিয়াজুলের বাবা মহম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুরের দহিন পাড়ার কৃষিশ্রমিক আজিজার মণ্ডল। তিন একসময় কৃষিশ্রমিক ছিলেন। জেলা সদর থেকে মহম্মদপুরের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। বিনোদপুরের দহিন পাড়া সড়কের পাশেই রিয়াজুলের বাড়ি। বাড়িটির এক ভিটায় একটি টিনের পুরোনো ঘর, অন্য ভিটায় ছোট একটি রান্নাঘর। ভেতরে চৌকি, একটি খাট আর পুরোনো একটি শোকেস বাদে আসবাব বলতে তেমন কিছুই নেই।

সেখানে রিয়াজুল ও মোয়াজ্জেমের বাবা আজিজার মণ্ডলের সঙ্গে কথা হয় আজকের পত্রিকার। এই সময় আজিজার তাঁর ছাগলের জন্য ঘাস কাটছিলেন। ঘাস কাটতে কাটতেই জানান, তাঁর তিন ছেলে ঢাকায় থাকেন। তাঁদের রোজগারেই সংসার চলে। তিনি বাড়িতে তিনটি ছাগল পালন আর কৃষিকাজ করেন। নিজের জমিও খুব একটা নেই।

দহিন পাড়ায় ও আশপাশের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে আজকের পত্রিকা। তবে নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, আজিজার মণ্ডল একসময় মানুষের জমিতে কাজ করতেন। ভিটেবাড়ি ছাড়া কিছুই ছিল না। বছরখানেক তাঁদের অবস্থা ফিরেছে, তাঁর (আজিজার) ছেলেরা বাড়িতে নিজের গাড়ি নিয়ে আসেন।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তাঁর এপিএস মোয়াজ্জেমের ‘শতকোটি’ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আসে দুদকে। পরে অভিযোগটি অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অজ্ঞাত কারণে অনুসন্ধানটি মাঝপথে থমকে যায়। এমনকি এই অভিযোগ নিয়ে কথা বলছেন না খোদ দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বৈধ আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ থাকলে দুর্নীতির মামলা করে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া এ অবৈধতার সূত্র হিসেবে যদি উপদেষ্টার এপিএসের যোগসাজশসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য থাকে, এমনকি উপদেষ্টার পরোক্ষ কোনো ভূমিকা বা দায়িত্বহীনতা থাকে, সে ক্ষেত্রেও গভীরতর তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগে বিষয়ে রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার দুইটা গাড়ি আর ব্যাংকের কিছু টাকার এফডিআর ছাড়া আর কিছুই নাই। থাকলে দুদক তো মামলা করত।’ আয়কর নথিতে কোটি টাকার ব্যবসায়িক মূলধন দেখানোর বিষয় জানতে চাইলে রিয়াজ বলেন, ‘এটা আসলে আইনজীবী করেছে, আমি তো জানি না। আমার সব মিলিয়ে ৮০ লাখ টাকার বেশি সম্পদ হবে না।’

দুদকের লিগ্যাল শাখার একজন কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে জানান, এ ধরনের ক্ষেত্রে অপরাধীর সঙ্গে তাঁকে সহায়তায় জড়িত থাকা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হয়ে থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ১০৯ ধারায় দুর্নীতির অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনা, অপরাধ সংঘটনে সহযোগীদের আসামি করার সুযোগ রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত